সুন্দরবনে ব্যথার সঙ্গে যুগলবন্দি

ব্যর্থ এক সার্জারি নিয়ে ভোগান্তির কাহিনি এটা। যার মূল পর্ব শুরু ২০২০ সালের জানুয়ারিতে, এখনো চলমান। এখন একটা সিনেমাটিক ক্লাইমেক্সে দাঁড়ায়া আছে। তবে সেই গল্পে দুর্ধর্ষ কোনো অ্যাখ্যান নাই, বিরাট কোনো বাঁক-বদল নাই। অনেক বিরক্তিকর দীর্ঘশ্বাস আছে। কিন্তু এ গল্প আমার খুবই কাছের, আমার বর্তমান। আমার স্বজনদের জন্য পরীক্ষার, আমাকে ভালোবাসার। সেই গল্পটা আমার বন্ধুদের জানাতে চাই, অন্তত এক অধ্যায়ের সমাপ্তির আগে আগে।  অবশ্য পুরো গল্পটা এভাবে শেয়ার করা সম্ভব কিনা আমার জানা নাই। এখন পর্যন্ত সব হাসপাতাল ও চিকিৎসকের নাম বদলে দেওয়া।)

আগের পর্ব: একঅসুখের দিনদুইবাবা আর আমি পাশাপাশিতিনঅপারেশন টেবিলের ঝাপসা দুনিয়াচারবাসায় ফেরার আনন্দপাঁচ. ঘুম ভেঙে দেখি শরীরজুড়ে রক্তছয়লজ্জা ভুলে কেঁদে উঠলাম হাসপাতালে, সাত. অপারেশন টেবিলে মৃত্যু নিয়ে রসিকতা, আট. হাসপাতালের বিল থেকে অর্ধেকের বেশি টাকা গায়েব, নয়. হোমিওপ্যাথির ডাক্তার বললেন, আপনি কি ক্ষমা করতে পারেন?

সুন্দরবন, ডিসেম্বর ২০২০/ নামলিপি নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

অক্টোবরের শেষ দিকে একদিন ফোন করল মিশু। একটু রহস্য করে কথা-টথা বলল। পরে বিষয়টা জানা গেল, ঢাকায় বদলি হয়ে চলে এসেছে। আফসোস হইলো, আহা বগুড়া ট্যুর সমাপ্ত রয়ে গেল। এরপর ওর সঙ্গে দেখা হলো। আমি বাড়ি যাওয়ার জন্য টিটি পাড়ায় গেছি। মিশু বাস কাউন্টারে হাজির হলো। ওকে দেখে জড়ায়া ধরলাম। বাস ছাড়ার বেশি সময় ছিল না। দ্রুত বিদায় নিতে হলো। তখনো তো জানার উপায় ছিল না, ওর ঢাকায় আসাটা ছিল আল্লাহর রহমত। এবার চট্টগ্রামে ফিরে আসি। ২০ নভেম্বরে।

বেশ আনন্দময় একটা সন্ধ্যা। আটটা নাগাদ দামপাড়া পৌঁছে গেলাম। সোহাগ পরিবহনের কাউন্টারে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। ঠাণ্ডা ও আরামদায়ক আবহাওয়ায় হাঁটতে হাঁটতে জিসি মোড়ে গেলাম। ওখানেই একটা রেস্টুরেন্টে শোয়েব-বীথির রিসেপশন। নিচে দাউদ, মোনায়েম, স্বদেশসহ কয়েকজন অপেক্ষা করছিল। ওদের দেখে খুবই ভালো লাগছিল, অনেকদিন পর চট্টগ্রামে আসলাম। আসলে বাস থেকে নেমেই মুক্তির একটা অনুভূতি হলো। ‘মুক্তি’ নিয়ে যদি ভাবি, সেটা হয়তো এমন কিছু যেটা আসলে অনেক কিছু করার চেয়ে খানিকটা স্বস্তি; নিজেকে চাপমুক্ত বা হালকা মনে করতে পারা। ওদের সঙ্গে কিছুটা সময় গল্প করলাম। যার অনেকটাই ছিল অসুখ-বিসুখ নিয়ে। চিপস খেতে খেতে গল্প করছিলাম। কোক খাইছিলাম বোধহয়। এরপর বিয়েতে এটেনন্ড করলাম। সেখান মাসউদ, সাদিয়া, শাফাকের সঙ্গে দেখা। চট্টগ্রামের বিয়ে বলে কথা, আয়োজন তো একটু ভারি হবেই।

২০১২ সালে আমি আর দাউদ হালিশহরে চৌচালা সৈকতে ঘুরতে গেছিলাম। শহর থকে কাছেই। যেখান থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত যাওয়া যায়। দ্বিতীয়বার যাই ২০১৭। ওই জায়গাকে আমরা দইজ্যার কূল বলি। এবারের ট্যুর একদিনের হলেও দইজ্যার কূল ছিল পরিকল্পনার অংশ। কিন্তু হতাশ হবো, এমন কিছু মাথার মধ্যে আসে নাই। শেষবার যখন গেছিলাম তখন পোর্টমুখী মেরিন ড্রাইভ তৈরির বিরাট আয়োজন চলছিল। এবার গিয়ে দেখি সড়ক পুরোপুরি প্রস্তুত। আগের ছায়া মোড়ানো বাধের কোনো চিহ্নই নেই। সূর্য তাপ ও চাপ পুরোপুরি ঢেলে দিচ্ছে। কড়া গ্রীষ্মে এখানে কী অবস্থা হয় আল্লাহ জানেন।

এটা একটা বড়সড় ধাক্কা ছিল। নৌবাহিনী ও সেনাবাহিনীর তত্ত্বাধানে এখানে কনটেইনার টার্মিনাল হচ্ছে। আগের রাস্তাগুলো বন্ধ বা হারিয়ে গেছে। তাই সমুদ্র পাড়ে যাওয়া হলো না। খানিকক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে ফিরলাম দাউদের বাসায়, সঙ্গে ছিলেন হাসান ভাই। পথে মেরিনা তাবাসসুমের ডিজাইন করা একটা মসজিদ দেখে আসলাম। যেখানে রয়েছে ১৭৯৫ সালে স্থাপিত আসগর আলী চৌধুরী মসজিদ; পুরোনো মসজিদটা আগেও দেখেছিলাম। এখন নতুনটার কারণে ওইটা বন্ধ। নামাজ পড়লাম।

ঘোরাঘুরি শেষে দাউদের বাসায় ফিরে খাওয়া-দাওয়ার পর কেউ শুয়ে কেউ বসে গল্প করছিলাম। এর মাঝে টের পেলাম কিছু একটা ঘটতে শুরু করেছে। পেটে। নাভির আশপাশে ব্যথাটা শুরু হলো আস্তে আস্তে। এরপর ছড়াতে শুরু করলো। অস্বস্তিটা দাউদ আর হাসান ভাইকে জানালাম। দাউদ গরম পানি এনে দিলে আস্তে আস্তে পান করলাম। ওর পরামর্মে নামাজে বসার মতো ভঙ্গি বসে রইলাম। ব্যথা অনেকক্ষণ নাভির চারপাশে জমা থাকলো, এক সময় আস্তে আস্তে সরে গিয়ে ডান বুকের হাড়ের নিচে এলো। সেখানে স্থির হয়ে রইলো। নিশো ভাইকে বিষয়টা জানালাম।

সেদিন সন্ধ্যায় চকবাজারে দীর্ঘ সময় ধরে আমরা কথা বললাম। ৩০-৪০ মিনিটের ভেতর তিনি আমার পুরো হিস্ট্রি জেনে নিলেন। নানান ধরনের উপদেশ দিলেন। ব্যাপারগুলো যেহেতু লাইফস্টাইলের সঙ্গে সম্পর্কিত, এবং নিজের লাইফস্টাইল নিয়ে অসন্তুষ্টি ছিল, ফলত উনার কথাগুলো মানতে সমস্যা নাই। আর হোমিওপ্যাথিতে ভেতর থেকে কিউর করার একটা ব্যাপার আছে মনে হয়। নিশো ভাই সম্ভবত এর সঙ্গে উপমহাদেশীয় জীবনধারার একটা ব্লেন্ড করেছেন। সব মিলিয়ে একটা ইতিবাচক ভাইব পেলাম। আপারও কিছু ঝামেলা ছিল, ওনার সঙ্গে নিশো ভাইয়ের লম্বা সময় কথা হলো। পরের সপ্তাহে আমাদের জন্য ওষুধ পাঠানোর কথা।

এর মাঝে একদিন ঢাকার একটা নামি হাসপাতালে গেলাম। আমি অবশ্য ভেতরে গেলাম না। রাশেদ, মোস্তফা ভাই ও অন্যরা গেলেন। আমাদের বন্ধু মামুনের বাইপাস সার্জারি হয়েছে। এ নিয়ে ওর বন্ধুরা খুবই বকাবকি করছিল। ঘটনা একটু অদ্ভুতই। উনি ভর্তি হয়েছিলেন রিং পরানোর জন্য, কিন্তু সার্জারির সময় রিং নাকি আটকে গেছে তাই বাসপাস করাতে হলো। অথচ হার্ট ফাউন্ডেশনের চিকিৎসক রিং পরাতেই মানা করছিলেন না। নামি এই হাসপাতালে আসার পর রিং পরার পরামর্শ দেয়। পরে এ নামি হাসপাতাল তার এনজিওগ্রামের সিডি দিতে অস্বীকার করে। ফলে পুরো বিষয়টি অস্পষ্ট থেকে যায়। পরে আমিও এই হাসপাতালে ডাক্তার দেখাত এসেছিলাম। তবে এখানে সার্জারি করাতে রাজি নাই। সে কথা সামনে হবে।

ঢাকায় ফেরার কয়েক দিন পর নিশো ভাইয়ের ওষুধ এলো। নভেম্বরের শেষ দিক থেকে শরীরে নতুন এই অস্বস্তি শুরু। কোনো কোনো দিন পেটের নিচ দিকে হঠাৎ করে ব্যথা শুরু হতো। তারপর নাভির চারপাশে গিয়ে স্থির হতো। শেষে ডান বুকের হাড়ের নিচে জেগে থাকতো। তবে খুব বেশি সমস্যা মনে হতো এমন না। কিন্তু কিছুদিন পরপর বিপাক প্রক্রিয়ায় ভীষণ সমস্যা হতো। যা চার-পাঁচদিন কষ্ট দিতো। এমন একটা পরিস্থিতিতে কোথাও যাওয়াটা আমার জন্য ভীষণ ঝামেলার হয়ে গেল।

আমি আর শাহনেওয়াজ খান দেশের মোটামুটি ত্রিশটা জেলা একসঙ্গে ঘুরেছি। অনেকদিন ধরে সুন্দরবন যাওয়ার কথা বলছিল ও। ডিসেম্বরের শুরুর দিকে আরেক দফা সেই প্রস্তাব দিল। বলল, জানি এ মুহূর্তে আপনার কাছে টাকা থাকার কথা না। সব খরচ আমি দিচ্ছি। যদি অবস্থা ভালো হয়, তবে ফেরত দিয়েন।

ডিমের চর, সুন্দরবন

আমারও সুন্দরবন ঘোরার ইচ্ছা অনেকদিন। সেই মাস্টার্স টুরে বন্ধু ও টিচারদের সঙ্গে গেছিলাম। তবে দীর্ঘ একটা সফরের ছোট্ট একটা অংশ ছিল এটা, একদিনের। তাই সুন্দরবনকে আরও গভীর থেকে দেখার ইচ্ছা ছিল। শাহনেওয়াজ সুন্দরবনের টুর অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ করে সব ফিক্সড করে ফেলল। ১৬ ডিসেম্বর থেকে পরের দুদিন।  কিন্তু সময়টা একটু গোলমেলে হয়ে গেল। আমার নোয়াখালী যাওয়ার ডেটের সঙ্গে মেলানো কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। এর মাঝে ছোটবোন অসুস্থ হয়ে পড়ায় যাওয়াটা প্রায় বাদ পড়ে যাচ্ছিল। ঠিক আগের দিন ও ঢাকায় আসলো। অবস্থা খানিকটা ভালো মনে হওয়ায় ১৫ ডিসেম্বর রাতে বাসে উঠতে রওনা দিলাম উত্তরা থেকে।

সুন্দরবন ভ্রমণ আমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কষ্টকর একটা লম্বা সময়ের পর প্রায় চারদিনের জন্য পরিচিত সবকিছু থেকে দূরে থাকা যাবে। সুন্দরবন এলাকায় নেটওয়ার্ক থাকে না প্রায়। ১৫ ডিসেম্বর রাত ১০টার দিকে দেশ ট্রাভেলসের গাড়ি। যেহেতু ওই সময় নদীতে বেশ কুয়াশা পড়ে। তাই রাত ১২টার পর ফেরি বন্ধ হয়ে যায়, এ কারণে সরাসরি মংলার গাড়িতে যায় নাই। এসি গাড়িগুলো নাকি ভিআইপি ফেরি ধরে। আবার আমাদের সকাল সকাল মংলায় গিয়ে জাহাজ ধরতে হবে। আমরা মংলার গাড়ি না ধরে খুলনার গাড়ি ধরলাম। এটাই ছিল ভুল। ১৫ ডিসেম্বর মঙ্গলবার ছিল। পরদিন বুধবার ছুটি। আর বৃহস্পতিবার ছুটি নিলেই টানা চারদিন ছুটি। সেটাই হলো। রাস্তায় প্রচন্ড জ্যাম।

উত্তরা থেকে গাড়ি ছাড়তে ছাড়তে রাত ১২টার মতো। আর কোথায় ভিআইপি ফেরি? সারারাত ঘাটে বসে থেকে যখন ফেরি উঠলাম তখন মোটামুটি আটটার বেশি বাজে। টুর অপারেটরের কর্তা ফোন দেওয়া শুরু করলেন। তার সঙ্গে শাহনেওয়াজের ভালো খাতির হয়ে গেছিলো। এছাড়া ওর একজন ফেসবুক ফ্রেন্ড মংলায় আছে নেভিতে। তার সঙ্গে টুর অপারেটরের পরিচয়। যাই হোক, উনারা বললেন, যথাসাধ্য দেরিতে জাহাজ ছাড়ার চেষ্টা করবেন। কিন্তু আমরা তো সরাসরি মংলা যাচ্ছি না, তাই বিষয়টা গোলমেলে হয়ে গেলো। বাসে উঠে দেখা গেলো, আরও কয়েকজন একই সমস্যায় পড়েছেন। তাদেরও জাহাজ ছেড়ে দিচ্ছে।

একটা অনিশ্চিত ব্যাপারের মধ্য দিয়ে চলছি। গাড়ি যেন চলেই না। উপভোগের মেজাজই নষ্ট হয়ে গেল। সারাক্ষণ বুকের মধ্যে যেন হাতুড়ির বাড়ি পড়ছিল। একেকটা মিনিট অনেক লম্বা। এ দিকে ড্রাইভারও লোকজনের গালি শুনতেছিল। একেকজন পড়েছিল একেক সমস্যায়। দুপুর একটার কাছাকাছি সময়ে খুলনায় পৌঁছলাম। সকালে ছোট একটা ফেরিতে গাড়ি দাড়িয়েছিল, যেখানে খাবার কিছু ছিল না। খুলনা নেমেও দ্রুত খালিশপুরের বাস ধরার তাড়া। প্রথমে একটা বাসে সিট নিয়ে বসে পড়লেও পরে আরেকটা চলন্ত বাসে গিয়ে উঠলাম। এখান থেকে মিনিট ৩০-৪০ এর মতো দাঁড়িয়েই যেতে হলো, এটা ছিল বাগেরহাটের গাড়ি। খালিশপুর নেমে মোটরসাইকেল ভাড়া করে আবার দৌড়। এ করে মংলা পৌছলাম চারটার দিকে। পশুর নদীর পার হয়ে অন্যপাশে এলাম। টুর অপারেটর ও নৌবাহিনীর ওই ভদ্রলোকের সঙ্গে মিনিট পাঁচেক কথা হলো। তারা একটা কাণ্ড করেছে। সারাদিন জাহাজ যতটা সম্ভব আস্তে আস্তে চলেছে। তারপরও আমরা পৌছতে পারি নাই। তাই শেষ স্থলপথের কাছাকাছি গিয়ে নোঙ্গর করা আছে। কী একটা অবস্থা! তারপর মটরসাইকেলে করে ৩০ মিনিট বা আরও বেশি সময়ের ভ্রমণ। রাস্তায় নতুন কংকর ফেলায় কিছু পথ হাঁটতে হলো। কী যে উত্তেজনাকর সময়। একসময় একটা খালের পাড়ে নামলাম। সেখানে একটা উচু জেটির নিচে নৌকা অপেক্ষা করছিল।

একদম সূর্যাস্তের কাছাকাছি সময়ে খাল পেরিয়ে নদীতে পড়তেই দেখলাম অদূরে ভাসছে জাহাজটা। অদ্ভুত সুন্দর সেই দৃশ্য। নদীর ওপর কুয়াশার হালকা সর ভাসছে। গল্পের যেমন বলে আরকি রাজহংসের মতো জাহাজ ভাসছে। এটা ততটা বিলাসী বা বড় কিছু না। কিন্তু সারাদিনের উৎকণ্ঠার ভেতরে হাত ফসকে যাওয়া জিনিস মিলে যাওয়ার স্বাদ অন্যরকম। নৌকা জাহাজের সঙ্গে বাধতেই আমরা উঠে পড়লাম। একজন এসে দ্রুত খেয়ে নিতে বললেন। আমরা আগে গোসল করে নিলাম। এরপর সারাদিনের মধ্যে প্রথমবারের মতো খেলাম। নদীর বড় মাছ, মুরগী, সবজি আরও কী যেন ছিল। ততক্ষণে জাহাজ চালু হয়ে গেছে। দ্রুত দৌড়াচ্ছে, সূর্য বেশ ওপর থেকে অস্ত গেল। বন আর শীতকাল দুটোরই যে মাখামাখি। আমাদের কারণে যে জাহাজ সারাদিন আস্তে এগিয়েছে এবং মাঝনদীতে ঘণ্টা দুয়েক দাঁড়িয়েছিল এটা কেউ কেউ বুঝতে পেরেছিল। ব্যাপারটা সহজভাবেই নিল।

আমাদের কেবিনের সামনে খোলা ডেক। চেয়ার পাতা আছে। বসে সামনের দৃশ্য বেশ উপভোগ করা যায়। আমবস্যায় চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার, এর ওপর তুমুল বাতাস। খোলা ডেকে বসে থাকা আসলেই কষ্টকর। সন্ধ্যার পরপরই কেবিনে ঢুকে লেপের নিচে চলে গেলাম। এমন আরামদায়ক পরিবেশে আমরা দুজন সারাদিনের ক্লান্তির পর গা ছেড়ে দিলাম। হালকা গল্পগুজব চলছিল। তখন টের পেলাম আস্তে আস্তে একটা ব্যথা জেগে উঠেছে। প্রথমে স্বাভাবিকই মনে হচ্ছিল, সারাদিনের কথা ভেবে। কিন্তু খানিকটা পর অস্বাভাবিক হয়ে উঠল পরিস্থিতি। এপাশ-ওপাশ শুরু করলাম। শাহনেওয়াজ গিয়ে একটু গরম পানি নিয়ে এলো। খেলাম। সেদিন রাতে জাহাজের ওপর বারবিকিউ করা হয়েছিল। মাংস ও মাছ দুটোই ছিল। ডাইনিং থেকে খুব ডাকাডাকি করছিল। কোনোভাবে নান দিয়ে মাছটুকু খেয়ে নিলাম।

জাহাজে মোট ২১ জন পর্যটক। একটা গ্রুপে ছিল ১৪-১৫ জনের মতো। সে দলের নেতা গোছের একজন খুব ঠাট্টা-মশকরা করছিলেন। শুরু থেকেই দেখছিলাম। এমন ভাড়ামি ভালো লাগে না আমার। দেখলাম অসুস্থতার কথা শুনে এ লোকই আগে এগিয়ে এলেন। দুই দফা গরম পানিতে মধু খেয়ে ও লবঙ্গ চিবিয়ে অনেকটা সুস্থির হলাম। এরপর গল্প মোড় নিলেন দুনিয়ার সব অসুস্থতার কথাবার্তায়। একেক জন লোক মোটামুটি গল্পের ডিপো। কেউ বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে বিশ্বাস করেন না। সত্যি বলতে কি আমার বন্ধুদের অনেকে শুরু থেকেই বলছিরেন, ইন্ডিয়ায় গিয়ে অপারেশন করে আসি। কিন্তু তখন শারীরিক অবস্থা ও পাসপোর্ট-ভিসা করার ঝামেলায় মন সায় দিচ্ছিলো না। টাকাও একটা ব্যাপার। এ ছাড়া আমার চিকিৎসক বন্ধুরা বলছিলেন, মামুলি অপারেশনের জন্য ভারতে যাওয়ার মানেই না।

যাই হোক, সেই রাতে অনেকটা সুস্থবোধ করা পর এগারোটার দিকে জাহাজের ডেকে গিয়ে বসলাম। চালকের ঘরের সামনে আরও কয়েকজন ছিল। তারাও একজন উঠে গেল। আমি আর শাহনেওয়াজ বসে থাকলাম। আকাশে চাঁদ নেই, তবে ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে অজস্র তারা। এবং জীবনে প্রথমবারের মতো তারা খসে পড়তে দেখলাম। এত অপূর্ব একটা রাত আমার জন্য দরকার ছিল। অনেক কিছুই তো ভুলে গেছি সেই ভ্রমণের। শুধু মনে আছে ব্যথা আর রাতটির কথা। রাত প্রায় ১টা-২টা চলার পর একটা খালের ভেতর বিশ্রামের জন্য থামলো জাহাজ। যেখানে অন্য জাহাজগুলোও এক হয়েছে। দশটার সঙ্গে সঙ্গে জাহাজের সব আলো নিভে গিয়েছিল, মাঝে মাঝে সার্চ লাইট জ্বলে উঠছিল। তার আলোয় নিসঙ্গ নৌকা চোখে পড়ছিল। হয়তো একা একজন জেলে বসে আছে তাতে।

পরদিন সকাল সকাল একটা দ্বীপে নামলাম। সেখানে শুকরের পাল, হরিণ, বানর এসব দেখলাম। ম্যানগ্রোভের বনের মধ্যে হেঁটে কাদায় মাখামাখি অবস্থা। সূর্য অনেকটা মাথার ওপর উঠতে আমরা জাহাজে হাজির হলাম। নাশতা করে আবার বের হতে হবে। এবার মোটামুটি ১০ কিলোমিটারের হাইকিং। বনের মাঝ দিয়ে পুরো দল হেঁটে যাবে, কচিখালী রেঞ্জে অফিসে। মাঝে থেমে পড়া বা ফিরে আসার সুযোগ নাই। অভিযাত্রীরা হাঁটা শুরু করলে জাহাজও চলতে শুরু করবে। প্রায় তিন-চার ঘণ্টার যাত্রা। নাশতা করে সবাই দ্রুত রেডি হয়ে গেল। আমিও রেডি হয়ে বসে রইলাম বাকিদের অপেক্ষায়। তখনই পেটে ব্যথা জানান দিলো। ইচ্ছা হলো গলা ছেড়ে কাঁদি। আমার চোখের সামনে দিয়ে সবাই বের হয়ে নৌকায় উঠলো। ওয়াশ রুমে গিয়ে হালকা হয়ে গোসল করে ডেকে এসে বসলাম। সেখানে উপস্থিত হলো এক ‘সন্দেহজনক দম্পতি’। যাদের ব্য়সের পার্থক্য, সন্দেহজনক হাবভাব মিলিয়ে অনেকের ধারণা ‘পরকিয়া’। আমি তো মন খারাপ করে বসে আছি। তারা ও চালক বুঝাইতে লাগলেন, না গিয়ে ভালো করছি। এ রোদের ভেতর দশ কিলোমিটার হাঁটার মানে হয় না। এর চেয়ে আরাম করে দুইপাশের তীর দেখতে দেখতে যাওয়া অনেক আনন্দের। এটা আরামের বটে! কিন্তু হাঁটার নেশা তো আমি জানি। একবার উঠলে থামানো যায় না। আমার শঙ্কা হলো, এভাবে যদি হাঁটা-চলা বন্ধ হয়ে যায়, তবে ভবিষ্যতে আমার ঘোরাঘুরির কী হবে। জেমসের একটা গান আছে না, ‘পথের বাপই পথরে মনা, পথের মা-ই মা’। এটা ঠিক একদম নীরবতার মধ্যে সুন্দরবনের অন্যরকম রূপ দেখলাম। উজ্জ্বল ঝকঝকে একটা দিন। কুমির, বানর, হরিণ, নানান ধরনের পাখি। এত এত সবুজ মন খারাপ হয়ে যায় খুব। মাঝি-রাধুনিদের গল্প শুনলাম। সবাই দেখি ঘর পলাতক মানুষ। এক পর্যায়ে তাদের আশ্রয় হয়েছে এ জাহাজ। ঘণ্টা তিন-চারেক পর আমরা ডিমের চরের কাছাকাছি একটা জায়গায় নোঙর করলাম। সেখান থেকে নৌকায় বন অফিসের ঘাটে নামলাম। সুন্দর একটা জেটি। বেশ মিষ্টি রোদ। সেখানে দাঁড়িয়ে বউয়ের জন্য একটা ভিডিও বার্তা রেকর্ড করলাম।

হাঁটতে হাঁটতে চমকে উঠলাম। এঁটোর লোভে কর্মকর্তাদের বাড়ির আশপাশে ঘোরাঘুরি করলে বিশাল বিশাল শুকর। ভেতরে মিঠা পানির পুকুর আছে। যেখানে কর্মচারীরা গোসল করছে। এক কিশোর ঘ্যানঘ্যান করছে। মাত্র কয়েকদিন হয় এখানে আসছে। কিন্তু মন টিকছে না। অন্যরা হাসতেছে। কারণ, তাদেরও মন কেমন করত, এখন ঠিক হয়ে গেছে। সম্ভবত এখানে বিরান জায়গায় টানা একমাস থাকার চাকরি। এরপর চেঞ্জ হয়। আমাদের দলটা আসতে অনেক দেরি করছিল। কাছাকাছি দুরত্বে আসলে ওয়ারলেসে সাড়া পাওয়ার কথা। এতক্ষণে রেঞ্জের মধ্যে চলেও আসার কথা। কিন্তু কোনো খবর নাই। আমি আর জাহাজের চালক তাদের জন্য পুকুর পাড়ে হাটতে হাটতে অপেক্ষা করছিলাম। আর নানা বিষয়ে আলাপ করছিলাম।

একসময় রেঞ্জের মধ্যে তারা আসলেন। খানিকক্ষণ পরই পুকুর পাড়ে পুরো দলটা। কেউ কেউ গোসল করতে নেমে গেল। আমার মন খারাপ হয়ে গেছ। তারা খুব মজা করেছে। সৈকতে মাছ ধরেছে, আরও কী কী যেন করেছে। দুপুরে দারুণ একটা লাঞ্চের পর বেলা গড়াতেই আমরা ডিমের চরে নামলাম। আমি ছাড়া বাকি ছেলেরা ফুটবল খেলল। আমি পুরোটা সময় শুধু হাঁটলাম। খুব মন খারাপ ছিল, কিন্তু এভাবেই ভালো লাগল। সূর্য অস্ত যেতে যেতে সবাই জাহাজে ফিরলাম। ঠাণ্ডা জাহাজের মধ্যে ডেকে চালকের ঘরে সামনে মাগরিবের নামাজ পড়লাম। চারদিন তখন শুনশান। নদীর পানি একদম স্থির। কিছুদূরে একটা জাহাজ নোঙর করে আছে, আলোকিত। আর লাখ লাখ মাইল দূরে চাঁদ, ঠিক মাথার ওপর। স্থির-অপার্থিব এ মুহূর্ত আমি কখনো ভুলবো না। সেদিন রাতেও পেটে ব্যথায় ভুগলাম।

সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত জাহাজ চললো। সকালে নৌকায় করে খালে মাঝে ঘোরাঘুরি হলো। সম্ভবত এর আগের দিন হঠাৎ নেটওয়ার্ক পাওয়া গেল, নিশো ভাইকে ফোন করে ঘটনাটা জানালাম। কথায় কথায় বললাম, বাক্সশুদ্ধ নানা পদের ওষুধের শিশি আনতে গিয়ে অনেকগুলো কিছুটা করে পড়ে গেছে। তখন একটা ভুল বোঝাবুঝি হলো। কারণ, আগেরবার একই সময়ে চার-পাঁচটা ওষুধ খাইছিলাম। ফলে এবারও একটা শিশি শেষ হলে আরেকটা ধরার কোনো বিষয় ছিল না। কিন্তু উনি বারবার বলছেন, আমাকে বলে দিছেন একটা শিশি শেষ হওয়ার পর আরেকটা ধরতে। যদিও আমার এমন কোনো কথা মনে পড়ছিল না। আপাতত ওষুধ বন্ধ রাখতে বললেন। পরে এ সম্পর্কিত অভিযোগ আরেক বন্ধুর কাছে বলছেন শুনে মন খারাপ হইছিল।

তৃতীয়দিন বিকেলে ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে বাস কাউন্টারে আসলাম। সন্ধ্যার আগে কোনো টিকিট নাই। বাসায় রাতে ফিরতে পারবো কিনা ঠিক নাই। তাই ঠিক করলাম, বেশি রাত হলে গাবতলীতে কাউন্টারে বা বাসে রাত কাটাইয়া দিবো। বাসে পর থেকে অস্থির লাগতেছিল। কখন বাড়ি ফিরবো! কিন্তু ফেরি ঘাট তো সহজে আসে না। আমার ভয় সত্যি করে আটটার দিকে হালকা হালকা পেটে ব্যথা শুরু হলো। পেটে খিল দেওয়ার মতো অস্বস্তি নিয়ে বসে রইলাম। গাবতলী পৌঁছাতে পৌঁছাতে দেড়টা কি দুইটার মতো। নেমে দেখি মোবাইলে চার্জ মাত্র ১৫ পারসেন্ট। কোনোভাবে একটা উবারের কারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চার্জ শেষ। বাসায় পৌঁছে শান্তি পেলাম। যদিও ব্যথার কারণে বাকিটা সময় এপাশ-ওপাশ করলাম। যদিও পরদিন সকাল সকাল অফিসে যাওয়ার কথা। সেদিন পত্রিকার বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠান। এক বছর আগেই একইদিন আলিশান আয়োজন থাকলেও কিছু থাকতে পারি না। অনুষ্ঠানের এক সপ্তাহ আগে হাসপাতাল ছাড়ছিলাম। তখন আমার রোগ নির্ণয় হয় নাই। কিছু খেতেও পারতাম না।

সুন্দরবন থেকে ফিরেই ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। কিন্তু যথারীতি কয়েকদিন পর ব্যথা ফিরতো। সন্ধ্যার দিকে হয়তো শুরু হতো। তারপর সারারাত ছটফট করতাম। এভাবে তিন-চারদিন চলে সপ্তাহখানেক বিরতি। কিন্তু যখন ব্যথা উঠতো তখন সন্ধ্যার পর কিছুই খেতে পারতাম না। খেলেই বিপত্তি। এক পর্যায়ে সন্ধ্যার পর পানি জাতীয় খাবারই বেশি খেতাম। হয়তো নয়টা-দশটার দিকে সামান্য ভাত খেতাম। ততদিন নিশো ভাইয়ের ওষুধগুলো আবার খাওয়া শুরু করলাম। প্রথম দিকে বলেছিলেন, সব ওষুধ একইসঙ্গে খাওয়া ঝামেলা কিনা। পরে জানালেন, ভালো করে চেক করেছেন, এর সঙ্গে এখানকার ঝামেলার সম্পর্ক নাই। কিন্তু ঝামেলা তো হচ্ছে, উনার কথার সঙ্গে কানেক্ট করতে পারছিলাম না। নিজের ওপর চূড়ান্ত বিরক্ত অবস্থা।

চলবে …

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *