উকিলের মনচোর

‘ধনু নদীর পশ্চিম পাড়ে, সোনার জালালপুর। সেখানেতে বসত করে, উকিলের মনচোর।’— লাইন কয়টি গীতিকবি ও সাধক উকিল মুন্সীর নামে প্রচারিত। কিন্তু উকিলের একমাত্র সংকলনে (সংগ্রহ, সম্পাদনা : মাহবুব কবির) এ গানের কোনো উল্লেখ নাই।

তরুণ বয়সে উকিল মুন্সী বেড়াতে আসেন মোহনগঞ্জ থানার জালালপুর গ্রামে চাচা কাজী আলিম উদ্দিনের বাড়িতে। ধনু নদী পার হতে গিয়ে ওই গ্রামের লবু হোসেনের মেয়ে ‘লাবুশের মা’র (হামিদা খাতুন) প্রেমে পড়েন। সে কথা এ গানে লেখেন বলে প্রচার আছে। প্রেমের কথা জানাজানি হলে কাজী পরিবার বাঁধা দেয়। কারণ হামিদার বাবা সাধারণ কৃষক। অভিমানে কিছুদিন আশপাশের শ্যামপুর, পাগলাজোড়, জৈনপুরে পাগলের মতো ঘোরাঘুরি করেন। ১৯১৫ সালে জালালপুর থেকে কয়েক মাইল দূরে মোহনগঞ্জের বরান্তর গ্রামের মসজিদে ইমামতি ও মক্তবে যোগ দেন। আর সারারাত কাটত গজলে। এমন বিরহকালে ১৯১৬ সালে হামিদা খাতুনের আগ্রহে বিয়ে সম্পন্ন হয়।

উকিল মুন্সী ও পুত্র আবদুর সাত্তারের কবর। জৈনপুর, মোহনগঞ্জ, নেত্রকোনা। ফেব্রুয়ারি ২০১২।

উকিল মুন্সী ও পুত্র আবদুর সাত্তারের কবর। জৈনপুর, মোহনগঞ্জ, নেত্রকোনা। ফেব্রুয়ারি ২০১২।

চলতি বছরের ডিসেম্বরে উকিল মুন্সী ও হামিদা খাতুনের বিয়ের শতবর্ষ পূর্ণ হবে। আর ১১ জুন উকিলের বয়স হবে ১৩১ বছর। এ সময়ে প্রেমের গানের খুচরো আলাপ নিশ্চয় মন্দ নয়!

বাবার মৃত্যু, মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের কারণে ছোটবেলা থেকেই ছন্নছড়া উকিল মুন্সী। হামিদাকে প্রথম দেখায় ভালোবাসেন, পরে ঘর বাঁধেন। মানব-মানবীর এ ধারার প্রেম তার গানে সরাসরি খুব একটা আসেনি। বরং রূপকের আড়ালে হদিস দিয়েছে আত্মা-পরমাত্মার প্রেম। একের অনুভূতি হয়েও ধরা পড়ে এককের প্রতি আকুলতা। বাংলার প্রচলিত ধারা অনুযায়ী সে ভাবের কথা বলেছেন গানে। পুরনো কথা এই; উকিলের গানে কৃষ্ণ-রাধার রূপক আর ভাব নতুন কিছু নয়। ঘাটুগানের দলে উকিল বেশ কয়েকবছর ছিলেন। ফলত পরমাত্মিক বিরহের মর্ম ও তার প্রকাশ জানা ছিল ঢের।

সে রীতি অনুসারে লেখক পুরুষ হয়েও গানে হাজির হয়েছে নারী। অর্থাৎ রাধা হয়ে কৃষ্ণের আকুলতা। সবখানেই তো কৃষ্ণের জন্য রাধার প্রতিক্ষা দেখি। এর উল্টোটা বিরল। অথবা উকিলের পার্থিব মনচোর কোথায়? তা নেই! বৃহত্তর অর্থে, পুরুষ আকারে কৃষ্ণের মধ্যে নিজেকে আবিষ্কারের আকুলতা আছে। হ্যাঁ, প্রেমের কারণে। সচরাচর এ ধরনের গানে পরমাত্মার বিরহ চোখে পড়ে না। এখানে দুটি গানের উল্লেখ করা যায়, যেখানে সরাসরি কৃষ্ণর বিরহ ধরা পড়েছে। তার সঙ্গে উকিল জুড়ে দিয়েছেন নিজের বিরহ। উকিলের ভেতর ধরা পড়েছেন কৃষ্ণ!

‘মন কেন আজ কেন্দে কেন্দে ওঠে রে ভাই রে নিতাই, কার কারণে বাঁশি হাতে তারে কোথায় পাই রে। গোকুল মাঠে ধেনু চরাই ডাকি সর্বদাই, কোথায় আমার চূড়া-ধরা প্রেমময়ী রাই রে।’

একই গানের শেষদিকে বলছেন, ‘আমার রাই বিরহে আঁখি ঝরে, তনু মন হইল অঙ্গার রে, হায় উকিল কান্দে বন্ধের লাগি, যেমন শ্যাম কান্দে বলে রাই রাই রে।’

গানটা বেশ মজার। রাধা নিজের অপূর্ণতাকে পূর্ণ করে তোলার জন্য কৃষ্ণের বিরহে কাতর। অন্যদিকে, কৃষ্ণের কৃষ্ণভাব জাগে না যদি না রাই আসে। উকিলের কান্নাও তেমন। উকিলকে গানে শুধু রাধা হলে চলছে না, পুরুষ কৃষ্ণের বিরহও জানা দরকার। নইলে বিরহের ইতি-আদি কী করে বুঝবেন।

অন্যটি গান এমন— ‘আমি রাই বিনে কারে করি স্মরণ, রে ভাই সুবল, আমার হাঁটিতে চরণ চলে না গো. হয়েছি দুর্বল।’ একই গানে আরো বলছেন, ‘আমি যেদিকে যাই রাধারে পাই, রাধা নামে বেণু বাজাই, তার বিরহে উকিল হইল কাঙাল।’

রাধাই শুধু কৃষ্ণের বিভ্রমের ভুগে না। কৃষ্ণকে কৃষ্ণরূপে মূর্ত হতে রাধা লাগে। এ অপূর্ণতার কারণে কৃষ্ণ নিজেও বিরহি। অথবা বিরহের মর্ম না বুঝে কৃষ্ণ হয়ে উঠে না। জগত সত্যের যে রূপ তা একের প্রেমে চলে না। বিরহের ভাব তাই একের জন্য হলে চলে না। কৃষ্ণ যে রাধাকে না বুঝলে স্বরূপে ধরা পড়ছে না। নিজেকে বুঝতে পারে না বলে! অন্য অনেক গীতিকবির মতো উকিল রাধার যন্ত্রণার বুঝার আকুতি করেছেন কৃষ্ণের কাছে। কৃষ্ণ যেন রাধা হয়ে ধরা দেয়। আর যখন কৃষ্ণ স্বরূপে রাধার বিরহে কাটান— তাও উকিল বুঝতে পারেন। যার সাধনা করে তার যন্ত্রণা বুঝতে না পারলে প্রেমিক কার সাধনা করে!

উকিল মুন্সী ও আব্দুস সাত্তারের কবর। এপ্রিল ২০১৬। ছবি জুবায়ের অপু

উকিল মুন্সী ও আব্দুস সাত্তারের কবর। এপ্রিল ২০১৬। ছবি জুবায়ের অপু

উকিল মুন্সী : তার পারিবারিক নাম আব্দুল হক আকন্দ। নেত্রকোণার খালিয়াজুরী উপজেলার নূরপুর বোয়ালী গ্রামে ১৮৮৫ সালের ১১ জুন জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৮ সালের মাঝামাঝিতে স্ত্রী হামিদা খাতুন মারা যান। এর কয়েক মাস পর ৬ আগস্ট ছেলে গীতিকবি সাত্তার মারা যান। এরপর উকিল মুন্সী অসুস্থ হয়ে পড়েন, ওই বছরের ১২ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।

উকিল মুন্সীকে নিয়ে কয়েকটি লেখার লিংক : ১. উকিল মুন্সীর চিহ্ন ধরে ২. উকিল মুন্সীর গানের ভেতর বাড়ি ৩. মধ্যাহ্নের উকিল মুন্সী ৪. কতকাল বিদেশ রবে উকিল ৫. উকিল ও কামালের ‘নাইওর’ তর্ক ৬. দক্ষিণ হাওয়ার দেশএই লেখাগুলোর পরিমার্জিত রূপসহ নতুন কিছু লেখা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ‘উকিল মুন্সীর চিহ্ন ধরে’।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *