মাজারে হামলা প্রশ্নে ধর্ম এলেও উহ্য থাকে ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক

মাজারে হামলার ঘটনাগুলোকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কেবল ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার ফল হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু এর আড়ালে যে রাজনৈতিক ক্ষমতা, সামাজিক কর্তৃত্ব ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রশ্ন জড়িয়ে রয়েছে, তা উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে। যখন হামলাকারীদের ‘তৌহিদী জনতা’ নামক একটি অচিহ্নিত ও বিমূর্ত বলয়ে শনাক্ত করা হয়, তখন নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সংগঠনের প্রকৃত দায় আড়াল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে ঘটনাটি তার রাজনৈতিক জবাবদিহি ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের  জায়গা থেকে সরে গিয়ে স্রেফ ধর্মীয় পরিচয়ের দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

হযরত শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমী (রঃ) এর মাজার

‘তৌহিদী জনতা’ শব্দবন্ধের আড়ালে একদল মানুষ দৃশ্যমান হচ্ছেন, যাদের কোনো সুনির্দিষ্ট অবয়ব বা চেহারা নেই; যা আছে তা কেবলই একটি ধর্মীয় আবহ। যেন ধর্মীয় প্রশ্নে ধর্মের ভেতরে কোনো বিভেদ বা ভিন্নতা নেই। এই ধরনের পরিচয় বা সংজ্ঞায় আমরা যাদের পাই, তারা আবার অনেক সময় ঘটনাস্থলে সরাসরি উপস্থিত থাকেন না। কিন্তু এই আলাপ যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতো পাবলিক পরিসরে আসে, তখন প্রশ্নগুলো মৃদু হলেও নিজের উপস্থিতি জানান দেয়। এমনকি সমাজে ‘সহি ইসলাম’-এর দাবি কী রূপে হাজির থাকছে, সে সম্পর্কে সবাই কম-বেশি ওয়াকিবহাল। তবে সেই রূপটি প্রায়শই নির্ধারিত হয় আলোচনার ঝড় ওঠা প্লাটফর্মগুলোয় কোন পক্ষের উপস্থিতি ও সক্রিয়তা কেমন, তার ওপর ভিত্তি করে।

আমি এখানে ‘মাজার-পালাকার’ বলছি, ‘মাজার-বাউল’ নয়। কারণ, প্রতিটি পরিচয়েরই একটি আলাদা ও সুনির্দিষ্ট তাৎপর্য রয়েছে। এই সরলীকরণের আরেকটি বড় উদাহরণ হলো—মাজার ও বাউলকে একই পরিচয়ের সমার্থক বানিয়ে ফেলা। এটি আমাদের জনপ্রিয় প্রতিবাদের রাজনীতির ভেতর না থাকলেও, আমরা যাদের নিয়ে কথা বলি বা বলতে চাই, তাদের স্বরূপ বোঝার জন্য প্রায়শই এই পার্থক্যের প্রয়োজন পড়ে। যেমন—এ দেশে লালন শাহ ‘বাউল সম্রাট’, শাহ আবদুল করিমও ‘বাউল সম্রাট’, আবার আবুল সরকার হলেন ‘বাউল মহারাজ’। এর মানে হলো, ‘লোক’ বা ‘সংগৃহীত’ তকমার আড়ালে আমরা আমাদের ভাবুকতার বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যকে একটি একহারা বা একমাত্রিক চেহারা দিতে চাই; বৈচিত্র্যের নাম দিয়ে আসলে একরৈখিক পরিচয় চাপিয়ে দিই। আবার এর বিপরীতে থাকা ধর্মীয় পরিচয়গুলো নিজেদের মধ্যকার হাজারো বিভেদ সত্ত্বেও একরৈখিক রূপ ধারণ করে। অর্থাৎ, আমরা একই নামে পরিচিত ধর্মের ভেতরে যেমন বৈচিত্র্য খুঁজছি, তেমনি লোক-ঐতিহ্যের বৈচিত্র্যকে আবার একাকার করে ফেলছি।

এমন পরিস্থিতিতে এটি খুব কমই ঘটে যে, শারীরিক হামলা হিসেবে ঘটনার তীব্র সমালোচনা ও আপত্তি হাজির করার পাশাপাশি একটি গভীর বিচারমূলক ও তাত্ত্বিক আলাপ বজায় রাখা গেছে। ফলে যেকোনো সহিংস ঘটনা শেষ পর্যন্ত কেবল বৈচিত্র্য রক্ষা ও নাগরিক অধিকারের আইনি লড়াইয়ে পর্যবসিত হয়। এমনকি ধর্ম-সম্পর্কিত গভীর আলোচনাকে সমাজে প্রায় উহ্য বা আড়ালে রাখা হয়। বৈচিত্র্য, নাগরিক অধিকার ও আইনি প্রশ্ন এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু হামলার পেছনের ধর্মীয় ব্যাখ্যা, রাজনৈতিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক দখলদারিত্ব বা সাংগঠনিক স্বার্থ নিয়েও আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। এমন এক দমবন্ধ পরিসরে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদের স্থলে একটি নির্দিষ্ট পরিমণ্ডলে ‘ইসলামোফ্যাসিস্ট’ শব্দটির বহুল ব্যবহার দেখা যাচ্ছে; এটা যে সব সময় ‘সঠিক নয়’ এমন নয়। তবে এই ভাষা ঘটনাটিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি, কখনো কখনো পুরো ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকেই একটি একক ও অখণ্ড সত্তা হিসেবে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ধর্মীয় সহিংসতার আলোচনায় নতুন রাজনৈতিক ভাষা তৈরি হচ্ছে, যা বৈশ্বিক পরিসরে একই ‘শব্দবন্ধের’ ঘটনাকে সময় পরিসরে আলোচ্য করে তোলে।

এর বাইরে, ধর্মীয় শুদ্ধতা রক্ষার নামে সংঘটিত এসব ঘটনায় ধর্মীয় পক্ষগুলোর বয়ান অত্যন্ত একপেশে এবং তা সামাজিক সংহতির বাইরে গিয়ে বিভেদ উসকে দেওয়ার চেষ্টা মাত্র। এমনকি মাজার কিংবা বাউল সংস্কৃতির এসব সংকটপ্রবাহে যে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দখলদারিত্বের যোগসাজশ রয়েছে, তা নিয়ে আলাপ একেবারেই কম হয়।

বাস্তবতায় ‘মাজার’ ও ‘বাউল’ দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাচক্রে এই দুটি বিষয়কে একই শব্দবন্ধে মিলিয়ে ব্যবহার করা সহজ হয়ে উঠেছে এবং তা একটি সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা দেয়। মাজারের সঙ্গে সুফিধারার ইসলামের যে সম্পর্ক এবং সমাজ গঠনে অলি-আউলিয়াদের যে ভূমিকা, তা নিয়ে সাধারণত দ্বিমত থাকার কথা নয়। আবার দেশে ইসলাম প্রচার ও বিস্তার সম্পর্কিত আলাপে পরস্পরবিরোধী দুটি বয়ান বিদ্যমান। এক পক্ষ দাবি করে—ইসলাম শান্তির ধর্ম, তলোয়ারের শক্তিতে ইসলাম প্রচার হয়নি। অন্য পক্ষ দাবি করে—তলোয়ার বা সামরিক শক্তির জোরেই ইসলামের বিস্তার ঘটেছে। অথচ সত্য হলো, এই দুটি দাবিই আংশিক এবং এদের সমন্বয়ই পূর্ণাঙ্গ সত্য। ইসলামের বিস্তার স্রেফ সামরিক বিজয়ের মাধ্যমে হয়নি, আবার শুধুই সুফিদের আধ্যাত্মিক প্রভাবেও ঘটেনি। ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে ও ভিন্ন ভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং আধ্যাত্মিক প্রভাব—উভয়ই সমান ভূমিকা রেখেছে।

একই সঙ্গে মাজারের যে সুদীর্ঘ ঐতিহ্য, তা যে সব সময় ক্ষমতাসম্পর্ক ও অর্থনৈতিক লেনদেন  থেকে সম্পূর্ণ বিযুক্ত ছিল, তেমনটিও নয়। এটি শুধু সামাজিক পক্ষগুলো নয়, রাষ্ট্রে কারা ক্ষমতায় আছে এবং তারা কীভাবে সমাজের নিয়ন্ত্রণ পেতে চায়— তার সঙ্গে যুক্ত। ক্ষমতার যে শরীরী ও কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটে, তার সঙ্গে আমরা কোন ভাষায় কথা বলব? আর সেখানে মানুষের আত্মিক যে রূপান্তর, তার আলাপটাই বা আমরা কোন ভাষায় খুঁজে পাব? বরং গুরুত্ব ও পরিস্থিতি ভেদে ধর্ম প্রচার ও বিস্তার দুই পথেই চলেছে, এর প্রভাবগুলো ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে দেখা সম্ভব। কিন্তু একটি পক্ষকে যখন সমাজে ধর্মীয়ভাবে প্রবল গোষ্ঠী হিসেবে এবং অন্য পক্ষকে কেবল অধিকারকেন্দ্রিক একমাত্র আলোচনা হিসেবে হাজির করা হয়, তখন মূলত এমন দুটি বিচ্ছিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলা হয়—যাদের পারস্পরিক সম্পর্কটি খতিয়ে না দেখলে পুরো সংকটটিই খণ্ডিত আকারে দৃশ্যমান হবে।

মোদ্দা কথা, আমাদের সামনে যে পরস্পরবিরোধী পক্ষগুলো হাজির রয়েছে, তার সমাধান কিন্তু এক পক্ষ কর্তৃক অন্য পক্ষকে কনভিন্স বা রাজি করানোর মধ্যে নিহিত নয়। আমার ধারণা, কর্তাসত্তার জায়গা থেকে নিজেদের অবস্থানগুলো স্পষ্ট করার মাধ্যমেই এর সমাধান সম্ভব। সমাজে আসলে কে বৈধ ধর্মীয় কর্তৃত্ব দাবি করছে এবং ঠিক কোন অবস্থান থেকে সেই দাবিটি করছে—সেটি সবার আগে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। অত্যন্ত কড়া ও রক্ষণশীল রিচুয়ালস্টিক (আচারসর্বস্ব) হওয়া সত্ত্বেও আপনি সমাজে অলি-আউলিয়াদের ঐতিহাসিক ভূমিকাকে কোনোভাবেই এড়িয়ে যেতে পারেন না। অনেক ক্ষেত্রে মাজার স্থানীয় ইতিহাসের অংশ, সামাজিক স্মৃতির অংশ ও আঞ্চলিক পরিচয়ের অংশ। ফলে মাজার আক্রমণ মানে শুধু একটি ধর্মীয় চর্চার বিরোধিতা নয়; অনেক সময় একটি ঐতিহাসিক স্মৃতিকেও চ্যালেঞ্জ করা।যেভাবে আপনার নিজস্ব আলাপের ভেতরেও একটি অথোরিটি বা কর্তৃত্ব তৈরি হয়, তৈরি হয় এক ধরনের দায়িত্বশীলতা। আমাদের সামাজিক বন্ধনগুলো যেভাবে ঐতিহাসিকভাবে তৈরি হয়েছে, বর্তমানের এই দ্বন্দ্বে ঠিক সেই দায়িত্বশীলতার জায়গাটিই অনুপস্থিত বা মিসিং। আবার মাজার প্রসঙ্গে আলোচনাগুলো সমজাতীয় শ্রেণীকে ছাড়িয়ে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর কাছে ভিন্ন ভিন্ন অর্থে হাজির হচ্ছে।

এটিই সত্যি যে, এই মতাদর্শিক বিবাদ আজ নতুন নয়, বরং শত শত বছরের পুরোনো। তাই মাজার ও ধর্মীয় চর্চা ঘিরে সংঘাতকে শুধু ধর্ম বনাম অধিকার কিংবা শুধু সহি ইসলাম বনাম ভ্রান্ত ইসলাম হিসেবে দেখলে হবে না। এর মধ্যে ক্ষমতা, ইতিহাস, সামাজিক কর্তৃত্ব, অর্থনৈতিক অবস্থান এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্নও জড়িত।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *