মৈনটের বিকেলে ভীষণ এক রাত্রির হামাগুড়ি

এক.

চাইলেই মৈনট ভ্রমণের তারিখটা বের করতে পারি। আগের রাতটি মোটামুটি নিখুঁতভাবে মনে আছে। কয়েকবার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল গোলাগুলির শব্দে। অনেকটা সময় নির্ঘুম ছিলাম। অনেক বছরের মধ্যে এই প্রথম আমাদের খাওয়ার ঘরের বাতি নেভানো ছিল। আমাদের কয়েকবার বাড়ি পরেই হানা গিয়েছিল পুলিশ। ‘জঙ্গি’ আস্তানায়। আমরা তেমন প্রমাণাদি পত্রিকা ও অন্যান্য মাধ্যমে দেখেছিলাম। এর মাসখানেক আগে বোধহয় হলি আর্টিসান হামলা হয়। একটা অস্পষ্ট দুঃখবোধ জারি থাকলেও সকাল দশটা নাগাদ আমাদের চারজনের দল হাজির গুলিস্তানে। যেখানটাই মৈনট যাওয়ার সবচেয়ে মোক্ষম গাড়িটা মেলে। যমুনা ডিলাক্স।

আমরা যমুনা ডিলাক্সে চড়ি নাই। এর একটা জনপ্রিয় কারণ আছে। সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভরতা। ফেসবুকে লিখিত একটা ভ্রমণ কাহিনীর ফাঁদে পড়েছিলাম। যার মূল্য উসুল করা গেল মেজাজ খারাপির মধ্য দিয়া। যেটা হলো— বাস জার্নি খারাপ হয় নাই। বান্দুরা বাজারের কাছাকাছি উকিল বাড়ি, জমিদার বাড়ি এখন টিচার ট্রেনিং কলেজ ব্যাপারের মধ্যে ঘোরাঘুরিতে দুপুরটা হইলো সার। তারপর বান্দুরা বাজারে গিয়া বিখ্যাত ‘চারা’ বিস্কুটের স্বাদ। শক্ত জিনিসটা আমার কাছে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ কিছু হয়ে ধরা না পড়লেও খারাপ লাগে নাই। তবে একজন সফরসঙ্গীর যথেষ্ট বিরক্তির কারণ এ বিস্কিট। তারপরের ব্যাপার হলো ওই বাজারে দুপুরে খাওয়ার জন্য একটা দোকান অনেক কষ্টে চিপাচুপার মধ্যে পাওয়া গেল। ভাত খাওয়া হলো রান্না করা ডিম দিয়া। ওই বাজারে মিনি চাইনিজ আছে! বাট ভালো ভাতের দোকান নাই। এত বিরক্তি আর ভোগান্তির ভেতরও মনের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করছিল রাতের শব্দ-স্মৃতি, যদিও তখনো ঠিক দেখা হয় নাই টিভি-অনলাইনের খবরাখবর।

ব্যাপারটা প্রায় বছরখানেক আগের। মনে আছে বান্দুরা বাজার থেকে সিএনজিতে যাচ্ছিলাম আমরা। কিছুটা ভাঙাচোরা রাস্তার পর সুন্দর পিচের রাস্তা। দুইপাশে বেশ নীরবতা, বেশ গাছপালা, বাড়িগুলাও সুন্দর। পরে শুনলাম এসব বাড়ির মালিকরা বেশির ভাগ দেশের বাইরে। আমেরিকা বা ইউরোপ জাতীয় কিছু একটা বলছিল। ধর্মে তারা খ্রিস্টান। যেতে যেতে হাতের বামে একটা জলধারা পড়ল। পানায় ভরপুর। নদী কিনা জানতে চাইলে ড্রাইভার বললেন, শাখানদীর মতো ব্যাপার। আগে বেশ খরস্রোতা আর পার ভাঙাভাঙির ব্যাপার ছিল। সে নদীতে বাধ দেওয়ায় স্বস্তির পাওয়ার মতো একটা ঘটনা ঘটছে। যেহেতু অস্বস্তির সঙ্গে পরিচয় নাই— নদীর জন্য খানিকটা দুঃখ হলো।

দুই.

মৈনট এখন খুবই পরিচিত জায়গা। অনলাইনে মৈনট লিখলেই দেখবেন অনেকে বলছে মিনি কক্সবাজার। আমাদের নোয়াখালীতে বিলে পানি জমা একটা জায়গারে বলে মিনি কক্সবাজার। যেখানে বর্ষায় নৌকা ভাড়া-টাড়া পাওয়া যায়! ব্রাক্ষণবাড়িয়াও একটা বিল বা হাওর জাতীয় জায়গারে বলে কক্সবাজার। বর্ষাকালে। তবে এখনকার ব্যাপার হলো— পদ্মার বিশালত্ব দেখা। আমরা যখন গেছিলাম তখন মোটামুটি বর্ষাকাল- রাস্তা ভেঙে বিলের সাথে একাকার। তাই অন্য ফেসবুক দেওয়া কক্সবাজার টাইপ সমুদ্র তট জাতীয় ছবিগুলার সঙ্গে মিল পাওয়া গেল না। নদীর দীর্ঘ তীর ভেসে গেছে জলে। যাই হোক, জায়গাটার প্রথম ইমপ্রেশন আমার কাছে অন্যরকম।

এক ধরনের ঘুম ভাঙার মতো অথবা ঘুমের ভেতর স্বপ্নের থাকার মতো অভিজ্ঞতা দিয়া মৈনট দেখা। হঠাৎ খেয়াল করলাম ছোটবেলার স্বপ্নটা সত্যি হয়ে গেছে অথবা স্বপ্নের মধ্যে আছি। একটা রাস্তা স্বপ্নে দেখতাম— সাগর দুভাগ কইরা চলে গেছে অনেক দূর মানে ওইপারে। এটা পার হওয়ায় আমার লক্ষ্য। তারপর কি প্রতিশ্রুত ভূমি? আমি যেন সামনে তাই দেখতেছিলাম। পদ্মা নদী ভাগ করে একটা পিচ ঢালা রাস্তা আগাইয়া গেছে সামনে। দু্পাশে টলমল জল- রোদে ঝিলিক দিচ্ছে। চোখে লাগছে সেই ঝিলিক। রোদ নিয়া আমার এক ধরনের ফ্যান্টাসি আছে। কড়া রোদের মধ্যে খানিকক্ষণ থাকলে সেই লেভেলের উদাসীনতা ভর করে। তাই পুরো দৃশ্যটার উপর মায়াবী সত্যতা আরোপিত হলো। কয়েক সেকেন্ড পর ধাতস্থ হয়ে বুঝতে পারি— আসলে দুই পাশের বিলের সঙ্গে নদীর পানি একাকার হয়ে গেছে। আর রাস্তাটা জেগে আছে উপদ্বীপের মতো!

আমার কাছে ব্যাপারটা দারুণ রহস্য! মুসা (আ.) বনি ইসরাঈল-রে সমুদ্র ভাগ করে পথ দেখালেন– তারপর তিনি কই গেলেন। নবীর দেখানো প্রতিশ্রুতি ভূমি কত গোলমেলে ব্যাপার। আর আমরাই ঠিক ঠিক পথের দিশা দিচ্ছি। কতজনায় কত জায়গায় হারায়া যাইতেছে। বাট বিশ্বাসের জন্য যখন মানুষ নিজেরে ছাড়খার করে দেয়, তখন মনের কষ্ট আর সহ্য করা যায় না! এর কারণ সম্ভবত- অচিনকে সত্য করে তোলার যে আকাঙ্ক্ষা সেটারে উপলব্ধ করতে না পারা আর ভাসা ভাসা একটা জগতের মধ্যে বসবাস! তারপরও আমরা যারা জানি না- তারাও কি অজান্তে কোনো উদ্দেশ্যের কাছে সমর্পিত নই! হয়তো কোনো না-হওয়ারে হওয়ার মধ্যে আনার স্বপ্ন দেখি না বলে তার মূল্য নাই।

তিন.

এখানে এসে আমাদের আর যেন নদী দেখার তাড়া থাকলো না। নতুন বাঁধা টিনের একটা চৌছালা তার ভেতরে প্লাস্টিকের চেয়ার ছিল— বইসা আমরা গল্প করতে ছিলাম। এটা মূলত ঘাটের ইজারাদারের অফিস। এখান থেকে ইঞ্জিনের নৌকা বা স্পিডবোটের টিকিট দেওয়া হয়। নদীর ওইপারে নাকি ফরিদপুরের ভাঙা। তবে দূরে যেটা হালকা-হালকা দেশগ্রাম মনে হয় সেটা না। ওটা হলো চর। আসলে কি তখন দেখছিলাম, নাকি একবছর পর কল্পনা করছি! তো, একজন লোক আসলেন ভেতরে। তিনি দায়িত্বে থাকা লোকটারে জিজ্ঞাসা করলেন, এরপর নৌকা ছাড়বে কয়টাই। উত্তর আসলো, আজ আর নাই। চাইলে স্পিড বোটে যাইতে পারেন। কারণ নৌকা ভরার মতো যাত্রী নাকি থাকে না বিকেল ৪-৫টার পর। এই লোকটার তো বিপদে। উনার বর্ণনা মতে। ধরেন নৌকার ভাড়া যদি হয় ৩০ টাকা, স্পিডবোট নেয় ১৫০ টাকা। তার যুক্তি হলো, এ সময়ে লঞ্চ না থাকা অনায্য ব্যাপার। কারণ একজন লোকের কাছে এতো টাকা নাও থাকতে পারে! তাইলে তিনি যাবেন কী করে। তার উপর উনার কাছে আছে একটা বস্তা। যেটা স্পিডবোটে তুললে আরেকজনের ভাড়া দিতে হবে। এখন উপায়! কী উপায় হইছিল বলতে পারি না।

কিন্তু লোকটাকে ঘণ্টাখানেকও বড়সড় বস্তার উপর বসে থাকতে দেখছি। উদাস নয়নে। একটু ভাবালুতা থাকলে হয়তো আমরা এভাবে কত কথা বলতে পারি, সাথে দীর্ঘশ্বাসও ফেলতে পারি। সবাই তো কোনো না কোনো ঘাটে বসে থাকে। সে জানে না পার হতে পারবে কি-না! কোনো কথাকে ‘ভাব’ বলে কখনো কখনো ছেড়ে দিই— কারণ তারে আড়াল করতে চাই। বাস্তবতা না ধরতে পাইরা যাপন করা কতো সুখের হে জীবন!

চার.

তখন আমরা চা খাইতেছিলাম। সে দোকানে কি একটা টিভি ছিল? মনে হয়। ঢাকার বাইরে চায়ের দোকান আর টিভির মধ্যে একটা সম্পর্ক আছে। ঢাকায় যেমন মোটামুটি মানের খাওয়ার হোটেলে আছে।

তখন আমরা আগের রাতের পরিস্থিতি নিয়া কথা বলতেছিলাম। ক্ষণে ক্ষণে এ কথা না বইলা আমরা যেন পারতেছিলাম না। তখন পাশ থেকে এ লোক বলল, ‘এখন জঙ্গি ব্যাপারটা ডাল-ভাত ধরনের। ধরেন বাসে কোনো লোকের সঙ্গে কারো গণ্ডগোল হইছে। দাড়িওলা হইছে আগে হেল্পার বইলা দিল রাজাকার। এখন দাড়িও লাগে না। বলে দেওয়া যায়, জঙ্গি।’ আমরা চাইতেছিলাম না, উনি অংশগ্রহণ করুক। বাট, ব্যাপারটা হলো চায়ের দোকান। যেখানে আলাপ মোটামুটি এজমালি ঘটনা। মারপিঠেও গড়াতে পারে। অবশ্য এখানে আমাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ অবস্থা জারি ছিল।

ওই ভদ্রলোক। গা গায়ে গামছা প্যাচানো। জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোথাকার ঘটনা?’ বললাম, কল্যাণপুর। এবার প্রশ্ন, ‘কল্যাণপুর কোথায়?’ বললাম, গাবতলীর কাছে। এবার বললেন, ‘ও আচ্ছা! গাবতলী তো ডিপজলের বাড়ি।’

এরপর জানা গেল, তিনি মান্নার হিউজ ফ্যান। উনার মতে, মান্নার মতো নায়ক সহজে আর আসবে না। শাকিব খান জনপ্রিয় কিন্তু চ্যাংড়া পোলাদের কাছে। আর মান্নার জনপ্রিয়তা ছিল ছোট-বড়-মাঝারি সব জনতার কাছে। এই স্টেটমেন্ট আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে হইছে। উনার ধারণা, বেঁচে থাকলে মান্না রাজনীতি করতেন। মন্ত্রীও হয়া যাইতেন। মান্না নাকি খুব ত্যাড়া আর চালাক পাবলিক ছিলেন।

দেখা গেল— মান্না আর ডিপজল নিয়া অনেক কেচ্ছা তিনি জানেন। আসল নাম থেকে বাড়ি-ঘর কোথায়সহ ফিল্ম পলিটিক্সের নানান কেচ্ছা। নিশ্চয় এমন খবরাখবর অনেক লোকেই রাখেন। এইসব হয়তো পত্র-পত্রিকা দিয়া ছড়ায় না, মুখে মুখে।

পাঁচ.

সুন্দর দৃশ্যের মধ্যে আসলে মন খারাপ হয়া যায়। কিছু করতে ইচ্ছে করে না। খালি মনে হয় একপাশে বসে থাকি। দেখতে থাকি দুনিয়াদারি। সম্ভাব্য দুনিয়াদারি। যেখানে আমরা ফুটে উঠতে চাই।

এখানে যেখানটাই রাস্তা শেষ, আসলে ভেঙে গেছে। মূল তীর নাকি আরো দূরে। ভ্রমণকারীরা পানিতে পা চুবিয়ে, ছবি তুলে ভ্রমণের মূল্য আদায় করে নিচ্ছিলেন। পাশে বড়সড় একটা কনক্রিটের টুকরো দেখে বসে পড়লাম।

কাছেই ছিলেন দুই ভদ্রলোক। একজন বাবা, আরেকজন ছেলে। ছেলের বয়স কতো? ১০-১২। বাবা তারে কেমন যেন সম্মান জানায়া কথা বলতেছিল। মোবাইলে ছবি তুলতে গিয়া বাবার উপ্রে পন্ডিতি করতেছিল ছেলে। বাবা সব মেনে নিচ্ছিল। মেনে নেওয়ার মধ্যে স্নেহ ঝরতেছিল। যেন ছোঁয়া যায়। এক সময় ছেলে বলল, ছবি ভালো আসতেছে না। ফ্ল্যাশ লাগবে (আসলে সূর্যের দিকে ছবি তুলছিল)। বাবা মেনে নিল, ফ্ল্যাশ নিয়ে কায়কারবার শুরু করল।  মৈনটের দারুণ হাওয়া মধ্যে গায়ের রোদ মেখে আমি তাদের দেখতে থাকলাম। মুছতে চাইলাম হয়তো কিছু গ্লানি। তারপর চোখ চলে যায় মেঘের দেশে। সাধারণত এই হয় আশ্রম। মেঘ! মৈনটের মেঘ!

Comments

comments

Related Post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *