পাহাড়ে শেষ বিকেল

এক.
আমাদের স্কুলের নাম সবুজ শিক্ষায়তন উচ্চ বিদ্যালয়। সীতাকুণ্ডের হাফিজ জুট মিলসে অবস্থিত। এসএসসি-তে আমরা ১৭ জন ছেলেমেয়ে। তার মধ্যে ১২ জন ছেলে। স্কুলের শেষবেলা ঘনিয়ে আসলে এ কটা ছেলে-মেয়ের মধ্যে অদ্ভুত এক সম্পর্ক তৈরি হয়। আমাদের মধ্যে নানান ধরনের রেষারেষি ছিল। বেশির ভাগ অহেতুক। তবুও এগুলোই ছিল আমাদের জীবনের সৌন্দর্য। শেষবেলায় এসে নানা উপলক্ষ্যে নিজেদের কাছাকাছি থাকতে লাগলাম। বিশেষ করে ছেলেরা। মেয়েরা তো শেষদিকে পরীক্ষার টেনশনে অস্থিত থাকে। কেন এ কাছাকাছি থাকার চেষ্টা- অচিরেই হারিয়ে যাবো, হয়তো তাই।

একবার গেছিলাম ফয়স লেক। অদ্ভুত বিষয় হলো সেদিন ফয়স লেকে কী কী করেছিলাম কিছুই মনে নাই। একটা জিনিস মনে আছে একে খান বা অলংকার থেকে টেক্সি করে গেছিলাম। একটা লম্বা দেওয়ালের পাশ দিয়ে। আরেক বিষয় মনে আছে- ওখানে একটা জায়গাকে লোকে বলত- কবিলা ধন। পরে জেনেছি এটা হকে কৈবল্য ধাম।

ফয়স লেকে প্রথম গেছিলাম প্রাইমারি স্কুলে থাকতে পিকনিকে। আমরা দেখি ফুল দিয়ে ঢাকা গোল মতো একটা জায়গা। কে যেন বলেছিল এখানে নাকি জিয়াউর রহমান কবর ছিল। সবার মতো আমাকেও টলটলে পানি মুগ্ধ করেছিল। কি চমৎকার পানি! আমরা ভয়ে ভয়ে লেকের মাঝখানে ব্রিজের মতো একটা জিনিস ছিল- সেখানে দাড়িয়েছিলাম। এর মধ্যে কে যেন বলল বানর। লেকের ওপারে জঙ্গলের মধ্যে বৃথা বানর খোঁজাখুঁজি। হয়ত কিছু না- আমরা ভেবেছিলাম। বাসায় ফিরে বেশ আহলাদ করে বলেছিলাম- বানর দেখেছি। ক্লাস থ্রি বা ফোরে থাকতে স্কুলে থেকে গেছিলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। একটা জিনিস পরে ধরতে পারছি আমাদের গাড়িটা আর্ট ফ্যাকাল্টির দোয়েলের মূর্তির সামনে দিয়ে গেছিলো। কিন্তু যে দৃশ্যটা এখনো চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই- সে জায়গাটার হদিস সাত বছর ক্যাম্পাস থাইকা পাই নাই। সেটা হলো একটা পাহাড়ের ঢাল। সেখানে বসে ডিম-পাউরুটি-কলা খাইছিলাম। বড় আপুরা বোধহয় শাড়ি পড়ে নেচেছিল। পরে স্কুলের নোটিশ বোর্ডে ডিম খাওয়ার ছবি টাঙ্গানো হইছিল।

যাই হোক, এত কথা বলছিলাম যদি কথা সূত্র ধরে স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে যাওয়া ফয়স লেকের কথা মাথায় আসে। কিছু আসে নাই। একটা আসছে.. বাসা থেকে নানাভাবে মানা করছে। এমনকি বলছিল বাবার শরীর খারাপ। তারপরও গেছিলাম। আমরা অবশ্য বেশি সময় থাকি নাই। বিকেল গড়াতেই বাসায় ফিরে আসছি।

আরেকবার আমি আর জসীম ভাইয়া ফয়স লেক গেছিলাম। আমি ঝিনুকের তৈরি পুতুল কিনছিলাম ছোট বোনের জন্য। বাসে উঠতে গিয়ে প্রায় পড়ে যাওয়ার অবস্থা হয়েছিল। গাড়ির লোকজন আমাদের খুব বকাঝকা করে। মনে আছে পরদিন দুইজনের জ্বর চলে আসে। তবে ঈদের সময় হওয়ায় বাসায় বকা শুনতে হয় নাই।

দুই.
আসলে এতো এতো বাধা-ধরা অনেকের ক্ষেত্রে ছিল, বারো জনের যাওয়ার জায়গা ছিল কম। স্কুলের পেছনের পাহাড়। এটা অবশ্য অদ্ভুত এর আগে আমরা দল বেধে পাহাড়ে যাই নাই। একবার আমি, রাশেদ ও আরিফ কুমিরায় গেছিলাম উষ্ণ পানির প্রসবণ দেখতে। কী অদ্ভুত! একই গর্তে আগুন জ্বলছে, পানিও উঠছে। দুই একবার রেল লাইন পর্যন্ত গেছিলাম। রেল লাইনে আমার একটা প্রিয় জায়গা ছিল। বার আউলিয়ার দিকে এগিয়ে গেলে ছোট্ট একটা ব্রিজ। ব্রিজের কিনারে বিশাল একটা গাছ। বর্ষাকালে সেখানে ভীষণ স্রোত বয়ে যেতো। সে পানি মিলত সমুদ্রে।

একবার আমরা রেল লাইনে গেছিলাম। আহসান হাবিব স্যার বললেন আমাদের ককটেল বানিয়ে দিবেন। বানানোর পর দেখা গেল মোট ককটেল ছয়টা। প্রতি দুইজনের ভাগে একটা করে পড়ে। এগুলো ফুটাতে আমরা রেল লাইনে গেছিলাম। তবে ভালো মতো ফুটে নাই। হাবিব স্যার আমাদের কৃষিবিজ্ঞান পড়াতেন। আমরা একবার তার নেতৃত্বে ক্ষেত করেছিলাম। সিম, টমেটো এসব আরকি। জীবনে একবারই গোবর ধরেছি। মাঠ তৈরি করতে গিয়ে। গোবর ধরাধরিও যে একটা মজার বিষয় হতে পারে সেবার বুঝে ছিলাম। যদিও পরে কখনও ধরা হয় নাই। উপলক্ষ্য আসে নাই।

তো আমরা বারোজন মিলে। যিশুর বারো শিষ্যের মতো হয় তো। আমাদের বারো জনের মধ্যে এখন সম্ভবত কারো প্রফেশনে মিল নাই। শুনছিলাম পাহাড়ে খেজুরের গুড় তৈরি হয়। উত্তর বঙ্গ থেকে লোকজন এসে নাকি এক সিজনের জন্য পাহাড়ের খেজুর গাছগুলো কিনে নেয়। তারপর সেখান থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় বানায়। আমাদের কাজ হলো মুড়ি কিনে নিয়ে যাওয়া। আমরা অবশ্য কলাসহ আরও কি যেন নিয়ে গেছিলাম।

আমরা পাহাড়ের কোলে শুয়ে ছিলাম। কেউ কৌতুক বলছিল, কেউবা ধাঁধা।

শেষ বিকেলের পাহাড়। অদ্ভুত এক মগ্নরূপ চারদিকে। আমরা একেক সময় দুষ্টুমী করি আবার চুপ হয়ে যাই। পাহাড়গুলে কি অদ্ভুত। কোনো কোনোটা এত পরিচ্ছন্ন! সবুজ ঘাসে ঢাকা। মখমল যেন। আমরা নিচের দিকে গড়াতে থাকি। একে অপরের উপর পড়ছি। এখানেও ঝগড়া বেধে যায়। হা হা হা।

তিন.
সবসময় যা হয়। তখনো তা হলো। হঠাৎ আমি আর রাশেদ উঠতে থাকি। একটা পাহাড় চূড়ায়। উঠতেই থাকি। কিছুটা বিরক্তি তো ছিল। তার চেয়ে বড় কথা- কোলাহলে কেন যেন একা বোধ করি। এর জন্য একটা দূরে যেতে হয়। সে শেষ বিকেলে আমরা অনেক উপরে উঠে আসি। সমুদ্র দেখা যেতে থাকে। অদ্ভুত নীল। এ পানি কখনো আমি এতো নীল দেখি নাই। সব সময় ঘোলা। শুধু পাহাড়ে উঠলেই নীল হয়ে উঠত। শেষ বিকেলে তো নীল হওয়ার কথা না। হয়ত অন্য সময়ের স্মৃতি মিলিয়ে ফেলেছি। অনেকে বলত পাহাড় থেকে নাকি সন্দ্বীপ দেখা যায়। হয়ত আমরা সন্দ্বীপ দেখেছিলাম। সন্দ্বীপ নাকি এক সময় কাছেই ছিল। পরে আস্তে আস্তে ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে দূরে সরে যায়। একটা মসজিদের কথা শুনেছিলাম। যেটা নাকি সমুদ্রে তলিয়ে গেছে। এ রকম একাকী এক মসজিদ আমার স্বপ্নে অনেকবার এসেছে। সমুদ্রের ধারে বা পাহাড়ের উপর নিসঙ্গ মসজিদ। ভার সইতে না পেরে কেঁদে উঠতাম। এখন আর আসে না। কেন!
Kirk Witmer Fine Art
আমরা নিজেদের অনেক ক্ষোভ বলতে বলতে চুপ হয়ে যায়। আমরা অনেকটা শুদ্ধবাদী ছিলাম। তাই আলাদা হয়ে আসি। কিন্তু এর বাইরে অসাধারণ একটা বিষয় ঘটে যায়। ঘন সবুজের মাঝে যেন আটকা পড়ে যায়। আমাদের নিসঙ্গতা প্রবল হতে থাকে। এক ধরনের হাহাকার তৈরি হয়। কিন্তু ক্ষণে মনে হয় তা কখনও মেটার নয়।
আমরা কখনও সে পাহাড়ের ফাঁদ থেকে বেরুতে পারি নাই। পাহাড়ের নিসঙ্গতায় প্রবলভাবে ঢুকে পড়ে। তাই হয়ত মানুষের সঙ্গে হেসে যে কয়টা কথা বলব- তাতে কি যে সংকোচ।

আমি অনেক ভেবেছি- কি করতে চাই। সবসময় একটাই উত্তর পেয়েছি। অনেক উচুঁ একটা পাহাড়ের উপর বসে থাকতে চায়। অনন্ত পরিমাণ সময়। সেদিনের- শেষ বিকেলের পাহাড় আমার মাঝে এভাবে ঢুকে পড়ে। এটা হয়ত সম্ভব না অথবা সম্ভবও। কী নিদারুন একটা স্বপ্ন দেখতে দেখতে হারিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি নিচের সবুজ অরণ্যে। আবার সে অরণ্য দেখতে চাই পাহাড় চূড়া থেকে। এত উপর থেকে মানুষের পক্ষে কি নিচের কিছু খুঁজে পাওয়া সম্ভব! সেদিন পাহাড়ে উঠার আগে মনে মধ্যে যে স্বপ্ন ছিল- এদিন হেটে হেটে এ পাহাড়গুলো পার হয়ে যাবো। তা আর হয় নাই- বিমূর্ততার আড়ালে হারিয়ে গেছে মূর্ত মানুষ।

হয়ত একটা জীবনে এমন অবর্ণনীয় বিকেল একবারই আসে। তাই এর জন্য দিতে পারি হাজারো বিকেল। থাকি না কিছুটা মুক হয়ে।

…………………………………………………………………………………………………..

ফিসফাস

হাতের রেখায় অনুজ্জ্বল হলো
বাদামী পৃষ্টার ছোপ ছোপ ছাপ
আমরা সে ফিসফিসানী এড়িয়ে
মগ্ন পাখির খোঁজে
পাহাড়ের নির্জনতায় হাঁটছিলাম।

কেউ একজন উদাম করে
বাদামী ঝোপের ছায়া
কারণ-অকারণ আর ভুলের চিহৃ ভরা
ফুল তোলা গণিতের খাতায়
আমাদের অবুঝ অলক্ষ্যে
এঁকে দিচ্ছিল হেমন্তের ছবি।

তার কিছু ভান হয়তো
ডানায় নিমিত্তের অপর বাসনা
মানুষ কি ছাই জানে-
নাড়ি পুতেছে বালিয়াড়ির তলে।

আমরা কেউ সে কথা তুলি নাই
নৈঃশব্দ্যে বিমূঢ় ছিলো নিমের বন
রং হারানো মগ্ন পাখি বুকে জড়িয়ে
আধো ছায়ায়  ঘুমিয়ে পড়ি
আমাদের চারপাশে ভাসতে থাকে
বিকেলের ছোপ ছোপ ফিসফাস।

*‘পাহাড়ে শেষ বিকেল’ নামটি নোমান সাইফুল্লাহ’র কবিতা থেকে নেওয়া। ছবি: অন্তজাল থেকে।

Comments

comments

6 thoughts on “পাহাড়ে শেষ বিকেল

  1. Pingback: চলো বন্ধু ঘুরে আসি | ইচ্ছেশূন্য মানুষ

  2. Pingback: কোথায় আমার স্কুল | ইচ্ছেশূন্য মানুষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *