প্রভু এবং দাস্ নৈতিকতা

প্রধান দার্শনিক সমস্যাগুলোর অন্যতম নৈতিকতা বিষয়ক সমস্যা। পুরানা জামানা থেকে শুরু করে হাল আমলের দার্শনিকরা কেউ এই আলোচনাকে এড়িয়ে যান নাই। নীতিবিদ্যার সনাতনী ধারা মূলত মানদণ্ড নির্ভর ভালো-মন্দের আলোচনা। সে ধারায় যতটা না অভিজ্ঞতা নির্ভর তারচেয়ে বেশি বৌদ্ধিক। এ অর্থে নীতিবিদ্যা শুধুমাত্র কোন একটি মানদণ্ড ধরে কী করা উচিত আর কী করা অনুচিত সেই পর্যালোচনা করেছে। প্রাচীন এপিকুরিয়ান দর্শনের মতো ব্যতিক্রম কিছু চিন্তা যে নাই- তা নয়। আধুনিককালে আছে উপযোগবাদের মতো ধারণা। যার গুরু জেরেমি বেনথাম। গতানুগতিক সার্বিকতা এদের লক্ষ্য। তবে আধুনিক নীতিদর্শনে প্রাধান্য বিস্তারকারী ধারণা দেন ইমানুয়েল কান্ট।

নীটশে। ফটো: উইকিপিডিয়া।

Edvard Munch-র তুলিতে নীটশে।

ফ্রেডরিক নীটশে (Friedrich Nietzsche) জম্মগ্রহণ করেন ১৮৪৪ সালের ১৫ অক্টোবর। এগারো বছর অসুস্থ্য থাকার পর ১৯০০ সালের আগষ্টের ২৫ তারিখে মারা যান। অনেক অবদানের মধ্যে তিনি আধুনিকতার নৈতিকতা সম্পর্কিত সমস্যাকে তাৎপর্যপূর্ণভাবে সাফ করে হাজির করেছেন। আমরা বলব না তিনি এই সমস্যার সমাধানে সফল। কিন্তু এটা আমাদের নিত্যজীবনের সমস্যাকে গভীরভাবে উদম করে। নীটশে সম্পর্কিত আরেকটি পোষ্ট ‘আমাদের কালের নীটশে’। সেই পোষ্টের দুটো টার্মকে পরিচ্ছন্ন করার জন্য এই আলোচনার সুত্রপাঠ।

কোনটাকে ভালো আর কোনটা মন্দ বলব এবং কেন বলব- এটাও বির্তক সাপেক্ষ। ধারণা মাত্রই কোন নির্দিষ্ট দেশ-কালে তৈরি। কোন বিশেষ সংস্কৃতির বিকাশের সাথে বিশেষ ধরণের নৈতিকতা যুক্ত। সে হিসেব একক কোন নৈতিক নির্মাণ নাই। এই বিষয়টিকে নীটশে গুরুত্ব দেন। মনে করেন আগের দার্শনিকরা নৈতিকতার অনেক অর্থের ভেতর কোন একটি বিশেষকে গ্রহণ করে সার্বিকীকরণের চেষ্টা করেছেন। তিনি বিশেষ নৈতিকতার অর্থে ভালো বা মন্দের অর্থ কী দাঁড়ায় তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। প্রাক-ঐতিহাসিককালে নৈতিকতার মূল্যায়ন হত কাজের তাৎপর্য থেকে। কিন্তু চূড়ান্তভাবে, একক নৈতিক ফেনোমেনা বলে কিছু নাই, আছে এই ফেনোমেনার নৈতিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ। যেটা তার সত্য ধারণার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। নীটশের আগ্রহ একক কোন সত্য-র প্রতি নয়। বরং, সমাজে কী করে সত্য-র ধারণা চলমান সেটাই তার আগ্রহের বিষয়।

বেনথাম ও কান্টের পর্যালোচনায় নতুন ধরনের নৈতিকতার ধারণা দিয়েছেন ফ্রেডরিশ নীটশে। দুনিয়ার ইতিহাস ঘেটে তিনি এই আলোচনা করেছেন। এর সাথে তার Will to power বা ক্ষমতার বাসনা তত্ত্বের যোগ আছে। সে মতে দৃষ্টি দেন পুরানা জামানা থেকে নৈতিকতার চর্চা কিভাবে হয়ে আসছে তার উপর। সেটা তার বিখ্যাত বইয়ের নাম থেকেও অনুমান করা যায়। ‘অন দ্য জিনিয়ালজি অব মোরালস’-এ তিনি দুই ধরণের নৈতিকতার আলোচনা করেছেন। দাস্য নৈতিকতা (Slave morality) এবং প্রভু নৈতিকতা (Master morality)। আমাদের আলোচনা এখানেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

nietzsche-chrishorner.net

নীটশে।

নৈতিকতা আদিম সময়ে উদ্ভুত, যা এখনো মানুষের মধ্যে বহাল আছে। সেখানে আত্ম-স্বীকৃতি ও অস্বীকৃতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একমাত্র প্রভুরাই আত্ম-স্বীকৃতিদানকারী। প্রভুরা কোড (Code) বানায় কারণ তারা নিজেদের দৃঢ়ভাবে ঘোষণা দিয়েছে। তার সবকিছু এ ঘোষণার সাথে সম্পর্কিত। এটা তাদের নৈতিকতার জন্য প্রাথমিক ফেনোমেনা।অনেক শতাব্দী আগে, কর্তৃত্বে থাকা প্রভু শ্রেনী নৈতিক কোড বানালে সমাজে তাদের অধীনস্থরা তা অনুসরণ করে। কোড সমাজের নীচুস্তরে থাকা অধীনস্থদের প্রতি ক্ষমতা প্রয়োগে কাজে লাগে।

প্রভুরা তাদের শত্রুদের ভালোবাসেন। তার একমাত্র কারণ রতনে রতন চেনে। শত্রুরাও আত্ম-স্বীকৃত। তাদেরই ঘৃণা করেন যারা নিজেদের স্বীকৃতি দিতে পারে না। ফলে সেলফ বা স্বয়ং ধারণার সাথে সম্পর্কিত না এমন সবাই প্রভুদের কাছে গৌণ। তাদেরকে সংজ্ঞায়িত করার জন্য এন্টি-প্রভু দরকার হয় না। প্রভুদের চোখে যারা-প্রভু নয় তারা তাৎপর্যহীন, ঘৃণ্য ও অপাংক্তেয়। তাদের ব্যক্তিত্বের সাথে জড়িত যেকোন কিছু  ‘ভালো’ এবং প্রভু নয় এমন কিছুর সাথে যা কিছু যুক্ত তা ‘মন্দ’। দাসরা এসব মেনে নেন। তারা বুঝতে পারেন নিজেরা প্রভুদের মতো মহান না।

নীটশে প্রভু নৈতিকতার সমস্যা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। কিন্তু এটা মন্দের ভালো। মুক্ত আত্মা (চিদাত্মা/স্পিরিট/Spirit) যেভাবে চিন্তা করতে পারে প্রভুরা তার মতো নয়। প্রভু নিজের মানদণ্ডের বাইরে চিন্তা করে না। তাদের বিশ্বাস আত্ম-স্বীকৃতির মাধ্যমে বানানো তত্ত্বই সবোর্চ্চ। মতামতকে পরিবর্তন করে এমন ধারণা গ্রহণে তারা ইচ্ছুক নয়। এদের মন আবদ্ধ এবং নৈতিকতাও তাই, চুড়ান্ত। এটা মুক্ত স্পিরিটের যাপিত জীবন নয়।

প্রভুদের পাওয়া যায় গ্রীক ও রোমানদের মতো প্রাচীন সভ্যতায়। সক্রেটিস-পূর্ব এবং হোমার বর্ণিত মহাকাব্যের নায়কদের মতো তারা। তাদের প্রতি নীটশের সবিশেষ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা আছে। মানুষের গুণ বিচারের পিরামিড বানালে সবচেয়ে উপরের ধাপে থাকবেন প্রভু। যিনি মহামান্য (Excellency)। তাদের সাথে তুল্য কেউ নাই। তার পরিচিতিসূচক গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো প্রাইড (Pride), তবে ভ্যানিটি (Vanity) নয়। যেহেতু তারা নিজেদের মূল্য নিজেরা পয়দা করেন।

নীটশে পরিষ্কারভাবে ভালো ও ইভিলকে (প্রভু কিছু জিনিসের বাইরে থাকেন) ভালো ও মন্দ (শক্তিশালী ও দুর্বল) থেকে আলাদা করেন। এটা দাস নৈতিকতার দিকে মনোযোগ দিতে সাহায্য করে।

নীটশে ও ফুকো। ফটো: http://schizosophy.com/tag/aesthetic/

পাংক নীটশে ও ফুকো।

প্রভু নৈতিকতার প্রতিক্রিয়ায় হীনমন্য দাস নৈতিকতার পয়দা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই দাসেরা প্রভুকে ঘৃণা করে। প্রতিক্রিয়াস্বরূপ প্রভু অসৎ (ইভিল/Evil) প্রতিপন্ন হয়। এই ধরণের নৈতিকতা তখনই উদ্ভব হয়, যখন সমাজ বা মানুষ একটা নঞর্থক সামাজিক পরিস্থিতিতে থাকে। এটা শুধুমাত্র সামাজিকভাবে অধীনস্থদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই ধরণের নৈতিকতা ইভিলের ধারণার মধ্য দিয়ে শুরু হয়। তাদের কাছে ক্ষমতার ব্যাখ্যা হলো কাউকে আঘাত করা।

দাস্য নৈতিকতার সমার্থকরা মনে করে তাদের নৈতিকতা ভালো, শোভনীয়তার সর্মথক। এরা সব মানুষকে সমান বলে স্বীকৃতি দেয়। প্রভু নৈতিকতা যাকে ভালো বলে, এই নৈতিকতা তাকে অসৎ (ইভিল) হিসেবে চিহ্নিত করে। এই ধরণের সামাজিক পরিস্থিতির ভিকটিম ‘মুক্ত ইচ্ছা’ নামক ধারণার পয়দা করে এবং তারা বলে প্রভু নৈতিকতার মুক্ত ইচ্ছা রয়েছে এবং এটা তাদেরকে জাস্টিফিকেশনের মাধ্যমে বলে কেন তাদের দাস্য নৈতিকতা প্রভু নৈতিকতার চেয়ে সুপিরিয়র।

তারা বলে তাদের নৈতিকতায় শ্রেষ্ট। কেননা, অপরকে আঘাতের ও ক্ষমতার বাসনা তাদের মধ্যে নাই। এই ধরনের বাসনা অসৎ। নিজেদের এন্টি-প্রভু বলে চিহ্নিত করে। এটা ধাঁধাময় কেন না তারা নিজেদের পয়দা করা নৈতিক নিয়ম দ্বারা প্রভুর উপর ক্ষমতা ফলায়। নীটশের কাছে এটা মোনাফেকি ও অসংগতিপূর্ণ। দাসরা তাদের ক্ষমতার বাসনা দ্বারা প্রভুদের মতো আচরণ কর। অথচ নৈতিকতার নামে একে লুকানোর চেষ্টা করে। প্রভু নৈতিকতা কোন কাজকে ভালো বা মন্দ বলে বিবেচনা করে। অন্যদিকে দাস নৈতিকতার বিবেচনা হলো কাজটির করার অভিপ্রায় সৎ বা অসৎ।

মোনাফেকির কারণে নীটশে দাস নৈতিকতার বিরোধিতা করেন। এটা আসলে দুর্বলের ক্ষমতার বাসনারই প্রকাশ, যদিও মুখে মুখে এটারই বিরোধিতা করে। নীটশের কাছে দাস নৈতিকতার সংস্কৃতিক উৎস একটাই। প্রাচীন ইহুদীবাদ। যেকোন দাস্য নৈতিক চর্চার অতীত বিশ্লেষণে পাওয়া যাবে প্রাচীন ইহুদীবাদে। সম্ভবত ব্যবিলন ও অন্যান্য কলোনী থেকে বেরিয়ে পড়া ইহুদীদের শাসক শ্রেণী এই নৈতিকতার পয়দা করে। প্রাচীন ইহুদীবাদই ছিল একমাত্র পরিপূর্ণ দাস সংস্কৃতি এবং এর সিলসিলায় এসেছে খৃষ্টবাদ। তার সিলসিলা হলো গণতন্ত্র। গণতন্ত্র কী করে সেক্যুলার ভাবনাসহ নানান তরিকায় মানুষকে সমান ঘোষণা দিয়ে ক্ষমতা ফলায় সেটা ভেবে দেখা যেতে পারে।

খৃষ্টবাদে প্রভু নিয়ে যীশু বাহানা করেছেন, যিনি নিজেই ইহুদী ছিলেন। বাহানা করেছেন সেন্ট পল- যিনি চমৎকারভাবেই দারিদ্রতাকে পবিত্রতার সমার্থক বানিয়েছে। এইসব কিছুই ইউরোপকে পেছনে নিয়ে গেছে। সেখানে প্রভু নৈতিকতা স্থান দখল করেছে দাস নৈতিকতা।

এ হিসেবে এখন এবং যখন নীটশে বেঁচে ছিলেন, দাস নৈতিকতাকেই প্রভাবশালী সার্বজনীন সংস্কৃতি আকারেই মেনে নেয়া হয়েছে।

অসন্তুষ্টি বা অপমানের উপর ভিত্তি করেই টিকে আছে দাস নৈতিকতা। কারণ বৈরী পৃথিবী মানুষকে ক্রমান্বিত অপমানিত ও রাগাস্বিত করে তুলছে। কিন্তু ভেবে দেখে না কিভাবে স্পিরিটকে গোপন করছে। উম্মুক্ত করে না। প্রভু নিজেকে উম্মুক্ত করেন এবং নীতিতে অটল থাকেন। দাসেরা অপমানের মধ্যে স্থির বিষাক্ত ও তিতা স্বাদ মুখে নিয়ে বসে আছে। ফলে জীবন হলো হতাশা ও ভীতিকর। এই ভীতি তাদের জীবনকে বিভীষকাময় করে তোলে। কিন্তু নতুন ধরনের জীবনযাত্রায় প্রবেশ না করেই গড়পরতা বেঁচে থাকে তারা।

যদি কেউ উচ্চমানের মানুষ হতে চায়, তবে নৈতিকতাকে নতুন পদ্ধতি দ্বারা সাজাতে হবে। এর উত্তর প্রভু বা দাস নৈতিকতার মধ্যে থাকে না। এদের অসংগতিগুলো দূর করতে হবে। যা নতুন, আত্ম-স্বীকৃতিকারী ও স্বাতন্ত্র্যিক জীবন যাপন; মুক্ত স্পিরিটের জীবন যা তার ক্ষমতার বাসনাকে সন্তুষ্ট করে এবং স্বীকৃতি দেয়।

> ব্যবহৃত ফটো (Photo Curtsey): উইকিপিডিয়া, কনটেন্ট ম্যাগাজিন , হর্নারস কর্নারসিযোসফি

Comments

comments

8 thoughts on “প্রভু এবং দাস্ নৈতিকতা

  1. চমৎকার বিশ্লেষণ। দর্শনে খুব বেশি পড়া শুনা নেই। কিছু বিষয়ে নৈতিকতা ইউনিভার্সেল মনে হয়।

    • কয়েকদিন আগে ইন্টারেস্টিং একটা বই পড়লাম। ‘বিমলকৃষ্ণ মতিলাল’-র ‘নীতি, যুক্তি ও ধর্ম (কাহিনী সাহিত্যে রাম ও কৃষ্ণ)’।

      নৈতিকতা ইউনিভার্সেল হওয়া সত্ত্বেও কোন কোন নৈতিক নিয়ম অন্য নিয়ম দিয়ে ওভারলেপিং হয়। দারুন আলোচনা।

      ইউনির্ভাসেল না হলে পালনের দায় তো থাকে না। এটা নিয়ে আলাদা পোষ্ট দেয়ার ইচ্ছে আছে। ধন্যবাদ ভাই।

  2. যদি কেউ উচ্চমানের মানুষ হতে চায় তাকে তার নৈতিকতাকে নতুন পদ্ধতি দ্বারা সাজাতে হবে। এর উত্তর প্রভু বা দাস নৈতিকতার মধ্যে থাকে না। এদের অসংগতিগুলো দূর হবে। যা নতুন, আত্ম-স্বীকৃতিকারী ও স্বাতন্ত্র্যিক জীবন যাপন; মুক্ত স্পিরিটের জীবন যা তার ক্ষমতার বাসনাকে সন্তুষ্ট করে এবং স্বীকৃতি দেয়।

  3. চমৎকার বিশ্লেষণধর্মী লেখা। পড়ে ভালো লাগলো। এই ধরণের চিন্তা সমৃদ্ধ লেখা আমিও মাঝে-মধ্যে লিখে থাকি। অনেক সাইট ভেঙ্গে-গড়ে GramBangla24.Com সাইটে থিতু হয়েছি। সময় থাকলে http://www.grambangla24.com/section/%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%af/%e0%a6%a6%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%b6%e0%a6%a8/ বিভাগের লেখাগুলো পড়ে দেখতে পারেন।

    • ধন্যবাদ। আপনার সাইটে এর আগে অনেকবার গিয়েছি। ভালো লেগেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *