তারেক মাসুদের রানওয়ে: দর্শকের চোখের আড়ালে রুহুলেরা জঙ্গি হয় এবং বাড়ি ফেরে

দর্শক সমাগম বেশি হওয়ায় আগেভাগে গিয়াও প্রথম শো’র টিকেট পাওয়া গেল না। দ্বিতীয় শো’র টিকিট নিয়া লাইনে দাঁড়ায়া পোস্টার দেখতে ছিলাম। সিনেমার নাম রানওয়ে। পোস্টারের উপরে আসমান ঢেকে দেয়া উড়োজাহাজ। সন্ধ্যাবেলা, তাই রানওয়ের ইন্ডিকেটর লাইট জ্বলছে মাঠের মধ্যে এইটা হল বামপাশের দৃশ্য। ডান পাশে একখানা ‘অস্ট্রেলিয়ান’ গরু। মাঝখানে সিনেমার নায়ক আসতেছে, তার পেছনে কাঁটা তারের বেড়া।

পোস্টারে এই সেই নায়ক, শুনেছি সিনেমার কাহিনীতে যার পরিবার নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে ঢাকার এই বিমানবন্দরের পেছনের শহরতলীতে এসে বসত গড়ে। ২০০৫-০৬ সালের কাহিনী, তখন এর নাম ছিল জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। নায়কের বাবা আরব দেশে গেছেন গতর খেটে রুজি রোজগার করতে। এই সেই নায়ক; যার জীবনের উড়াল কাহিনীর চলচ্চিত্রখানা বানাইতে নির্মাতা তারেক মাসুদ নাকি স্বয়ং নিজের জমি জিরাত বেইচা টাকা জোগাড় করছেন, বাজারে শুনতেছি।

জমি-ঘটি-বাটি বিক্রি কইরা এই দেশের গরিব মানুষেরা আরব দেশে যায়। তাদের চেয়ে মাসুদের স্বপ্ন নিশ্চয় কম বড় না, ফলে নিজের জায়গা-জমি বিক্রি কইরা এই সিনেমা তিনি বানাইলেন। এইটারে ড্রিম প্রজেক্ট বললে ভুল হইবে না, এমন আশা রাখা যায়। সেই ঈমান রেখেই দেখা যাচ্ছে, এই সিনেমাখান নিয়ে দেশ ভ্রমণে বের হইছেন মাসুদ। এই কাজটা তিনি আরেকবার করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের ওপর ডকুমেন্টারি ‘মুক্তির গান’ নিয়ে দেশের নানান জায়গায় গেছেন। সেই আসা-যাওয়া নিয়া তিনি বানাইছিলেন আরেকখান ডকুমেন্টারি, যেইটার নাম ‘মুক্তির কথা’। এই দুই ডকুমেন্টারি দেইখা মানুষের চোখের পানি ঝরেছিল। আমি নিজেও সেই মানুষদের একজন।

এবার রানওয়ে শুরু করলেন চট্টগ্রাম থেকে। দুই হাজার দশ সালের ষোল ডিসেম্বর বিকেল পাঁচটায় চট্টগ্রামের থিয়েটার ইন্সটিটিউট চিটাগাং [টিআইসি] হলে প্রথম প্রদর্শনী হয় রানওয়ে সিনেমার। তো, লাইনে দাঁড়ায়া পোস্টার দেখতেছিলাম। ডিটেইল দেখতে অভ্যস্ত এক বন্ধু বলল; দেখছেন ক্যামেরার ফোকাস কিন্তু নায়ক না, লাইটগুলা। খুতখুতে স্বভাব বন্ধুর। হয়ত ওর স্বভাব কিছুটা তখন সংক্রমিত হইছিল আমার মধ্যে। ভাবতেছিলাম; গরুটা কথিত উন্নত বা বিদেশী জাতের কেন। এর মধ্যে কোন প্রতীকি বিষয়-আশয় আছে কি না। বাংলাদেশের কথিত ‘বিকল্পধারা’ বা ‘সুস্থধারা’র চলচ্চিত্র দেখতে গেলে এই প্রতীক সন্ধান না কইরা উপায় নাই। এ এক বিরাট মুশকিল; প্রতীক খুঁজতে খুঁজতে জান জেরবার হয়। কিন্তু মাসুদ সাহেবকে ধন্যবাদ, এই সিনেমায় প্রতীকি আধ্যাত্মিক কোন ব্যারাম নাই। সহজ-সরল বর্ণনা আর অভিনয়ের মধ্য দিয়া কাহিনীখান আগুয়ান রাখছেন।

এইটারে ড্রিম প্রজেক্ট বললে ভুল হইবে না, এমন আশা রাখা যায়। সেই ঈমান রেখেই দেখা যাচ্ছে, এই সিনেমাখান নিয়ে দেশ ভ্রমণে বের হইছেন মাসুদ।

জঙ্গিবাদ কাহিনীর চলচ্চিত্র দেখার মধ্যে রাজনৈতিক ও শ্রেণীগত বিষয়-আশয় আছে। সেটা এড়াইয়া চলা আসলেই মুশকিল। টিকেট না পাওয়া প্রথম প্রদর্শনী শেষ, দর্শকদের লাইন সামনে আগাইতে শুরু করে চট্টগ্রামের এক প্রগতিশীল কবি হুঁশিয়ার করে দিলেন। বলতেছিলেন, সাবধানে থাকতে হবে। মোল্লাদের বিশ্বাস নাই। কখন আবার বোমা মেরে দেয়। পাশে থেকে বন্ধুদের একজন বলে উঠল, মোল্লাদের দরকার নাই। বোমা মারার জন্য তোরাই যথেষ্ট। বুঝতে পারলাম সমাজটা একরৈখিকভাবে চলে না। এর মধ্যে নানান ধরনের মত ও ধরন আছে। ফলে কারা বোমা মারতে পারে সে বিষয়ে নিশ্চিত না হয়েই আসনগ্রহণ করতে হল।

বসে চারিদিকে তাকাইয়া মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গেল যে, তারেকের কথিত ‘টার্গেট তরুণ’রা এই চলচ্চিত্র দেখিতে আসবে না। যাদেরকে নিয়ে যাদের জন্য এই চলচ্চিত্রখানা বানাইছেন বলিয়া তারেক ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমে জানাইয়াছেন। জেলা শহরগুলোতে ঘুরে ফিরে মধ্যবিত্ত ঘরানার সংস্কৃতমনা দর্শকই কথিত ভাল সিনেমার প্রদর্শনী ও থিয়েটারে গিয়ে সমাজ বদলানো ধরনের তৃপ্তির ঢেকুর তোলে। চট্টগ্রামের এইসব মচ্ছবে একই লোকগুলো থাকে। যারা প্রগতিশীলতায় অনেক ঈমানদার, বুকে হাত দিয়ে বলা যায় এরা কখনও ইসলামে মাতোয়ারা হইয়া জঙ্গি হইতে যাবে না।

সিনেমা শুরু হবার আগে তারেক মাসুদ ছোট্ট একখানা বক্তব্য দিলেন। তিনি ভয় পাইয়া দিছিলেন এই কথা বলে, তার এই সিনেমাখানা যদি কোন কারণে পরিত্যক্ত হয়ও, তারপরও একটা কারণে টিকিয়া থাকিবে, সেটা হল অসাধারণ সিনেমাটোগ্রাফি। যে কাজটা করেছেন মিশুক মুনির। তারেক যথার্থ বলিয়াছিলেন, এই সিনেমাখান থেকে চিত্রগ্রহণ শিখার অনেক কিছু আছে। প্রতিটি শট নেয়া হয়েছিল অনেক পরিকল্পনা ও যাচাই-বাছাই করিয়া নিশ্চিত হয়ে। তারেকের কথা শুনিয়া এই আশঙ্ককাও মনের মধ্যে উঁকিজুঁকি মারিতেছিল- সিনেমার দৃশ্যায়ন ছাড়া আর কিছু কি টিকিয়া থাকার মত হয় নাই!

চলচ্চিত্র শুরু হল। গ্রামে নায়ক রুহুল মাদরাসায় পড়ত। রুহুলের বাপ এখন আরব দেশে। পরিবার ঢাকায়। বোন ফাতেমা গার্মেন্টসে চাকুরি করে। গন্ডগোলের কারণে দুই মাস বেতন পায় না। মা রহিমা এনজিও থেকে টাকা ধার নিয়া গরু পালে। সেই গরুর দুধ বেইচা সংসার চলে। সংসারে আরও আছে তার বুড়া দাদা। অন্যদিকে আলিম পাশ করার আগে লেখাপড়া ছেড়ে দেয়া রুহুল চাকুরির চেষ্টা করতে থাকে।
চলচ্চিত্র রুহুলের এই চাকুরির চেষ্টা পর্যন্ত গেলে কিছুটা আরাম বোধ হল। নতুন কোন জায়গায় যাইতেছি ভাইবা পৌঁছানোর পর গিয়া যদি দেখি- এইটা তো চেনা জায়গা! তার উপরে মানুষজনও চেনা! তখন যেমন আরাম বোধ হয় তেমন আরাম। চলচ্চিত্রখানা নয়া হইলেও কাহিনীর ছক ঠিক আছে। ‘জঙ্গিবাদ’ এর ছকেই কাহিনী আগাইতেছে, মাদরাসা-দারিদ্র্য-বেকারত্ব ইত্যাদি। ‘জঙ্গিবাদ’র বিরুদ্ধে যারা ‘অনন্ত যুদ্ধে’ নামছে তাদের কাটা ছক।

মিশুক মুনীরের ক্যামেরায় ছিলো অসাধারণ সব শট।

রুহুল কম্পিউটার শিখতে যায় তার মামার ক্যাফেতে। যদিও এই সম্পর্কটা গোলমেলে। মামা মনে হইতে হইতে কেন যেন বিশ্বাসযোগ্য হয় নাই তাদের সম্পর্কটা। এই ক্যাফেতে রুহুলের পরিচয় হয় আরিফের সাথে। আরিফ জিহাদী। কিন্তু গণতন্ত্রকে সে মনে করে কুফুরি জিনিস। তাই প্রচলিত ইসলামী গণতান্ত্রিক রাজনীতি ছেড়ে সে জঙ্গি হইছে। রুহুল ও আরিফের মধ্যে খায়-খাতির হয়। রুহুলকে এক হুজুরের কাছে নিয়ে যায় আরিফ। পরে নিয়া যায় ‘উর্দু ভাই’য়ের কাছে। কিন্তু আমাদের ‘বাংলা ভাই’য়ের কথা মনে পইড়া যায়।

গল্প ও সংলাপ লিখেছিলেন নির্মাতা মাসুদ নিজেই। চিত্রনাট্য ও সঙ্গীত পরিচালনায় ক্যাথরিন মাসুদ। চরিত্রগুলার মধ্যে রাবেয়া মনি ছাড়া আর কেউ নিজের চরিত্রের অভিনয় দেখা যায় নাই। এমনকি সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত চরিত্র আরিফও মনে হইতেছিল যে, অন্যের সংলাপ বইলা দিয়া যাইতেছে ক্যামেরার সামনে। নাজমুল হুদা বাচ্চু, নাসরিন আক্তার, রিকিতা নন্দিনী শিমু, মোছলেমুদ্দিন এবং জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় এর অবস্থাও ছিল তাই। কাহিনী এতই ধীর লয়ে আগাইতেছিল। মনে হইতেছিল যে, সিনেমা হলে বসে আমার বয়স আসল বয়সের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বাইড়া যাইতেছে। শ্র“তিচিত্র’র পরিবেশনায় পরিবেশিত চলচ্চিত্রখানা আমরা দেখিতে থাকিলাম।

‘উর্দু ভাই’ বোমা ফাটানোতে ওস্তাদ। ইতিমধ্যে তরুণ রুহল কিভাবে যেন হতাশ হয়ে পড়ে দর্শকের চোখের আড়ালে। রুহুলদের এমন কি হইল যে তারা জঙ্গি হবে, সেটা যেমন স্পষ্ট না। তেমনি আবার বোমা মারা নিয়া পে বিপে কোন বয়ান নাই। বরং বাজারে আগে থেকেই চালু ভাসা-ভাসা, নিরর্থক কিছু সংলাপের ছড়াছড়ি। নিজের তাজা খুন বিলিয়ে দেয়ার জন্য যুবকেরা কিভাবে উসকানি পায়, কিভাবে তারা তৈরি হয়। সে ধরনের পরিবেশ-পরিস্থিতি, সংলাপ ও চরিত্র নাই। উর্দু ভাই চলচ্চিত্রে কোন শক্তিমান সবল চরিত্র না। অথচ এই ভাই আবার যুবকদের জানবাজ করে গড়ে তোলে! কিভাবে? সে আর দর্শকের জানা হয় না। এই অস্বস্তি নিয়েই আবার সেই জানবাজ যুবকদের ‘বাড়ি ফেরা’ দেখতে হয় আমাদের। তারা আবার সেই পরিবারে ফিরে আসে যেখানে আছে দারিদ্র্য, আছে গার্মেন্টস শ্রমিক বোন। যে দুইমাস বেতন পায় না, আছে এনজিওর কাছ থেকে চড়া সুদে ধার নিয়া পালিত গরু। কিন্তু ফিরত আসার পর তারা খুবই স্বাভাবিক থাকে। জীবন উলোট পালট করে দেয়ার মত ঘটনা হলেও তার খুব স্বাভাবিক থাকে। যেন অমন কোন ঘটনা তাদের জীবনে ঘটেই নাই। অবিশ্বাস্য, অবাস্তব, অতিসরলীকরণ ও তাড়াহুড়া।

তবে আরিফের চরিত্র অনেক বেশি প্রতিষ্ঠিত; সংলাপের ক্ষেত্রে। তার কাজের পক্ষে জোরালো ও স্পষ্ট সংলাপ; অন্যান্য চরিত্রের তুলনায়। গণতন্ত্রে ঈমান রাখে নাই বলে আরিফ জঙ্গি হইছে। ভালো কথা। কিলিয়ে কাঠাল পাকানোর মত সেই গণতন্ত্র কায়েমের মহান বয়ান শোনা যায়, আবার একইসাথে এক সময়ের জঙ্গিরা ঘরের টানেই ঘরে ফেরে। কিন্তু ইহা কি করে শেষ কথা হয়! যার ব্যাপারে বাংলাদেশের মত দেশগুলার আম-জনতা যারপরনাই হতাশ ও বিরক্ত।

যে গণতন্ত্ররে জায়েয করতে আরও অনেকের মত খোদ আরিফের স্ত্রীও তৎপর। সে গণতন্ত্রের ভেতরেও যেন কোন দায় নাই। পরিবারের বাইরে মানুষের দায়িত্ব-কর্তব্য ও ভাবনার কোন বড় জায়গা নাই। সমাজ নাই, রাষ্ট্র নাই। এই এক অদ্ভূত গণতন্ত্র। মানুষের আকাক্সক্ষাগুলোকে সে নানা রঙে আর মোড়কে বিক্রি করে চলেছে। এই সম্মতি উৎপাদন সম্মতির শক্তিকে ভুলিয়ে দেয়। নির্বাচন করে এমন কিছু সে শুধু আদেশ করে। জবাব দেয় নাই। এটাই হল তথাকথিত গণতন্ত্র, হোক ইসলামী এটাই তার নিয়তি।

বোরখাওয়ালী চরিত্রে অভিনয় করেছেন টিভির জনপ্রিয় অভিনেত্রী তিশা।

মাঝখানে পরিচালক একখান চমক দিতে চেয়েছেন। একজন বোরখাওয়ালীকে এনেছেন, যে কি না গণতন্ত্রী, ইসলামী গণতন্ত্রী। আরিফকে জঙ্গিবাদ থেকে ফেরাতে একমাত্র তৎপর মানুষ হিশাবে ওই চরিত্রে অভিনয় করেছেন টিভির জনপ্রিয় অভিনেত্রী তিশা। জঙ্গি আরিফ একসময় ইসলামী ধারার গণতান্ত্রিক কোন ছাত্র সংগঠন করত। সেইটাকে ঈমান হারাইয়া এই লাইনে আসছেন। তার আগে ওই লাইনের ছাত্রী সংগঠনের একজনরে ভালবেসে বিয়ে করে। যাচ্ছেতাই অভিনয় তিশার, মনে হচ্ছিল পরিচালক শুটিং চলাকালে তাকে পাশে কোথাও থেকে ধরে এনেছেন এবং তাতে তিশার খুব রাগ হয়েছে। ফলে তিনি কিছুক্ষণ সংলাপ বিতরণ করে চলে যেতে পারলে বাচেন। অবশ্য মিনিটখানেকের ওই দৃশ্যের শেষে তিনি চলে গেলে আমরা দর্শকরা হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। গণতন্ত্রের ওপর দর্শকদের এভাবে কেন বিরক্ত তৈরি করলেন নির্মাতা!

যাই হোক, আরিফের মারফত জঙ্গিবাদে দীক্ষা নেয় রুহুল। তারপর বাড়ি এসে নানা ফতোয়া জারি করে। যেমন- খবর ছাড়া টেলিভিশনে কিছু দেখা যাবে না, এনজিও টাকার সুদ দিতে হয় এটা দিয়ে কারবার করা যাবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। এরপর উর্দু ভাইয়ের সাথে বিশাল কর্মী বাহিনী কোন এক নির্জন চরে প্রশিণ নেয়। সিনেমা হল ও আদালত প্রাঙ্গনে বোমা হামলা দেখানো হয়। এই জঙ্গি দলে এক মন্ত্রীর হাত দেখানো হয়। যিনি ‘কমিউনিস্ট’ মারার জন্য এই দল খানার সমর্থন দেন। একসময় সেই সমর্থন উঠে যায়। আরিফ বোমা হামলা চালাতে গিয়া আহত হয়। উর্দু ভাই বলে, আরিফ আমাদের নাম কইয়া দিতে পারে, চল সবাই যার যার মত পালাইয়া যায়।

রুহুল নিজে নিজে অনেক কিছু চিন্তা করে। কিন্তু কি যে চিন্তা করে সেটা আমরা দর্শকরা টের পাই না। যেমন এই জঙ্গিবাদ এ দীক্ষা নেয়ার আগে সে কেন হতাশ হইয়া পড়ছিল, কেন সে দীক্ষা নিল তার টের পাই নাই। তারপর বাড়ি এসে অস্বাভাবিক রকম স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে শুরু করল। যেন এর আগে কিছুই ঘটে নাই। মামার ক্যাফেতে আরিফের সাথে পরিচয় হবার পর এই ‘বাড়ি ফেরা’র মাঝখানের কোন স্মৃতিই যেন নাই তার। অতঃপর তাহারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিল। সিনেমায় প্রায় শেষ দৃশ্যকল্পটি অবশ্য খুবই মনোহর। এটা অবশ্যই দশর্কের চোখে অনেকদিন লেগে থাকবে। কিন্তু কিছু জিনিস মনের মধ্যে খচখচ করে। রুহুল জঙ্গিবাদী নাই বা হল- তার দিলের মধ্যে নানান কথা জাগে তো! এরমধ্যে পরিবারের দায়িত্ব একটা। কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের যে সমস্যা তার রাজনৈতিক, সামাজিক বা ধর্মীয় অবস্থানের বাস্তবতার মধ্যে তিনি রুহুলকে দাঁড় করাতে পারেন নাই। কেন পারেন নাই?

জঙ্গিবাদ ভাল বা খারাপ যাই বা হোক, তাতে সমস্যা কিন্তু সমাধান হয় না। বরং, ভাবিতে হয় মানুষের সাথে মানুষ, নাগরিকের সাথে রাষ্ট্রের যে সম্পর্ক সেটা নিয়া প্রশ্ন তোলা হয় নাই। মনে হল, রুহুলের মধ্যকার কোন দ্রোহ থাকলেও সেটাকে খামোশ করে দেয়া হল।

বেসরকারি টেলিভিশনের একজন সাংবাদিক উচ্ছ্বসিত হইয়ে বললেন, এটা একটা ভাল মানের রিপোর্টিং। কিন্তু রিপোর্টিং এই পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু এটাকে অনুসন্ধানী বা ঘটনার পেছনের কিছু বলা যাবে না। বাংলাদেশে যে পর্যন্ত হয় আর কি! এখানে তেহেলেকা ডট কমের মত কারও কাছা কেউ খুলে দেয় না। বড় জোর প্রপাগান্ডা করে। তারেক মাসুদ বলতেছিলেন, তিনি দর্শকদের ভেবে দেখার দায়িত্ব দিলেন। কিন্তু সমস্যা হল সৃষ্টিশীল কাজের ব্যাখ্যার জন্য আম-জনতার উপরে নির্ভর করলে হিতে বিপরীত হইতে হবে। নিদেন পক্ষে নিজের একখান অবস্থান থাকতে হবে। তারেক যদিও বলেছেন, নিরপেক্ষ থাকার কাজ করেছেন। কিন্তু সেইটারেও ভাসা ভাসা মনে হইছে। কেন এমন ভাসা ভাসা হইল? তারেক মাসুদ চলচ্চিত্র প্রদর্শনী শুরু হওয়ার আগে বলতেছিলেন এখানে তার নিজের কোন পজিশন নাই। ফলে চলচ্চিত্রেরও কোন পজিশন খুঁজে পাইলাম না দর্শক হিশাবে। তারেকের কথা মত তিনি সেন্সর বোর্ডের ঝামেলায় পড়তে চান নাই। সে কথা থাক। নির্মাতাকে ঝামেলায় না ফেলেই যেটুকু সিনেমা পেলাম, তা আর কম কিসে!

>ব্যবহৃত ছবি রানওয়ে মুভির ফেসবুক একাউন্ট থেকে নেয়া।
>লেখাটি পাক্ষিক চিন্তা জানুয়ারী ১৫, ২০১১ সংখ্যায় প্রকাশিত।

Comments

comments

7 thoughts on “তারেক মাসুদের রানওয়ে: দর্শকের চোখের আড়ালে রুহুলেরা জঙ্গি হয় এবং বাড়ি ফেরে

  1. Pingback: আমরা সবাই আবদুর রহমান « ইচ্ছেশূন্য মানুষ

  2. Pingback: হালাল টেলিভিশন | ইচ্ছেশূন্য মানুষ

  3. দুর্বল কাহিনীর মধ্য দিয়ে নতুন করে জঙ্গীবাদী শরবত গেলানোর চেষ্টা। মানুষ আর কত গিলবে।

  4. Pingback: তারেক মাসুদ কার কাছে ফিরবেন | ইচ্ছেশূন্য মানুষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *