কান পেতে রই

হিটলারকালের জার্মান কিশোরী লিসেল। অভিনয়ে সোফি ন্যালিস। মার্কাস জুসাকের 'দ্য বুক থিফ' অবলম্বনে নির্মাণ করেছেন ব্রিয়ান পার্সিভল।

হিটলারকালের জার্মান কিশোরী লিসেল। অভিনয়ে সোফি ন্যালিস। মার্কাস জুসাকের ‘দ্য বুক থিফ’ অবলম্বনে নির্মাণ করেছেন ব্রিয়ান পার্সিভল।

অনলাইনে দেখলাম উপন্যাস থেকে সিনেমা হওয়া ‘দ্য বুক থিফ’-এর সংলাপগুলা বেশ মশহুর। সুবিধাই হলো। সংলাপটি পেয়ে গেলাম যেখানে কিশোরী লিসেলকে ইহুদি তরুণ ম্যাক্স বলছে, ‘ওয়ার্ডস আর লাইফ’।

হিটলারকালের জার্মান কিশোরী লিসেল। যাকে দত্তক নেওয়া পরিবার এক ইহুদী তরুণকে (ম্যাক্স) লুকিয়ে রাখে বেজমেন্টে। ম্যাক্সের সঙ্গে গড়ে উঠে লিসেলের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। তখন চলছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

বড়দিনে লিসেলকে একটা ডায়রি উপহার দেয় ম্যাক্স। একসময় ওটা বই ছিল। লেখাগুলো সাদা রঙ দিয়ে মুছে দেওয়া হয়। ম্যাক্স বলে, ‘Write. In my religion we’re taught that every living thing, every leaf, every bird, is only alive because it contains the secret word for life. That’s the only difference between us and a lump of clay. A word. Words are life, Liesel.’

মানুষ ও জড়ের পার্থক্য যে জায়গায়— শব্দ! এমনটা শুনলে বলতে, বুঝতে ও শুনতে পারার বিষয়টা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায়। শব্দের গোপন বিষয়াদি ধরতে পারা ছাড়াও একটা মধুর ভাব পাওয়া যায়।

জীবের এ ক্ষমতার মাধ্যমে জড় বস্তুর পেছনের অর্থও ধরা যায় হয়তো! মানুষকে বিশেষ ইন্দ্রিয় বৃত্তির মাঝে জড়িয়ে ফেললে অর্থও হয় একমাত্রিক। তার বহুমাত্রিককা ধরা যায় না। অথবা সবকিছু মিলে যে মানুষ সে কই থাকে! তাই গোপন শব্দকে ইন্দ্রিয়াতীত কোনো সম্পর্কের সূচনাও ধরা যেতে পারে। নাকি?

গোপন শব্দে মূর্ত হয় জীবন। শব্দের অর্থ কি সবসময় প্রকাশ্য হয়? সিনেমায় দেখি শব্দ ব্যাপারটা বইয়ের পাতা থেকেও ধরা যাচ্ছে। লিসেলের জীবন পূর্ণ হয়, অসুস্থ ম্যাক্সকে বইয়ের শব্দ দিয়ে জীবন্ত রাখে। লিসলে বই চুরি করে আনে। (এখানে বই সম্ভবত চিন্তার স্বাধীনতা। কারণ ওই সময় জার্মানিতে চলছিল বিপরীথ মতের বই পোড়ানোর মহোৎসব) নতুন শেখা শব্দগুলো লিসেল লিখে রাখে দেওয়ালে। শব্দ দিয়ে অর্থবান হয় লিসেলের জীবন। গোপন কথাগুলো রয় না গোপন। সবকিছুর ভেতর থেকে শব্দ ছুইয়ে পড়ে। তারপরও কিছু শব্দ আড়াল রয়ে যায়, তাকে খুঁজে বেড়ানোর মধ্যে আনন্দ। ইহুদি ধর্মে অবশ্য বস্তুগত অর্থে ‘আনন্দ’ পাওয়াকে নিকৃষ্ট বিষয়াকারে বর্ণনা করা হয়।

আরো পড়ুন : ইচ্ছেশূন্য মানুষ । মুভি

ম্যাক্সের সঙ্গে গড়ে উঠে লিসেলের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। তখন চলছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ম্যাক্স ভান্ডেনবার্গ চরিত্রে অভিনয় করেছেণ বেন শ্নেৎজার।

ম্যাক্সের সঙ্গে গড়ে উঠে লিসেলের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। তখন চলছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ম্যাক্স ভান্ডেনবার্গ চরিত্রে অভিনয় করেছেণ বেন শ্নেৎজার।

বলছিলাম লিসেলকে একটা বইয়ের লেখা মুছে উপহার দেয় ম্যাক্স। পুরনো বইযের লেখা মুছে সাদা খাতা বানিয়ে দেওয়ার অর্থ কী? পুরনো বইয়ে থাকা হিটলারের ছবি ও শব্দ-বাক্য মুছে দেওয়া কি বাইরের দুনিয়া থেকে মুছে দেওয়ার মতো ব্যাপার! নাকি ওই সাদা পাতায় উল্টো ইতিহাস লিপিবদ্ধ হওয়ার ইঙ্গিত।

ম্যাক্সের সহচর্যে লিসেল অনেক শব্দ খুঁজে পায়— সেটাই ম্যাক্সের বোঝাপড়া ও জ্ঞানকাণ্ড। সম্ভবত ওইসবই নিজের মতো করে খাতায় লিখে রাখে। অনুমান করে নিতে পারি বিশেষ কারো বা অভিজ্ঞতার সহচার্যে একটা সময়ের আগে ও পরে আমাদের বোঝাপড়ায় ব্যাপক পার্থক্য তৈরি হয়। আগের বর্ণনা মুছে নতুন বর্ণনার আবির্ভাব হয়। লিসলের মন একটা সাদা খাতা। যা নতুন করে পূর্ণ হবে! এটা কতটা পক্ষপাতমূলক তা অন্য প্রশ্ন!

জন লক মানুষের মন সম্পর্কে বলছিলেন। জন্মের সময় এটা সাদা খাতার মতো থাকে। অভিজ্ঞতা তারে পূর্ণ করে।  এ কথার  নানান ধরেন আলোচনা-সমালোচনা আছে। কথা হলো- মন সাদা খাতার মতো হলে ‘গোপন শব্দ’ কই থাকে?

একদিন ইস্কুল থেকে আসার পর ম্যাক্স জিগেশ করে, লিসেল তুমি তো বাইর থেকে আসলা। চারদিকে কী দেখলা? তখন লিসেল মুখস্ত বর্ণনা দিতে শুরু করে। ম্যাক্স বলে, এভাবে না। তুমি কী ফিল করলা? তখন দেখা গেল দুনিয়া রঙ বদলাইতে শুরু করেছে বর্ণনায়। ওই বর্ণনা শুনে বুঝতে পারা যায়— কীভাবে ম্যাটাফোরের আড়ালে দুনিয়াকে আমরা লুকায়া ফেলি। অথবা সাধারণ বর্ণনা কী করে আমাদের ভাব-ভাষা আড়াল করে। দুইটা মিলা যদি একই সময় জগতরে পাইতে থাকি— ভাবতেই কেমন জানি লাগে।

আর বই ব্যাপারটাই বা কী রকম? মাঝে মাঝে শুনি মানুষ হলো জীবন্ত বই, আবার বই শব্দ চুরি করে মানুষের জীবন থেকে। বই কি জীবন্ত নয়? নইলে বই নিয়া এতো মারামারি/কাটাকটি ক্যান?

পুরো সিনেমার গল্প বর্ণনা করে ‘মৃত্যু’। মৃত্যুকে একটা দরোজা হিসেবেও বর্ণনা করা যায়। ইহলোক ও পরলোকের। শব্দের এ ক্ষমতার জোর পরলোক প্রায় অবান্তরই মনে হয়। কবরের নৈঃশব্দ্যে শব্দের ভূমিকা কী হবে? শব্দ কী নিতান্ত ইহলৌকিক ব্যাপার! তবে কি এরপর জীবনের কোনো ধারাবাহিকতা নাই।

নৈঃশব্দ্যের ব্যাপারে না বলে কীভাবে থাকি! নৈঃশব্দ্যে জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়া সাধারণ ও অসাধারণ মানুষ এ জগতে বিরল নয়।

এক রাতে এয়ার রেইডের সাইরেন বেজে উঠে। লিসেলদের বাসার সবাই মাটির নিচের আশ্রয় কেন্দ্রে ছোটে। বেজমেন্টে পালায়া থাকা ম্যাক্স থাকে একা।

যাইহোক, শহরের ১০ হাজার মানুষ বোমার ভয়ে লুকায়া আছে। তখন রাস্তায় বাইর হয়া আসে ম্যাক্স। নিখিল আকাশে ঝিকমিক করছে তারকারাজি। সে দিকে তাকায়া মুক্তির স্বাদ পায়। (জনারণ্যে নিজেরে কতটা প্রকাশ করা যায়/ভাবা যায়) তাজা নিঃশ্বাস নেয়। কোথাও শব্দ নাই, হয়তো ঘ্রাণ আছে, আলো আছে, পৃথিবীর ঘূর্ণন আছে। এ দৃশ্যটা দেখে আমার মন খারাপ হয়ে গেল। এটা কী জীবন নয়। নাকি দৃশ্যটা আমরা বর্ণনা করতে পারি বলে দাবি করি। তাই জীবনের অংশ হয়ে গেল। আসলে কি বর্ণনা সম্ভব!

লিনেল চরিত্রে সোফি ন্যালিস।

লিসেল চরিত্রে সোফি ন্যালিস।

যদি চিরকাল ওইদিকে তাকায়া থাকি! বিস্ময়াভুত হয়ে। শুধু মুখ নয়, মনে কথা আসে না। ভাব না আসে। না প্রেম না ঘৃণা। তাহলে কি জীবন হবে

এর ভেতর গোপন শব্দরাজি কীভাবে খেলা করে?

হয়তো এ সব কিছুই না। আল্লাহ বললেন হও! হয়ে গেল। এই কী ব্যাপারটা! একটাই কী গোপন শব্দ! রুহ! নাম, পরিচয়, সনাক্তকরণ, মিল, অমিল, মূর্ত, বিমূর্তকরণের সঙ্গে তার যুক্ততা।

এ সিনেমায় আছে বিশ্বযুদ্ধ, হিটলার, ইহুদিদের দুর্দর্শার অতিপরিচিত চিত্র। বই পোড়ানো, চিন্তা করতে না দিয়ে মানুষরে বন্দি করে রাখার একঘেয়ে বিষয়াদি। এ জগতে আমরা তো এই দেখি— চিন্তা করার স্বাধীন বা প্রকাশ করার স্বাধীনতা বন্দি থাকে নানা কর্তৃপক্ষের কাছে। স্রেফ এভাবে বললে হয়তো এন্টি-সেমেটিক হবে না। ‘দ্য বুক থিফ’ নিয়াই বলি— শব্দের জন্য কান পেতে থাকা যায়, তাকায়া থাকা যায়!

আর এ সব বাদ দিয়া বললে! আমরা মানুষেরা থাকি পরমার্থিক ডাকের অপেক্ষায়!

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *