সালাম মীরা নায়ার

কৃষ্ণা ও মঞ্জু

সালাম বম্বে (১৯৮৮) ‘কৃষ্ণা’ নামের এক বালকের কাহিনী। কৃষ্ণার মতে, বাবা মারা যাওয়ার পর বড় ভাই তার উপর দাদাগিরি ফলাতে থাকে। একদিন রাগ করে বড় ভাইয়ের মোটর সাইকেলে আগুন ধরিয়ে সে। ভাইকে ক্ষতিপূরণ পাচঁশ রুপী দেবার জন্য মা তাকে এপোলো সাকার্সের কাজে লাগিয়ে দেন। কৃষ্ণার স্বপ্ন পাচঁশ টাকা জমিয়ে বাড়ি ফেরা। তার যে বাড়ি ছাড়া কিছুই ভালো লাগে না। কিন্তু ভাগ্যের ফেরে সে চলে আসে তখনকার বম্বে বা এখনকার মুম্বাই শহরে। কৃষ্ণার সেই বম্বে আমাদের দেখা রঙ্গিন ঝলমলে বম্বে নয়। সেখানে আলো ঝালকানি আছে বটে। সেই ঝলকানিতে কৃষ্ণার চোখ ঝ্লসে যায়। সেই ঝলকানি তাকে কোন স্বপ্ন দেখায় না। আছে মায়াবী আলো-ছায়া। সেই আলো-ছায়ায় চলে মাংসের বিকিকিনি। কৃষ্ণা সেই শহরের চা-বালক। ঘরহীন আরো অনেক শিশু-কিশোরের সাথে ঠাই হয় ফুটপাতে। চায়ের স্টলে কাজ করায় কৃষ্ণা থেকে হয়ে যায় চাপিয়ু। তার আশে পাশে থাকা চরিত্রগুলো হলো এলাকা মাদক ডিলার বাবা, মাদক বিক্রেতা চিলিম, রেড এরিয়ায় কাজ করতে না চাওয়া নতুন মেয়ে সুইট সিক্সটিন বা ষোল সাল, বেশ্যা রেখা ও তার মেয়ে মঞ্জুসহ আরো অনেকে। এইসব মানুষের মিছিলে কৃষ্ণা জড়িয়ে গেলেও তার স্বপ্ন সেই পাচঁশ রুপি। কৃষ্ণা মায়ের কাছে ফিরে যাবে। কৃষ্ণার এই ফিরে যাওয়াকে কেন্দ্র করে আরো অনেক মানুষের বাড়ি ফেরার স্বপ্ন নিয়ে এই মুভি। আসলে কেউ কি ফিরতে পারে?

পরিচালক হিসেবে এটি মীরা নায়ারের প্রথম মুভি। এর আগে শর্ট ফিল্ম বানিয়ে হাত পাকিয়েছিলেন। এই মুভির কাহিনী ও প্রযোজনায় মীরা নায়ার। চিত্রনাট্যে তার সাথে কাজ করেছে সোনি তারাপোরেভেলা, যিনি বরাবরই মীরা কাজে থাকেন। মুভির মিউজিক করেছেন কর্নাটক ঘরানার বিখ্যাত বাদক ড. এল. সুব্রামানিয়াম। সুব্রামানিয়াম মুভির কাজ করেছেন মাত্র চারটি। বাকি কটি হলো মীরার মিসিসিপি মাসালা (১৯৯১), বানার্ডো বার্তুচ্চির লিটল বুদ্ধা (১৯৯৩)এবং ঈসমাইল মার্চেন্টের কটন মেরি (১৯৯৯)।

মীরা নায়ার

সালাম বম্বে বিদেশি ভাষায় অস্কার মনোনয়নে শামিল হওয়া দ্বিতীয় ইন্ডিয়ান মুভি। এই মুভি নিউইয়র্ক টাইমসের ‘দি বেষ্ট ওয়ান থাউজেন্ড মুভি এভার মেড’-এ স্থান পেয়েছে। এই মুভিতে ইন্ডিয়ান বাণিজ্যিক মুভির কিছু ক্লিপ আছে। আরো আছে এর পাত্রপাত্রীদের মুখে সেইসব মুভির গান। দুটো জগতের আলাদা আলাদা চিত্র। অথচ দুটো একই শাইনিং ইন্ডিয়ান। ভালো লাগা এই মুভির কেন্দ্র ভূমি বম্বের এক রেল স্টেশন, তার চারপাশ ও রেড লাইট এরিয়া। এই এরিয়ার মেয়েরা রুম নাম্বার দিয়ে পরিচিত, নাম দিয়ে নয়। এই মুভিতে কোন গ্ল্যামারাস কোন চরিত্র নাই। সব অভিনেতা অভিনেত্রীর গায়ের রং ময়লা। একজন ধবধবে সাদা মানুষকেও দেখা গেল না। যেমন দেখা যায় মূলধারার মুভিতে। এই মুভিতে আছে সত্যের অনুসরণ। সেই অনুসরণ ধরে নির্মিত কাহিনীর গতিশীলতা ও টানটান অভিনয় পর্দা থেকে মুখ ফেরাতে দেয় না।

এই মুভিতে গরীব মানুষের বিপরীতে মীরা কোন জুলুমবাজ ধনী মানুষ বা শ্রেনী তুলে ধরেন নাই। প্রচ্ছন্নভাবেও না। জীবন যাত্রার তুলনা এসেছে মাত্র একটা জায়গায়- তা মাত্র মিনিট দুয়েক। ফলে কাহিনীর আলাদা কোন মারপ্যাচ নাই। বরং, এই এলাকার মানুষগুলোর সম্পর্ক কোন ছাঁচে তৈরি হয়, তার বয়ান মুখ্য। যা এই মুভিকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দান করেছে।

এই মুভিতে কৃষ্ণার বাড়ি ফেরার আকুতি হলো এক ধরণের প্রাকৃতিক আহ্বান। সেখানে ভাইয়ের অত্যাচার আছে, আছে লাঞ্চনা। এটাকে আমরা প্রতিকীভাবে নিতে পারি। না নিলেও সমস্যা নাই। মূলকথা হলো ফেরার মতো একান্ত নিজের কিছু একটা থাকা। কৃষ্ণার মুখে যতবার ‘মুলুক’ শব্দটা শুনেছি- অদ্ভুত লেগেছে। দর্শক হয়তো নিজেও ভাবে সেও মুলুকে গিয়ে পৌছবে। কৃষ্ণার এই বাড়ি নিছক ইট-কাঠ বা শন-টিনের বাড়ি ফেরা না। তার চেয়ে বেশি কিছু। যা কিছু সুন্দর- যেখানে আমরা কিছূ অসুন্দর আন্তরিকভাবে মেনে নিই তা কি আমাদের বাড়ি নয়! তাই কৃষ্ণার বাড়ির কল্পনা আমরা ইচ্ছে মতো বাড়িয়ে নিতে পারি।

নিসন্দেহে সালাম বম্বে একটি অবাণিজ্যিক ধারার মুভি। এই মুভি আমাদেরকে সরাসরি চিন্তা দেয়। আলাদা করে ভাবতে হয় না। কিন্তু এটাকে সরাসরি শিক্ষামূলক করে তোলার কোন চেষ্টা নাই। বরং, এক ধরণের সরল ও আপাত সত্য বয়ান দিয়ে এগিয়ে চলা কাহিনী আপনাকে হাসাবে – কাদাঁবে। সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। এই জায়গা দাড়িয়ে ভাবছিলাম আমাদের দেশের কথিত শিল্পমান বা বিকল্প ধারা এই ধরণের ভাব কেন জাগাতে পারে না। অনেক সময় অতি তেলায়িত ভাব থাকে- সেখানে তেলায়িত না হলে প্রেস্টিজ থাকে না। এইখানে আমার একটা অনুমান আছে। সালাম বম্বে আর কিছুই নয়, মূলধারা বাণিজ্যিক মুভির পরিপূরক । সেই সব মুভি মানুষের জীবনের সত্যকে যতটুকু কেড়ে নেয়- সালাম বম্বে-র মতো মুভি তার কিছুটা ফেরত দেয়।

এই মুভিগুলোর নির্মাণের পেছনের আরেকটা নির্মাণ হলো পেশাদারি মনোভাব। সেই পেশাদারীত্বে শিল্পের দীক্ষা আছে। একই লোকগুলো আবার মূলধারার মুভিতেও কাজ করে। সেই অনুমান থেকে বলি মূলধারা বা বাণিজ্যিক ধারার ইন্ডাষ্ট্রি গড়ে না উঠলে পেশাদারি কাজ সম্ভব না। শুধুমাত্র নন্দনবোধ আর দেশ উদ্ধার দিয়ে কোন শিল্প মাধ্যম টিকে থাকতে পারে না। একই সাথে সেই সম্ভাবনা তৈরী না হলে সালাম বম্বে তৈরি সম্ভব না। আমার অনুমানের সাথে কেউ দ্বিমত করলেও সমস্যা নাই।

বাস্তব লোকেশনে নির্মিত এই মুভিতে দারুন অভিনয় করেছে কৃষ্ণা চরিত্রের শফিক সাইয়েদ । বাবা গিলাব চরিত্রে আছে শক্তিমান নানা পাটেকর। তাকে ভালো-মন্দ মিশেল একটা চরিত্র দেয়া হয়েছে। যিনি মাদক বিক্রি ও পতিতালয়ের সাথে জড়িত থাকলেও এক পতিতাকে জীবনের সাথে জড়িয়ে নেন। তিনি খুব বাস্তব কারণে তাকে স্ত্রীর মতো করে রাখতে পারেন না। তার জীবনের ট্রাজেডী পাঠকদের না জানায়। সেখানে বদলে গেছে কৃষ্ণার জীবন। মীরা নায়ার সেটা খোলাসা না করেই খুব হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য দিয়ে মুভিটি শেষ করেন। এখানেও আমার একটা অনুমান আছে। যা আমি বিশ্বাস করি না- তারপরও কৃষ্ণাই হয়তো একদিন বাবা হয়ে উঠবে। রাঘুবীর যাদব বরাবরেই মতো প্রাণবন্ত। কৃষ্ণার টাকা চুরি করা সত্ত্বেও তার মৃত্যু দর্শকদের কাদাঁবে। দুই মিনিটের দৃশ্যে আছেন ইরফান খান। এটি তার অভিনীত প্রথম মুভি। রেখা চরিত্রে অনিতা কানওয়ারের অভিনয় অনবদ্য।

শফিক সাইয়েদ-সহ সব’কটি শিশু চরিত্র বাস্তব জীবনের পথ শিশু। শফিক সাইয়েদ এই মুভির জন্য শিশু শিল্পী ক্যাটাগরিতে জাতীয় পুরষ্কার জিতেন। বর্তমানে তিনি ব্যাঙ্গালোরে অটো রিকশা চালান। নিয়া মীরা নায়ার এই মুভির পথশিশুদের তিনি গড়েছেন সালাম বালক ট্রাস্ট । যা এখনো টিকে আছে। এই মুভি অস্কার না জিতলেও অনেকগুলো দেশি-বিদেশি পুরষ্কার জিতে নিয়েছে। সেই লিষ্টি নিচে দেয়া হলো:

পুরষ্কার

জিতেছে:

  • 1988: Audience Award, Cannes Film Festival
  • 1988: Golden Camera, Cannes Film Festival
  • 1988: National Film Award for Best Feature Film in Hindi
  • 1988: National Film Award for Best Child Artist: Shafiq Syed
  • 1988: National Board of Review Awards: Top Foreign Film
  • 1988 : Lilian Gish Award Excellence in Feature Film, Los Angeles Women in Film Festival (tied with Elysium)
  • 1988: Jury Prize, Montréal World Film Festival (tied with The Dawning)
  • 1988: Most Popular Film, Montréal World Film Festival
  • 1988: Prize of the Ecumenical Jury, Montréal World Film Festival

মনোনয়ন:

  • 1989: Academy Award for Best Foreign Language Film
  • 1990: BAFTA Film Award Best Film not in the English Language
  • 1989: César Award for Best Foreign Film (Meilleur film étranger)
  • 1990: Filmfare Best Director Award
  • 1989: Golden Globe Award for Best Foreign Language Film

 > ব্যবহৃত তথ্য ও ফটো: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত।

Comments

comments

10 thoughts on “সালাম মীরা নায়ার

  1. বেশ ভালো লিখেছেন। ছবিটি দেখা আছে। মীরার খুব সম্ভবত এই একটি সিনেমাই দেখেছি। তবে প্রথম প্যারার পর পরের প্যারা কি মুল লেখার সাথে সম্পৃক্ত নাকি আলাদা কোট জাতীয় কিছু সেটা বুঝতে কষ্ট হয়েছিলো 😛

    • ধন্যবাদ বস। আমিও এই একটাই দেখছি। সেই প্যারায় মীরার প্রথম কাজ বলে হাইলাইট করছি। আর সুব্রামানিয়াম সম্পর্কে কিছু তথ্য দেয়ার লোভ সামলাইতে পারি নাই। আপনার দেখার/পড়ার এই ধরণটা আমার ভালো লাগছে। ভালো থাকুন।

  2. ছবিটার নাম শুনেছিলাম, দেখি নাই। আসলে ছবির ব্যাপারে আমার কোপাল খারাপ, ভাল ছবি কখনো দেখা হয় না। তবে সময়ের কারনে এখন আর সাহস করি না…
    বেশ ভাল লিখেছেন, আপনার লেখা পড়ে ছবিটা চোখের সামনে ভেসে উঠল।

  3. বরাবরের মত অসাধারণ রিভিউ কবি! আপনার লেখাগুলো ভালো লাগে এই কারনে যে, আপনি অন্য সবার মত করে না ভেবে স্বতন্ত্র থাকেন নিজের চিন্তায়। গভীর থেকে আরো গভীরে চলে যান অনুভূতির! সিম্পলি অসাধারণ!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *