নিখুঁত জুতা

এমন পরিস্থিতিতে আগে পড়ে নাই- তা না। কিন্তু আজকের অনুভূতি একদম বিজাতীয়। শৈশবে শবে বরাতের রাতে এক অচিন সুর তাকে আপ্লুত করত। যার তীক্ষ্ণতা অপরাপর সময়কে অনুপমভাবে ছাড়িয়ে যেত। এই চাঁদনী রাতে কি এক উপহার অপেক্ষা করে। বরাতকে মন্দভাবে চিন্তা করতে নাই।

ভরদুপুরে যখন ছায়ারা আপন আপন কায়ার কোটরে বিশ্রাম নেয়- তখন সে একাকী চিন্তার উথালপাথাল সমুদ্রে সাতাঁর কাটছে। তার ছায়া কুন্ডুলী পাকিয়ে পায়ের তলে পড়ে আছে। মাঝে মাঝে জীবনটাকেও এমন হীনতর মনে হয়। তবুও জীবনের অবিমিশ্র ভেদের ছায়ায় সাতাঁর কেটে বের হওয়ায় তো বরাত।

আবদুল জলিল পেশায় জুতাচোর। গত চারবছর ধরে এ পেশায় যুক্ত। এ পর্যন্ত চারবার ধরা পড়েছে। বেশ উত্তম মধ্যম জুটেছে। এসব ভাবলে মাঝে মাঝে বিরল হাসি ফুটে উঠে তার মুখে। প্রতিবার যখন ঘরে ফিরতো- মনে হতো শাস্তি তার পাপ কেটে নিয়েছে। আবার অনেক সময় ভেবেছে এ পথে আর না। কিন্তু জুতার প্রতি অদ্ভুত মুগ্ধতা তাকে সবসময় তাড়িয়ে বেড়ায়। এক জোড়া ছেড়া স্যাল্ডেল জগতের এক রূপ। আবার এক জোড়া চকচকে দামি জুতা অন্য এক ভুবনে নিয়ে যায়। সে দর্শন জানে না, শিল্প জানে না। কিন্তু জুতার মধ্যে আবিষ্কার করে মানুষের ভেদ আর খেদ। এই আবিষ্কার তার পেশা আবার নেশাও।

এখন সে এসব নিয়ে ভাবছে না। ভাবে তার ভাবনার অগোচরে কি বরাত সত্য সদা জাগ্রত আছে। যা জুতায় দেখাদেখি ভেদের চেয়ে আলাদা।

গতকাল সে আবার চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। অস্বস্তির সাথে পকেটে হাত দিয়ে সিগারেট খুঁজে। মনে পড়ে কাল থেকে একবারও সিগারেটের কথা ভাবে নাই। যদিও তার হাত বারবার পকেটে গেছে। প্রতিবার সে অকারণ অনুসন্ধান থেকে নিজেকে ফিরিয়ে দিয়েছে।

তার মনে হলো এ টেনশন থেকে মুক্ত হবার অন্য কোন তরিকা আছে।

তার নেশা ধরে যখন জরির সাথে ঝগড়া হয় বা দেখা হয় না। আজ দু’দিন তাকে দেখে নাই। তার কথা মনে হতে চিরকালীন হৃদ্যতার সুর তার প্রাণের মাঝে বেজে উঠে কিন্তু সে অন্য এক জটিল সমাধানের অপেক্ষায় থাকে।

হঠাৎ সে যেন হৃদয়বৃত্তির সাথে এর যোগসূত্র খুঁজে পাই। তার অচিন অনুভূতিকে অনেকটা বুঝতে পারে। বুঝতে পারে না বলে বুঝতে শেখে বললে হয়। কি এক অমূল্য তম্ময়তায় ডুবে পড়ে। এটাকে ধরতে চায়।

পাশে থাকা জুতোর প্যাকেটটা অনন্য উদ্যমে কাঁপতে থাকে। যেমন কাঁপছে লেকের জল। কাঁপছে গাছের পাতা। অথবা ছোট একটি বায়ুমতী প্রজাপতি। সে হাওয়ায় কেঁপে উঠে অতীত আর বর্তমানের প্রান্তবিন্দু। কিন্তু তার কাছে সবই বর্তমান। এই তো সে বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণের দরজা গিয়ে মসজিদে ঢুকছে। জানে যোহরের চার রাকাত ফরজের শেষ দুই রাকাতই তার কপাল আছে। তবুও সে ওজু ঘরে ঢুকে।

ওজু পর্ব তাকে সবসময় বিস্মিত করে। আচানক ব্যাখ্যাতীত পবিত্রতার রেশ এনে দেয়। বাইতুল মোকারমের ঠান্ডা ভাব তার প্রাণের মধ্যে অমোচনীয় কালির মতো লেগে থাকে। সে দাগ কোন পাপ কাজই মুছে দিতে পারে না।এই তার পবিত্রতার অন্যতম সম্বল। তাকে খোদাতালা ছেড়ে যান নাই।

সে সময় সেদিন শিকারকে দেখে। তার চেহারা বেশ সাধারন। এ রকম হাজারটা লোক বাংলাদেশের শহর-গ্রামে পাওয়া যায়। যাদের আলাদা করে মনে রাখার কিছু থাকে না। তবুও এ মসজিদের ছায়ায় খানিক ঝিলিক খেলে যায়। জলিল মাঝে মাঝে ভাবে মসজিদে চুরি করতে আসলেও এর উপকারিতা আছে। আল্লাহর ঘরে নানান কিসিমের বান্দা হাজির হয়। কারো চেহারা ভাবলেশহীন, কারো চেহারায় আলাদা নূর। আবার কেউ কেউ ডাকাতিপনা, হারামিপনা লুকাতে পারে না। চোর বলে অন্য লোককে কলংক দিতে তার খারাপ লাগে। তবে শেষ কিসিমের লোকগুলো তার মধ্যে আত্মপ্রত্যয় এনে দেয়। সে সামান্য জুতা চোর। এরা পুরো দেশটাকেই সাফ করে দেয়। এজন্য সে মাঝে মাঝে তওবা কাটে। কিন্তু তা কিছুতেই তা গুছে না।

এসব ভাবনার রেশ তাকে কিছুটা অনমনা করে দেয়। জামাতে লোকটার পাশে দাড়াঁয়। নিত্যদিনের মতো আতরের সুরভি মাথার মধ্যে বাসা বাঁধে। ভাবে আজ নামাজটা শেষ করে যাই। সেজদায় তার চোখ মুঁদে আসে। উচ্চারণ করতে থাকে- সুবহানা রাব্বিল আলা (নিশ্চয় আমার মহান রব পবিত্র)…।

সালাম ফিরিয়ে খেয়াল হয়- অভ্যাস মতো পুরো নামাজ শেষ করে নাই। ইতিমধ্যে ফরজের বাকি দুই রাকাত আদায় করতে পাশের লোকেরা দাড়িয়ে পড়েছে। জলিল উঠে দাড়াঁয়। কারণ এ কাজ খুব দ্রুতই করতে হবে। চকচকে জুতো জোড়ার সামনে এসে দাড়াঁয়। পেছনে আতরের বাসি গন্ধ । সে কিছুটা ইতস্তত করে। সে মুহুর্তটাই তার জন্য কাল হয়ে দাড়ায়।

জলিল নিজের জুতা নেবার ভান করে বসে পড়ে। এসময় হাতে থাকা ব্যাগের মধ্যে জুতা জোড়া ঢুকিয়ে ফেলে। ঘটনাটা চোখের পলকে ঘটে। এবার সে হাঁটা শুরু করে। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গি- ঢিলে ঢালা ভাব। কোন তাড়া নাই। দরজা পেরিয়ে বারান্দায় পা দিতেই কাঁধে টান পড়ে।

পুরো নামাজ না পড়ে যাচ্ছেন?

আমি মুসাফির।

আসেন মুসাফর ভাই। আপনার সাথে কথা কই?

সে ঘুরে লোকটার দিকে তাকায়। চোখের ভাষা পড়ার চেষ্টা করে। তার ঘোলেটে চোখে কিছু লেখা নাই। কিন্তু চেহারার ক্রোধ স্পষ্ট।

বদমাইশ.. আমি তোরে অনেকদিন ধরে খুঁজতছি।

আপনি এসব কি বলেন?

কি বলি! বসে থাক। বুঝবি। একদম উঠবি না।

এ বলে দেয়ালের সাথে ধাক্কা দিয়ে লোকটি তাকে জোর করে বসিয়ে দেয়। দ্রুত লোকজন জড়ো হয়ে যায়।

কি হইছে ভাই?

লোকটি বলে-

এরে দেখেন তো। যাইতে দিবেন না।

লোকটি ভিড় ঠেলে বের হয়ে জুতা হারানো লোকটাকে বলে-

ভাই আপনার জুতা হারাইছে।

হা।

এদিকে আসেন।

জলিল দেখে ভিড় ঠেলে সেই খানিক ঝিলিক দেয়া লোকটা হাজির।

ভাই এ ব্যাগ খুলে দেখেন তো।

কেন?

জলিল ভাবে ব্যাগটা আড়াল করবে। কিন্তু কিসের আড়াল। সে তো পুরো দুনিয়ার সামনে ফরসা হয়ে গেছে। নামাজের গাম্ভীর্য আর আতরের সুবাস তাকে হতভম্ব করে রাখে। পালানোর কথাও যেন ভুলে যায়। সে লোকটির দিকে তাকায়। খুবই সাধারণ একজন মানুষ। এর চোখে আলাদা কোন ঝিলিক নাই। তিনি তার দিকে ফিরেও তাকান না।

বেশ ধীরে সুস্থ্যে বাগটা খুলেন। খুলে কয়েকটা পুরানো কাপড়ের উপর রাখা স্যাল্ডেল জোড়া বের করে আনেন। ভিড়ের মধ্যে গুঞ্জন উঠে। সবাই যেন হাফ ছেড়ে বাঁচে। অন্যদিকে এ উল্লাস ধ্বনিতে বিঘ্ন ঘটায় নামাজের মধ্যেই অনেক মুসুল্লী বিরক্ত হন।

জলিলের চিন্তা অসাড় হয়ে আসে। সে যেন হাত-পা নাড়াতে পারে না। আগে তো এমন হয় নাই। এখন কাজ হলো সুযোগ বুঝে দৌড় দেয়ার প্রস্তুতি রাখা। নিজের চেহারাটা মলিন আর অপ্রকৃতিস্থ করে তোলা।

ভাই পাইছেন তো আপনার জুতা। এবার বলেন এ বদমাশরে কি করবেন?

একজন বলে উঠে-

হাতের বল পরীক্ষা করেন!

আরেকজন বলে-

এসব মুসুল্লীর দোষ কম না, তারা কেন যেখানে সেখানে জুতা রাখে…

নানা ধরণের মন্তব্যের মাঝে একজন বলে-

ভাই এতো কথার কাজ কি! আসেন উত্তম মধ্যম দিই। মারের চোটে চুরির কথা জনমের মতো ভুলে যাবে,।

জলিল শেষ রক্ষার চেষ্টা করে-

এ জুতা আমার ছোট ভাইয়ের জন্য…।

একথা শুনে অশ্লীল কি যেন বলে একজন কলার ধরে হেচকা টান মারে। সে আর কথা শেষ করতে পারে না। আতংকিত জলিল দেখতে পায় তার সামনে অসংখ্য বাঘ, সিংহ, শিয়াল ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাকে খেয়ে ফেলার আগে দাঁতে শান দিচ্ছে। দুই মিনিট যেন অজস্র মিনিটে ভাগ হয়ে যায়। কিছু শুনতে পায় না। সমুদ্রের একটা গর্জন যেন তাকে ভাসিয়ে নেবে। সে আগাম হাবুডুবু খায় বাতাসের সমুদ্রে।

হঠাৎ সব শান্ত।

এ জুতা আমার না।

লোকটি জুতা জোড়া জলিলের ব্যাগে ঢুকিয়ে চেইন লাগিয়ে দেয়। তারপর ভিড় ঠেলে সরে পড়ে। তাকে পাকড়াও করা লোকটা তোতলাতে থাকে।

কলারের মুঠো আলগা হয়ে যায়। জলিল স্তদ্ধ হয়ে দাড়ানো থেকে বসে পড়ে। লোকের সন্দেহ কাটে না। একের পর এক লোক এসে তার জুতা পরখ করে। কেউ ভুল বা লোভ করেও বলে না এ জুতা তার।

ভাই যে লোক এতো লোকের সামনে আপনেরে বেইজ্জত করছে আসেন তারে ধরি। এসব লোকের জন্য মানুষের মান সম্মান নিয়ে টানাটানি।আহারে, বেচারা কষ্টের টাকায় কেনা জুতা নিয়ে ফেসে গেল।

দু-একজন এ কথায় সায় দেয়। সে যেন কথাগুলো শুনে নাই।

ঠান্ডা সম্মোহিত টাইলস ধরে হাঁটে। সিড়িতে দাঁড়িয়ে সেই লোকটাকে দেখতে পাই। তার দিকেই যেন তাকিয়ে আছে। সেও নিশ্চল হয়ে তাকিয়ে থাকে। দুই জোড়া চোখে যেন কত কথা জমেছিল। না বলা সব কথা আজ হবে। কি কথা! জলিলের মনে হয় এ মানুষটাকে সব কথা বলা যায়। সব কথা। কিন্তু তার তো কোন কথা নাই। একজন জুতাচোর কি আর একান্ত কথা!

সে এগুতে থাকে। মানুষটাকে কোথাও দেখে না।

লেকের জলে কেউ একজন ঢিল মারে। নিমগ্নতা কেটে যায়। ঘটনাটা যেন এখনকার। সময়ের মধ্যে যেন কোন ভেদ নাই। একই ঘটনা বারবার ঘটছে।

সেদিন অনেক রাত করে সে বাসায় ফিরেছিল। তার মোবাইলে জরি বারবার ফোন করেছে। কোন জবাব দেয় নাই। মনে শান্তি আসে না। মনে হয় এ ঘটনার অন্য কোন তাৎপর্য আছে। সে ধরতে পারে না। সেটা কি? এটা কি শুধু খারাপ কাজ না করার শিক্ষা। তাহলে এ লোক তো তাকে কিছু বলে নাই। কিন্তু তার চোখে কি এমন ছিলো- এ প্রশ্ন তার মনে আসে আর যাই।

আবার অতীত আর বর্তমানের ভেদরেখা টানে।

আজ সে খুব খুশি। বাবার সাথে ঈদের জুতা কিনতে যাচ্ছে। কত বছর পর নতুন জুতা পড়বে!

জুতার প্রতি তার আলাদা মহব্বত আছে। এক জোড়া দিয়ে বছরের পর বছর কাটিয়েছে। বাবা বলতেন- বছর বছর জুতা কিনে দিতে পারবেন না। এই জুতা দিয়ে যাতে চার বছর চালায়। এজন্য সবসময় তার জন্য বড়ো মাপের জুতা কিনে আনতেন। সস্তা হলেও বছর দুই কোনভাবে চলত। সে সময় জলিল জুতার প্রেমের পড়ে যায়। জুতার প্রতিটি জিনিস মনোযোগ দিয়ে দেখত।

তার ঘরে একটা ট্রাৃংকের ভেতর অনেক জোড়া জুতা আছে। বিভিন্ন সময়ে চুরি করা। এগুলোর গড়ন এতই মুগ্ধকর যে সে বিক্রি করতে পারে নাই। সব নতুন এমন না- অনেক ছেড়া জুতা আছে। মাঝে মাঝে সে জুতাগুলো দেখে আর মুছে তুলে রাখে। জমানো জুতাগুলো কাল রাতে বস্তির লোকজনকে বিলি করে দিয়েছে।

শুধু এক জোড়া বাদে। তার সর্বশেষ চুরি করা জুতা জোড়া।

এর আগে তার কল্পনা মতো একজোড়া নিখুঁত জুতা খুঁজে পাই নাই। কি তার সেলাই, মসৃণ চমড়া এবং সোলের খাঁজ! কতো নামের, দামের জুতা সে চুরি করেছে- কত দোকানে জুতা দেখেছে- কত দোকানীর গালমন্দ শুনেছে- কোন জুতাতেই সে মন দিতে পারে নাই। কিন্তু কালকের জুতাটা একদম নিখুঁত। সেলাই, চামড়া সবকিছু ছুয়ে দেখেছে- কখনো চোখ দিয়ে, কখনো চোখ বন্ধ করে। এরচেয়ে নিখুঁত হতে পারে না।

নিখুঁত জুতা পেয়েও মালিকানা তার না। সারাদিন পথে পথে ঘুরে জুতার মালিককে খুঁজেছে। খুঁজেছে একজন নিখুঁত জুতার মালিককে। তাকে খুঁজে পায় নাই। সে জানত এ মানুষটা খুঁজে পাবার নয়। তারপরও কিসের টানে পথে পথে ঘুরছে?

তার নিজের প্রশ্ন। উত্তর পায় নাই।

শেষবারের মতো জুতার প্যাকেটটা হাতে নেয়। তারপর জুতা জোড়া বেঞ্চির উপর রেখে সে পথ ধরে। গাছের আড়াল হলে ফিরে তাকায়। কিছু দেখা যায় না। হয়তো আছে হয়তো নাই। শিরশির বাতাসটা চোখে লাগে। বৈশাখী নামে গেট পেরিয়ে রাস্তায় নামে। তখন কে যেন হাত ধরে পেছন দিকে টানে। তাকিয়ে দেখে সাত-আট বছরের একটা মেয়ে। মেয়েটির চোখে শেষ বিকেলের আলো। অযত্মের ছাপ চেহারার মায়াকে আড়াল করতে পারে না। যেমন ক্ষণিক জ্বলে উঠা চোখ। সে মেয়েটাকে ছুঁয়ে দেখে।

তারপর জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়।

বাচ্চাটা আরেকটা হাত তার দিকে তাকিয়ে দেয়।

জলিল হাত পেতে নেয় সে উপহার। একজোড়া নিখুঁত জুতা।

…………………………………………………………………………………………………………………

: গল্পটি ২০১২ সালে পরিবর্তন ডটকমে প্রকাশিত।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *