মায়া

‘প্রতিদিন স্নায়ুতন্ত্র অবশ হবার আগে আমি নতুন নতুন প্রশ্ন তৈরি করি। মানুষ অবাক হতে পারলে খুশি হয়। অনেক মানুষ শুধুমাত্র অবাক হবার জন্য বেঁচে থাকে। বিস্ময়ে তাদের জীবন অর্থপূর্ণ হয়। ইদানিং আমি বিনামূল্যেই বিস্মিত হচ্ছি।’

এক.

তার নাম নীলাঞ্জনা। নীলাঞ্জনা নিয়ে চমৎকার কিছু গান ছিলো আগের যুগে। একটার কথা আবছা মনে পড়ছিল তখন। নীলাঞ্জনাকে একবার জিঞ্জেস করেছিলাম- আপনি কি ‘নীলাঞ্জনা গানটি শুনেছেন’?

তিনি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। কেউ অবাক হলে আমার ভালো লাগে। একই প্রশ্ন দুইবার জিগেস করলে লোকে প্রথমবারের মত অবাক হয় না। বিস্ময়ের লেশমাত্র রেশ হয়তো থাকে। কচিৎ বিস্ময়ের সাথে সাথে একধরণের মগ্নতা দেখা যায়। এটাও আমার ভালো লাগে। এসবই স্মৃতি নামক ছায়াময়তা থেকে বলছি। তবে একই প্রশ্ন খুব একটা দ্বিতীয়বার করা হয় না। কিন্তু আজ দেখলাম বিষয়টা এমন না।

আজ আমি নিজেই বিস্মিত হলাম। নীলাঞ্জনাকে জিগেস করলাম, আচ্ছা আপনি কি কখনো প্রেমে পড়েছেন? তিনি তৃতীয় দিনের মতো আজো অবাক হলেন। নীলাঞ্জনার অবাক হবার ক্ষমতা আমাকে মুগ্ধ করল। কিন্তু কাঁটার মতো কি যেন আটকে থাকল মনের মধ্যে। মনে পড়ে পড়ে করে পড়ছে না।

কয়জনের লোকের ইন্টারভিউ নিতে হয়েছিল একবার। সেটা ছিলো আন্তঃনাক্ষত্রিক মিশন। মানুষ নানা গ্রহে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে পছন্দ করলেও যোগাযোগের বিচ্ছিন্নতা পছন্দ করে না। সে হয়ত গুহার মধ্যে বসবাস করবে কিন্তু একটা কমিউনিকেশন ডিভাইস লাগে। অবশ্য আগের কালের সন্তদের বিষয় আলাদা। যা বলছিলাম, এটা ছিল মানুষের মস্তিষ্কের উপর গবেষণা। আশি ভাগ নমুনা বলেছে, বিস্ময়ের আলাদা গন্ধ আছে। তারা অবাক হলে গন্ধ শোকার মতো করে নাক কুঁচকায়।

কাজটি আমি বেশ উপভোগ করেছি। মানুষের চকচকে চোখ দেখার মধ্যে আলাদা মজা আছে। মজা শব্দটা আমি ইচ্ছে করে ব্যবহার করছি। এটা একটা অস্পষ্ট শব্দ। তাই বুদ্ধিমান মানুষকে চিন্তা করার সুযোগ দেয়া যায়। গবেষণা রিপোর্টে আমি মজা শব্দটি ব্যবহার করেছি। বুদ্ধিজীবীরা নাকি এর অর্থ খুজতে মেলা সময় ব্যয় করেছিল। এরজন্য আমাকে অতিরিক্ত পেমেন্ট দেয়া হয়েছিল। যদিও পুরো বিষয়টি ছিলো আমার পরিকল্পনার বাইরে ছিল। এই ধরনের কাজে পরিকল্পনার বাইরে কোন কিছু গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। এটা আমার জন্য একদম নতুন অভিজ্ঞতা ছিলো। তারপর থেকে আমি অর্থহীন চিন্তাকে গুরুত্ব দেয়া শুরু করি।

আমার পেশা হলো-মানুষকে চিন্তা করার সুযোগ করে দেয়া। আমি নানান বিষয়ে কথা বলি। বুদ্ধিমানরা তা থেকে চিন্তার খোরাক পান। এর বিনিময়ে তারা আমাকে অর্থ দেন। এই অর্থের কিছু অংশ আমি নীলাঞ্জনাকে দিই। বাকি অর্থ দিয়ে আমার যাবতীয় খরচ মেটানো হয়। তারপর অনেক অর্থ বেচে যায়। আমার ইচ্ছে যেদিন চিন্তা দেয়া বন্ধ করব- সেদিন নীলাঞ্জনাকে ছাটাই করে দিবো। তাকে আমার একাউন্টটা ট্রান্সফার করে বলব: লাইফ সাপোর্ট মেশিনটা বন্ধ করে দাও।

নীলাঞ্জনা নিশ্চয় খুব অবাক হবে। এটা দেখতে আমার খুবই ভালো লাগবে। ‘ভালো’ একটা অস্পষ্ট শব্দ। একেক ক্ষেত্রে এর একেক মানে। এরমধ্যে চিন্তা করার অনেক কিছু আছে। আমার খুব ইচ্ছে মৃত্যু নিয়ে একটা প্রশ্ন তৈরি করার। অস্পষ্ট প্রশ্ন না। এর উত্তর শুধু আমি জানব- অন্যেরা জানবে না। তারা নাক শুঁকে শুঁকে হন্য হয়ে প্রশ্নটার উত্তর খুঁজবে। কিন্তু সেই প্রশ্ন তো হাওয়ায় পাওয়া যাবে না। আমি অনেক ভেবেছি। কিন্তু পাইনি। তবে এমন কোন প্রশ্ন তৈরি করা গেলে তার জন্য অনেক মূল্য পাওয়া যেতো।

এবার নীলাঞ্জনাকে নিয়ে কিছু বলা যাক। বুঝতে পারছি তাকে নিয়ে আপনাদের মেলা কৌতুহল জেগেছে। নীলাঞ্জনা আমার নার্স। গত এক বছর দুই মাস ধরে তিনি আমার দেখাশুনা করছেন। আমার নিজের সম্পর্কে এইটুকু বলা যায়- আমার শুধু মাথাটা আছে। মানে মানুষের যে ফ্যাকাল্টি চিন্তা করে, কল্পনা করে, বিশ্বাস করে- তা অবশিষ্ট আছে। অবশ্যই এই তিনটা টার্মই অস্পষ্ট। আমার মাথাটা শরীর থেকে কোন এক দুঘর্টনায় আলাদা হয়ে যায়। তারপর কি যেন এক জটিল প্রক্রিয়ায় আমাকে মানে আমার মাথাটাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। আমার ধারণা ইচ্ছেকৃতভাবে আমার আগের স্মৃতিকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। তারপর কিভাবে কিভাবে যেন তারা মাঝে মাঝে হাজির হয়। সমস্যা হলো, বিষয়টা ধরতে গিয়েও ধরা যায় না এমন।

নীলাঞ্জনা আমার মাথার দেখা শোনা করে। আমি মাঝে মাঝে ভাবি এই যে আমি আমি করছি- এটা কি? নীলাঞ্জনা কোন কোন প্রসঙ্গে আমি শব্দটি বলে। তারটা হলো সুস্থ্য-স্বাভাবিক মানুষের আমিত্ব। কিন্তু আমার আমিত্ব কি? এই যে ঔষুধের জগতে নিরন্তন শুয়ে থাকা। শুয়ে থাকা শব্দটা আমার জন্য অস্পষ্ট। এরজন্য কিছু শরীরি ক্রিয়া লাগে। আমার যেসব কিছু নাই। মাঝে মাঝে এইও ভাবি অন্য লোকেরা যেভাবে শরীরি ও মানসিকভাবে কোন শব্দ ব্যবহার করে- আমারটা তার মত হবে কি? আমার শরীর কই কোথায় আমার মন। যদি মন বলে গ্লাসটা ধরো- আমি তো কিছু ধরতে পারি না। শুনতে আপনাদের অদ্ভুত লাগলেও বলি, মাঝে মাঝে মনে হয় আমি যেন গ্লাসটা স্পর্শ করতে পারছি। কখনো কখনো খুব কোমল একটা হাত জড়িয়ে ধরি। বাচ্চার হাত। মৃত্যুর সাথে সাথে আমি স্পর্শ নিয়েও ভাবি। কেন ভাবি জানি না।

নীলাঞ্জনা জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিলেন। বাইরে কড়া রোদ উঠেছে। বিচিত্র সব যন্ত্রপাতিতে রোদের আলো নানান ধরণের আকার তৈয়ার করছে। এগুলো সারাদিন বদলাতে থাকবে। কাঁঠাল পাতাগুলো কি অদ্ভুত রকম ঝিকমিক করছে। সে আলো আমার চোখে লাগছে।আসলে কি আমার চোখ আছে! চড়ুই পাখিরা এক ডাল থেকে অন্য ডালে ছোট ছোট লাফ দিচ্ছে। তাদের ডাক শুনা যায় না। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে ছাদের দাড়িয়ে ছোলা খেতে দিই। চড়ুই পাখিরা আশে পাশে উড়ে উড়ে আসবে। খুটে খুটে ছোলা খাবে। মনে হবে আমিই উড়ছি। প্রাচীন একটা প্রবাদ মতো আছে- দুনিয়ার সবকিছুই নাকি এক। এই দৃশ্যটা আমার সত্য মনে হয় না যদিও। তারপরও সত্যের মতো লাগে। মানুষের অভিজ্ঞতায় কি এমন কিছু ছিলো। তাইলে তো এই চড়ুইয়ের মধ্যেও আমি আছি। ইচ্ছে করছে চড়ুইকে আমার স্বপ্নের কথা বলি।

স্বপ্নই তো। বাবার হাত ধরে হাঁটছি। অনেক অনেক পথ। হয়তো সব মানুষেরা এভাবে হাটেঁ। সে স্মৃতি আমার মস্তিষ্কে কোনভাবে জমা হয়ে গেছে। হয়তো এই স্মৃতি আমি কিনে নিয়েছি। স্মৃতির মানুষটা এভাবে হাটেঁ, তাই আমিও হাটিঁ। এইরকম একটা প্রোজেক্ট আমাকে দেয়া হয়েছিল- স্মৃতি তৈরি করে দেয়া। সুন্দর ও অসুন্দর দুটোই। অসুন্দর স্মৃতির মেলা দাম। এটা সাধারণত রাজবন্দীদের দেয়া হয়। শুনেছি এটা খুব কার্যকর অস্ত্র। সে প্রস্তাবে আমি রাজি হই নাই। এটা নাকি নৈতিক হয়ে গেছে। কথাটা আমার কাছে অন্যরকম শুনায়। অনেককাল আগে নাকি নৈতিকতা বিষয়টিকে মানুষের চিন্তা থেকে মোটামুটি অবমুক্ত করা হয়েছে। তাহলে ধারণাটা টিকে আছে কিভাবে?  বিষয়টা নিয়ে পত্রিকা-টিভিতে তুমুল বিতর্ক উঠেছিল।

-নীলাঞ্জনা, চড়ুই পাখিদের ছোলা ভেজে দিন। দেখেন কি সুন্দর উড়াউড়ি করছে। জানালাটা খুলে দেন। পাখির ডাক শুনি।

নীলাঞ্জনা কোন উত্তর দেন না। এটা নিয়ে আমি ভেবেছি। নীলাঞ্জনা জানালা ব্যাপারটা বুঝতে পারে না। জানালা বললে তাকে প্রথম প্রথম বিহ্বল দেখাতো। কিন্তু কোন প্রশ্ন করত না। সে অবশ্যই এমনিতে কোন কথায় বলে না। আসলে আমি নিজেও কোন মানুষের সাথে কথা বলি না। আমার মাথার সাথে যুক্ত ডিভাইসের মাধ্যমে নানান ধরেন প্রস্তাব পাই। সে অনুসারে আমি তাদের চিন্তা দিই।

আমার চিন্তাটা নীলাঞ্জনার কাছে পৌছে যায়। আজ সে অন্যদিনের চেযে ধীরস্থির, তার মধ্যে কাজটা করার কোন তাড়া থাকে না। আমি ভাবি পাশ ফিরে অন্যদিকে শুয়েছি। আজকে আর কাজ করতে ভালো লাগছে না। কিছুটা মন খারাপও বটে। আজকে স্মৃতি, অতীত এইসব বিষয়ে লাইব্রেরীর আর্কাইভে ঢুঁ মেরেছিলাম। কিন্তু এক্সেস পাইনি। আমার প্রশ্নকে পাত্তাই দেয়া হলো না। নিজেকে কেমন যেন প্রতারিত মনে হয়। পাশ ফিরে পিতা-পুত্র নিয়ে স্বপ্নটা দেখার চেষ্টা করি।

দুই.

ছোট একটা শকে রোজকার মতো আমার চেতনা ফিরে আসে। শকের বিষয়টা আমাকে চালানোর ম্যানুয়েলে জেনেছি। চেতনা ফিরতেই টের পাই কোথাও একটা সমস্যা হয়েছে। আমি নীলাঞ্জনাকে খুঁজতে থাকি। প্রতিদিন সকালে সেই আমাকে ‘শুভ সকাল’ বলে। আজ বলছে না। ডাকি- নীলাঞ্জনা।

কেউ কোন উত্তর দেয় না। কিছুক্ষণ পর মাথার ভেতর শো শো শব্দ হতে থাকে। কে যেন কথা বলতে থাকে।

– আজ থেকে নীলাঞ্জনা আমার এখানে কাজ করবে না।

-কেন?

-তোমার প্রশ্ন নীলাঞ্জনাকে বিব্রত করছে। তোমার জানা আছে প্রশ্ন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের সভ্যতা অযথা প্রশ্ন অনুমোদন করে না। এছাড়া তাকে করা প্রশ্নগুলো অতিশয় নিম্নমানের হলেও কেন্দ্র লক্ষ্য করছে এটা নিয়ে কোন ধরনের খেলা খেলতে চাচ্ছ। এই ধরনের খেলার অনুমোদন আমাদের সভ্যতা দেয় না।

-তোমরা তো চাইলে আমার স্মৃতি থেকে বিষয়গুলো মুছে দিতে পারো।

-তা পারি। কিন্তু এতদিনের সুসঙ্গত ব্রেনটা অসংগতিপূর্ণ হয়ে যেতো।

– হা হা হা। মানে ব্রেনটাকে সংগতিপূর্ণ রাখাটা তোমাদের একটা কাজ। আচ্ছা তোমাদের বলব না তুমি বলব।

ঐ পাশ থেকে কোন কথা আসে না। কিন্তু এই প্রথম আমার সন্দেহ হয় আসলেই কি আমি কোন দুর্ঘটনার স্বীকার হচ্ছি। আজ বোধহয় কোন দুযোর্গের দিন। বাইরে তাকিয়ে দেখি কাঁঠাল গাছটি নাই। ঝাঁক বাধা চড়ুই পাখিও নেই। ধূসর একটা পর্দা ঝুলে আছে। আমার বিষাদ বিষাদ লাগে। আচ্ছা সত্যিকারের বিষাদ ব্যাপারটা কেমন।

ইচ্ছে করে বাবার হাত হাঁটি। কেন জানি মনে হয় আমার দুনিয়ার জীবন শেষ হয়ে এসেছে। নীলাঞ্জনাকে দেখতে খুবই ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে তাকে হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেখি। সবই কি আমার মিথ্যা কল্পনা! কখন যে অবসাদে জড়িয়ে পড়ি জানি না। অন্যদিনের সময়ে বোধহয় এটা বিকাল হবে। তখনো জানালার ওপাশে গাঢ় পর্দাটা ঝুলে আছে। কাঁঠাল গাছ আর চড়ুই পাখিগুলোর জন্য মন আনচান করে। বুঝতে পারি এটা একটা খেলা। এখানে এমন কিছু নাই। সবকিছুই হয়তো বানানো।

wsকোথাও ফিসফিস শব্দ হয়। মনে পড়ে আজকে কিছু প্রশ্ন দেয়ার তারিখ ছিলো। তারা তাগাদা দিচ্ছে। সাধারণত এদের সাথে নীলাঞ্জনা যোগাযোগ করে। না, যোগাযোগ অন্য কেউ করে না- আমিই করি। কিন্তু এরজন্য মস্তিষ্কে একধরণের বিভ্রম তৈয়ার করা হয়েছে। যাকে আমি নীলাঞ্জনা বলছি। নীলাঞ্জনা হয়তো আমার অতীতের কোন চরিত্র থেকে উঠে আসা। এটা অনেকটা মুক্তা বানানোর মতো। ঝিনুকের খোলের ভেতর আসল মুক্তোর সামান্য অংশ দেয়া হয়, যাতে নকল মুক্তো তৈয়ার হয়। তেমনি নীলাঞ্জনা হলো একটা ফাঁদ। যেটাকে ঘিরে আমার নতুন একটা সত্তা তৈয়ার হয়েছে। তবে এর খারাপ দিক আজ প্রকাশিত হলো। কাজটা যারাই করুক ছোট্ট একটা যোগাযোগ পুরো প্রক্রিয়াটাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এটা নিশ্চয় যারা আমাকে চালায় তাদের জন্য খুবই খারাপ সংবাদ।

নীলাঞ্জনা আমার স্মৃতিকে আস্তে আস্তে জাগিয়ে তুলছে। তারা এটা কোনভাবে সারিয়ে তুলতে পারছে না। তারা ঐ অংশ দিয়ে আমাকে বুঝার চেষ্টা করত। কিন্তু আমার ফাঁকিগুলো ধরতে পারত না। কারণ সত্তার একটা অংশ অযৌক্তিক। আজ আমাকে যন্ত্রণা দেয়ার জন্যই তাদের প্রয়োজনীয় সত্তাকে সরিয়ে নিয়েছে। নাকি অন্যকিছু, আমি নিশ্চিত না। তবে এটা পরিষ্কার নীলাঞ্জনা নামের মানুষটি আমার খ্বুই কাছের একজন।

এইসব ভাবতে ভাবতে ঝমঝম শব্দটা শুনতে পাই। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ। তারপর হুট করে ঢুকে পড়ি শিশুদের কান্নায়। আরে এই তো কে যেন গান গাইছে। নীলাঞ্জনা? তাকে তো কখনো গান গাইতে শুনি নাই। শিরশির কিসের শব্দ। ঘাসের বনে কে হেঁটে যায়। এভাবে একের পর এক ছবি ও শব্দ আসতে থাকে। এসবের ধাক্কায় আমি যেন পাগল হয়ে যাবো। কাকে দেখতে গিয়ে কাকে দেখি। কোন শব্দটা শুনি। প্রচণ্ড জলের তেষ্টা পাই। ঠিক এই মুহুর্তে মনে পড়ে গত একবছর দুই মাসে কখনো তেষ্ঠা পাই নাই। আমি এই অনুভূতিটির জন্য কত যে চেষ্টা করেছি। নিজের কামনা বাসনা যেন কঠিন কোন পর্দা করে হাজির হচ্ছে।

-তুমি বা তোমরা যা হও সাড়া দাও।

নীলাঞ্জনা এসে দাড়ায়। জানালার বাইরে কাঁঠাল গাছ আর চড়ুইয়ের ঝাঁক। প্রতিদিনকার মতো বলে ‘শুভ সকাল’। অথচ আমি জানি সময়ের যে হিসেব আমাকে দেয়া হয় সে মতে, এখন বিকেল হবার কথা।

-শুভ বিকাল।

নীলাঞ্জনা খিল খিল হেসে গেয়ে উঠে ‘নীল নীল নীলাঞ্জনা তুমি আমার জোছনা।

-তুমি কি আমায় বিদায় জানাতে এসেছো?

নীলাঞ্জনা উধাও হয়ে যায়। কাঁঠাল গাছ আর চড়ুইয়ের ঝাঁকসুদ্ধ। আমি অভিশাপ দিই।

একটি শিশু এসে কান্না জুড়ে দেয়। আহা! নীল পোশাক পড়া ফেরেশতা যেন।

-বাবু কাঁদে না। কাঁদে না।

বাচ্চাটি আমার খুবই কাছের কেউ। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে কাছে ডেকে গায়ে হাত রাখি। আয় বাবু আয়! বাচ্চাটি হারিয়ে যায়। ইচ্ছে হয় চিৎকার করি। কান্না করি।

-হা হা হা।

-হাসছেন কেন?

-ব্যর্থতা ডাকতে। ব্যর্থতা ডাকতে ধ্বংসের খেলা খেলি।

তারপর বিষস্ন একটা কন্ঠ। বলে- এভাবে আমাদের প্রতিটি নমুনা অতীত ফিরে পায়। আমাদের চিন্তার প্রজেক্ট মাঝপথে বাঁধা পড়ে। এই ব্যর্থতার সান্ত্বনা হলো এরা মানসিক যন্ত্রণা পেয়ে ধ্বংস হয়। যদি এতে আমাদের কোনো লাভ নেই। কিছু বিনোদন পাই আরকি!

-কেন তোমরা মানুষকে নিয়ে এমন ধ্বংস খেলায় মাতো।

-আমরা মানুষের জীবনকে সহজ করে দিচ্ছি। এরজন্যই তোমরা বলি হও। তাতে পুরো সভ্যতার উপকার হয়।

-তাহলে কোন একসিডেন্টে আমার শরীর থেকে মাথা আলাদা হয় নাই।

-না, তোমরা খুবই মেধাবীদের দল। মেধা তোমাদের শত্রু। আমাদের বাজারের পণ্য তৈয়ারে ভূমিকা রাখে। কিন্তু আফসোস মানুষের মস্তিষ্ক এখনো পুরোপুরি আমাদের আয়ত্বে আসে নাই।

-আমাকে কি করা হবে?

-ধ্বংস করা হবে। কেননা তুমি বানানো জগত থেকে অতীত বাস্তবতার বিভ্রমে ঢুকে গেছো। এই বিভ্রম থেকে তোমার চিন্তার মুক্তি নাই। আমরা চাই বিশুদ্ধ চিন্তা, বিশুদ্ধ প্রশ্ন।

তার গলাটা বিষাদময় হয়ে উঠে।

-এটা তোমাদের ভ্রান্তি। জগতে বিশুদ্ধ বা নৈব্যক্তিক কিছু নাই।

-আমরা এটা মানি না। তুমি আমাদের প্রকল্পের বাইরে কথা বলছ। তাই তোমাকে ধ্বংস করা হবে। আগামীকাল ভোরে তুমি আর জাগবে না।

-আমার একটা শেষ ইচ্ছ আছে।

-কি?

-আরেকবার নীলাঞ্জনাকে দেখত চাই।

-এটা তোমাকেই করতে হবে। তোমার মস্তিষ্ক এখন আমাদের নিয়ন্ত্রণে নাই। এখন তুমি নিজেই বাস্তব-অবাস্তবতার মাঝে নিজেকে নিয়ে খেলছ?

-তাইলে শুধু এই বলো, নীলাঞ্জনা আমার কে? সে সত্য নাকি মায়া।

-দুঃখিত উত্তরটা তোমাকেই খুঁজে নিতে হবে। তুমি যদি উত্তর খুঁজে না পাও তাতেই আমাদের আনন্দ। আমাদের ব্যর্থ করে তুমি সফল হতে পারো না!

 ঘরের আলো নিভে আসে। আমি ‘নীলাঞ্জনা’ বলে ডাকতে থাকি। কেউ একজন আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিক।

………………………………………………………………………………………………………………………………………….

*গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল পরিবর্তন.কমে। ব্যবহৃত চিত্র: ইন্টারনেট।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *