ভিক্টর কসাকভস্কির ক্লাসে

ভিক্টর কসাকভস্কি সমপ্রতি বাংলাদেশে এসেছিলেন ফিল্মি বাহাস গ্রুপের আমন্ত্রণে। এটা ছিল তারেক মাসুদ মাস্টারস ক্লাসের প্রথম সেশন।

ভিক্টর কসাকভস্কিকে ধরা হয় দুনিয়ার প্রথম সারির ডকুমেন্টারি নির্মাতাদের একজন। সমপ্রতি বাংলাদেশে এসেছিলেন ফিল্মি বাহাস গ্রুপের আমন্ত্রণে। এটা ছিল তারেক মাসুদ মাস্টারস ক্লাসের প্রথম সেশন। মাস্টার যেহেতু ভিক্টর, সেখানে মাঘ মাসের দুই তারিখে কাকগোসল দিয়ে সাড়ে নয়টায় ফার্মগেটের ডেইলি স্টার ভবনে হাজির হতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়। হয়েছিলও তাই। সারাদিনের আয়োজনে ছিল ভিক্টরের চারটি ডকুমেন্টারি, সাক্ষাত্কারের ক্লিপস এবং সরাসরি তার লেকচার। সঙ্গে ছিলেন কলকাতার সত্যজিত রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের ডিন প্রফেসর নীলোত্পল মজুমদার।

বার্লিনকেন্দ্রিক নির্মাতা ভিক্টর কসাকভস্কি রাশিয়ার পিটার্সবার্গে জন্মগ্রহণ করেন ১৯৬১ সালের জুলাইয়ের ১৭ তারিখে। তার সঙ্গে সেই দিনে যারা জন্মগ্রহণ করেছিলেন তাদের নিয়ে ‘ওয়েডনেস ডে ১৯.০৭.১৯৬১’ নামে তার একটি ডকুমেন্টারি (১৯৯৭) আছে। তিনি ১৯৭৮ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গে ডকুমেন্টারি স্টুডিওতে চিত্রগ্রাহক, সহকারী পরিচালক এবং সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ভিক্টর সাধারণত তার ফিল্মের চিত্রগ্রহণ ও সম্পাদনা নিজে করে থাকেন। তার প্রথম ডকুমেন্টারি লোসেভ (১৯৮৯)। ভিক্টর মোট আটটি ডকুমেন্টারি বানিয়েছেন, দেশে-বিদেশে পুরস্কার জিতেছেন একশ’টির মতো।

ফিল্মি বাহাসের অনুষ্ঠানে প্রথমে দেখানো হয় ২০০২ সালে নির্মিত ‘টিসে!’ ভিক্টর একবছর ধরে সেন্ট পিটার্সবার্গে তার অফিসের জানালায় দাঁড়িয়ে ক্যামেরা হাতে শুট করেন। এই একবছরের ফুটেজ দিয়ে বানিয়ে ফেলেন টিসে। টিসের ইংরেজি হলো কুয়াইট। ভিক্টর জানান, তিনি নিশ্চিত ছিলেন না শেষ পর্যন্ত এই মুভিটি কি হয়ে উঠবে। রাস্তার খোঁড়াখুঁড়ি, ঋতু পরিবর্তন, প্রেম-বন্ধুত্ব ও নানা কিছুর শেষে দেখা যায় এক বৃদ্ধ মহিলা রাস্তায় বের হয়ে বলতে থাকে টিসে। যেন তিনি রাশিয়ার দীর্ঘ ইতিহাস ফুড়ে কোলাহলময় দুনিয়াকে বলছেন, একটু শান্তি দাও। অন্যগুলোর মতো এই ফিল্মের প্রাণ হলো অসাধারণ সব শট। আপনাকে ভাবতে বাধ্য করবে কী সেই কবিত্ব আর কল্পনাশক্তি ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্যগুলোকে একই সূত্রে বাঁধা। তখনও চমকের অনেকটা বাকি ছিল, যেগুলো দেখব পরবর্তী চলচ্চিত্রগুলোতে।

‘দি বিলভস’ (১৯৯২) এই মুভিতে দেখা মেলে রাশিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাস করা বৃদ্ধ দুই ভাই-বোনের দৈনন্দিন জীবন। তারা কোনো এক নদীর উেসর কাছাকাছি সভ্যতা থেকে দূরে বসবাস করেন। যেখানে মানুষ, গাছপালা ও পশুর সম্পর্ক নিবিড়। নদী-তীরবর্তী প্রাকৃতিক দৃশ্যের দীর্ঘ শট শুরু হয় পুরনো হিন্দি গানের মধ্য দিয়ে। একজন দর্শকের প্রশ্ন ছিল ভিক্টর তার ডকুমেন্টারির মিউজিক কীভাবে বাছাই করেন। কারণ তার কাজে পৃথিবীর নানা জায়গার সুর আর গান স্থান পেয়েছে। প্রতিউত্তরে জানান, তিনি জানেন না। তবে এটা জানেন যে, ফিল্ম বানাতে গেলে চোখ আর কানের তীক্ষষ্টতা দরকার।

২০০৫ সালে বানানো সোভিয়েটো সেদিনের প্রোগ্রামের সূচিতে ছিল না। ভিক্টর দুপুরের খাবার খাওয়ার ফাঁকে নিজেই এই মুভির ডিস্ক বের করে দিলেন। এই মুভি তার নিজের জীবনের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে। এই ডকুমেন্টারিতে তিনি তার দুই বছর বয়সী ছেলের প্রথম আয়না দেখার অভিজ্ঞতাকে বন্দি করেছেন। তার ছেলে সোভিয়েটোর জন্মের পর প্রতিবিম্ব তৈরি করে এমন সব জিনিসকে তিনি বাড়ি থেকে সরিয়ে ফেলেন। একদিন দু’বছর বয়সী সোভিয়েটো তার সামনে কেউ একজনকে আবিষ্কার করে। পরবর্তীতে সে জানতে পারে এটা তার নিজের ছায়া। এই পরিচিতিতে আছে অনির্বচনীয় নিখাদ বিস্ময় ও বিষাদ এবং সর্বশেষ নিজের সামনে নিজেকে দাঁড় করানো। ভিক্টর নিজের সম্পর্কে বলেন, তিনি ভালো নির্মাতা নন। কিন্তু তিনি এমন কাজ করেন যেটা অন্যদের চেয়ে আলাদা, সে কারণে তাকে লোকে স্মরণ করবে। তিনি বলেন, আপনি যদি ভালো মানুষ হন তাহলে সিনেমা বানানো আপনার কাজ নয়।

চোখ আর কানের বিষয়টি স্পষ্ট বোঝা যায় তার নির্মিত সর্বশেষ ফিল্মটি দেখে। ভিভন লাস এন্টিপোডাসের প্রিমিয়ার হয় ২০১১ সালের ভেনিস চলচ্চিত্র উত্সবে। এটা ছিল সেই উত্সবে প্রদর্শিত প্রথম চলচ্চিত্র। এটি তার দশ বছরের শ্রম। এন্টিপোডাস হলো পৃথিবীর কোন একটা স্থান থেকে তার অপর পৃষ্ঠের স্থান। পৃথিবীর বেশিরভাগ জায়গার উল্টো পিঠে আছে সমুদ্র। মাত্র চারটি জায়গার উল্টো পিঠে ভূ-পৃষ্ঠ আছে। যেমন—স্পেনের উল্টোপিঠে নিউজিল্যান্ডের, রাশিয়ার উল্টোপিঠে চিলি, আর্জেন্টিনার উল্টোপিঠে চীন আর বাতসোয়ানার উল্টোপিঠে হাওয়াই দ্বীপ। বৈচিত্র্য জল-হাওয়া, সংস্কৃতি, কর্মযজ্ঞের স্বাক্ষী এই ডকুমেন্টারি। এই ডকুমেন্টারী প্রসঙ্গে জানান তার কাছে বিষয় হিসেবে কোনো কিছুই গুরুত্বহীন নয়। যেমন—ডকুমেন্টারি বানানোর সময়কালে নিউজিল্যান্ড উপকূলে ভেসে আসে বিশালাকার তিমির মৃতদেহ। ভিক্টর তার বোনকে পাঠিয়েছিলেন স্পেনে কী আছে দেখার জন্য। তার বোন জানায়, একদম বৈচিত্র্যহীন টিলাময় অঞ্চল। ভিক্টর সেখানে গিয়ে ধারণ করেন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণী আর প্রকৃতির পরিবর্তন। তার মতে, বিষয় হিসেবে একজন মানুষ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে গাছপালা, পিঁপড়া সবকিছুই ডকুমেন্টারির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি সেদিনের অনুষ্ঠানে থাকা ফিল্ম বিষয়ে আগ্রহীদের জন্য ইউরোপ আর এশিয়ার পার্থক্য টানেন। কারণ ইউরোপের যেদিকে তাকান একই রকম গাছপালা, ঘরবাড়ি, মানুষ ও রঙের কোনো বৈচিত্র্য নেই। অন্যদিকে আপনি এশিয়ার যেদিকে তাকান না কেন বিভিন্ন ধরনের রং আপনার চোখের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তিনি বলেন, এই রং আর বৈচিত্র্য নিয়ে এখানকার আগ্রহী নির্মাতারা দারুণ সব কাজ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে ক্যামেরার ঝাকাঝাকি মার্কা এক্সপেরিমেন্ট না করলেও চলে।

ভিক্টর কসাকভস্কি

অনুষ্ঠানে আসা একজনের প্রশ্ন ছিল এখন তো তরুণদের নিজেদের কাজ প্রদর্শন করার অনেক সুযোগ মিলেছে। যেমন কেউ চাইলে তার বানানো ফিল্মটি সহজে ইউটিউব বা এই জাতীয় ভিডিও শেয়ারিং সাইটের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে পারেন। ভিক্টর এই পরিস্থিতি স্বীকার করেন, আবার ভিন্নমত পোষণ করেন। এটা শুধু শখের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কারণ আমরা যে কেউ টাকা থাকলেই ফিল্ম বানাই না। ভিক্টরের কাজগুলো দেখলে বোঝা যায়, তার কাজের পেছনে কী পরিমাণ শ্রম ও বিনিয়োগ থাকে। এখন একজন প্রযোজক যদি কোনো ফিল্মের পেছনে বিনিয়োগ করেন তার মূল চিন্তা হলো বিনিয়োগ তুলে আনা। সেক্ষেত্রে এই ধরনের উন্মুক্ত বা বিনামূল্যে প্রদর্শন সম্ভব নয়। এই কথাগুলোর প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় প্রশ্নোত্তরের কিছু সময় পরে। ভিক্টর ভিভন লাস এন্টিপোডাসের প্রদর্শনের আগে জানিয়ে রাখেন এর ফিল্মের কোনো অংশের ভিডিও করা বা ছবি তোলা যাবে না। তিনি জানান, শুধু বিনিয়োগের অভাবে এই কাজটি দশ বছর ধরে আটকে ছিল। পরে অনেকগুলো দেশ ও সংস্থার কারণে নির্মাণ হয়েছে।

ভিক্টরের কাজের ধরন থেকে আরেকটি প্রশ্ন জাগে কীভাবে তিনি এই স্ক্রিপ্টগুলো তৈরি করেন। এটা বরাবরই প্রশ্নসঙ্কুল। কারণ তার কাহিনীগুলো দেখলে মনে হয় এখানে আগে থেকে তৈরি করা স্ক্রিপ্টের কোনো বিষয় নেই। তাহলে সেই কাজটি কীভাবে করেন। এটাকে তিনি জাদুকরী বলেন। তার পক্ষে কোনো টেলিভিশনের সঙ্গে কাজ করা সম্ভব নয়। কারণ তিনি তাদের কোনো স্ক্রিপ্ট দিতে পারবেন না। আবার একই সঙ্গে কত সময় লাগবে সেই গ্যারান্টিও দিতে পারেন না। এই যেন তার অভিনব যাত্রা। এই যাত্রায় ভিক্টর নিজেকে মেলে ধরেন আসলে অন্যকে বুঝতে। এই বোঝাটুকুই যেন হাজির থাকে আগে থেকে, কিন্তু কীভাবে। এখানে কোনো কিছু একটা করতে নিজে প্রত্যয়ী, সঙ্গে সঙ্গে অন্যকে দিয়েও কাজটি করিয়ে নিতে হয়। এটাকে তিনি ‘ভালোবাসা’ বলে উল্লেখ করেন। ভালোবাসা দিয়েই তিনি তার কাজগুলো অর্জন করেন। সঙ্গে সঙ্গে ভিক্টর কিছু টেকনিক দেখান—কী করে তিনি অপেশাদার লোক দিয়ে ক্যামেরার সামনের কাজগুলো করিয়ে নেন। তিনি ফিকশন না বানিয়ে কেন ডকুমেন্টারি বানান তা জানাতে গিয়ে বলেন, তিনি এতো কিছু দেখছেন, সেগুলো বাদ দিয়ে বানিয়ে বানিয়ে কিছু করতে যাবেন কেন।

ভিক্টরের মুভি দেখার ফাঁকে তার একটি সাক্ষাত্কারের ক্লিপ দেখান হয়েছিল ‘ভিক্টরের দশ নিয়ম’র কয়েকটি। এটা ভিডিও ইন্টারনেটে পাওয়া যায়। আগ্রহীরা দেখে নিতে পারেন। এই ভিডিওটি করা হয়েছিল ইন্টারন্যাশনাল ডকুমেন্টারি ফিল্ম অ্যাসোসিয়েশনে। সেখানে তার প্রথম নিয়মটি হলো, ‘আপনি যদি ফিল্ম না বানিয়ে বেঁচে থাকতে পারেন তবে আপনার ফিল্ম বানানোর দরকার নাই।’ এটা তিনি টলস্টয়ের ‘যদি কেউ না লিখে বেঁচে থাকতে পারে, তবে তার লেখার দরকার নাই’—এই উক্তি অনুসরণে বলেছিলেন। এই দশ নিয়মের সর্বশেষ নিয়ম হলো—‘আপনার জন্য নিয়ম বানিয়ে নিন’।

কখনও দৃশ্য, কখনও কথা—নানা অনুরণনের মধ্য দিয়ে কেটেছিল ১৬ জানুয়ারির সারাটা দিন। এমন আয়োজনের জন্য আয়োজকদের অসংখ্য ধন্যবাদ। আশা করা যায়, এমন ঋদ্ধ আয়োজন আগামীতে আরও হবে।

> লেখাটি দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত।

Comments

comments

2 thoughts on “ভিক্টর কসাকভস্কির ক্লাসে

  1. দারুন লাগলো পড়তে। ঠিক যেন নিজের চোখের সমানে দেখতে পাচ্ছিলাম।
    কিছুটা দু:খবোধ হচ্ছে ভিক্টর কসাকভস্কির ক্লাসে যেতে পারিনি বলে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *