দ্বিজ

সবচেয়ে ভালো লাগে দুপুরবেলা। কখনো কখনো ভাব নিয়ে বলি অলীক দুপুর, একান্ত নিজস্ব দুপুর। এজমালি দুনিয়ায় আমি এভাবেই স্বস্তি পেতে চাই। সে দুপুরটা কেমন? সবাই খেয়ে দেয়ে জিরাবে, ঘুমাবে। সূর্যের তাপ অনেকটা মরে যাবে। ছায়ারা একটু একটু করে পুবে হেলতে থাকবে। এমন দুপুরে নির্জন কোনো রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে ভালো লাগে। ছোটবেলায় পুকুর পাড়ে এমন নির্জনতা মিলত। এ মুহূর্ত বিষয়টা অন্যরকম, নিশ্চুপ রাস্তার দিকে তাকিয়ে হলের বারান্দায় কফি হাতে বসে আছি। আমার রুম নাম্বার ৪৪২। কোলের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে আছে একটা বই। মাঝে মাঝে পাখি ডাকছে। অবশ্য পাখির ডাক শোনার জন্য পাখি না ডাকলেও চলে। হঠাৎ হঠাৎ দু-একজন মানুষ হেঁটে যায়। যাদের ভুত বলে ভ্রম হয়। মনে হয়, সুন্দর করে বেঁচে থাকতে হলে ভুতকেও ভালোবাসতে হবে। এমন দুপুরে ভুত-পেত্মী সবাইকে ভালোবাসতে ভালো লাগে। আর নিজেকে?

wahedsujan.com

এক.

এমন ধ্যানী সময়ে হারাতে হারাতে আপনার একসময় মনে হবে অলক্ষে কী যেন ঘটে গেছে। আমি এভাবে ব্যাখ্যা করি- প্রতিটি প্রহরের আলাদা আলাদা আলাপ থাকে, নির্জনতা আছে, খানিকটা ঘ্রাণও। এমন না যে পাখির ডাক, হাওয়ার আসা-যাওয়া, মানুষের দীর্ঘশ্বাস দিয়ে এ শব্দ-নৈঃশব্দ্য তৈরি হয়। এটা প্রহরের নিজস্ব স্বভাবের মধ্যে থাকে। এ রকম দুপুরে আপনি হঠাৎ খেয়াল করবেন চারদিক নিস্তদ্ধ হয়ে গেছে। পাখিটি ডাকছে না, পাতাটি নড়ছে না, হাওয়ার শব্দে ভর করেছে অদৃশ্য নির্জনতা। আলোটা ঝাপসা হতে হতে একটা কোমল ভাব জেগে উঠে। সুক্ষ কিসে যেন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আপনার বুকের ভেতর সংজ্ঞাহীন শূন্যতায় ভরে যায়। কোমল একটা খেয়াল আপনাকে জড়িয়ে ধরে। কোথাও একটা সুর বাজছে, অথচ ধরতে পারছেন না। কে যেন বলে, কোথাও চলে যাই। আপনি ভাববেন, কোথায় যাবো? নিজেকে এমন প্রশ্ন করছিলাম। পেছনে পড়ে থাক ৪৪২ নাম্বার রুম, কফির মগ, কবিতার বই আর ফিরে আসার অপেক্ষা।

সূর্যের আলোর নিচে চন্দ্রাহতের মতো হাঁটতে থাকি ছায়ানিবিড় পথে। পাহাড়ের আড়াল আছে বলে এ পাশের রাস্তায় বেশ ছায়া। দুইপাশে আম-কাঁঠাল আর নানান ধরনের গাছ। পুবে যেখানে চোখ আটকে যায়- হালকা কুয়াশার স্তর। ভর দুপুরে কুয়াশাকে কে ডেকেছে! মাঠের পর মাঠ টমেটো। লাল-সবুজের মেলা। হলুদ রং থাকার কথা। হলুদ হয়ত মিশে গেছে দুপুরে আলোয়। কেমন দূরদেশ দূরদেশ ভাব চলে এসেছে। হাসতে থাকি।

‘হাসছিস ক্যান?’

নয়নের কথায় হাসি বন্ধ করি। তবে বোধহয় আনন্দের রেশ চেহারা থেকে মুছেনি। ও আমার স্কুল বন্ধু। স্কুলের প্রথমদিনে ওর সঙ্গে পরিচয়। স্কুলের দুটো গেট ছিল। মেইন গেট আর কলোনি গেট। সকালবেলা যেদিক দিয়ে এসেছিলাম, দুপুরে ভুলে অন্য পথ বেছে নিই। ভয়ে পেয়েছিলাম খানিক, হয়ত বা। অনেকক্ষণ পর ওর সাথে দেখা। ওর সাহায্যে বাসায় ফিরি। আরও কিছুদিন আমাদের সঙ্গে পড়ে বা আমরা একই টেবিলে বসি।

তারপর একদিন খেয়াল করি অনেকদিন নয়ন আসছে না। ওর বাবা বিদ্যুৎ প্রকৌশলী। বাবা চিনতেন। জানান, আঙ্কেল বদলি হয়ে গেছেন। এরপর দশ দশটা বছর মঞ্জুশ্রী আপা আমাকে নয়ন নামে ডাকতেন। একটা গ্লানি নিয়ে আমিও উনার ডাকে সাড়া দিতাম। তিনি খুব আদর করতেন। ভুল মানুষকে আদর। আদর তো আর ভুল না! তবে একটা বিষয় নিয়ে এখন আমি কিছুটা সংশয়গ্রস্থ। আমাদের দুটা আপা ছিলেন। মোটা আপা, চিকন আপা। কোনজন মঞ্জুশ্রী আপা এতদিনে মনে নাই। কিন্তু চিকন আপা আমাকে নয়ন ডাকতেন এটা মনে আছে। তাইলে কী আমার মধ্যেও একই বিভ্রমের সম্ভাবনা উড়িযে দেয়া যায় না। তাই তার ভালোবাসা ও ভুল দুইটাকেই বিনম্রে গ্রহণ করি।

মঞ্জুশ্রী আপার সঙ্গে আর দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নাই। সে সময়টুকুই তার-অমার চিরকাল। একজন মানুষের কিনা অনেকগুলো চিরকাল থাকে। নাকি মানুষ একটা ঘরের মতো। তার অনেক দরোজা। একেকটা দরোজা একেক সময় চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। নাকি হয় না। এই যে মঞ্জুশ্রী আপার কথা বলছি। তিনি কোথায় যেন- আমার স্মৃতির গভীরে বেঁচে আছেন। সতত একই ধরনের দৃশ্য আর কল্পনায় ধরা পড়েন। দিন দিন এসব মানুষ কি পাল্টে যায় না? হয়ত যায়। এ জগতে কিইবা স্থির। শুধু পুনরুৎপাদনের সাক্ষী হয়ে থাকি!

‘কিরে কি ভাবছিস। কথা বলিস না ক্যান?’
‘মঞ্জুশ্রী আপার কথা। আমাকে নয়ন বলে ডাকত। খুব আদর করত।’
‘তুই উনার কথা এতএত বলেছিস। অথচ অমার তো কিছুই মনে পড়ে না।’
‘জানিস, আমার মাঝে মাঝে একদম ভালো লাগত না। মঞ্জুশ্রী আপার কাছে আমি সবটা সময় নয়ন হয়েছিলাম। একসময় না আমার মনে হতো- আমি হয়ত অন্য কেউ। সবকিছু ভুলে গিয়ে ভুল মানুষের কাছে বড় হচ্ছি।’
‘তুই এতো বোকা ক্যান?’
‘বোকামী কিনা জানি না। মাঝে মাঝে ভাবতাম উনাকে বিষয়টা বলি। কিন্তু বলা হয় নাই। শেষবার দেখা হয়েছিল রণজিত স্যারের বাসায়। ভাবছিলাম বলব, বলা হয় নাই। কারণ সেই সংশয়।’
‘কী?’
‘কখনও মনে হতো আমিই নয়ন। মঞ্জুশ্রী আপার কথা ঠিক। আমার অন্য কোথাও বাবা-মা, ভাই-বোন আছে। হুট করে আলাদা হয়ে গেছি। পরিচয় বদলে গেছে। অথবা আমারা আত্মাটা অন্য কারো শরীরে ঢুকে গেছে। হা হা হা। হয়ত স্কুলে হরর বই পড়ার আছর। তবুও ভেবে দেখ কত বড় দার্শনিক সমস্যা। পরিচয় নিয়ে, স্বাতন্ত্র্যতা নিয়ে। তুই তো ঢের ভালো ছিলি। এমন সমস্যাও ছিল না। আমার কোনো স্মৃতি তোর ছিল না। আর আমি ভুলতে পারলাম না। এখন অবশ্যই মজা লাগে।‘
‘দূর, গুল মারছিস। এমন কিছু ঘটে নাই। হুদায় আমাকে বোকা বানাস।’
‘বোকা হতে কি তোর ভালো লাগ না?’
‘তা লাগতে পারে। তবে তার মূলে তোর বোকামী। এ সব অর্থহীন কথাবার্তা।’
‘কারে বোকা বানাই আল্লায় জানে’।
‘দর্শনের পোলাপাইন তাইলে আল্লা বিশ্বাস করে।’
‘আর বলিস না। আল্লা থাকা না থাকার সমস্যা তো আমার হলে থাকা না থাকার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।’

আমাদের এখানে এ এক ভীষণ সমস্যা। দর্শন মানে আল্লাহ-খোদা বিশ্বাস না করা। এ নিয়ে কত ঝামেলা পোহাতে হয়। প্রায় বুঝাতে হয় যুক্তি দিয়ে থাকা- না থাকা দুটোই সমান। নয়ন চুপ থাকে। আমিও চুপ করে থাকি। চারদিকে চুপচাপ। মাঝে মাঝে দুই একটা রিকশা যায়। ভুতুড়ে যাত্রীহীন রিকশাগুলো।

‘চল রিকশায় চড়ে ঘুরি।’
ফিসফিস করে বলি, ‘খবরদার কখনও এ সব রিকশায় চড়বিনা। দুপুরের রিকশাগুলো ভুল কেউ চালায়। এমন কোথাও নিয়ে যাবে আর ফিরে আসতে পারবি না। ধর কোহেকাফ।’
‘গুল মারিস না। গা ছমছম করছে।’
‘তাইলে চল। তোকে আসল ছমছম করা জায়গায় নিয়ে যায়। আমার খুব পছন্দের জায়গায়। তুইই শুধু সেখানে যাওয়ার এন্ট্রি পেলি। এর আগে কাওরে বলি নাই।’
ও মুখ বাঁকিয়ে বলে, ‘আমারে না বলে তোর উপায় আছে!’

আসলে এতদিন কেন বলি নাই- সেটাই তো বিরাট রহস্য!

দুই.

পাহাড় বেয়ে হাঁটতে থাকি। একদম উপরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ। আমরা ওই পর্যন্ত যাই না। মসজিদের সীমানা দেয়াল ঘেঁষে ডানের পথ ধরে অন্য একটা পাহাড়ে উঠতে থাকি। ইউক্যালিটাস গাছের ছায়া ঘেষে হাঁটি। তাদের চকচকে গা থেকে ভোতা ধরনের আলোর প্রতিফলন ক্ষণে ক্ষণে চোখে লাগে। পায়ের নিচে শুকনো পাতারা কথা বলে উঠে। পথের শেষ মাথায় পাহাড় চূড়া সমতল করে কাটা।

ওইটা হলো কবরস্থান। এখনো সমতল জায়গায় তেমন কবর নেই। পুরানো কবরগুলো পাহাড়ের গা ঘেষে। চূড়া কাটা হয়েছে বেশিদিন হয়নি। মাঝে মাঝে দুই এক জায়গায় নতুন পুকুরে যেমন চিহ্ন রাখা হয় তেমন করে পাহাড়ের চিহ্ন রাখা হয়েছে। কেন? হয়ত পাহাড়টা কত উচুঁ ছিল এ চিহ্ন রাখা। কিন্তু কোনো চিহ্নই তো চিরকাল থাকে না। নাকি থাকে। থাকে বলেই এভাবে চিহ্ন রেখে দিই।

‘চিহ্ন রবে। তার ইশারা যুগ যুগ ধরে অজ্ঞান ও অবিস্কারের চোখ হয়ে থাকবে। তাইলে কি চিহ্ন আর ইশারা আলাদা জিনিস।’
‘হঠাৎ এ কথা কেন?’
উত্তর না দিয়ে নয়ন বলে, ‘মনে হলো। আমরা ভাবি সবকিছুর একটা প্রতিরূপ কোথাও থাকে। ধর মনের ভেতর। হয় কি এর জন্য আমরা কিছু চিহ্ন রাখি। তারপর ভাবি এ চিহ্ন সে আসল বা অবিকলে নিয়ে যাবে। কিন্তু তা হয় না। আমরা সে আসল বা অবিকলকে নিজের ছাঁচে কিছু একটা বানিয়ে নিই। আবার দেখ এ পাহাড়ের মধ্যেই তার নাই হয়ে যাওয়া সম্ভাবনাটা ছিল।’
‘হুম। সবকিছুর মধ্যে এমন বিষয় কী থাকে না। তারপরৃ’
‘প্রকৃতই কী তাই। কিছু থাকে না। থাকে শুধু অন্ধকার। হা হা হা।’

হাসি পাহাড় জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। আলো বদলাতে থাকে। খোলা জায়গায় নয়নের লাল শার্টটা জ্বলতে থাকে। দুপুরের আলোয় রঙটা বেশ দারুন দেখায়। যদিও আমার লাল রঙ পছন্দ না। কিন্তু নয়নকে মানিয়ে যায়। আমার প্রিয় কালো। ওকে কালোতে একদম ভালো লাগে না। নয়ন কখনও কখনও বলে, ভালো লাগা-না লাগা একটা অন্যরকমভাবে ভাবার বিষয়। প্রত্যেকের মধ্যে লাল বা কালোয় জ্বলে উঠার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু তারা হয়ত জানে না। এ সব ভেবে আমারও হাসি হাসে। আমি অন্য প্রসঙ্গে কথা বলি।

‘এ সময় বের হলি।’
নয়ন বলে, ‘বারান্দায় বসে বই পড়ছিলাম। কেমন যেন লাগছিল। কে যেন বলছিল বসে বসে কি করিস। একটু বেড়ায় আয়।’
‘গুল। আমারে এ সব বিশ্বাস করতে বলিস?’
‘হৃদয় বলে কথা।’
পিঠে আর কথায় কিল বসিয়ে বলি, ‘কার বই?’
‘মনে নাই। কি যেন কবিতা পড়লাম। হেমন্তের হাওয়ায় কি যেন নেই টাইপ। নাকি কার বাবা, না ওড়না হারিয়ে গেছে। এসব কিছুৃ বের হতে দিয়ে মনে হলো তোকে এ দিকেই পাওয়া যাবে।’
‘তোর অনুমান বেশ ভালো।’
‘অনুমান হবে কেন? ধরতে পারিস একজনের মধ্যে খানিকটা করে তার প্রিয় মানুষগুলো থাকে। এটা প্রাকৃতিক ব্যাপার আরকি। প্রকৃতিরে অনুমান বলে খারিজ করলে বেইনসাফ হয়।’
‘যাক, কিছুটা ব্যাখ্যা তো মিলল।’
‘আরে এ রকম অনেক কিছু মিলানো যায়।’
‘খারিজও তো হয়।’
‘তা ঠিক। কিন্তু শুধু শুধু এমন উপকারি সম্ভাবনাকে খারিজ করব ক্যান?’

খারিজ তো আমিও করতে চাই না। খারিজ করা না করার এ ডিলেমা আমায় আপ্লুত করে। আমি কি তবে সবকিছুতে নিশ্চিত হওয়ার রোগে ভুগছি। অস্বস্তি হয়। তাহলে এমন দুপুরে এখানে এসে বসে আছি কেন? কিছু বলি না, চুপ করে থাকি। চারদিকটা চুপ। চুপচাপ। চুপচাপ।

তিন.

‘দূরে হারিয়ে যাওয়া হয়ত ভালো। তবু তুমি কিছু ছায়া রেখে যেও। কিছু ছায়া রেখে যেও। হয়ত তোমায় ভেবে এ ছায়াময় পথে নতুন নতুন কথা পাবো। পাবো বলে দূরে রাখি না ছায়া। তুমি ছায়া হয়ে থেকো।’

নয়নের গলায় গানটি ভালো শুনায়। ওর লেখা ও সুর করা গান। আমিও মোটামুটি গাইতে পারি। মাঝে মাঝে ওর সঙ্গে এক আধটু ধরি। গান শেষে আমাকে জড়িয়ে ধরে। কাঁদতে থাকে। ও প্রায় এমনভাবে কাঁদে। কখনও কিছু বলে না। আমারও খুব কান্না আসে। আমি কাঁদি না। অনেকক্ষণ ওকে জড়িয়ে ধরে রাখি। কান্নার মধ্যে আমি কখনো স্বস্তি খুঁজে পাই নাই।

নয়ন বলে, ‘আমি মুক্তি চাই।’
চমকে উঠে বলি, ‘কিসের মুক্তি?’
‘তোর স্মৃতি থেকে মুক্তি চাই!’
‘স্মৃতি বলে কিছু নাই। সবই বর্তমানে নির্মিত।’
‘মিথ্যে কথা। তুই জানিস, আমিও জানি।’

কারও আসা-যাওয়া টের পাই। দু’একটা কুকুর আসা শুরু করেছে। কয়েকটা কাকও উড়ে এসেছে। আরও কিছু পাখির ডাকও শোনা যায়। যেন ধীরে ধীরে ভোর হয়।

‘আমি বুঝতে পারছি না। হঠাৎ এমন অদ্ভুত কথা কেন?’
‘এ যে স্মৃতি, ছায়া, চিহ্ন এ সব কিৃ বল তো। আর কিছু না। তোর কল্পনা। ছায়া নিয়ে গান- এ সবই তো তোর। আপন মনে নিজে নিজে করছিস। আর ভাবছিস অন্য কেউ। নয়ন সত্য হতে পারে। তবে সে অন্য কেউ। তার সঙ্গে তোর কোন যোগাযোগ নাই। সম্ভব না।’
‘ধুর! কি যে বলিস। এমন হয় নাকি। পুরা একটা মানুষ- আমার কল্পনা। এই যে আমায় জড়িয়ে আছিস। গল্প করিস।’
‘সবই তোর চিন্তা করছে। এই যে ধর। তুই একটু আগে ভাবলি- আমি লাল পছন্দ করি, আর তুই কালো। আমি যে বলি এক প্রেক্ষিত থেকে তোকে লালেও ভালো মানায়। তবে এর ধরনটা বুঝতে হবে। তুই কি বুঝিস না আমি তোর সে অংশ। নয়ন নামে তাকে জাগিয়ে তুলেছিস মাত্র। আমি তো কখনো এ সব কথা উচ্চারণ করি নাই। এমনকি একজন মানুষ আরেকজন মানুষের অংশ হয়ে যাওয়া। এটা স্রেফ নিজের অপ্রাকাশ্য দিককে সামনে আনা।’
আমি হতভম্ব হয়ে যায়। আসলেই তো তা ভাবছিলাম। শুধু তাই নয়। ওর প্রতিটি কথা তো আমার ভাবনার উত্তর। তবুও বলি, ‘এ সব কী বলিস?’
‘এটাই ঠিক। তুই ভেবে দেখ। তোর আমার কথার মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে কি। আমরা তো প্রতিদিন একই কথা বলি। আমাদের কথার আলাদা কোনো অর্থ নাই। আমরা একই জিনিস ভাবি। আমাদের মাঝে তেমন কোনো বিরোধ নাই। হাঁ, আছে। যা আছে তা হলো- তোর নিজের মাঝে থাকা বিরোধ মিলিয়ে নেওয়া। যেটা নিয়ে অন্য কোথাও স্বস্তি নিয়ে আলাপ পারা যায় না। এ সব ভাবনা তোকে স্থিরতা দেয়। কিন্তু একটা কাল্পনিক জগতে নিয়েও যায়। এই তো আর কিছু না। একটা খারাপ সময়ে আমার উপর ভর দিয়ে সান্ত্বনা পাওয়া। এর বাইরে কিছু নয়। পালিয়ে থাকা ছাড়া আরকি।’
‘হা হা হা। তাহলে আজ হঠাৎ সে সান্তনার জায়গাটা আলাদা হইতে চায় কেন?’
‘আর কিছু না। তোর আরেকটা অংশ অন্ধকারে থাকতে চায় না। সে বলতে চায়- দুই মিলেই তো আমি। দুইকে এক করতে না পারলে- নিজেরে কোনো দিন বুঝা হবে না।’
আমি হাসার চেষ্টা করি। বেশি জোর পাই না। হাস্যকর যুক্তি দিতে থাকি। ‘আরে না। আমি বেশ অনুকরণ প্রিয়। আমার দেখা মানুষগুলোর কোনো কোনো দিক আমি দেখতে পাই। এ আমার চরিত্রের দুর্বলতর দিক।’
‘লুকিয়ে রাখিস কেন। তুই ভালোই জানিস।’
হঠাৎ হাসি পায়। বলি, ‘তাইলে কি একজনের মধ্যে খানিকটা করে তার প্রিয় মানুষগুলো থাকে। এ কথাখান খারিজ হয়ে গেল। মানে ধর কল্পনা যেহেতু।’
‘পুরোটা খারিজ করতে ভালো লাগছে না। কি আর করা- কিছুটা তো খারিজ হয়। জোশের সঙ্গে কথাগুলা বলে ফেলছি। এখন তো আমার লজ্জা লাগতেছে। নিজের কাছে যে লজ্জা, তাতো সবচেয়ে বড়। তাই না!’
‘তার মানে কি- তুই কিছুটা সত্যি। মানে যেভাবে আমি দাড়াইয়া থাকি বা বসে থাকি বলে বিশ্বাস করি। এ রকমভাবে সত্যি। দ্যাটস গুড আইডিয়া। বাই বাই।’

আমরা দুইজনেই হেসে উঠি। টমেটো ক্ষেতের ওপাশে কুয়াশার কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে অদৃশ্য হওয়া হলুদের কথা। কবিতার বইটার কথা। বইটার নাম কী, কবির নাম কী। কোথা থেকে উড়ে আসে হেমন্তের হওয়া। মানুষ রেখে ভুতকে ভালোবাসতে চাই কেন! আমি জানি না। এ সবই কি আমার অংশ! নাকি পুরা জাহানই আমার অংশ।

আমি হাঁটতে থাকি। হাঁটতে থাকি। পেছন থেকে নয়ন ডাকে। গ্রাহ্য করি না। রাস্তায় নেমে আসি। টমেটোর ক্ষেতে ঢিল মারতে থাকি। ক্ষেতটা অদৃশ্য হয়ে যায়। কে যেন চিৎকার করে উঠে। ‘কে রে’। ঢিলটা পড়ে একটা কটেজের টিনের চালে। আমি উত্তর না দিয়ে হাঁটতে থাকি। মুয়াজ্জিন ভাঙ্গা গলায় আসরের আজান দেন। কিন্তু আমার বেশ মধুর লাগে। শুনেছি তার গলা নাকি বেশ মধুর ছিল। এক ভোরে কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় কে যেন তার গলা মুচড়ে দেয়। প্রত্যেক সুন্দরের মধ্যে ক্ষয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তো থাকে। হয়ত ক্ষয় থেকে সুন্দরটা খানিক টের পাওয়া যায়। তাই না! নয়নের কথাটা ভেবে মজা লাগে।

পাহাড় শেষ হলে সোহরাওয়ার্দী হলের মাঠ। মাঠে আমার বন্ধুরা খেলছে। অনেকে চায়ের আড্ডায় কেউবা মেয়েদের হলের দিকে যাচ্ছে। নীলু বলেছিল শহীদ মিনারে আসবে। কিন্তু আমার দেখা করার কোনো তাড়া নেই। নো বই, নো নোটস। এখানে এখন অনেকের শহরে ফেরার তাড়া। সেটা দেখতে ভালো লাগছে। শেষ ট্রেন ধরবে। আমার কোনো কাজ নেই, তাড়া নেই। আপাতত ভিড়ের মধ্যে মিশে যেতে চাই। কিন্তু মনে হয় পৃথিবীতে প্রকৃত কোনো ভিড় নেই। শুধু অনেকগুলো স্রোত একসাথে চলে। তারপর পৃথক পালঙ্ক। এ সব ভাবতে ভাবতে দেখি ট্রেনের একটা বগির দরোজা থেকে বাই বাই জানাচ্ছে নয়ন।

*গল্পটি আলোকিত বাংলাদেশ ‘শুক্রবার‘ পাতায় পূর্ব প্রকাশিত। অলংকরণ আলোকিত বাংলাদেশের সৌজন্যে।

Comments

comments

4 thoughts on “দ্বিজ

  1. Pingback: কোথায় আমার স্কুল | ইচ্ছেশূন্য মানুষ

  2. Pingback: কোথায় আমার স্কুল | ঈশ্বরী ও আলতাফ পারভেজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *