চিত্রায়ন হয় না এমন দশটি উপন্যাস

উপন্যাসকে চলচ্চিত্রে যথাযথ রূপায়িত করা কিনা, সেটা নিয়ে মেলা বাদ-বিবাদ আছে। এখানে যথাযথ শব্দটি চলচ্চিত্র উপন্যাসটি আবেদন ধরে রাখতে পারে কিনা সেই প্রশ্ন। একই সাথে উপন্যাসের আছে পাঠককে কল্পনা করতে দেয়ার কুহকী ক্ষমতা। ফলে পাঠক কোন উপন্যাস পড়ে যেভাবে কল্পনা করেন- তাকে সন্তুষ্ট করার বিষয়ও থাকে এতে। সম্প্রতি ব্রিটেনের টেলিগ্রাফ পত্রিকা দশটি উপন্যাসের তালিকা ছাপিয়েছে। বলা হচ্ছে- এগুলোকে চলচ্চিত্রে রূপায়িত করা সম্ভব নয়। কিন্তু আয়রনি হলো এই দশটি উপন্যাসই চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়েছে।এর মধ্যে তিনটি ২০১২ সালে মুক্তি পেয়েছে। সমালোচক ও দর্শকদের মনও কেড়েছে। ডন কুইক্সোট ছাড়া এই তালিকার বাকি উপন্যাসগুলো ইংরেজিতে লেখা। ফলে ওয়ার এন্ড পিস, আন্না ক্যারেনিনার বা অল কোয়ায়েট ইন দ্য ওয়েস্টান ফ্রন্টের মত ক্লাসিকের নাম সেখানে নাই।

ক্লাউড এটলাস (Cloud Atlas)

Cloud-Atlas_2482420kডেভিড মিচেলের এই উপন্যাসটি ২০০৪ সালে প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসে ছয়টি ঘটনাকে জুড়ে দিয়ে বিস্তৃত হয়েছে। এই ঘটনাগুলোর সময়কাল উনিশ শতককে শুরু করে ভবিষ্যত- যখন মানব সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায়। এই উপন্যাস বিভিন্ন সময়কার মানুষের সম্পর্ক ও পারিপাশ্বিকতাকে বর্ণনা করে। সেখানে দেখা যায় তুচ্ছ বিষয়ও কি করে ভবিষ্যতের গতিপথ ঠিক করে দেয়। ম্যাটিক্স ট্রিলজিখ্যাত লানা ও এণ্ডি ওয়াকস্কি সাথে ২০১২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন রান লোলা রান চলচ্চিত্রের পরিচালক টম টাইকার। অভিনয় করেছেন টম হ্যাংকস, হেলি ব্যারি ও জিম ব্রডবেন্টসহ অনেকে। বক্স অফিসে সুবিধা করতে না পারলেও চলচ্চিত্র ভালো ও বাজে চলচ্চিত্র আকারে নাম কামিয়েছে।

লাইফ অব পাই (Life of Pi)

Life-of-Pi_2482423kএই উপন্যাসটির জন্য ইয়ান মার্টেল বুকার পুরষ্কার জিতেন। ২০০১ সালে প্রকাশের পর থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা হয়ে থাকে। জাহাজডুবির পর নৌকায় আশ্রয় নেয়া এক কিশোর আর  কিছু চিড়িয়াখানার জন্তু নিয়ে এই উপন্যাস। পরিচালক অ্যাং লি তার কাজ কিছু দিন বন্ধ রাখেন। তিনি এই চলচ্চিত্রের জন্য ১০০ মিলিয়ন ডলারের উপরে বাজেট চেয়েছিলেন, যা এডাপশনের জন্য অনেক বেশি। চলচ্চিত্রটি ২০১২ সালের নভেম্বরে মুভি পেলে এই পর্যন্ত ৫৫০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি আয় করেছে। সেরা চলচ্চিত্র ও সেরা পরিচালকসহ এটি ১১টি বিভাগে একাডেমি পুরষ্কারের মনোনয়ন লাভ করে। এরমধ্য থেকে সেরা পরিচালক, সেরা সিনেমাটোগ্রাফি, সেরা অরিজানাল স্কোর, সেরা ভিজুয়াল এফেক্টস-র পুরষ্কার জিতে নেয়।

ডন কুইক্সোট (Don Quixote)

Don-Quixote_2482422kমিগুয়েল ডি সারভেন্তেসের ক্লাসিক উপন্যাস ডন কুইক্সোট সম্পর্কে বলা হয় এটি চলচ্চিত্র নির্মানের জন্য অতি দীর্ঘ ও জটিল কাহিনী। ওল্ড স্পেনিশে লেখা এই উপন্যাসটির প্রথম ভলিউম প্রকাশিত হয় ১৬০৫ সালে।  জটিল সত্ত্বেও সিটিজেন কেইন (১৯৪১)খ্যাত ওরসন ওয়েলেস একে চিত্রায়িত করার কাজ শুরু করেন ১৯৫৭ সালে। কিন্তু আর্থিক সমস্যার কারণে প্রজেক্টটি তাকে বন্ধ রাখতে হয়। পরবর্তীতে দশক জুড়ে কাজ চালিয়ে গেলে ১৯৮৫ সালে ওরসন যখন মারা যান তখনো চলচ্চিত্র অসমাপ্তই থেকে যায়। পরবর্তীতে ‘টুয়েলভ মাংকিস’-র পরিচালক টেরি গিলিয়াম দুইবার চেষ্টা করেন। প্রথমবার জনি ডেপ ও জিন রচারফোর্ট কে নিয়ে ২০০০ সালে, দ্বিতীয়বার ইয়ান ম্যাকগ্রেগর ও রাবর্ট ডুবলকে নিয়ে ২০০৮ সালে। কোনটিই নির্মিত হয় নাই। তবে তিনি হাল ছাড়েন নাই। তার ভবিষ্যত প্রজেক্ট হিসেবে এখনো আছে। ২০০০ সালের ব্যর্থতা নিয়ে ২০০২ সালে জেফ ব্রীজেস নির্মাণ করেন লস্ট ইন লা মাঞ্চা (Lost in La Mancha) নামের ডকুমেন্টারি।

হোয়ার দি ওয়াইল্ড থিংকস আর (Where the Wild Things Are)

Where-The-Wild-Thi_2482424kমরিস সেনডাক-র শিশুতোষ বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৬৩ সালে। অলংকরণ করা এই বইটি ইত্যমধ্যে ওপেরাসহ নানা মাধ্যমে রূপান্তরিত হয়েছে। বাক্য বিন্যাস এবং অনন্য ইলাস্ট্রেশনস চলচ্চিত্রায়নের কাজকে কঠিন করে দেয়। চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রতিষ্ঠান পিক্সারের স্থপতি জন লেসস্টার ১৯৮০ সালে চিত্রায়নের প্রজেক্ট নিয়েছিলেন। সে সময়ের জন্য এই পরিকল্পনা কঠিনই ছিল। পরবর্তীতে সেনডাক পরিচালক হিসেবে  স্পাইক জনজিকে নির্বাচন করেন। স্টুডিও-র অনিচ্ছা, শিশুদের জন্য ভীতিকর কিছু হবে কিনা তার অডিয়েন্স টেস্টের কারণে নির্মাণ পিছিয়ে যায়। চলচ্চিত্রটি ২০০৯ সালে মুক্তি পায় এবং প্রশংসা লাভ করে।

ইউলিসিস (Ulysses)

Ulysees_2482425kজেমস জয়েসের এই এপিকটি (১৯২২) নানা কারণে চলচ্চিত্রায়নের জন্য ভীতিকর। সাহিত্যিক দিক থেকে এটি এতো প্রত্যাশাকে ধারণ করে যে, চলচ্চিত্রায়ন অনেক ক্ষেত্রে অচিন্তনীয়ই মনে হয়। এছাড়া আছে চরিত্র ও স্থানের বারংবার পিছলে চলা এবং একই সাথে এক ঝাঁক বিশেষ ধরণের প্রযুক্তির দরকার পড়ে এর জন্য। প্রাথমিকভাবে এক্স রেটিং পেলেও ১৯৬৭ সালের জোসেপ স্টাইকের মুভিটি সে অসম্ভবকেই ধারণ করে। এটি ১৯৬৮ সালের অস্কারে সেরা চিত্রনাট্যের মনোনয়ন পেয়েছিল।

লর্ড অব দ্য রিংস (Lord of the Rings)

Lord-of-the-Rings_2482426kজে কে টোলকেইনের এই ত্রয়ী উপন্যাসের (১৯৫৪-১৯৫৫) লিজেন্ডারি অনুসন্ধানের জন্য যে ধরণের প্রযুক্তির দরকার, ধারণা করা হচ্ছিল চলচ্চিত্রায়নের সময়কালে তা সম্ভব নয়। কিন্তু পিটার জ্যাকসন সেই চ্যালেঞ্জটা নেন এবং চলচ্চিত্রের ইতিহাসে খুব সেলিব্রেটেট ট্রিলজিটা নির্মাণ করেন। এই ট্রিলজিটি প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার কামিয়ে নেয়। মোট ১৭টি অস্কার পুরষ্কার জেতে। ২০১২ সালে পিটার জ্যাকসন এর প্রিকুয়েল হবিট ট্রিলজি-র প্রথম পর্বটি মুক্তি দেয়। দর্শকরা এটিও লুফে নেয়।

অন দ্য রোড (On The Road)

On-the-Road_2482427kএই উপন্যাসের কাহিনী লেখক জ্যাক কেরুর আমেরিকাময়  ভ্রমন নিয়ে। ‘গডফাদার’খ্যাত ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা চলচ্চিত্রটি নির্মাণের জন্য ১৯৭৯ সালে এর সত্ত্ব কিনে নেন। কিন্তু তিনি বানাতে গিয়ে ব্যর্থ হন। কপোলার জন্য এই উপন্যাসের সময়কে ধরা কঠিন সমস্যা হয়ে দাড়ায়। তিনি বলেন:  ‘Anything involving period costs a lot of money.’ পরবর্তী প্রচেষ্টায় এতে যুক্ত হন ব্রড পিট ও কলিন ফেরেল। ২০১২ সালে গ্যারট হ্যাডলুণ্ড ও ক্রিস্টের স্টয়ার্টের অভিনয়ে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন পরিচালক ওয়াটার সেলার্স। এটি সমালোচকদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া লাভ করে।

দ্য সাইলেন্স অব দি ল্যাম্বস (The Silence of the Lambs)

Silence-of-the-Lam_2482429kটমাস হ্যারিসের ১৯৮৮ সালের ক্লাসিক থ্রিলার উপন্যাসটি চলচ্চিত্রায়িত করা সম্ভব নয়- বলে এক ধরণের ঘোষণায় ছিলো। এর ভায়ালেন্স ছিলো অনুমান অযোগ্য এবং রূপায়িত করা মানে একে কোন একটা নির্দিষ্ট ফ্রেমে আটকে ফেলা। এমনই ছিলো ধারণা। কিন্তু জোনাথন ডেমির আয়রণিক চলচ্চিত্রটি অসাধারণভাবেই উপন্যাসের কোনকিছুই হারিয়ে যেতে দেয় নাই। কোন ডিটেইলসই বাদ যায় নাই অনুভূতিপ্রবণ এই চলচ্চিত্রে। এন্থনি হপকিন্স ও জুডি ফস্টার অভিনীত এই চলচ্চিত্র ইতিহাসে সেই তিনটি চলচ্চিত্রের একটি যেটি সেরা ৫টি বিভাগে অস্কার জিতেছিল: সেরা চলচ্চিত্র, সেরা অভিনেতা, সেরা অভিনেত্রী, সেরা পরিচালক এবং সেরা লেখা (এডাপ্টেড চিত্রনাট্য)।

এ কক এণ্ড বুল স্টোরি (A Cock and Bull Story: Tristram Shandy)

A-Cock-and-Bull-St_2482419kট্রিটাম স্যান্ডিকে নিয়ে লরেন্স স্টেন-র উপন্যাস। বিষয় স্যান্ডি তার আত্ম-জীবনী লিখতে গিয়ে ব্যর্থ  হয় এবং যাকে তুলনা করা হয় ডন কুইক্সোটের জটিলতার সাথে। এই বই থেকে এডাপ্ট করে চলচ্চিত্র বানান মাইকেল উইন্টারবটম এবং ফ্যাঙ্কি কটের্ল বয়েস। ‘মকুমেন্টারি’ আঙ্গিকে নির্মিত চলচ্চিত্রটিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন স্টিভ কোগান। আত্মজীবনী লেখার ব্যর্থতার পরিবর্তে এই চলচ্চিত্রের মনোযোগ ছিলো তার জীবন নিয়ে চলচ্চিত্র বানানোর ব্যর্থতা নিয়ে।

নো কান্ট্রি ফর ওল্ড ম্যান (No Country for Old Men)

No-Country-For-Old_2482432kকরম্যাক ম্যাকার্থি-র একই নামের উপন্যাস থেকে বানানো চলচ্চিত্রটির কাহিনী অন্ধকার জগত নিয়ে। যেখানে প্রতিমুহুর্তে কারো না কারো রক্ত ঝরছে। কোয়েন ভাইদের বিশ্বস্ত চলচ্চিত্রায়নটি বক্স অফিসে ১৭০ মিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করে নেয়। জশ ব্রলিন এবং হেভিয়ার বারদেমের অসাধারণ অভিনয় সাহায্য করে ২০০৭ সালের অস্কারে সেরা চলচ্চিত্র ও সেরা পরিচালকসহ মোট চারটি পুরষ্কার জিতে নিতে।

> আরো পড়ুন: ইচ্ছেশূন্য মানুষ । মুভি

>ফটো: ইন্টারনেট

Comments

comments

5 thoughts on “চিত্রায়ন হয় না এমন দশটি উপন্যাস

  1. ক্লাউড এটলাস, লাইফ অব পাই, লর্ড অব দা রিংস দেখেছি। আমার কাছে খারাপ লাগেনি। যদিও মূল উপন্যাস পড়ার সৌভাগ্য হয়নি তাই এক্সপেক্টেশনও তেমন ছিলনা।

    • লাইফ অব পাই কিছুটা পড়েছিলাম। তবে আপনার দেখা মুভিগুলো দেখেছি। আমারও ভালো লেগেছে।

      ইচ্ছেশূন্য মানুষ ব্লগে স্বাগতম। ভালো থাকুন।

  2. Pingback: পাইয়ের লগে এক নৌকায় | ইচ্ছেশূন্য মানুষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *