বার্ডম্যান : ভালো লাগা আর না লাগা

আলেকজান্দ্রো গনজালেস ইনারিতুর দুটা সিনেমা দেখেছিলাম আগে। ‘আমোরেস পেরোস’ ও ‘বাবেল’— সিনেমা দুটা আমার ভালো লাগে নাই, এগুলো বিখ্যাত ‘ডেথ’ ট্রিলজির অংশ। মৃত্যুকে এখানে যেভাবে হাজির করা হয়েছে। তা আমাকে স্বস্তি দেয় নাই। মনে হয়ছে জীবনে মৃত্যুর অর্থপূর্ণতাকে হাজির করতে পারার ব্যর্থতা ঘটছে।

'বার্ডম্যান' অভিনেতা মাইকেল কিটন

‘বার্ডম্যান’ অভিনেতা মাইকেল কিটন

এতদিন পর ‘বার্ডম্যান অর (দ্য আনএক্সেপ্টেড ভার্চু অব ইগনোরেন্স)’-এ মুগ্ধ হইয়া ভাবতেছিলাম কেন আগেই দুটা ভালো লাগে নাই? সম্ভবত নানান ঘটনার জোড়াতালি দিয়া এক ধরনের কোলাজের মাধ্যমে সাধারণ কোন সূত্র হাজির করার ব্যাপার ছিল। সেটা আমার কাছে মশহুর বিদ্যা মনে হয় না। তবে সিনেমা যেহেতু প্রেজেন্টেশনের খেলা। সে দিক থেকে চমকে উঠার মতো বৈকি! তা নিঃসন্দেহে ঘটছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চমকেই থাকছে— ঘটমান হয়ে উঠার অনুভূতি জাগায় নাই।

লজিকের অল্প বিদ্যা থেকে এটারে ইনড্রাকশন বলা যেতে পারে। যেহেতু জাস্টিফিকেশনের বড় সুযোগ নাই, তাই ছোট ছোট ব্যাপার দিয়া বড় কিছু হাজির হইলে কাকতালীয়ই লাগে। তবে এ সব ছোট ছোট ঘটনা বা ভুল কত কত অমর ট্রাজেডির জন্ম দিছে। এই যে রোমিও-জুলিয়েটের মৃত্যু। তখন অবশ্যই এভাবে ভাবি নাই, কারণ এ ভুলে ভরা অমর মৃত্যু দুনিয়া সম্পর্কে সোজাসাপটা কোনো দৃষ্টিভঙ্গি দাঁড় করায় নাই বা তা অনুধাবনে ব্যর্থতা। তবে এটা ঠিক একেকটা ঘটনা আপনারে এক একেকটা চিন্তা হদিস দিতে পারে! তাই ধন্য ইনারিতু। আপনারে সালাম।

আবার ছোট্ট কিছুরে বড় কিছুর কারণ ভাবতে পারা পর্যবেক্ষণের দুর্বলতা ভাবা যাইতে পারে। অন্যদিকে বড়-ছোট- যাই হোক আপনে পুরাটারে একটা ইউনিট আকারে ভাবতে পারেন। তারপরও আমার ভালো লাগে নাই। কারণ এগুলো নানান বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের সুর তোলে। কিন্তু কেমন যেন স্বতন্ত্র সুরগুলা হারায়া যায়। ‘বার্ডম্যান’র ক্ষেত্রে এ সব কথা ক্যান? কারণ এখানে তা অনেকটা আছে।

আরো পড়ুন : ইচ্ছেশূন্য মানুষ। মুভি

আলেকজান্দ্রো গনজালেস ইনারিতু ও মাইকেল কিটন

আলেকজান্দ্রো গনজালেস ইনারিতু ও মাইকেল কিটন

এ সিনেমাও হয়ত একই রকমে কোন একটা সূত্রে আসতে চায়। এই ধরেন জনপ্রিয় তারকা, বুড়া হইছেন— এখন ঝলসে উঠতে চান, জনপ্রিয়তার সংকটকে পাশ কাটাইয়া প্রশংসা পাইতে চান। এ সময়ে টুইটারের জনপ্রিয়তায় হাজির হইতে চান। নিজের নানান চারিত্রিক অসুখ সত্ত্বেও মেয়ের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল বাবা। তাইলে এই যে, হইলোকে সাধারণ সূত্র হাজির না থাকার ধাক্কা সামলানো কঠিন। এটা আসলে মানুষের বাঁইচা থাকার ঝামেলা। ওই যে মাঝে মাঝে আমরা শুনি ‘এখন তো সবাই তারকা, শিল্পী কয়জন?’। তো এখানে সুপারহিরো ‘বার্ডম্যান’র নায়কের ক্ষেত্রেও আলগা কিছু ঘটে নাই। আইডিয়াল অর্থে তারকা আর শিল্পীর কাজিয়া দিয়া একটা ইউনিভার্সল ধারণা দিয়া গোসল করা যায়। এ তর্কের এলিট হওয়া-না হওয়ার ঝামেলা আছে। তারপর দেখেন, এটা হওয়ার পর ‘বার্ডম্যান’ অভিনেতা পাখি হইয়া গেলেন। এটা কী ঠাট্টা ছিল! ইনারিতু যতটা না আমজনতার, তার চেয়ে বেশি তো আর্টওলাদের।

‘বার্ডম্যান’ ভালো লাগার সম্ভাব্য আরেক কারণ হলো এটা সম্ভবত জীবন খাইয়া-পরার ভেতর দিয়া, মানে যে লিনিয়ার জীবন (উল্টো দেখলেও ভাবার সময় সিধা করে নেয়) আমরা দেখি, তার কাছাকাছি বয়ান হওয়ায় ভালো লাগছে। আবার ধরেন অন্য দুটি সিনেমার মতো এটা কোলাজ না। বরং, চলমান জীবনের একটা ধারণা নিয়া হাজির হইছে। কোনো একটা বিষয় বা ঘটনা মানুষে মানুষে এক ধরনের কাছাকাছি হওয়ার চেতনা তৈয়ার করতে পারে। কিন্তু প্রত্যেকটা জীবন আলাদা— যদি তার উদ্দেশ-লক্ষ্য একইও হইয়া থাকে।

এ ছাড়া ‘বার্ডম্যান’-এ একটা ভিজুয়াল আরাম তো আছে। ক্যামেরার কাজ নিয়া সেটা বলা যায়। তার চেয়ে বড় বিষয় হলো জীবনকে আমরা যেভাবে একটা দৃশ্য আকারে ভাবি— যার মধ্যে পরিবর্তনগুলো ঘটছে— আজকের আমি আর কালকের আমির মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য আছে। কিন্তু আইডেন্টিক্যাল ব্যাপারটা ‘আমি’ই থাকতেছে। অথচ এর মধ্যে আমাদের ওজন বাড়ে-কমে, প্রেম-বিচ্ছেদ নানান কিছু ঘটে। এ ধরনের সোজা সাপ্টা বিষয় মুগ্ধ করে হয়ত। মনে হয়, একটা শটের ভেতর দিয়ে যা দেখানোর দেখাইয়া ফেলছেন। আর অবশ্যই কয়েকটা দৃশ্যে এ আরামটায় ইনারিতু বিচ্ছেদ ঘটাইছেন। এটাকে তার কারিশমায় বলব।

একের ভাবনার ভেতর দিয়া অনেক কিছু ধরার চেষ্টা থাকে। যেমন— একের লগে এককের সম্পর্ক থাকতে পারে। বহুর সঙ্গেও আছে, সেটা হাজির করা মুশকিল লাগে আরকি! এবং সিনেমার শেষ দৃশ্যটা একদম অভাবনীয়, (যদিও এর অর্থ অভাবনীয় না)— কিন্তু সেটা শুধু চমকে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাই ‘বার্ডম্যান’ ভালো লাগে। অথবা মৃত্যু নিয়া পুরানো ভাবাবেগ আমাদের উতলে পড়ে না, এমন সন্তুষ্টি জাগে। আর পুরা সিনেমার মধ্যে কবিতা কবিতা ভাব আছে। তাই অথেন্টিক্যালি বুঝা-না বুঝার ব্যাপার নাই। তা-ই!

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *