এনালাইটিক ও কন্টিনেন্টাল দর্শন : কী হলো, কেন হলো

কন্টিনেন্টাল ও এনালাইটিক দর্শনের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতীকি উপস্থাপন।

নামে কী আসে? গোলাপকে যে নামেই ডাকা হোক একই সুবাস ছড়াবে। উইলিয়াম শেক্সপীয়রের রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট নাটকের এ রকম একটি সংলাপ বেশ মশহুর।

শেক্সপীয়রের সঙ্গে দেখা হয়নি ভিটগেনেস্টাইন, রাসেল কিংবা রাইলের। উপরের প্রশ্ন নিয়ে নাট্যকার যদি এই দার্শনিকদের কাছে হাজির হতেন, কী উত্তর পেতেন? ভিটগেনস্টাইনের জবাব হতে পারত ‘চিহ্নের ধাঁধা’, রাসেলের মতে ‘কনসেপ্ট বা প্রত্যয়ের একটি ব্যাখ্যা’ আর চাতুরির সাথে রাইল বলতেন ‘অপ্রয়োজনীয় সমস্যা’। একইভাবে জানতে ইচ্ছে করে কী বলতেন হেগেল, হুর্সেল, কিয়ের্কেগার্ড বা নীটশে? তা জানা কখনো সম্ভব হবে না। তবে এই দার্শনিকদের চিন্তার দিকে নজর দিলে কিছু অনুমান করা হয়। যেমন; উপরে ভিটগেনেস্টাইন বা অন্যদেরটা অনুমান করা হয়েছে।

যে কারণে শেক্সপীয়নকে টেনে আনা; আমরা কী উত্তর অনুমান করে নিচ্ছি তা থেকে এই দার্শনিকদের চিন্তা পদ্ধতির ফারাক বোঝা যাবে- এ কথাটা বলাই আমাদের লক্ষ্য। আরেকটু ভাবলে দেখা যাবে, এটা মূলত এনালাইটিক বা বিশ্লেষণী ও কন্টিনেন্টাল ধারার দর্শনের পার্থক্য। বৈসাদৃশ্য ও সাদৃশ্যের মাধ্যমে এই দুই পক্ষকে আমরা ভালোভাবে বুঝতে পারব- অনেকেই এ ভাবনাকে সঙ্গত মনে করবেন। তবে দেখা যাক।

সংজ্ঞায়নের সুবিধা

গতানুগতিক বা আদর্শ সংজ্ঞা থেকে যে কোনো চিন্তার একটা সাধারণ কাঠামো দাঁড় করানো যায়। যদিও অতি সাধারণীকরণ ও অতি সরলীকরণের আশঙ্কা থাকে।

এ বিষয়ের উপর একটি অতিপরিচিত সংকলন সি জি প্রাদোর ‘আ হাউস ডিভাইডেড’। যেখানে দুই ধারার পদ্ধতিগত পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। প্রাদোর মতে, এনালাইসিস বা বিশ্লেষণ ও সিন্থেসিস বা সংশ্লেষণের উপর আলো ফেললে এনালাইটিক ও কন্টিনেন্টাল ধারার পদ্ধতিগত পার্থক্যের প্রমাণ পাওয়া যায়। এনালাইটিক দার্শনিকরা সাধারণত দার্শনিক সমস্যাকে ভাগ ভাগ করে সমাধান করেন এবং দেখেন কোন সম্পর্কের সূত্রে তারা বাঁধা। কন্টিনেন্টাল দার্শনিকরা সংশ্লেষণ বা সুসংহতভাবে বড় পরিসরে প্রশ্নগুলোকে পরিচিত করান এবং বিশেষ কোনো বিষয়কে ‘বৃহত্তর কোনো ঐক্য বা ইউনিটির অংশ’ বিবেচনা করেন। আর প্রশ্নগুলো যদি ওই ঐক্যের মধ্যে মানানসই হয়, তবে তাদের ঠিকভাবে বোঝা যাবে, মোকাবেলা করা যাবে।

সুতরাং, এনালাইটিক দর্শন বিশ্লেষণের সঙ্গে যুক্ত— এটা হতে পারে চিন্তা, ভাষা, যুক্তি, জ্ঞান, মন ইত্যাদির বিশ্লেষণ। যেখানে কন্টিনেন্টাল দর্শনের চিন্তার বিষয় হলো সংশ্লেষণ। ইতিহাসের সঙ্গে আধুনিকতার সংশ্লেষণ, ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের ও চিন্তার সঙ্গে প্রয়োগের।

নেইল লেভি, এনালাইটিক দর্শনকে বর্ণনা করেছেন ‘সমস্যা-সমাধানের কার্যকলাপ’ আর কন্টিনেন্টাল ধারাকে দেখেন, ‘মানবিক ঐতিহ্যের জন্য, সাহিত্যের জন্য, শিল্পের জন্য… এটা রাজনৈতিকভাবে আরও বেশি জড়িত।’ হ্যানস-জোহান গ্লকের ‘দ্য রাইজ অব এনালাইটিক ফিলোসফি’র মতে, এনালাইটিক দর্শন হলো মর্যাদাসম্পন্ন বিজ্ঞান বা নৈপুণ্য; এটা আলাদা আলাদা সমস্যা মোকাবেলায় নির্দিষ্ট কৌশল ব্যবহার করে যার ফলাফল সুনির্দিষ্ট।’

এ ধরনের প্রভেদে অতি সাধারণীকরণ থাকলেও বড় একটা ছবি আঁকতে সাহায্য করে। যেমন; কোনো এনালাইটিক দার্শনিক পলিটিক্যাল ফিলোসফি লেখেননি। কিন্তু এর মধ্যে ভুল আছে। জন রলস লিখেছেন ‘থিওরি অব জাস্টিস’, রাসেল লিখেছেন ‘দ্য হিস্ট্রি অব ওয়েস্টার্ন ফিলোসফি’। আবার এমন নয় যে, যুক্তি ও ভাষা নিয়ে কন্টিনেন্টাল ফিলোসফিতে কোনো অবদান নেই। হেগেল বিস্তৃতভাবে লিখেছেন যুক্তিবিদ্যা নিয়ে, হাইডেগার লিখেছেন ভাষা সম্পর্কে। যদি সব দার্শনিককে বিস্তুতভাবে দেখা যায়, দেখা যাবে পার্থক্যের জায়গাটি কোথাও কোথাও অনেক ঝাপসা। সে দিক থেকে ভাবলে, আমাদের সুর্নিদিষ্ট দাবিগুলো আসলে সম্ভাব্য কিছু।

সতর্কতা হিসেবে মনে রাখা দরকার, সাধারণীকরণের মধ্যে থাকে আংশিক সত্য। যেমন; ফিলোসফি অব মাইন্ড নিয়ে আলোচনা করেছেন হিলারি পুটনাম, ড্যানিয়েল ডেনেট, ডেভিড শালমার্স, জে জে সি স্মার্টের মতো এনালাইটিক দার্শনিকরা। আবার একই ধারার দার্শনিকদের মধ্যে ফেনমেনোলজির আলোচনা খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। এটা বলে দিচ্ছে দুই ধারার ভাবুকদের চিন্তার তফাত স্পষ্ট এবং দর্শনে তাদের জন্য আলাদা আলাদা স্থান রয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য, লক্ষ্য, হাতিয়ার, আলোচনার সীমা রয়েছে- যাকে বুঝতে হবে তাদের স্বাধীন চিন্তাশীলতা ও ট্র্যাডিশনের আলোকে। প্রশ্ন হলো, ভিন্ন ভিন্ন ধারা কীভাবে এলো?

এনালাইটিক ও কন্টিনেন্টাল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কৌতুক

গতানুগতিক সংজ্ঞা থেকে বিচ্ছেদ

পুরনো সংজ্ঞা থেকে বিচ্ছেদের জন্য আমরা প্রথমে শরণ নিতে পারি কোনিংসবার্গের ইমানুয়েল কান্টের (১৭২৪-১৮০৪)। তার জ্ঞানতত্ত্বে ‘সংশ্লেষণী জ্ঞান পূর্বতসিদ্ধ হওয়া সম্ভব’ ধারণার ব্যাখ্যা পাই।  তার এই প্রক্রিয়ার মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো বাস্তবতার দ্বিখণ্ডন— নোমেনাল বা বস্তু নিজে যা ও  ফেনোমেনাল বা যেমন দেখায়। কান্টের মতে, যা আমরা দেখি ও তার সম্ভাব্য অভিজ্ঞতার অন্তরালে যা আছে তাদের মধ্যে তফাৎ আছে। সে হিসেবে ঈশ্বর, অমরত্ব, স্বাধীনতা আমাদের কাছে অজ্ঞেয়। তবে কান্টের এমন তত্ত্বের বিপরীতে প্রধান দুটি সমালোচনা এসেছে জর্জ উইলহেম ফ্রেডরিক হেগেল (১৭৭০-১৮৩১) ও ভিয়েনা সার্কেলের তরফে।

হেগেলের আলোচনা থেকে বিশ শতকের অনেক কন্টিনেন্টাল দার্শনিক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত হয়েছেন। হেগেলের সমালোচনা প্রথমত ফেনোমেনাল থেকে নোমেনালের পৃথকীকরণ। এর মানে হলো যা দেখা যায় তার বিপরীতে বাস্তব হলো— যা থেকে তাকে পাওয়া যায়। কিন্তু হেগেলের কাছে কোনো বিভক্তি নেই, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন একই আইডিয়ার মধ্যে সকল বাস্তবতা একাট্টা হয়ে আছে। জ্ঞেয় ও অজ্ঞেয়ের মধ্যে কোনো জ্ঞানতাত্ত্বিক ফারাক নেই, তাই আইডিয়ার বাইরে অজ্ঞেয় কিছু নাই।

কন্টিনেন্টাল ধারায় অগ্রগণ্য পুরুষ বলা যায় হেগেলকে। তার কাছ থেকে এসেছে সর্বোচ্চ ধারণাটি এবং যা সাহিত্য, ইতিহাস, শিল্পকলাসহ সবকিছুকে দর্শনের আগ্রহে অন্তর্ভুক্ত করেছে। যার কারণে মিশেল ফুঁকো বলেন, হেগেল থেকে সার্ত্রে (কন্টিনেন্টাল ফিলোসফি) মূলত একটি পূর্ণাঙ্গ উদ্যোগ।

ঊনিশ শতকের শেষদিকে হেগেলের ভাববাদী চিন্তা ইউরোপ ও এমনকি ব্রিটেনের এফএইচ ব্র্যাডলি, জেএমসি ম্যাটটাগের্ট ও টমাস হিল গ্রিনের মতো নেতৃত্বস্থানীয় দার্শনিকদের প্রভাবিত করে। তাদের হেগেলিয়ানও বলা হয়। অন্যদিকে ওই শতক যেতেই কান্টের বিরুদ্ধে ফেনিয়ে ওঠে কেমব্রিজ ও ভিয়েনার চিন্তকরা।

যেখানে দোতলা জ্ঞানতাত্ত্বিক বাস্তবতা নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন হেগেল, অন্যদের আপত্তির জায়গা ছিল সংশ্লেষণী পূর্বতসিদ্ধ। কেমব্রিজের আক্রমণ শুরু হয় জি ই মুরের নেতৃত্বে, দ্রুতই দলে টানেন সহকর্মী বাট্রান্ড রাসেলকে। যিনি ছিলেন গণিতের দার্শনিক, তিনি জ্ঞানের রিডাকশনিস্ট ধারার চালু করেন যা লজিক্যাল অটমিজম নামে পরিচিত। এবং ক্ষেত্রে বিশেষে তার মনোযোগ ছিল বিরোধিদের লজিক্যাল সমস্যাগুলো নিয়ে। দুটো বিষয়কে এক করলে দেখা যায় এগুলো তাকে হেগেলিয়ানদের থেকে দূরে নিয়ে গেছে। ইতোমধ্যে নেতৃত্বস্থানীয় পদার্থবিদ ও দার্শনিক অ্যার্নস্ট ম্যাখ দেখলেন অধিবিদ্যা ও জ্ঞানতত্ত্বের সঙ্গে কান্টের জড়িয়ে যাওয়া বিজ্ঞানের জন্য বিপজ্জনক। তিনি কান্টের জ্ঞানতত্ত্বকে বিকটমূর্তি বলে উল্লেখ করেন।

এদিকে মরিস স্লিককে কেন্দ্র করে ভিয়েনায় একদল দার্শনিক একত্রিত হয়েছিলেন। তাদের অভিপ্রায় ছিল মাখের দর্শনের পরবর্তী পর্যায়। যারা নিজেদের প্রথমে ডাকতেন আর্নস্ট মাখ সোসাইটি নামে। কিন্তু চূড়ান্তভাবে তারা পরিচিত হন ভিয়েনা সার্কেল হিসেবে।

এই সার্কেলের অনেক কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য— অধিবিদ্যার মূলোৎপাঠন (কারনাপ), দর্শনে যুক্তিবিদ্যার শ্রেষ্টত্ব উদ্ধার করা (গোডেল), লিঙ্গুয়েজস্টিক কনভেনশনালিজম (ওয়াইজম্যান) এবং কান্টের সংশ্লেষণী পূর্বতসিদ্ধের ভ্রান্ততা প্রমাণ। এছাড়া পূর্বতসিদ্ধ (অপর্যবেক্ষণযোগ্য) ও পরতসিদ্ধ (প্রত্যক্ষণের উপর নির্ভরশীল) সম্পর্কে ডেভিড হিউমের দৃষ্টিভঙ্গির অদলে তারা বলেন, সত্য হলো দ্বিরুক্ত (সংজ্ঞাগতভাবেই সত্য বা টটোলজি) অথবা অভিজ্ঞতাভিত্তিক (প্রত্যক্ষণ দ্বারা বিচার্য)।

সুতরাং, কান্টের দর্শনের এই দুই প্রতিক্রিয়া দর্শনের ভিন্ন দুটি স্কুল নির্দেশ করে। অধিবিদ্যা ও জ্ঞানতত্ত্ব নিয়ে তাদের আচরণও ভিন্ন, দার্শনিক পদ্ধতি ও বিচরণের সীমার দিক থেকেও।

মার্টিন হাইডেগার ও বাট্রান্ড রাসেল।

হাইডেগার ও ভিটগেনস্টাইনের বিচ্ছেদ

হেগেল পরবর্তী কন্টিনেন্টালে নানান ধরনের দ্বান্দ্বিক অধিবিদ্যা সূত্রবদ্ধ হয়েছে, অন্যদিকে ভিয়েনা সার্কেলে পাই যুক্তিবিদ্যা ভিত্তিক জ্ঞানের তত্ত্ব। মার্টিন হাইডেগার (১৮৮৯-১৯৭৬) গড়লেন তত্ত্ববিদ্যা বিষয়ক তত্ত্বসমূহ, যেখানে অনটোলজি মানে স্টাডি অব বিয়িং। তিনি বিয়িং-কে অভিজাত দার্শনিক বর্গে পরিণত করেন। কারণ, এটি সব অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কযুক্ত। উল্টোদিকে ভিয়েনা সার্কেল বলছে, দর্শন মূলত একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রকল্প, হাইডেগার তর্ক তুললেন— বিয়িং হলো জ্ঞানের অগ্রগামী। এবং ফেনোমেনা (অভিজ্ঞতার বিষয়বস্তু) অবশ্য যৌক্তিক বর্গীকরণ বা ব্যাখ্যার আগেই পঠিত হয়ে থাকে।

এর মাধ্যমে ফেনোনেমোলজি বা অবভাসবিদ্যায় দার্শনিক সমস্যার যৌক্তিক বিশ্লেষণে অরুচি তৈরি করেন হাইডেগার। রিচার্ড ম্যাথুর মতে, এভাবে হাইডেগার ‘যুক্তিবিদ্যায় সীমারোপের চেষ্টা করেন’ এবং পথ তালাশ করেছেন ‘দর্শনকে যুক্তিবিদ্যা মুক্ত করতে’। এমনকি আরেকটু এগিয়ে কেউ কেউ বলেন, প্রি-লজিক্যাল ফেনোমেনোলজির প্রশ্রয় নিয়ে যুক্তিবিদ্যাকে বাতিল করেন তিনি।

ইতোমধ্যে এনালাইটিক দর্শনে অনেক বদল হয়ে গেছে। রাসেলের ছাত্র লুডভিগ ভিটগেনস্টাইন লিখেছেন বৈপ্লবিক ‘ট্রাকটাটাস লজিকো-ফিলোসফিকাস’, যা ভাষা দর্শনের দিকে জোর দেয়। ভিটগেনস্টাইন যে তত্ত্ব দাঁড় করালেন, তাতে দেখা যায় দুনিয়ায় বচনগুলো হলো বিদ্যমান যৌক্তিক ছবি। যার মানে হলো— বাক্য তখনই অর্থপূর্ণ হবে যদি তারা ছবির মতো হয়। এভাবে কারনাপ ও ভিয়েনা সার্কেলের সাথে ভিটগেনস্টাইন অধিবিদ্যা ও আল্লাহ বিষয়ক আলাপ ধ্বংসে মাতলেন। (অবশ্য ‘ফিলোসফিক্যাল ইনভেস্টিগেশন’ নামের ভিটগেনস্টাইনের পরবর্তীকালের বই এখানে আলোচ্য নয়।)

১৯২৯ সালের এক বক্তৃতায় তিনি বলেন, নৈতিক ও ধর্মীয় ভাষায় প্রতিনিয়ত রূপকের ব্যবহার হয়। কিন্তু রূপক হলো কোনো কিছুর রূপক। এবং আমি যদি রূপকের মাধ্যমে কোনো ফ্যাক্ট বা প্রকৃত বাস্তব বর্ণনা করতে পারি তবে ওই রূপক বাদ দিয়েই আমি ফ্যাক্টটিকে বর্ণনা করতে পারব। এ ক্ষেত্রে, যত তাড়াতাড়ি রূপকটি বাদ দেওয়ার চেষ্টা করব এবং তার পেছনে কোনো ফ্যাক্ট আছে কিনা দেখতে চাইলে আমরা দেখতে পাবো তেমন কোনো ফ্যাক্ট নেই। তাহলে প্রথমে যা কিছু রূপক হিসেবে দেখা গিয়েছিল, তা এখন নিরর্থকই প্রতীয়মান হবে।

এনালাইটিকের দীর্ঘ ট্র্যাডিশনে ভিটগেনস্টাইন শুধু আল্লাহ-বিরোধী-আলাপের ধারাই তৈরি করেন নাই, তিনি এমন এক মানসিকতা তৈরি করেন যেখানে ভাষার বিশ্লেষণকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ‘ছদ্ম দার্শনিক সমস্যা’ চিহ্নিত করা যায়। ভিটগেনস্টাইনের মতে, ধারণাগত বা যৌক্তিক সমস্যাগুলো নিছকই ভাষার ভুল। ভাষার সীমাবদ্ধ থেকে সমস্যার সৃষ্টি। সিমান্টিক্যালি বা শব্দার্থগতভাবে ভুল পথে চালিত বাক্য ভাষার যুক্তিকে বিভ্রান্ত করে, প্রশ্নের মধ্যে যে প্রস্তাবনা থাকে তার বিশ্লেষণ করে এর অবসান সম্ভব।

অস্তিত্ববাদ ও যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদের উত্থান

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে জাঁ পল সার্ত্রে (১৯০৫-১৯৮০) ফ্রান্সে ‘ফেনোমেনোলজিক্যাল অনটোলজি’ জনপ্রিয় করেন, যাকে তিনি অস্তিত্ববাদ হিসেবেই বর্ণনা করেন। বর্তমান সময় পর্যন্ত এর নিস্পত্তিমূলক প্রভাব আছে কন্টিনেন্টাল চিন্তায়। সার্ত্রের মতে, হিউম্যান অনটোলজি নিজের পূর্ণ সাবজেক্টিভির মাঝে একাট্টা : আমরা হলাম তা-ই যা আমরা বাছাই করি ও যা আমাদের অভিজ্ঞতা। হাইডেগারের শিক্ষা থেকে ডাজাইনকে (বিয়িং-দেয়ার) নেন সার্ত্র। তিনি মানুষকে এজিস্টেশিয়াল সত্তা হিসেবে চিহ্নিত করেন। আমরা একটি অবহেলিত দুনিয়ায় নিক্ষিপ্ত এবং সে কারণে নিজেকে আমরা মুক্ত দেখি ও আমাদের কাজের জন্য দায়ি।

তার মতে, আমি এই দুনিয়ার পরিত্যক্ত, এই অর্থে নয় যে, আমি পরিত্যক্ত থাকব এবং পানির উপর ভাসমান তক্তার মতো প্রতিকূল মহাবিশ্বের নিস্ক্রিয় থাকব, বরং এই অর্থে যে আমি আকস্মিকভাবে নিজেকে একা দেখতে পাই ও কোনো সাহায্য ছাড়া নিজেকে খুঁজে পেতে পারি, একটি জগতের সঙ্গে যুক্ত হই যেখানে সক্ষমতা ছাড়াই আমি পুরো দায়িত্ব বহন করি, যাই হোক না কেন, এক মুহূর্তের জন্য হলেও এই দায়িত্ব থেকে নিজেকে দূর রাখতে চেষ্টা করি। (বিয়িং অ্যান্ড নাথিংনেস)

তার বন্ধু আলবেয়ার কামু (১৯১৩-১৯৬০) আমাদের এজিস্টেশিয়াল স্তরে জেনুইন অবসার্ডিটি খুঁজে পান। তার মতে, ‘অবসার্ড হলো অপরিহার্য ধারণা ও প্রথম সত্য’ এবং ‘আমাদের চারদিকে ঘিরে থাকা সবকিছুর অবসার্ডিটিকে গ্রহণ করা হলো… আবশ্যকীয় অভিজ্ঞতা’ (অ্যান অবসার্ড রিজনিং) জগতের অবসার্ড চরিত্রকে জড়িয়ে ধরা ও চ্যালেঞ্জ জানানো হলো সত্য ও খাঁটি অভিজ্ঞতায় উপনীত হওয়া। যদিও অবসার্ডকে জড়িয়ে ধরার ক্ষেত্রে দুটি হুমকি আছে : এটা হতাশা ও যা সম্ভাব্য আত্নহত্যার দিকে ঠেলে দেয়। অথবা ভাববাদ ও অজ্ঞানতার দিকে ঠেলে দেয়। তো, লক্ষ্য হতে হবে চরম ভাববাদ ও হতাশার মধ্যে ভারসাম্য রাখা।

সার্ত্রে ও কামুর লেখালেখি প্রকাশের মধ্যে কন্টিনেন্টাল ফিলোসফি বাঁক নেয়। বহুবছর ধরে কন্টিনেন্টাল দার্শনিকরা কোনো ধরনের পূর্ণাঙ্গ প্রকল্প নিয়ে যুক্ত হননি, তাদের মধ্যে ছিল অনড় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ। ইতিহাসের বাঁকবদলের হেগেলের ইউটোপিয়ান ধারণায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও জাতীয় সমাজতন্ত্রের পূর্বাভাস দিতে পারে নাই। এই যুদ্ধের কারণে কন্টিনেন্টাল দার্শনিকরা বুঝতে পারেন, যে উদ্যোগই ক্ষমতাকে একচেটিয়া অধিকার করতে চায়, এমনকি দর্শন নিজে হলেও, এটা সন্দেহজনক।

ইতোমধ্যে রর্বাট হান্না জানাচ্ছেন, ইউরোপে শতবর্ষ প্রাধান্য বিস্তার করা কান্টের দর্শনের সমাপ্তিতে সিলমোহর পড়ে এনালাইটিক দর্শনের উত্থানে। ভিয়েনা সার্কেলের চিন্তাকে বহন করে এনালাইটিক দর্শন মনোযোগকে আরো সুনির্দিষ্ট করে তোলে। ‘যৌক্তিক বিশ্লেষণ’ নামের একই ধরনের প্রকল্পে বাট্রান্ড রাসেল বলেন, যে দার্শনিকরা যৌক্তিক বিশ্লেষণকে দর্শনের কাজে পরিণত করেন তারা এই সবগুলোই (ধর্মীয় মতবাদ ও অধিবিদ্যা) বাতিল করে দেন। এ বিসর্জনের কারণে তারা অনেক প্রশ্ন আবিষ্কারের মাধ্যমে পুরস্কৃত হন। আগে যা অধিবিদ্যার কুয়াশা দ্বারা অস্পষ্ট ছিল, এখন তার উত্তর আসে স্পষ্টভাবে। (দ্য হিস্ট্রি অব ওয়েস্টার্ন ফিলোসফি, ৮৩৫)

যে প্রক্রিয়াকে তিনি যৌক্তিক বিশ্লেষণ নাম দেন তার মনোযোগ ছিল যৌক্তিক বিষয়, দার্শনিক সমস্যা ও জ্ঞানবিদ্যার সাথে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও প্রক্রিয়ার হাতিয়ারের সঙ্গে, যার উদ্দেশ্য ছিল জল্পনামূলক অধিবিদ্যার লোকসানি জালে আটকা পড়া এড়িয়ে যাওয়া। এই তত্ত্ব হয়ে যায় এনালাইটিক দর্শনের ট্রেডমার্ক এবং নির্ধারণ করে দেয় এর পদ্ধতি ও বিচরণ ক্ষেত্র। এভাবে সাফ সাফ এনালাইটিক দর্শন আলাদাভাবে নিজের পথ খুঁজে নেয় ও কন্টিনেন্টাল দর্শনের বিরুদ্ধে যায়।

উত্তরাধুনিকতাবাদ রূপে আধুনিক কন্টিনেন্টাল দর্শন

অস্তিত্ববাদী ধারা সার্ত্র ও ডি ব্যুভরের সঙ্গে মূলত সমাপ্তিতে পৌঁছে, তবে এর ধারাবাহিকতায় কিছু আন্দোলন চোখে পড়ে। যার সাধারণ প্রবণতা হলো সন্দেহগ্রস্ততা ও কর্তৃত্ববাদ-বিরোধি দর্শন।

কাঠামোবাদের পথ ধরে পাই পরবর্তী-কাঠামোবাদ বা পোস্ট-স্ট্রাকচারালিজম, জ্যাক দেরিদার বিনির্মাণবাদ। মিশেল ফুঁকো অনুসন্ধানের মাঝে ছিল সরকারের নিয়ন্ত্রণ, পাগলামি ও যৌনতা; জ্যাঁ বদ্রিঁয়া প্রশ্ন তোলেন অধি-বাস্তবতা বা হাইপার রিয়েলিটি ও সিমুলাক্রা বা কারো কাছে একটি ইমেজ কী রূপে উপস্থাপিত হয় তা নিয়ে এবং চূড়ান্ত নাস্তিবাদ বা নিহিলিজমের পুনরুত্থান ঘটান ভাটিমো। একটু শিথিলভাবেই এ সবগুলোকে বলা হয় উত্তরাধুনিকতাবাদ বা পোস্ট মর্ডানিজম। এই টার্মকে সংজ্ঞায়িত বা এর পরিসরকে সীমায়িত করা কঠিন, কিন্তু এটা বাস্তবতা, সত্য, মূল্য ও অর্থ নিয়ে কথিত খাঁটি মতকে বিনির্মাণ করে। জার্মান ভাববাদের মেটা-ন্যারেটিভ আরো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে উত্তরাধুনিকতাবাদে বিচার্য হয়, কিন্তু পূর্বসুরীদের সব আশাবাদই হতাশাজনক হয়ে ওঠে।

উত্তরাধুনিক চিন্তা অংশত এনালাইটিক দর্শনের মতো আশাবাদী ও মাত্রাতিরিক্তভাবে তাৎক্ষণিক আত্মতুষ্টি নির্ভর। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, এনালাইটিক দর্শনের যুক্তিবিদ্যা ও বিজ্ঞানে আস্থাকে অস্তিত্ব ও অর্থবোধকতার মতো বড় বিষয়গুলোকে উপেক্ষার কারণ হিসেবে দেখা হয়। আর কন্টিনেন্টাল দর্শনের ধ্রুপদী ধারাগুলো অব্যাহত রাখার জন্য উত্তরাধুনিকতাকে শেষ বিন্দু হিসেবে দেখা হয়।

লুডভিগ ভিটগেনস্টাইন

 

আধুনিক বিশ্লেষণী দর্শন হিসেবে ফিলোসফি অব মাইন্ড

বিশ শতকের শেষদিকে ফিলোসফি অব মাইন্ড বিশ্লেষণী দর্শনের অন্যতম আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। হিলারি পুটনাম হলেন আধুনিক ফিলোসফি অব মাইন্ডের অন্যতম অগ্রদূত। মন ও মস্তিষ্কের সম্পর্ক নিয়ে তার প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বটি ফ্যাংশনালিজম নামে পরিচিতি। যেখানে মানসিক অবস্থাকে বিশ্লেষণ করা হয় তাদের ক্রিয়ার প্রেক্ষিতে। এছাড়া তিনি মাল্টিপল রিয়েলাইজেবিলিটি তত্ত্বও প্রস্তাব করেন। এই মতে, বিভিন্ন ধরনের শরীরিক ক্রিয়ার যে অভিজ্ঞতা তা একই মানসিক অবস্থায় হতে পারে যদি  সাংগঠনিকভাবে তাদের মিল থাকে। বিপরীতে ‘নন-রিডিউটিভ ফিজিক্যালিজম’ তত্ত্বের জন্য পরিচিত ডোনাল্ড ডেভিডসন বলছেন, শারিরীক প্রতিক্রিয়ার কারণ শুধু শারীরিক বস্তু। কিন্তু মন পুরোপুরি মস্তিষ্কের মতো শরীরি সত্তায় রূপান্তরযোগ্য নয়। তবে মন কেন মস্তিষ্কে রূপান্তর হতে পারে না তা নিয়ে বেশ কিছু হাইপোথেটিক্যাল আর্গুমেন্টের অবতারণা করেন ডেভিড শালমার্স। যার মধ্যে বিখ্যাত জম্বির ধারণাটিও রয়েছে। আর এ সবগুলোই ঘটে বিশ্লেষণী দর্শনে।

কী হলো, কেন হলো

কান্টের অধিবিদ্যিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক তত্ত্বের দুটি স্বতন্ত্র প্রতিক্রিয়া- একটা হলো হেগেলের, অন্যটি ভিয়েনা সার্কেলের। সত্তাতাত্ত্বিক অদ্বৈতবাদের মাধ্যমে কান্টের দোতালা দুনিয়া নাকচ করেন হেগেল এবং টটোলজি বা দ্বিরুক্তি ও অভিজ্ঞতা দ্বারা তথ্য যাচাই- এ দুই ভাগাভাগির মাধ্যমে সংশ্লেষণী পূর্বতসিদ্ধকে নাকচ করে ভিয়েনা সার্কেল। হেগেলের ভাববাদী তত্ত্ববিদ্যাকে অবভাসবিদ্যায় স্থানাস্তরিক করেন হাইডেগার, যার কেন্দ্রীয় ধারণা বিয়িং ইন দ্য ওয়ার্ল্ড। পরের দৃশ্যে ভিটগেনস্টাইন হাজির হলেন ভাষার বিশ্লেষণ নিয়ে, যা ছিল ভিয়েনা সার্কেলের অধিবিদ্যা বিরোধিতায় জ্বালানি, যেখানে মেনে নেওয়া হয় ভাষা হলো পর্যবেক্ষনযোগ্য প্রকৃতি ও প্রকৃতির আয়না। যা এই পরীক্ষায় পাস করে, তবে তা-ই অর্থপূর্ণ।

আবার অবভাসবাদীদের অনেক শিক্ষা গ্রহণ করেছেন অস্তিত্ববাদীরা, সাথে যোগ করেছেন অস্তিত্ব, স্বাধীনতা, উদ্বেগ ও আবসার্ডিটি। ইংল্যান্ডে ভিয়েনা সার্কেলের ধারাবাহিকতা থাকল যোক্তিক প্রত্যক্ষবাদের মাধ্যমে; রাসেল ও এ জে আয়ার তৈরি করলেন জ্ঞানের নানা তত্ত্ব ও যৌক্তিক বিশ্লেষণের পদ্ধতি। সাম্প্রতিক সময়ে কন্টিনেন্টাল ফিলোসফি এসে থেমেছে উত্তরাধুনিকতাবাদে। তারা আক্রমণ করলেন খাঁটি সত্যের ধারণা, ঐতিহাসিক মেটা-ন্যারেটিভ, ভাববাদী অধিবিদ্যা ও ভাষাগত/শব্দার্থিক বাস্তববাদকে। অন্যদিকে এনালাইটিক পক্ষ, বেশ শক্তভাবে জেগে উঠেছে আধুনিক ফিলোসফি অব মাইন্ডে, যেখানে জীববিদ্যা, স্নায়ুবিজ্ঞান ও পদার্থবিজ্ঞানের চিন্তা ভাগাভাগি করা হচ্ছে।

সুতরাং, জার্মান ভাববাদের মাধ্যমে কন্টিনেন্টাল দর্শনে সূত্রপাত, যা রূপান্তরিত হয় অবভাসবিদ্যায়, পুনর্নির্মিত হয় অস্তিত্ববাদে এবং এখনো রয়েছে উত্তরাধুনিক মেজাজে। এনালাইটিক দর্শনের শুরুটা ছিল ভিয়েনা সার্কেলে কান্টের জ্ঞানতত্ত্বের প্রতিক্রিয়ায়, ভিটগেনস্টাইনের মাধ্যমে এটা ভাষাগত বিশ্লেষণের উদ্দীপনা পায়, আরো সুনির্দিষ্টভাবে নিয়মের মধ্যে আসে যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদী ও অন্যদের দ্বারা। আর বর্তমনে ফিলোসফি অব মাইন্ড ও অন্যান্য ডিসিপ্লিনের মাধ্যমে শক্তিশালী অবস্থানে আছে।

তারপর?

কেউ কেউ অবশ্য এক ধরনের ঘনিষ্টতার আশা করছেন। যেখানে; কন্টিনেন্টাল ধারার ইতিহাস সচেতনতার সঙ্গে এনালাইটিক দর্শনের কঠোরতার মেলবন্ধন হবে! যদি ভারসাম্যপূর্ণ কিছু করতে হয়, তবে আমাদের বুঝতে হবে দুই ধারার পদ্ধতি, সীমা আছে। কিন্তু তার মানে এই নয়, আমরা সবকিছুতে বিশ্বাস করি। অবশ্য আমাদের উপলব্ধি করতে হবে দুই ধারাতেই শুরুর ভুল ও শুদ্ধ বিন্দু আছে, আছে পদ্ধতি ও জবাব। প্রশ্ন উঠতে পারে দর্শনে এ ধরনের অদলবদল হতে পারে কিনা? যেমন; এনালাইটিক ফেনোমেনোলজি ও ফেনোমেনোলজিক্যাল এনালাইসিস, সায়েন্টেফিক হিস্ট্রি ও হিস্ট্রিক্যাল-মাইন্ডেড সায়েন্স, এপিজটেমোলজিক্যল এথিকস ও এথিক্যাল এপিজটেমোলজি। এবং এই সব আলোচনায় এসে দুই ধারা মিলিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবন দর্শনের কথা বলেন কেউ কেউ।

(কাইল জোনসের লেখা অনুসারে)

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.