মানুষ আর বাঙালি আলাদা ব্যাপার?

সৈয়দ জামিল আহমেদ নির্দেশিত ‘রিজওয়ান’ নাটকের চরিত্রায়নে মুসলমান মরছে- এ ভাবটা গুরুতর ছিল না মে বি। যদিও কাশ্মীরের হাঙ্গামার গুরুতর ব্যাপার এটাই, অন্য যা যা-ই থাকুক তার মধ্যে থেকেও।

তাও লক্ষণীয় ছিল- নাটকের প্রচারণায় ‘অসাম্প্রদায়িকতা বানী’ ছড়ানোর ব্যাপার ছিল। যদিও সেটা স্পষ্ট ছিল না কেন এবং কার উদ্দেশে। বিশেষত মুসলমানদের ‘অসাম্প্রদায়িক’ হতে বললে দারুণ অস্বস্তি লাগে! মাঝে চাকমা সংলাপও জুড়ে দেওয়া হয়। সম্ভবত সার্বজনীন একটা ভাব প্রকাশের প্রচেষ্টা।

জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা নাটকের একটি দৃশ্য

এমনিতে মুসলিম আক্রান্ত হইলে ‘মানুষ’ আক্রান্ত হওয়ার একটা ধারণা বাংলাদেশি সুধী সমাজে প্রচলিত আছে। এমনকি বাইরের দুনিয়ায় মুসলমানের হাতে মারা গেলে শুধু মুসলমানের হাতে মারা গেছে- এই রকম বিচারের প্রবণতা নিয়া এখানেও কথা হয়। আবার অন্যদের পরিচয় লুকানো বা মানসিক বিষয়াদি বিবেচনার ঘটনা এন্তার শোনা যায়।

তো, সেই নাটকে (রিজওয়ান) সেই ভাবটা আছে। এমনও বোধহয় দেখি নির্যাতকরাও মানুষ। নির্যাতিত আর নির্যাতক মূলত একই সত্তার অংশ। একজন মরলে আরেকজনও বাঁচে না। খুবই মানবতাবাদি একটা ব্যাপার। বাট, এটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে এই কারণে- কাউরে আপনি পুরোপুরি মেরে ফেলে অথবা পুরোপুরি আপনার মতে হবে- এমনটা ভাবতে পারেন না।

তো, এখানে বাঙালি আর মানুষের ব্যাপারটা কী?

হ্যাঁ, সেটাও সৈয়দ জামিল আহমেদের শরণ নিয়া। ধরেন সাম্প্রতিক শোরগোল তোলা (শহীদুল জহিরের উপন্যাস অবলম্বনে) নাটক ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’। এটা ‘রিজওয়ান’-এর মতো সুসংহত প্রযোজনা লাগে নাই। আরোপিত সংগীতের মাঝে মাঝে খুবই ভিড়ভাট্টা টাইপ ব্যাপার। মঞ্চে কসরত করতে করতে চিল্লায়া উপন্যাস পড়ার মতো ঘটনা। তারপরও চমক আছে। চিন্তা আছে কি? তাও আছে। সেটা আবার কেমনে না থাকে?

ধরেন- এইখানে নানান কিসিমের বাঙালি আছে। ধর্ম ও ধর্মের ভেতরের ফেরকাসমেতই। তা সত্ত্বেও তারা বাঙালিই। তুমি কে আমি কে! উত্তর তো জানেনই। (সেখানে কারা বাদ থাকে তা আমরা এখনো কি ভাবি না) তাদের মারে পাঞ্জাবি আর রাজাকাররা। তবে এইখানে কেউ বোধহয় ‘মানুষ’ না। মানে যারা মরে তারাও মানুষ না, যারা মারে তারাও মানুষ না। তো, এইখানে ‘মানুষ’ কারা? আমি জানি না। নাকি বাঙালি হইলে মানুষ হওয়া লাগে না। এবং নির্যাতক ও নির্যাতিত একই সত্ত্বার অংশ হওয়া লাগে না।

এর নানা কারণ থাকতে পারে। বাট আমি নরমভাবে দেখবো। এটা মেবি বিশেষ আর সাধারণের ঝামেলা। কোনো ঘটনাকে দূরে ও কোনো ঘটনাকে কাছে থেকে দেখার ঘটনা। অথবা খুবই সংকীর্ণ পরিসরে নির্দিষ্ট খোপের বাইরে বা দ্বেষ-বিদ্বেষের বাইরে চিন্তারে আগাইতে না দেওয়া। নিজেরে নিজের কাছ থেকে মুক্তি না দেওয়ার ব্যাপার।

তারপরও মানুষ না হইয়া এই যে বাঙালি হওয়া। এ পরিচয়ের ব্যাপারটা আমার কাছে ঠিকই লাগে এখানে। কারণ, মানুষ এমনিতেই মানুষ থাকে। তাকে আলাদা করে মানুষ বলা লাগে না। বরং মানুষ বইলা নির্যাতকরে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা থাকে। সেই কারণেই ঠিক কী কী কারণে কখন আমরা মানুষ বলি আর বলি না- সেটা দেখার বিষয় বটে।

নির্দেশক সৈয়দ জামিল আহমেদ

এটা হইতে পারে যে যা সে তা এভাবে মীমাংসার ভেতর দেখার। এবং মানুষের লগে মানুষের, মানুষের লগে প্রকৃতি বা এই দুনিয়ার সম্পর্ক দিয়া দেখা। তাইলে ‘মানুষ’ বইলা অপরের অপরত্ব খারিজ করা লাগে না। বরং বহুবিদ চিন্তা মধ্য দিয়ে একটা অর্থপূর্ণ জায়গায় পৌঁছাইতে চাইতেছি বলে এই রকম কল্পনা সহজ হয়। এটা আসলে সহজ না। বাট, বিরোধের মধ্যে আগানোর সংকল্প। এটা দরকারি হইতে পারে। এবং ন্যায় বিচার সাপেক্ষে। হ্যাঁ, এটা নিয়া তর্ক হবে। যেহেতু এটা মাত্র শুরু এখানে… অন্য কোথায় কোথায় অনেক দূরও আগাইয়া গেছে….

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.