চেন্নাই এক্সপ্রেস: বাণিজ্য বিস্তারে হৃদয়ের ভাষা

চেন্নাই এক্সপ্রেস_wahedsujan.com

চেন্নাই এক্সপ্রেস- এটি একটি আন্তঃরাজ্য ট্রেন। যাত্রার শুরু থেকে শেষে বদলে যায় ভাষা ও সংস্কৃতি। ভাব কি বদলে যায়! এই ট্রেনে করে যাচ্ছেন চেন্নাই এক্সপ্রেস মুভির হিরো শাহরুখ খান আর হিরোইন দীপিকা পাড়ুকোন। শাহরুখ হিন্দীবাসী, তামিল বুঝেন না আর দীপিকা তামিল-হিন্দী দুই ভাষায় বলতে পারেন। তাদের সাথে আছে চার ডাকাত। এরা আবার হিন্দী বুঝে না। তারা দীপিকাকে তার বাবার কাছে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। কারণ, লোকাল ডন বাবা তাকে জোর করে বিয়ে দিতে চান। দীপিকা এই বিয়েতে রাজি না। রাজি হলে অবশ্য মুভিরই দরকার হতো না! ডন আর তার আশে পাশের সেই তামিলবাসীরাও হিন্দী বুঝে না। ফলে চেন্নাই এক্সপ্রেস হয়ে উঠল সেই মুভি যেখানে বিশাল দেশ ইণ্ডিয়ার ভাষাগত দুরত্নের রেশ বেশ বুঝা যায়। একই সাথে কিভাবে তা অতিক্রম করা যায়- সেটার একটা সেল্যুয়েড রূপ দেখা রূপ পাওয়া যাবে। যার আছে আন্তঃরাজ্যিক প্রেম ও ব্যবসার সম্ভাবনা। শুধু তাই নয়, এতো বৈচিত্র্য নিয়ে বিশাল রাষ্ট্র কিভাবে টিকে আছে- তার সম্ভাব্য উত্তরও এতে আছে। অতিক্রম করে গেছে ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তাবাদের গরিমা। অবশ্যই সবকিছুর মূলে হিন্দী মুভির বহুল কথিত হৃদয়ের দেখা মিলবে তাতে।

এই মুভির পরিচালক রোহিত শেঠি। যার ঝুলিতে রয়েছে চারটি একশ কোটি রুপী আয় করা মুভি। ফেসবুকের সিনেমা বিষয়ক গ্রুপগুলোতে মাঝে মাঝে রোহিতের মুভি নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য শোনা যায়। হায় হুতাস করে বলে এই বুঝি এই কালের দর্শকের নমুনা।এইবারের মুভিও তার ব্যতিক্রম নয়। আবার একের পর এক আয়ের রেকর্ড ভাঙ্গছে। ইণ্ডিয়ান মুভির সর্বকালের রেকর্ডভঙ্গকারী থ্রি ইডিয়টের সত্তুর দিনে গড়া রেকর্ড এই মুভি ভেঙ্গে ফেলেছে মাত্র পনের দিনে। এছাড়া এই প্রথম কোন হিন্দী মুভি তামিল অঞ্চলের এতো ব্যবসা করতে পারল। এই ঘটনায় থ্রি ইডিয়টের ভক্ত যার পর নাই ধরণের হতাশ। কারণ থ্রি ইডিয়টে তারা যে ধরণের সিরিয়াস শিক্ষামূলক ভাব দেখেছিলেন তা এই মুভিতে অনুপস্থিত। অনেকে আবার ইণ্ডিয়ান দর্শকদেরও গালমন্দ করছেন।

রোহিত শেঠির ক্ষেত্রে যা হয়, বরাবরের মতো এই মুভিতেও আইএমডিবির রেটিং আর রোটেন টমেটোর ফ্রেশনেস দেখবেন দর্শক প্রশংসার একেবারে তলানিতে। তাহলে এই মুভি কেন একের পর এক রেকর্ড ভাঙ্গছে? এটা মুভি ইন্ড্রাস্টি ও ট্রেড এনালাইজারদের জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। অন্যদিকে বলা যায় মাশালা মুভির এই জনপ্রিয়তা আসলে কি বার্তা নিয়ে আসছে। এই আলোচনার আরেকটি দিক হতে পারে এই ধরণের মুভিগুলোর বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্য অদৌ দাড় করানো যায় কিনা। যেটা সাধারণত আমরা করতে চাই না। এক ধরণের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য এখানে প্রধান বিষয় হয়ে দাড়ায়। কিন্তু এটা যদি বিবেচনা না করি তাহলে এর মনোস্তাত্ত্বিক প্রভাবটিও আমাদের চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে আপাত অর্থহীন মুভিটি কোন একটা বিশেষ ধরণের মেসেজ তার সম্ভাব্য ভোক্তার মাথায় ঢুকিয়ে দিতে পারে। কারণ, ইন্ডিয়ান সিনেমার বিক্রি করার গুরুত্বপূর্ণ একটা দিক হলো বিষয়ের আবেগীয় উপস্থাপন। যা দর্শকের মনোযোগ বিশেষ দিকে টেনে নিতে কার্যকর। একটা অফ-বিট বা আর্ট ঘারাণার মুভি যে পরিমান ভোক্তাকে নির্দিষ্ট মেসেজ পৌছে দিতে পারে, সে তুলনায় একটা চটুল বিজ্ঞাপন বা টিভি সিরিয়াল দরুন সব মেসেজ দিতে পারে। এবং তা দিয়ে দেয় ভোক্তার রুচি, মেজাজ-মর্জি মতো। ফলে ভোক্তা চিন্তা-ভাবনা না করে খুব সহজেই তা এস্তেমাল করে নিতে পারে। তার জন্য তাকে অতিরিক্ত বোধ-বুদ্ধি খরচ করতে হয় না। চিন্তার না করার সুযোগটা খুব কম লোকই নিতে চায়, তাদের সময় কোথায়!

উপরে আমরা অনেকগুলো বিষয়ের দিকে নজর দিয়েছি। সেইসব বিষয়ে নানান ধরণের আলোচনা তোলা যেতে পারে। এই আলোচনায় আমরা সেদিকে যাচ্ছ না। মুভির ছোট একটা দিকে নজর দেবো। আগেই বলছি মুভির প্রথম থেকে ভাষাগত দুরত্ব মজার বিষয় হয়ে দাড়ায়। যে ভাষাগত দিকই প্রকটভাবে হিন্দী আর তামিল ভাবের পার্থক্যের অন্তরঙ্গ বিষয়গুলোর একটি। এটাই এই মুভির হাস্যরসাত্বক দিকগুলার মধ্যে মুখ্য। আমরাও সেদিকেই আলো ফেলব।

srk98

এটা সকলেরই জানা বহু ভাষী ও বহু নৃতাত্ত্বিক গোষ্টির দেশ ইণ্ডিয়ান ইউনিয়ন। ভাষা এবং অঞ্চলকেন্দ্রিক বিরোধও কম নয়। এরমধ্যে জাতিগত বৈশিষ্ট্য ও কেন্দ্রের সাথে স্থানিক দুরত্ব তো আছে। যাতে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক লক্ষণও বিরাজমান। হরে দরে বলিউডি মুভিগুলো রাজনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধানে নানান ধরেন বয়ান তৈরি করে। সাধারণ তামিলদের নিয়ে যেমন শুনা যায়- তামিল লোকেরা খুবটা হিন্দী বলে না, এমনকি হিন্দী চ্যানেল ও মুভি সেখানে জনপ্রিয় না। শাহরুখ খানও সেখানে জনপ্রিয় না। যেটা শাহরুখের সর্বগ্রাসী জনপ্রিয়তার জন্য কালো মেঘের মতো। শাহরুখ নানাভাবে চেয়েছেন তার বাজার সেখানে গড়ে তুলতে। তিনি বাণিজ্য বুঝেনও। তিনি জানেন তামিল হিরো রজনীকান্তকে ফেলে সেখানকার মার্কেট দখল করা সহজ নয়। এর একটা ভালো বিকল্প হতে পারে রজনীকান্তের ইমেজকে কাজে লাগানো। ফলে শাহরুখের আগের প্রজেক্ট রা ওয়ান মুভিতে রজনীকান্তের স্বল্প উপস্থিতি আর চেন্নাই এক্সপ্রেসের লুঙ্গি ডেন্স ভালো উদাহরণ। অবশ্যই এটা স্বীকার করতে হবে, এই মুভিতে তামিল লোকেশান ও সংস্কৃতির উপস্থাপন স্থানীয় দর্শকদের ব্যাপকভাবে টেনেছে। বিশেষ করে এই মুভির সংলাপের একটা বড় অংশ তামিল ভাষায়। অর্থ্যাৎ, শাহরুখ তামিলদের জন্য বড় একটা প্যাকেজ নিয়ে হাজির। কিন্তু এটা বাদেও এই মুভির অন্য একটা ভাবার্থ আছে। যা সাথে মিলে এই মুভির একটা গান কাশ্মির টু কন্যাকুমারী। যেখানে মুভির তুচ্ছ কমেডির সাথে এটা বৃহৎ প্রশ্ন উত্তরের দিকে নিয়ে গেছে। সেটা হলো ইণ্ডিয়ার নাগরিকরা কিভাবে রাজ্যে রাজ্যে এতো পার্থক্য সত্ত্বে একটা সমচেতনায় একাত্মবোধ করে। এমন মেসেজ রোহিতের মুভিতে বিরল। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে- তারপরও বলা হচ্ছে, এই মুভির বাণিজ্যিক সফলতার জন্য বিশেষ কোন কারণের দিকে আমরা জোর দিচ্ছি না- বরং উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দিক তুলে ধরা হলো মাত্র।

বরাবরের মতো অতি অভিনয়কারী শাহরুখ মুভির সবচেয়ে সাসপেন্স মোমেন্টে নিয়ে আসলেন হৃদয়ের ধারণা। হৃদয় দিয়ে চাইল সব জয় করা যায়, এটি আবেগ প্রধান হিন্দী মুভি- এমনকি শাহরুখের প্রায় মুভির মূল ভাষা। আবেগের জায়গায় প্রেম, দেশপ্রেম ও বাণিজ্য একাকার হয়ে গেছে। রোমান্টিকতায় এটি দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গের ছায়ার নিচেই হেটেছেন। শাহরুখ এই জায়গায় ঝুকি নিতে রাজি না। বুঝা গেল শাহরুখ এখনো নব্বই দশকে সালেই আটকে আছেন। কাহিনিতে দেখা যায় দীপিকা আর শাহরুখ স্থানীয় ডনের বলয় থেকে বারবার পালাতে চাচ্ছিল, সেখানে শরীরের শক্তিই মূল কথা। কিন্তু শাহরুখ দুর্বল কমজোরি মানুষ, তার পক্ষে এদের শরীরিভাবে মোকাবিলা সম্ভব না। এটা নিয়েই যত হাস্যরস। এক পর্যায়ে তারা পালাতেও পারে। কিন্তু সেখানে ঘটে অন্য ঘটনা। শাহরুখ বুঝতে পারেন তিনি দীপিকার প্রেমে পড়েছেন। তখন অনুধাবণ করেন এই প্রেমই পারে সব সমস্যার সমাধান দিতে। যাতে মুক্তি ঘটবে ভারত মাতার বুকের বিবাদের।

শক্তির লড়াইয়ে কমজোরি শাহরুখ বুক চিতিয়ে দাড়ায় ডনের সামনে। বলেন তুমি তামিল বলবা আমি হিন্দী বলব, কোন দোভাষীর দরকার নাই। কারণ ভাষা আলাদা হলো আরেকটি পক্ষ আছে হৃদয়, দেশও একই। যে হৃদয়ের বলের জোরে বহুভাষী ও সংস্কৃতির দেশ হয়েও ইণ্ডিয়া টিকে আছে। ফলে দুই পক্ষ যাই বলে তা হৃদয় অনুবাদ করে দেবে। মুভির শেষে এসে মনে হয় সেই ভাষা ডন বুঝতে পেরেছেন। যদিও মাসালা মুভির ফর্মুলা অনুসারে শাহরুখ ব্যাপক শক্তির অধিকারী (প্রেমের জোরে) হয়ে তাবত ভিলেনকে হঠিয়ে দেন। ততক্ষণ চুপ থাকে নায়িকার বাবা। অর্থ্যাৎ, শরীরি শক্তিতে জেতার পরই যেন নায়িকার বাবা হৃদয়ের শক্তি বুঝতে পারেন। এমনকি ভিলেন মহাশয়ও শাহরুখকে মেনে নেন। ভারত মাতার মুক্তি ঘটেছে কিনা জানি না, তবে সন্দেহ পরায়ণ হবার যথেষ্ট কারণ আছে এতে তামিলদের মান বাড়ল কি বাড়ল না!

তবে ঘটনা যায় ঘটুক, এমন দেশপ্রেম রোহিতের মুভিতে আগে দেখা যায় নাই। সেদিক থেকে মাশালা মুভি আকারে চেন্নাই এক্সপ্রেসকে একদম মেসেজহীন মুভি বলা যায় না। যেখানে মানিয়ে নেয়ার আর মেনে নেয়ার কথা আছে। যা দর্শকের অজান্তেই মাথায় ঢুকে পড়ে। অনুপস্থিত হিন্দী মুভির প্রথাগত নৈতিক অনুশাসনও। যেন বলছে তুমি ডন হও আর মাফিয়া হও- আমার সাথে থাকো, আমার তাতেই চলবে। একইসাথে সিরিয়াসহীনভাবেই মুভির ভাষার সাথে তা মিলে গেছে। মুভি আকারে চেন্নাই এক্সপ্রেস কেমন- সে বিচার না করেও বলা যায় বলিউডের দেশপ্রেমের ট্রেন্ডের সাথে মিলিয়ে দারুন চিত্রভাষ্য তৈরি করেছে। দেশপ্রেমকে এতো ভালোভাবে আর কে বিক্রি করতে পারে! আর তা যদি হয় বহু জাতির দেশে হয়, তাহলে তো এক দানে অনেক কিছু জেতা গেল। যা বাণিজ্য বিস্তারের সাথেও দারুণ মানানসই। সেই বাণিজ্যে লক্ষীই ধরা পড়েছে।

চেন্নাই এক্সপ্রেস

পরিচালনা: রোহিত শেঠি

অভিনয়: শাহরুখ খান, দীপিকা পাড়ুকোন,

রেটিং: ৬/১০

Comments

comments

2 thoughts on “চেন্নাই এক্সপ্রেস: বাণিজ্য বিস্তারে হৃদয়ের ভাষা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *