বনের কোকিল

এক.

সমুদ্রকে বলতাম দইজ্যা আর সমুদ্রের পাড়কে দইজ্যার কুল। পাহাড়কে বলতাম মুড়্যা। আমরা দুই ভাই-বোন দাঁত দিয়ে নখ কাটতে কাটতে সমুদ্র আর পাহাড়ের শ্রেষ্টত্ব  নিয়ে ঝগড়া করতাম। এ ঝগড়া প্রতিদিন হতো। পাহাড় হলো ভাই আর সমুদ্র হলো বোন।

ঝগড়া নিয়ে মা-র আপত্তি না থাকলেও দাঁত দিয়ে নখ কাটার অভ্যাসটা মা একদম পছন্দ করত না। মা যদিও পরীর মতো মেয়ে নীলুকে কিছু বলতেন না। নীলু আবার পাহাড়, সমুদ্র দুই পক্ষের। মায়ের ভয়ে আড়ালে দাঁত দিয়ে নখ কাটতাম। মা পেটের অসুখের কথা বললেও আমাদের স্বাস্থ্য বরাবরই ভালো ছিলো। নীলুরও বোধহয় ছিলো। নীলু অবশ্য তার কোন সমস্যার কথা খুলে বলত না। ওর মধ্যে গায়েবী ব্যাপার-স্যাপার ছিলো।

প্রথমবার যখন দেখি – মাটির দিকে চোখ আর দাঁত দিয়ে নখ কামড়াচ্ছিল। প্রথম প্রথম ভাবতাম তার নখ কেটে দেয়ার কেউ নাই। তাই এমন করে। পরে বুঝলাম এমনি এমনিই করত।

নীলু আমার চাচাতো বোন। আমার বয়স যখন নয় বছর, সেবার নীলুকে প্রথম দেখি। ওর বয়স সম্ভবত আট।

নীলু আমার বাবার পিছন পিছন ঘরের দাওয়ায় উঠে আসে। গুটিসুটি মেরে দাড়িয়ে ছিলো। মা বাড়ি ছিলো না। আমি আর আপু বারান্দায় বসে লুডু খেলছিলাম আর সমুদ্র আর পাহাড়ের শ্রেষ্ট্ত্ব নিয়ে গোপন রেষারেষি চলছিল। বাবা যে কখন তাকে নিয়ে ঘরের দাওয়ায় উঠলেন আমরা টেরই পায় নাই।

‘খোকা তোর মা কইরে?’
আমরা ফিরে তাকাই। তখনই নীলুকে দেখি। আপা নীলুর উপর থেকে চোখ না ফিরিয়ে উত্তর দেন- ‘দক্ষিণ বাড়ি গেছে’।
‘এটা তোর আজাদ চাচার মেয়ে। আমাদের সাথে থাকবে। ওর নাম নীলু’।
আমরা কিছু বলি না। বাবা বলে যান- ‘নীলু এরা তোমার ভাই বোন। সুরুজ আর জোসনা’।

আপু এগিয়ে বাবার হাত থেকে নীলুর ব্যাগটা নেন। বাবা জোসনাকে মোড়া টেনে দিয়ে বলে- ‘এখানে বসো। এই মেয়ে এতো লজ্জা পাচ্ছ কেন? বস। এটা তোমারও বাড়ি। এই বারান্দায় বসে আমরা দুই ভাই এদের মতো করে খেলতাম। আমাদেরও একটা বোন ছিলো। নাম ছিলো আসিয়া। আমরা ছিলাম তিন ভাইবোন। তোমরাও তিন ভাইবোন’।

বাবাকে বিষস্ন দেখায়। তিনি সাধারণত এতো কথা বলেন না। চুপচাপ মানুষ। কাপড় বদলে হাত মুখ ধুতে গেলেন। আমি চুপচাপ দাড়িয়ে আছি। সেই সময়ও নতুন কারো সাথে আমার কথা বলতে অস্বস্থি লাগত। তাকাতেই পারতাম না। কিন্তু এটা আমাদের আরেকটা বোন। তার সাথে তো কথা বলতেই হয়। কি কথা বলি!

‘তোমার নাম কি’?
নীলুর চোখের পাতা একটু কাঁপে যেন। আমি লজ্জা পেয়ে বলি- ‘নীলু তো তোমার ডাক নাম। আসল নাম কি? আমার নাম রোকনুদ্দৌলা সুরুজ। ক্লাস থ্রি-তে পড়ি। সবুজ শিক্ষায়তন উচ্চ বিদ্যালয়’।

হড়বড় করে অনেকগুলো কথা বলে আবার বিব্রত হই। নীলু যেন কথাই বলবে না। তারপর কি মনে করে রিনরিনে কন্ঠে বলে- ‘নীলুফার ইয়াসমিন। মা ডাকত টিয়া। ক্লাস টু-তে পড়ি’।

আর কিছু বলে না। আমিও বলি না। দুইজনেই নখ কামড়াতে কামড়াতে পায়ের আঙ্গুল দিয়ে মাটিতে দাগ কাটতে থাকি। আমরা কেউ কারো দিকে তাকাই না কিন্তু বুঝতে পারি তাকিয়ে আছি। কিভাবে?

আপা এসে নীলুকে ডাকেন- ‘নীলু হাত মুখ ধুয়ে নাও। ভাত খাবে এসো’।

নীলু আপার পিছু পিছু ঘরে ঢুকে। খেয়াল করলাম ছোট্ট একটা ব্যাগ আপার হাতে। এটাই ছিলো নীলুর একমাত্র সম্বল। আমি তাকিয়ে থাকি। নীলু ফিরে তাকায় না। নীলু চলে গেলে মনে হয় – এখানে কেউ ছিলো না। কি অদ্ভুত ব্যাপার। একটু লজ্জা পাই।

বাবা কখন যে সামনে এসে দাড়িয়েছে টের পাই না। তিনি বলেন- ‘কিরে ভোম্বলের মতো দাড়িয়ে আছিস কেন্? কি চিন্তা করিস’?
‘কিছু না’।
‘যা, বাইরে যা। খেলাধূলা কর’।

হাটতে হাটতে মাঠের দিকে যায়। শফিক আর তমাল ফুটবল নিয়ে আসছে। আর কেউ নাই। আমরা তিনজন একই ক্লাসে পড়ি। মোটামুটি এই সাথে চলে ফেরা। বন্ধু আর কি! কিন্তু আমি বন্ধু বললে কেমন যেন লজ্জা পেতাম। কেন? আল্লায় মালুম।

প্রতিদিন এই সময় পাড়ার সব পোলাপান একসাথে হয়।

শফিক বলল- ‘সবাই বলী খেলা দেখতে গেছে’।
‘কোথায়’?
‘সমুদ্রের পাড়ে’।
তমাল বলে- ‘চল আমরাও যাই’।

আমার দীঘির পাড় ধরে হাটতে থাকি। শফিক কোমড় থেকে গুলতি নিয়ে পাখিদের গায়ে মারতে মারতে হাঁটে।

আমি হঠাৎ বলে উঠি, ‘আমার নতুন একটা বোন এসেছে। নাম নীলু’।

ওরা কোন আগ্রহই দেখালো না। আমি খুব বিরক্ত হই।

দুই.

আমার বাবারা দুই ভাই। শামুসদ্দোজা ও বদরুদ্দোজা। তাদের বোন আসিয়া খুব ছোট বয়সে মারা গেছেন। দাদীও অল্প বয়সে মারা গেছেন। দাদা আর বিয়ে করেন নাই। একলায় ছেলে মেয়েকে লালন পালন করেন। সব ভাইবোনদের মধ্যে দুরন্ত ছিলেন চাচা। তিনি পালিয়ে অন্য ধর্মের মেয়েকে বিয়ে করেন। কড়া মেজাজী দাদা মেনে নিতে পারেন নাই। চাচাকে তাজ্য করেন। বাবা বলেন- শরীয়ত মতে সন্তানকে তাজ্য করা যায় না। যাইহোক, চাচা আর বাড়ি আসেন না। শোনা যায়, তিনি ঢাকা শহরে থাকেন। প্রথম দিকে বাবার সাথে যোগাযোগ ছিলো। আস্তে আস্তে সেটাও ধূসর হয়ে আসে। এর মাঝে দাদাজান ইন্তেকাল করেন। চাচাকে সেই সংবাদ দেয়া যায় নাই। মৃত্যুকালেও দাদাজান চাচাকে ক্ষমা করতে পারেন নাই। আমার মায়ের মতে, সেটা ছিলো তার শ্বশুরের হঠকারিতা। চাচাজানও নাকি সেই কড়া ধাতের ছিলেন। তিনি কোনভাবেই বাপের কাছে ক্ষমা চাইবেন না। তিনি কোন ভুল করেন নাই। আমি ভুল শুদ্ধ ধরতে পারি নাই। তবে বিয়ে- কি লজ্জার বিষয়। তাও পালিয়ে।

খবরটা আমরা মাস দুয়েক পরে পাই। আমার চাচা ও চাচী সড়ক দুঘর্টনায় মারা গেছেন। বাবা যোগাযোগ করার পর চাচার এক বন্ধু নীলুকে আমাদের কাছে দিয়ে যায়। এই হলো নীলু কাহিনী। মা নীলুকে সহজভাবে গ্রহন করেন। তাকে আলগা কোন খাতির কোন যত্ন করেন না। আমাদের নিয়ে তার আলগা কোন দরদ দেখি নাই। অবিশ্বাস্য হলেও মা আমাদের কোন দিন মুখে তুলে ভাত খাইয়েছেন এমন স্মৃতি মনে পড়ে না।

আমি আর আপু তো প্রথম প্রথম সারাদিন নীলুকে চোখে চোখে রাখতাম। ও আমাদের চেয়ে একদম আলাদা। শহরের মেয়ে দেখার সুযোগ আগে তেমন পাই নাই। এটা সেটা চিনিয়ে দিতাম। কিন্তু মা বলতেন, এটা তো তারও বাড়ি, চেনানোর কি আছে। তাছাড়া মেয়েরা নাকি সহজে যেকোন কিছুতে মানিয়ে নিতে পারে। মা কথাগুলো যত সহজে বলতেন, আসলে তত সহজ না। তার চোখের দিকে তাকালে স্নেহের গাঢ় ছায়া দেখা যেত। নীলুও সেটা টের পেয়েছিল। মা চাচাকেও খুব পছন্দ করতেন। প্রায় তার গল্প বলতে বলতে তার চোখ ভিজে যেতো। তাই আমাদের সংসারে অসংকোচ হতে নীলুর সময় লাগে নাই।

প্রথমদিনই নীলুর সাথে আমার ভাব হয়ে যায়। বলী খেলা থেকে নীলুর জন্য একটা পুতুল কিনে এনেছিলাম। আমার কাছে টাকা ছিলো না। সোলাইমানের কাছ থেকে ধার নিয়ে ছিলাম। মুখে কিছু না বললেও পুতুল বেশ শক্ত করেই ধরে রেখেছিল। ধরা দেখে বুঝা যায় সে খুব খুশি হয়েছে। পুতুলটাও তার বালিশে মাথা রেখে ঘুমাতো।

‘আমার একটা কোকিল ছিলো’।

নীলুর মুখে কথাটা শুনে অবাক হই। মানুষের বাড়িতে ময়না, টিয়ে, ঘুঘু-র থাকে শুনেছি। নীলুর কাছে ছিলো কোকিল। আমার চেহারায় বিস্ময়ের ছাপ দেখে নীলু বলে- ‘সত্যি। আব্বু এনেছিলো। কোকিল নাকি কখনো মাটিতে নামে না। তাই আমরা তাকে সবসময় খাঁচার রাখতাম’।
‘তারপর’?
‘কোকিলটার মনে খুব দুঃখ ছিলো। আব্বু বলত, মা বাবা ছেড়ে বন্দী হয়ে গেছে- তাই এতো দুঃখ’।
‘কোকিলটা এখন কই’?
‘ছেড়ে দিয়েছি। সে তার মা বাবার কাছে চলে গেছে। সে আমাকে খুব পছন্দ করত। সে বলেছে আম্মু-আব্বুর পথ চিনিয়ে আমাকে নিতে আসবে’।
‘কবে বলেছে’?
‘কাল’।
‘কাল’?

নীলু কোন কথা বলে না। কেমন উদাস হয়ে দূরে তাকিয়ে থাকে। দাঁত দিয়ে নখও কাটে না। আমি আর কিছু জিগেস করি না। কিন্তু মনের মধ্যে প্রশ্ন থেকে যায়। নীলুকে আমার কোকিল কোকিল মনে হয়। সেও একদিন উড়াল দিবে। সেদিন রাতে স্বপ্ন দেখি নীলু কোকিল হয়ে আমাদের আম গাছের ডালে বসে আছে। আমি তাকে ধরতে যায়- সে আকাশে উড়াল দেয়। আমি কেঁদে উঠি। পাশের খাট থেকে আপু উঠে আসে।

‘কিরে কি হইছে’?
আমি চুপ করে থাকি।
‘স্বপ্ন দেখছস’?
মাথা নাড়ায়।
‘কি স্বপ্ন..  থাক রাতে বলার দরকার নাই। তুই চোখ বন্থ কর। আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিই’।

দেখি পাশের খাট থেকে চোখ বড় বড় করে নীলু তাকিয়ে আছে। আমি নীলুর মধ্যে কোকিল হবার কোন লক্ষণ দেখি না। নিশ্চিন্তে চোখ বন্ধ করি।

তিন.

আমরা কেউ খেয়াল করি নাই প্রথমে দিকে। কিন্তু ক্রমেই ধরা পড়ল নীলু দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে। বাবা ডাক্তারের কাছে নেন। ডাক্তার বলে কোন সমস্যা নাই। ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করার কথা বলেন। ভিটামিন দেন। বলেন- সবসময় যেন হাসি খুশি থাকে। প্রায় দেখি মা নীলুকে কোলে নিয়ে এটা সেটা খাওয়াচ্ছেন। দুপুরবেলা নীলু মাকে জড়িয়ে ঘুমাতো। আমার হিংসে হতো না- এমন না। নীলু এতো মায়াবী যে কখনো সেই হিংসে জোরালো হয়ে উঠে নাই।

আপা একদিন বলল- ‘নীলু একা হইলে কান্নাকাটি করে । আর বলতে থাকে- আমারে নিয়া যাও’।

নীলু আমাকে একদিন বলল- পাখির তো পাখা আছে। তাই সে দুনিয়ার সব জায়গা যেতে পারে। তার মা-বাবা নাকি খুব সুন্দর একটা দেশে চলে গেছে। কিন্তু তারা নাকি নীলুর খবর নিতে পারে না। শুধু নীলু যখন ঘুমিয়ে তখন এসে দেখে যায়। নীলু কোকিলের উপকার করেছে। কোকিল নাকি একটা উপকার করবে। পথ চিনিয়ে নীলুকে আল্লাহর দেশে নিয়ে যাবে।

আমি বলি- ‘না। মানুষ মরে গেলে ফেরত আসে না। যেদিন কোয়ামত হবে সেদিন সবার সাথে দেখা হবে। বেহেশতে আমরা সবাই এক সাথে থাকব। দাদাজানও চাচার উপর রাগ করে থাকবেন না’।

নীলু মন খারাপ করে। কিছু বলে না। আমারও খুব খারাপ লাগে। তাকে এ কথা বলা ঠিক হয় নাই।

মা বলেন- ‘তোমাকে এতো পাকা পাকা কথা বলতে কে বলেছে? এইসব তার কল্পনা। দুইদিন পরেই ভুলে যাবে। আমরা আছি না’।

মা নীলুকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। রান্না ঘরের বাইরে এসে নীলূকে জিগেস করেন- সে কিছু খাবে কিনা। আর আমি সে বয়েসেই বুঝে গিয়েছিলাম সব সময় সত্য কথা বলতে নাই। তার কথাটা তার আপুকে বলি না।

আবার যথারীতি আমরা দাওয়ায় বসে খেলতে থাকি।

‘খোকা ভাই, তোমাকে একটা কথা বলি। কাউকে বলতে পারবা না।‘।
‘কি কথা’।
‘আগে তিনসত্যি বলো- কাউকে বলবা না’।
‘আচ্ছা তিন সত্যি।‘

নীলু দম নিয়ে কোকিলের গল্প শুরু করে।
‘কোকিলটা আমায় বাচিয়ৈছিলো’!
‘হুমম’।
‘আমরা সবাই মিজান চাচার গাড়িতে চড়ে বেড়াতে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি আমার কোকিলটা গাড়ির সাথে সাথে উড়ছে। আমি মাকে বলতে চাচ্ছিলাম। তখন কোকিলটা চোখ টিপে বলে নীলু তোমার মাকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ো’।

নীলু কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।

এরপর আর আমি ঘুম থেকে উঠে দেখি আমরা পানিতে ডুবে যাচ্ছি। সবাই চিৎকার করছে। মা বলছেন- ‘আল্লাহ আমার মেয়েকে বাঁচাও। তার জীবন ভিক্ষা চাই। তোমার কাছে আর কিছু চাই না। তখনি.. কোকিলটি এসে বলে নীলু মাকে ছেড়ে দাও। এরপর মনে নাই..’।
তারপর সে বলে- ‘আমি জানি কোকিল এসে আমাকে আবার নিয়ে যাবে..’।

কিন্তু আমি তা চাই না। আমি চাই নীলু সবসময় আমাদের সাথে থাকুক। তবে কোকিলটা দেখতে পেলে খুব ভালো লাগত। আমিও স্বপ্নকাতর হই। ঘুমালেই সেই কোকিলটা যেন আমার শিয়রে এসে বসে থাকে।

একদিন স্কুল যাচ্ছিলাম। কুহুকুহু শব্দ শুনি। আমি উপর দিকে তাকায়। কোথাও পাখিটিকে দেখতে পাই না। ক্লাশে মনোযোগ দিতে পারি নাই। স্যার কি বলে কিছুই কানে ঢুকে না। শুধু কোকিলের গান। স্যার কি জিগেস করে আর কি উত্তর দিই, তার ঠিক নাই। আবার বাসায় ফিরতে গেলেই সেই কুহুকুহু। অসহ্য লাগে। আমি বাসায় ফিরে আম্মাকে বলি- ‘একটা কোকিল আসছে নীলুকে নিয়ে যেতে’।
‘বোকা ছেলে- কোকিল কি কাউকে নিয়ে যেতে পারে। আর আশ্বিন মাসে কোকিলের ডাক কই পাইছস। কোকিল ডাকে চৈত-ফাগুন মাসে’।
‘আমি শুনছি…’।
বাবা বলেন- ‘বাচ্চাদের খেয়াল। বাদ দাও’।
আমি নীলুকে বলি- ‘কোকিলটা আমার কাছে আসছিলো। তবে দেখতে পাই নাই’।
‘খোকা ভাই। বানাইয়া বানাইয়া গল্প বলবা না। তাইলে গুনাহ হয়।

আমি রেগে যাই। কিন্তু নীলুর এক কথা। এটা তার কোকিল, তার সাথে ছাড়া আর কারো সাথে দেখা দিবে না।

কল্পনা হোক আর যাই হোক এটা একদিনের মধ্যে উবে যাই। আমার রাগ আর হিংসা দুইয়েই হয়। ইস আমার যদি একটা কোকিল থাকত। আমার মন খারাপ হয়েছে দেখে হয়তো সে কারণে নীলু বলে- ‘খোকা ভাই, চলো সমুদ্রের পাড়ে যাই। বাবার মুখে কতো গল্প শুনেছি…’।
‘চলো’।

মাকে বলে আমরা দুজন হাঁটতে থাকি। পথে শফিকের সাথে দেখা। আবার খুব ভালো লাগে। সাথে আমার নতুন বোন। কিন্তু সে আমাদের পাত্তায় দেয় না। পরের কয়েকদিন ক্ষেপিয়ে মারে। মেয়ে মানুষের সাথে হাটেঁ। লজ্জা নাই। আমি খুব বিরক্ত হয়ে বলি- ‘এ্যা.. তোর তো ছোট বোন নাই। থাকলে বুঝতি’।

আসলেই।

সেদিন সমুদ্রের পাড়ে যেতে যেতে আমি আর নীলু কত যে কথা বলি। নীলু হড়বড়িয়ে তার স্কুল, স্কুলের বন্ধু, স্বপ্নের কথাগুলো বলে। আমিও তার কথা শুনতে শুনতে কোকিলের কথা ভুলে যায়।

একসময় আমরা সমুদ্রের ঢেউ গুনা খেলি। আমি নীলুর চেয়ে পাঁচটা বেশি ঢেউ গুনে ফেলি। নীলু যা বুদ্ধি। ও বলে বসে- ‘আমরা তো একসাথে গুনছি। তোমার ঢেউ বেশি হলো কেন’?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি না। আসলেই তো। কিন্তু আমি বলি- ‘আমি তোর চেয়ে বড়ো। তাই বেশি ঢেউ গুনেছি। তোর ছোট ছোট হাতে বেশি ঢেউ গুনবি কি করে’।

নীলু মনে হয় উত্তরটা মেনে নেয় নি। কোন কথা বলে না।

সমুদ্রের তীব্র বাতাস আমাদের শরীর ছুঁয়ে দূরে কোথাও চলে যাচ্ছিল। পারলে আমাদেরই সাথে করে নিয়ে যায়। আমরা চুপচাপ ঢেউ গুনি। ঢেউয়ের পর ঢেউয়ের। আমাদের অজান্তেই দূরে কোথাও নিয়ে গেল…।

সমুদ্রের বিশালতার মধ্যে এতো মমতা ও রহস্যতা আছে- তা যেন বিশ্ব চরাচরকে একসূত্রে বেঁধে রাখে। সেদিন তার আড়ালে আমরা লুকিয়ে পড়ি। আমি শুনায় সাদা ঘোড়ার গল্প আর নীলু শুনায় লবনকুমার।

চার.

সেদিন বাড়ি ফিরতে ফিরতে দোকানের ক্যাসেট প্লেয়ারে একটা গান শুনি, মনর কোকিল বনত গেয়ি, ফিরি নুঁ আইয়ি…।

আমরা হাসতে থাকি। আর অর্ধেক গান মুখস্ত করে ফেলি।

আরেকদিন মুখস্ত করেছিলাম- আইলো কোকিল, বইলো ডালে, শিস দি আঁরে জ্বালায় মারে…।

আমাদের মুখে এসব গান শুনে আপা কি যে রেগে যান!

সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো সময়ও কি দ্রুতই না গড়িয়ে যায়। আমরা হিসাব রাখতে গিয়ে হিমশিম খাই। একসময় হিসাব করাই বন্ধ করে দিই। হিসাব বন্ধ রাখলেই বা কি হবে। সময় ঠিকই নিজেকে জানান দেয়। সেই বছর খুব শীত পড়েছিলো। মনে আছে নীলুর জন্য বাবা টকটকে তার সুয়েটার কিনেছিলেন। বুকের কাছে একটা হলুদ রঙের গোঁফঅলা বিড়াল দাঁত বের করে আছে।

তারপর এলো বসন্ত। ততদিনে নীলু আমাদের সাথে স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে। একসাথে যাই একসাথে আসি। টক ঝাল আচার, চানাচুর, চুইংগাম ও চকলেটময় সময়গুলো ভালোই কাটছিলো।

একদিন স্কুল থেকে ফিরতেই শুনি কুহুকুহু ডাক। কানের ভুল নাকি। আবার। আবার। আবারো। এবার নীলুকে বলি- ‘শোন। কোকিল ডাকছে…’।
‘হাঁ’।
‘এটা কি তোর কোকিল’।
‘না’।

এভাবে কতো কোকিলের ডাক শুনিয়েছি তারপরও বলে কোনটা তার কোকিল না। এবার নীলু নিজেও হতাশ হয়। কোকিল বোধহয় তাকে নিতে আসবে না। আমারও মনে কষ্ট জাগে মা-বাবা ছাড়া এত ছোট একটা মেয়ে কি করে থাকবে। আমি বলতাম- ‘আল্লাহ নীলুর কোকিলটাকে পাঠাও’।

কিন্তু নীলুর কোকিলটা আসে না। বয়স নিতান্তই কম বলে নীলুর প্রতি অবিশ্বাস গাঢ় হয় না। বরং, কষ্টটা বাড়তে থাকে। নীলু চুপচাপ হয়ে যায়। আমরা প্রায়শ বিকালে সমুদ্রের পাড়ে গিয়ে ঢেউ গুনি। ঢেউ গুনায় আমাদের কারো ক্লান্তি নাই। শফিক আমাকে আরো বেশি করে ক্ষেপাতে থাকে। ভাগ্যিশ তমালের একটা ছোট বোন ছিলো। সে বোনের মর্ম বুঝত।

সে বছর গ্রীষ্মের শুরুতেই যখন গাছে আমের মুকুল বেশ বড়ো। আমরা আম গাছের নিচে বসে মধুর সময়টার জন্য তপস্যা করতাম, পুরানো ছুরিগুলোতে শান দিতাম তেমন সময়ে নীলুর খুব জ্বর হয়। গলার নিচে দুটি গোটা দেখা দেয়। নীলু বসন্ত হয়েছিলো।

নীলুকে আলাদা ঘরে রাখা হয়। হোমিওপ্যাথিক খাওয়ানো হচ্ছিল। দেখতে দেখতে আপুরও বসন্ত হয়। শুধু আমার রক্ষা। মানুষের জীবনে নাকি কমপক্ষে একবার এই রোগ হয়। আম্মা আর বাবারও হয়েছিলো। এবার আমার পালা।

ঘরের আবহাওয়া কেমন যেন বিষাক্ত লাগে। আমি নীলুর সাথে আগের মতো গল্প করি না। এটা সেটা এনে জানালা দিয়ে দিতাম। তাদের গায়ের গোটাগুলো দেখলেই আমার কেমন যেন গা চুলকাত। নীলু মাঝে মাঝে গাঢ় স্বরে কান্না-কাটি করতো। কখনো সমুদ্র পাড় দেখার আবদার, কখনো বা কোকিলটা আসে না কেন। তার নাকি কিছু ভালো লাগে না। সবাই তার সেবা করে সান্ত্বনা দেয়, শুধু আমি দূরে দূরে থাকি।

একহপ্তার মাঝে নীলু মারা যায়। ডাক্তার বলে- এমন তো হবার কথা না। তবে তার মৃত্যুর দিনটা আনন্দে কেটেছে। আমাকে খোকা ভাই বলে ডাকে। ভয় ছড়িয়ে তার পাশে গিয়ে বসি। নীলু আমায় বলে- ‘খোকা ভাই, কাল রাতে কোকিলটা এসেছিলো..’।
আমি কিছু বলি না। কিছুক্ষণ নিরব থাকার পর বলে- ‘ও নাকি পথ হারিয়ে ফেলেছিলো। তার নাকি আমার জন্য মন খারাপ হয়ে গিয়েছিলো’।

আমার কেন জানি খুব খারাপ লাগে। কি যেন আশংকা। ধরতে পারি না। নীলুকে কিছু বলি না।

নীলু মারা যাওয়ার পর প্রায় বিকেলে সমুদ্রের পাড়ে বসে থাকতাম। একদিন কোকিলটা আমার পাশে এসে বসে। আমরা কথা বলি না। পুরানো দিনের মতো ঢেউ গুনি। সে দিনও আমি পাঁচটা ঢেউ বেশি গুণেছিলাম। বাসায় ফিরে কেমন ঠান্ডা ঠান্ডা লাগে। দুই সপ্তাহ ভীষণ জ্বর। তখন কোকিলটা আসে। এই কোকিল বনের কোকিল নয়। এ আমাদের নীলু। সে ঘরের পাশের আম গাছটাতে বসত। আমি গাছ তলে দাঁড়াতাম। তার সাথে গল্প করতাম। প্রতিবার সে চলে যাবার পর আমি বলতাম আমাকে নিয়ে চলো। কোকিলটা কিছু না বলে উড়াল দিতো।

কোকিলটা চলে যাবার পরই আমার ঘুম ভাঙ্গত। ভীষণ কান্নাকাটি করতাম। উম্মাদের মতো দৌড়াদড়ি করতাম আর বলতাম- আমার কোকিলটাকে এনে দাও। কখনো কখনো ভয় পেতাম। দেখতাম ঘরের জিনিস পত্র উড়াউড়ি করছে। ডাক্তার কিছু বলতে পারে না। বাবা মৌলভীর কাছ থেকে তামার খোসায় ভরা তাবিজ এনে গলায় পড়িয়ে দেয়। ঘরে সোনা-রূপার পানি ছিটিয়ে দেন।

একসময় কোকিল আসা বন্ধ করে- আমার জ্বরও ভালো হয়ে যায়। কিন্তু আমার মন কোকিলটাকে দেখার জন্য আনচান করে। একদিন সকালে তাবিজটা পুকুরের পানিতে ফেলে দিই।

এখনো সময় পেলে সমুদ্রের পাড়ে যাই। পাহাড় হলো ভাই আর সমুদ্র হলো বোন। আমি বোনের কাছে আসি। একা অথবা দল বেঁধে। সে সমুদ্র কতো পাল্টে গেছে। কেওড়া বন নাই। শিপ ইয়ার্ডের জঞ্জালে সমুদ্র তার লাবণ্য হারিয়েছে। তবুও সমুদ্রকে পুরোপুরি ছিনিয়ে নিতে পারে নাই। সকল পঙ্কিলতা ছাড়িয়ে আমি হারিয়ে যাই। সমুদ্রের গর্জনকে মনে হয় সহস্র কোকিলের ডানার ঝাপটানি।

সব কোকিলই আসে একটি ছাড়া।

বনের কোকিল বনে চলে গেছে।
……………………………………………………………………………………………………………………………………

 

*উৎসর্গ : লাকী আপু, তিন বছর বয়সে যার হাত ধরে স্কুলে যেতাম। অনেক অনেক বছর তাকে দেখি না। তার চেহারা কেমন তাও মনে নাই। যেখানে থাকুন ভালো থাকুন।
**অলংকরণ: চাইনিজ ট্রাডিশনাল চিত্রকর্ম অনুসরণে।

 

Comments

comments

12 thoughts on “বনের কোকিল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *