নির্ঘুম মেঘের দেশে

আমার ছোট্ট কলার ভেলাটি জলে কোন আলোড়ন না তুলেই চলছিল দূর কোন দেশে। আর মানুষটা ভেলার পাশ ঘেষে ভাসছিল। সেও কি আমার মতো নিরুদ্দেশ যাত্রায় বেরিয়েছে। উছলে পড়া আলোর সমুদ্দুরে খুব আরাম করে হাত-পা ছড়িয়ে আছে। একবার মনে হলো মৎস্য কন্যা। আবার মনে হচ্ছিল পাখি। এই বুঝি হয়ে ডানা মেলে আকাশে উড়াল দেবে। গায়ে তার লাল জামা। টুকটুকে লাল।

আমার খুব চেনা মানুষ। বুবু। আমি ডাকি, বুবু, বুবুরে। বুবু আমার উত্তরহীন। সে কি পণ করেছে জলের মৌনতা ভাঙ্গবে না। ভয় নয়, শংকা নয় এমনকি কোন প্রশ্ন নয়, শুধু ব্যাকুল হয়ে ডাকতে ইচ্ছে করে। কিন্তু গলা বেয়ে শব্দ গড়িয়ে নামে না। কি যেন একটা বুকের মাঝে জমাট বেধে গেছে। ইচ্ছেরা ভাষা খুজে পায় না। কে একজন ফিসফিসিয়ে বার বার বলছিল, খোকন, ও খোকন মৌনতা ভাঙ্গিস না। ভর দুপুরের মৌনতা ভাঙ্গতে নেই। মাছরাঙাটা উড়াল দিয়ে আবার এসে ভেলায় বসে। বুড়ো আম গাছে কয়েকটা কাক কা-কা-কা শোরগোল তোলে। আজ কাকদের কি হয়েছে কে জানে। প্রতিদিনকার মত লজ্জা না পেয়ে ডেকেই যাচ্ছে। কাক, মাছরাঙা, জল সবাই কি জানত আজকের দুপুরটা অন্যদিনের চেয়ে আলাদা। হয়ত জানত, শুধু আমাকে জানতে দেয়নি। নিজেদের মাঝে গোপন করে রেখেছিল। এখন আর কিছুই গোপন নাই। আমি আর বুবু ভাসছি পাশাপাশি।

দুপুরের রোদ্দুর.

আকাশের মেঘেরা কখনো ঘুমায় না। আমি কখনো স্থির মেঘ দেখিনি। আমার মনে হত দুপুরবেলার মেঘগুলো জিরাতে চাইতো যেন। কিন্তু স্থির থাকার সময় কই। আমার মনটাও যেন তেমন অশান্ত। আবার, কখনো কখনো মনে হত যদি মেঘ হতাম তবে ছুটোছুটি না করে জলে নিজের ছায়ার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। দুপুরবেলার ছায়া একদম অন্যরকম। সবকিছু থম মেরে থাকে। নির্ঘুম দুপুরে মাকে ফাকি দিয়ে একা একা ঘাটলায় এসে বসতাম। পুকুরের টলটলে জলে হাওয়া এসে আস্তে আস্তে সুড়সুড়ি দিতো। মুদৃ হাসি দিয়ে জলে ছোট ছোট ঢেউ উঠত। সেই হাসি পুকুরময় ছড়িয়ে যেত। ঢেউ আমার ছায়া নিয়ে ইচ্ছেমত খেলত। ঢেউয়ে আঙ্গুল বুলিয়ে আরো ঢেউ তুলতাম। ঢেউয়ের পর ঢেউ। আমার ছায়াটা ভেঙ্গে পড়ত। কিন্তু জলের ছায়ায় আমার হাসি মুছে না।

এই সময়টা নাকি খুবই অলুণে। পেত্মীরা বাচ্চাদের ধরে নিয়ে যায়। শুনলেই ভয়ে গা ছমছম করত। তারপরও চলত সেই নিষিদ্ধ অভিযান। আমার একাকী অভিযান। দুপুরের রহস্যময় আলো গাছের পাতা চুয়ে চুয়ে নামত। কিছুদূর এসে থেমে যেত। হাল ছেড়ে দেয়া ভাব। বৃক্ষের পাতা চুয়ে যতটুকু নামে। এটা হলো ধ্যানের সময়। হঠাৎ হয়ত একটা কাক ভুল করে ডেকে উঠল। লজ্জা পেয়ে চুপ হয়ে যেত। মাছরাঙাগুলো একা একা নিজের সাথে কথা বলত। তারপরও সবই শুনা যেত। নৈশব্দ্যের কানে।

পুকুর পাড়ের ঘাসটা অবাক হয়ে তাকাত আকাশের নীলে। কতণ আর মাথা উচু করে থাকা চলে। একসময় নেতিয়ে পড়ত। সে হয়ত ভাবত আকাশকে সবাই নীল বলে কেন? আকাশ কি আসলেই নীল। ঘাস কি ভাবত কে জানে? নাকি আমিই ঘাসের বনের একজন হয়ে উঠতাম। ঘাসের উপর শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে কি যে মজা। একদিন এই ঘাসের বনে ডোরকাটা বিশাল একখানা সাপ একেবেকে চলছিল। আমায় দেখে ফোস করে উঠে। তারপর কি যেন ভেবে মাথা ঘুড়িয়ে ঘাসের বনে হারিয়ে গেল।

মা বলেন, বাচ্চারা হলো মাসুম। তাদের সাথে আল্লাহর ফেরেশতা থাকে। ফেরেশতারা বাচ্চাদের আগলে রাখে। তাদের কোন ক্ষতি হতে দেয় না।

একদিন মাকে সাপের কথাটা বলেছিলাম। ভয়ে তার গা কাপতে থাকে। প্রথমে আফসোস করছিলাম কেন বে-আক্কেলের মতো গোপন কথাটা জানিয়ে দিলাম। নির্ঘাত বকা শুনতে হবে। আমাকে অবাক করে দিয়ে বকা দেন নাই, অনেকণ বুকে জড়িয়ে ধরে রেখে ছিলেন। তখন মায়ের বুকে ছিল অন্যরকম উম। এখনো সেই কথা ভাবলে সাপটাকে শুকরিয়া জানাই।

আমি কৈফিয়ত দিই , ছোটদের সাথে ফেরেশতা থাকে। তাই সাপ তাদের কামড়ায় না।

বুবু বলে উঠেন, আসলে সাপটার অনেকগুলো বাচ্চা আছে, তাই সে অন্যের বাচ্চাকে কামড়ায় নাই। মা তো, বুকভরা রহম। বড় কেউ হইলে ঠিকই কামড় দিতো। আবার কিছু আছে যেগুলো সাপ না, জিন। দুষ্টু জিন। সাপের বেশ ধরে থাকে। তাদের সামনে পড়লে তেড়ে এসে কামড় দিত।

আমার হাসি পায়, সাপের বুকভর্তি রহম। এটা কেমন কথা।

মা বুবুকে বলেন, তুই এত কিছু কেমনে জানিস?

বুবু বলেন, আমি সাপের বাচ্চাগুলো দেখেছি।

আমি আর মা তো অবাক। মা বোধহয় ভয়ে কোন কথা বলতে পারেন নাই।

দুপুরবেলায় মা তার ইস্কুলে থাকতেন । যেদিন মা বাড়ি থাকতেন তাকে ফাকি দিলেও বুবুকে ফাকি দেয়া কঠিন। আমি বিছানা ছেড়ে উঠলে সে কেমনে যেন টের পেত। সাথে সাথে বলত, মা কে বলে দেবো।

মা এমনি খুব আদর করে। কিন্তু দুপুরবেলায় ঘুমানো আর সন্ধ্যায় পড়তে বসা নিয়ে খুব কড়া। এই দুটো জিনিস তার কাছে ছিল ভালো। আমার খুবই অপছন্দের। তারপরও মাঝে মাঝে ফাকি দিতাম। কিন্তু সেই যে বলছিলাম বুবুকে ফাকি দেয়া কঠিন। আমার মনে হতো বুবুর ঘ্রাণ শক্তি প্রখর।

বুবু একদিন বলছিল, খোকন তোর গা থেকে ফুলের মত সুন্দর সুবাস বের হয়। সে গন্ধ শুকে আমি অনেক দূর থেকে হাজির হই।

আমি রেগে গিয়ে বলি, কচু তুমিই ঘুমাইতে যাও।

বুবু বলেন, বড়দের ঘুমাইতে নাই। ঘুমাইলে অলস হইয়া যায়।

আমি বলি, তাহলে আমাকে ঘুমাইতে বল কেন? আবার সবসময় আলসে আলসে কর।

বুবু বলেন, দুপুরে ঘুমালে বাচ্চারা অলস হয় না। তাদের বুদ্ধি বাড়ে।

বুদ্ধি বাড়ে কিনা জানি না। মাঝে মাঝে বুবুকেও ফাকি দিতাম। আবার মনে হত বুবু নিজেই আমাকে ফাকি দেয়ার সুযোগ দিতেন। ঘর থেকে বের হতে খুব বেশী কসরত করতে হতো না। চট করে পুকুর পাড়ে চলে আসতাম। অথবা কোন গাছের মগডালে উঠে বসে থাকতাম। তখন মনে হইত বুবু ভুল বলেছে। আসলে দুপুরে না ঘুমাইলেই বুদ্ধি বাড়ে। আর দিন দিন বুবুর নাকটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কি সুন্দর, বুবু আর মা’কে ফাকি দিলাম। নিজের এই গুনে নিজেই খুব মুগ্ধ হতাম।

একদিন বুবুকে বলে ফেললাম, তুমি বলো না ঘুমাইলে বুদ্ধি কমে যায়, আজকে দুপুরে যে বাহির হয়েছিলাম তুমি তো টের পাও নাই।

বুবু কেমন ভাবে যেন আমার দিকে তাকায়। তাকে অপরাধীর মত লাগে। মনে হচ্ছিল, একটা অপরাধ করে ধরা পড়ে গেল।

বুবু কেমন যেন অস্বস্থি নিয়ে বলে, দুপুর বেলায় তুই কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়াস?

আমি অনেক কিছু বলি। কিন্তু ঘাটলার কথা বলি না। পুকুর পাড়ে যাওয়ায় নিষেধ। বছরখানেক আগে একবার পুকুরে ডুবে মরমর অবস্থা হয়েছিল।

বুবু আমাকে কেমন কোমল হয়ে বলতে থাকে, কেন মায়ের কথা শুনতে হয়। বাচ্চাদের সবসময় লক্ষী থাকতে হয়। তা নাহলে গুনাহ হয়। এই কথা বলতে গিয়ে বুবুর মুখটা কেমন যেন ম্লান হয়ে উঠে। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রই। বুবু নিরবে কাদতে থাকে। ওড়না দিয়ে চোখ মোছে।

কিছু বলতে পারি না। বুবুকে জড়িয়ে ধরি। বুবু আমাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে কাদতে থাকে।

বলে, কখনো মায়ের অবাধ্য হবি না। মা আমাদের জন্য কত কষ্ট করে। আমরা যদি তার কথা না শুনি। মা খুব কষ্ট পাবেরে।

আমি কিছু বলি না। অবাক হই। বুবুকে কখনো এইভাবে কাদতে দেখিনি। বুবু এক সময় নিজেকে সামলে নেন।

তারপর বলেন, খোকন আজকের কথাকে মাকে বলিস না।

মাঝে মাঝে মেঘগুলোকে মনে হয় ভেলা। আর আকাশ হলো মস্ত বড়ো পুকুর। আর আমি সেই ভেলাগুলোর মালিক।

বুবু বলতেন, তোর মেঘের ভেলায় আমাকে নিবি।

যদিও কাউকে নিতে ইচ্ছে করে না। আমার আপন রাজত্বে।

তারপরও বললাম, তোমাকে নেবো। আর আম্মুকে নেবো।

বুবু বলে, আরেকজনকে নিবি।

আমি বলি, কে?

বুবু একটু চুপ থেকে বলে, কেউ না। এমনি বললাম।

মেঘের ভেলায়.

সেইবার খুব গরম পড়েছিল। কোথাও একরত্তি হাওয়া নেই। গাছের পাতা পর্যন্ত নড়ে না এমন অবস্থা। আমাদের পুকুরটা প্রায় শুকিয়ে গেছে। মাছরাঙাগুলো নিরুদ্দেশ হয়েছে। আম গাছের কাকাগুলো সবসময় বিরক্তিতে কা-কা করত। দুপুরটা খুবই খারাপ কাটত।

মা বলতেন, এইবার গরমে অনেক মানুষ মরবে।

এমনই একদিন বিকেলে বুবু আর মায়ের মধ্যে প্রচন্ড ঝগড়া। তারপর সন্ধ্যার সময় অনেকণ বুবুকে কোথায় দেখা যাচ্ছিল না। মা কি যেন খুজছিলেন। বুবুর বিছানা উল্টিয়ে, ট্রাংক খুলে সবই লন্ড-ভন্ড। হাতে একগাদা কাগজ নিয়ে মা থম মেরে বসে আছেন। আর দরদর করে ঘামছেন। আমি হাতে পাখা নিয়ে মায়ের পাশে দাড়ালাম।

মা বললেন, খোকন তুই এই ঘর থেকে যা।

আমি বের হয়ে যাচ্ছিলাম। মা ডাকলেন।

বুবুকে নিয়ে নানা কথা জিজ্ঞেস করলেন। বুবু কোথায় যায়, কার সাথে কথা বলে ইত্যাদী ইত্যাদী। আমি ভয়ে ভয়ে বললাম কিছুই জানি না। মনে হচ্ছিল অনেক কিছুই জানা উচিত ছিল। খুব ভয় পেয়েছিলাম। কেন জানি না, মনে হচ্ছিল আজ এমন কিছু ঘটবে, যা আমাদের শান্ত নিস্তরঙ্গ জীবনকে আমূল বদলে দেবে।

এরপর মা বোধহয় ঘুমিয়ে পড়ছিলেন। মা অবেলায় ঘুমান না। তিনি আমায় বললেন, যা রুম্মানের সাথে পড়তে বস। বই খাতা নিয়ে পাশের বাড়ি গেলাম। কিছুটা হাফ ছেড়ে বাচলাম।

রাতে বুবু আমায় নিতে এলেন।

বললাম, আজ কোথায় গিয়েছিলে?

বুবু কি যেন বলল বুঝতে পারলাম না। রাতের বেলায় সবাই একসাথে খেলাম। মা’র কি একটা কথায় বুবু হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ল। মাকে খুব স্বাভাবিক দেখাচ্ছিল।

মধ্যরাতকে কি ভর দুপুরের সাথে তুলনা করা যায়? যায় বোধ হয়। দুপুরের মতো মধ্যরাতও রহস্যময়। একদম আলাদা। মাঝে মাঝে খোলা জানালা দিয়ে দেখি চাদের আলোতে মেঘের ভেলা ভেসে ভেসে অসীমে মিলিয়ে যাচ্ছে। মেঘগুলোকে খুব অচেনা মনে হয়। কেমন জানি লাগে। মেঘের দিকে তাকালে মনে হয় কে যেন হাত দিয়ে মাথার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে। বলছে আয় আয়, দূরে কোথাও চল। জানালার শিকগুলো বলত যেন এটা একটা জেলখানা। অনেক দূরে পালাতে ইচ্ছে করত। মন চাইত মেঘকে নিজের সবগুলা ইচ্ছের কথা বলি। ঠিক যেন দুপুরের বিপরীত। রাত হয়তো সবকিছুকে নিস্তদ্ধ করে দেয় বলে, আমার মন চাইত অনেক অনেক কোলাহল।

বুবু মাকে জড়িয়ে ধরে বলছিলেন, মা আমায় ক্ষমা করে দাও।

কেন যেন ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল। একটা কাক ডেকে উঠে।

মা একবার বলেছিলেন, কাক খুব ব্যস্ত পাখি। সারাদিন দৌড়ের উপর থাকে। তাই রাতে আরাম করে ঘুমায়।

এই কাকটা বোধহয় ঘুমের নিয়ম ভুলে গেছে। আমি কান্নার শব্দে মায়ের ঘরের সামনে দাড়ায়। জানালা দিয়ে কি চমৎকার হওয়া দিচ্ছে। পর্দাগুলো ফুলে ফুলে উঠছে। তার ফাক দিকে মিষ্টি বাতাস আসছে। আমার কিছুই শুনতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় হওয়ার রাজ্যে ফুলের সুবাসের সাথে উড়ে উড়ে দূরে কোথাও চলে যাই।

বুবু বলছিল, মা বিশ্বাস কর। যা করছি ভুল করেছি। মা আমি কখনো তোমার অবাধ্য হবো না।

মা কি বললেন বুঝা গেল না। তিনি যে কাদছিলেন বুঝতে পারছিলাম।

আমি হওয়াকে বললাম, যা জোরে ছুটে যা। আমাকে একখানা মেঘের ভেলা এনে দে। সেই ভেলায় মা আর বুবুকে ছড়িয়ে আমি অনেক দূরে কোথাও নিয়ে যাবো। সাত সমুদ্দুর তের নদী পেরিয়ে আরো দূরে, আমি নাবিক সিনবাদ। সেখানে মা আর বুবু কখনো কাদবে না। সবাই মিলে সারাক্ষণ মজা করব।

কিরে খোকন, এইখানে দাড়িয়ে কি করছিস?

মায়ের কথায় আমি সম্বিত ফিরে পাই। সেদিন রাতে মা’কে মাঝখানে রেখে দুই ভাই-বোন ঘুমালাম। স্বপ্নে দেখছিলাম বুবু আর মা’কে নিয়ে মেঘের ভেলায় চড়েছি। মৃদৃ হওয়ায় ভেলাখানা তরতর করে ভাসছে। মা যেন কি বললেন আর বুবু খিলখিল করে হেসে উঠলেন। আমার কি এতো কথা শুনার সময় আছে। আমি এই ভেলার নাবিক। আমার হাতে কত কিছু নির্ভর করছে। মা আবার বুবুকে কি যেন বললেন। এইবারও শুনতে পেলাম না। বুবু আবার খিলখিল করে হাসেন।

এক সময় মা আর বুবু ঘুমিয়ে পড়লেন। আর আমি একা একা নির্ঘুম, চলছিলাম মেঘের দেশে। জানি না, কখন যে বুবু ছিটকে পড়লেন দূরে কোথাও।

মা চিৎকার করেই চলছেন, খোকন ভেলা থামা। খোকন ও খোকন।

আমি তখনও স্বপ্নের ঘোরে ভেলায় চলছি। এই ভেলায় ইচ্ছে পূরণের জিয়ন কাঠি। মা’র ডাক শুনতে পাইনি।

না। মায়ের চোখে জল ছিল না। মা একদম নিশ্চুপ হয়ে গেলেন।

আমি চিঠিখানা কয়েক লাইন পড়েছিলাম। বুবু লিখেছিলেনৃ মা আমাকে মা করে দিও। আমি তাকে ছাড়া বাচব না। ৃ কি অদ্ভুত কথা। আমি বুঝতে পারছিলাম না বুবু কাকে ছাড়া বাচবে না। মাকে জিজ্ঞেস করতে গিয়ে থমকে যাই।

আমার মায়ের সহ্য করার অদ্ভুত ক্ষমতা। আমি মা’কে নিয়ে ভাবতে গিয়ে অবাক হই মাঝে মাঝে। মা’র তুলনা মেলে দুপুর বেলার নির্লিপ্ততার সাথে। কত দুঃখ-কষ্ট তাকে জড়িয়ে ছিল। সবকিছু দুপুরের স্তব্ধতার মতো বুকে ধারণ করে নিতেন। উছলে পড়া জীবন। বুবু চলে যাওয়ার পর সেই মা পাথর হয়ে গেলেন। সকাল বেলায় ইসকুলে হাজিরা দেয়া আর বাকি সময় একমনে ঘরের কাজ করতেন। এই কাজ সেই কাজে ব্যস্ত থাকতেন। আরো সাথে মিশতেন না। পাড়া প্রতিবেশী আফসোস করে বলত, আহারে শোকে পাথর হয়ে গেছে। এতো কষ্ট মানুষের জীবনে সহ্য হয়।

ঘর-বাইরে, গ্রামের বাজার-ইসকুল-পথে-ঘাটে বুবুর কেলেংকারি নিয়ে নানা কাহিনী শুনা যেত। কেউ বলত বুবুকে থানা শহরে দেখেছে আবার কেউ বলত না না অন্য কোথাও বুবুকে দেখা গেছে। কিন্তু মা’র কোন রা নেই। অনেকে বলত, আর কতদিন। বুবু ঠিকই মা’র কাছে ফিরে এসে মা চাইবে। মায়ের রাগ বেশি দিন থাকে না। বুবুর উপর আমার অভিমান ছিল। সেই অভিমান জানাতেই তার অপেক্ষায় ছিলাম। আবার মনে হত সে যদি ফিরে আসে সবকিছু আবার আগের মত হয়ে যাবে। কিন্তু কখনো মা’কে মুখ ফুটে সেই কথা বলতে পারতাম না। মায়ের মনে কি ছিল, সেটা কখনো বুঝতে পারিনি। বুকের ভেতর কষ্ট নিয়ে একটা কবিতা পড়তাম, বাশ বাগানের মাথার উপর চাদ উঠেছে ওই, মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই।

মা একদিন বললেন, অন্য ক্লাসের কবিতা আর কতদিন পড়বি। নিজের পড়া পড়।

সেই বার যেমন গরম পড়েছিল, তেমনি বর্ষা এসেছিল ঝাপিয়ে। রাত-দিন বৃষ্টি আর বৃষ্টি। থামার কোন লক্ষণ নাই। সারাদিন ঘরে বসে থাকা। জানালার ধারে বসে বৃষ্টি দেখি। এক সময় খুবই বিরক্ত হই। শুয়ে থাকি। আবার উঠে বসি।

সেই বর্ষায় একদিন মা বললেন, খোকন।

জি মা।

যা, বৃষ্টিতে ভিজে আয়।

মা বলতেন, বৃষ্টি হলো খোদার নেয়ামত। খোদার নেয়ামত ভোগ করতে হয়। আর বলতে হয় শোকরিয়া। মা’র চোখ যেন ছলছল করছিল। আমার বুবু কথা মনে পড়ে। আমরা দুই ভাই-বোন বৃষ্টিতে ভিজতাম। উঠতে চাইতাম না। এক এক সময় বেত নিয়ে মা উঠোনে নামতেন। আর আমরা মায়ের সাথে দুষ্টুমী করতাম। মা বেত ফেলে আমাদের সাথে ভিজতেন। মা’কে মনে হতো মুক্ত পাখি। আমরা তার ছানা।

বৃষ্টি থেমে গেল আমরা কয়েকজন মিলে কলার ভেলা বানাতে যায়।

সেদিন বিকেলে আবার অঝোর বৃষ্টি শুরু হয়। যেন দুনিয়া ভাসিয়ে নেবে। আমাদের মধ্যে কে যেন বলল, নুহের বন্যা।

আরেক জন বলল, আমাদের কোন সমস্যা নাই। আমরা ভেলা বানিয়ে রেখেছি। যেখানে খুশি চলে যেতে পারব।

সেই সন্ধ্যায় বুবু এসে উপস্থিত। বুবু কখন এসেছিলেন জানি না। বোধ করি অনেকণ ঘরের বাইরে দাড়িয়ে ছিলেন। ঘরে ঢুকার সাহস পাচ্ছিলেন না। মা দরজাটা ভালো করে লাগাতে গিয়ে খেয়াল করলেন বাইরে কে যেন দাড়িয়ে আছে।

মা হারিকেনটা উচু করে বলেন, কে?

কেউ জবাব দেয় না। মা আবার বললেন, কে?

বুবু এসে মা’কে জড়িয়ে ধরে। মা নিজেকে ছাড়িয়ে নেন।

না, সে বর্ষায় বুবুর সাথে বৃষ্টিতে ভিজা হয়নি। আসলে কখনো হয়নি। বুবু নিজেও চুপচাপ হয়ে গেলেন। বোধহয় সারারাত জেগে থাকতেন। চোখের নিচে অমোচনীয় কালির দাগ। মা এক সময় নরম হয়ে আসেন। বুবুর সাথে নানা কথা বলেন। সংসারের গল্প করেন। কিন্তু বুবু – অস্বাভাবিক রকম চুপ। দিনের বেশীরভাগ সময় ঘাটলায় বসে থাকতেন। মাঝে মাঝে বিড়বিড় করে কি যেন বলতেন। হা, বাড়ি পালিয়ে যাওয়া থেকে ফিরে আসা তক বুবুর একটা গল্প ছিলো। সেই গল্প এখানে বলা নিস্প্রয়োজন। আজ আমি সহজেই বুঝতে পারি কি ঘটেছিল বা কি ঘটতে পারে। লোকজন নানা কথা বললেও মা বোধহয় কখনো জানতে চাননি কি ঘটেছিল। তার একটা কথা বেশ মনে পড়ে। তিনি বলতেন, অতীতই সব নয়।

তারপর একদিন লালজামা গায়ে বুবু নিজেকে জলে ভাসিয়ে দিলেন। চিরকালের মতো। আমি ভাবতাম বুবু মেঘের দেশে চলে গিয়েছিলেন। আমি জানলার ফাক দিয়ে দেখে যে মেঘের ভেলা দেখে আফসোস করতাম, সেই দেশে। কখনো কখনো ঘুমের ঘোরে বুবুকে বলতাম, তুমি একা একা ভেলা নিয়ে চলছ। কষ্ট হয় না। বুবু কিছু বলেন না। তাকে দেখে বুঝতে পারি না কেমন আছে। মেঘের দেশটা কেমন। একসময় চোখের আড়ালে হারিয়ে যান। এই নিয়ে আমি বেশ ছিলাম।

…আর মা। এইবারও এতটুকু কাদেন নাই। শুধু ফ্যালফ্যাল করে সব হারানো দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে ছিলেন দূরে কোথাও।

>গল্পে ব্যবহৃত ছবিটি লেআউট পার্কস থেকে নেয়া।।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *