ঋষিধামে কুম্ভমেলায়…

বাঁশখালীল গুনাগরীতে ঋষিধাম।

এক.

কুম্ভ মানে আমি কলসিই জানতাম। কুম্ভমেলার নাম শুনে ভক্তিপ্রবণ বন্ধুরে ভয়ে ভয়ে জিগেশ করলাম, বিষয়টা কী? অবিদ্যায় সর্বনাশ হেতু ‘কুম্ভ মানে কলসি’ বললাম না। তিনি জানালেন, বেশ এলাহি ব্যাপার। একই সঙ্গে কুম্ভমেলা ও ঋষিমেলা হয়। এ মেলার একটা পরম্পরা আছে।

তিনি পরম্পরাকে গুরুত্বপূর্ণ মানেন। আমিও মানি, নইলে বিশ্বজগতরে স্বস্তি পাবো কোথায়। আবার আচানকেও আগ্রহী। যদিও দুনিয়ায় এ দুইয়ের ভাব-বিনিময় খুবই সম্ভব ব্যাপার। আবার দুইয়ের গোড়ায় স্বভাবগত মিল তো থাকে। ‘আচানক’ কোনো ঘটনার কারণ আপাত হাজির না হলেও গোপন কোনো কারণ থাকতেই পারে!

যেহেতু ঋষিমেলা, সেহেতু ঋষিদের ভাব আদান-প্রদান থাকবে। এটাই স্বাভাবিক। ঋষি বলতে আমার কাছে মনে হয় হিন্দু পুরাণের কোনো ব্যাপার অথবা সেক্যুলার পাঠ্যপুস্তকে লেখা ‘ঋষি বসে ধ্যান করে’। রবীন্দ্রনাথ নাকি মহানবী (স.)-কে ‘মহাঋষি’ বলেছিলেন। এটাকে রবী বাবুর ইসলাম সম্পর্কে বলাবলির গুরুত্বপূর্ণ দলিল ধরা হয়। ঋষিদের প্রোটোটাইপ ছবির লগে মহানবী (স.)-কে মিলাইতে পারি না, তাই বলি রবীন্দ্রনাথ হলেন ‘মোল্লার পুত’। তো, ঋষিতে সেক্যুলার ভেক থাকলেও মোল্লায় নিশ্চয় নাই!

যাইতে যাইতে জানতে পারলাম, সাধারণত কুম্ভমেলা প্রতি চার বছর অন্তর হয়। প্রতি বারো বছরে পূর্ণকুম্ভ আর বারোটি পূর্ণকুম্ভ অর্থাৎ প্রতি ১৪৪ বছরে আয়োজিত হয় মহাকুম্ভ।

আমাদের গন্তব্য গুনাগরী বাজার। বাঁশখালীতে যার অবস্থান। কর্ণফুলি ব্রিজ পার হইতে হইতে অথবা তারও আগে মাথায় আসলো— ন্যাশনাল জিওগ্রাফির সে কুম্ভ মেলা নাকি। সেখানে রাজ্যের সাধকরা আসেন। তাদের বেশভূষা যেমন অদ্ভুত অদ্ভুত, ক্ষমতা বা কাজকর্মও তেমন। আর অভাব থাকে না ভক্তি দিতে আসা মানুষের। পরে অনলাইন ঘেটে জানলাম, কুম্ভের কলস বা পাত্র যোগাযোগ আছে। তার আগে শোনা কথা বলি— কলসের নানান প্রতীকি ব্যাখ্যা আছে। বিশেষ করে স্থাপত্যকলায়। হিন্দু স্থাপত্যের মতো মুসলিম স্থাপত্যেও কলস দেখা যায়। হিন্দু স্থাপত্যে কলসির মুখ উপরের দিকে হয়, মুসলিম স্থাপত্যে উল্টো। কোথায় যেন এমনটা পড়েছিলাম!

পরম্পরা : জগদানন্দ, শংকরানন্দ ও অধ্বৈতানন্দ।

হিন্দু পুরাণ মতে, সমুদ্রমন্থনের সময় দেব ও দানব মন্দার পর্বতকে উঠিয়ে নিয়ে এল। বাসুকি নাগ বেষ্টন করলেন সেই মন্দার পর্বতকে। কূর্ম বা কুমিরের রূপ ধরে সমুদ্রে নিমজ্জিত হলেন বিষ্ণু। পিঠে ধারণ করলেন মন্দার পর্বত। সেই পর্বতের আবেষ্টনকারী বাসুকী নাগের দুই প্রান্ত ধরে দেব আর দানব মন্থন করতে লাগলেন সমুদ্র। মন্থনের ফলে উঠে আসে মূল্যবান সামগ্রী, সাথে থাকে অমৃতের ভাণ্ড। কিন্তু দানবকে তো অমৃতের ভাগ দেওয়া যায় না। এ বিচার দেবতাদের সাহায্যের বিনিময়েও দানবরা এর হক্ব পাইলেন না। তাই দেবগুরু বৃহস্পতির তত্ত্বাবধানে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে সেই অমৃতভাণ্ড রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হল ইন্দ্রপুত্র জয়ন্তকে। চন্দ্রকে দেওয়া হল পাহারার ভার। সেই ভাণ্ড অসুরদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য দেবতারা পালিয়ে বেড়ালেন তিন লোক— পাতাল লোক, মৃত্যুলোক এবং স্বর্গলোক। তারা বারো দিন ছিলেন মৃত্যুলোকে অর্থাৎ এই পৃথিবীতে। এই বারো দিন পৃথিবীর হিসেবে বারো বছর। এই সময় এই অমৃতভাণ্ড রাখা হয়েছিল চারটি স্থানে– হরিদ্বার, প্রয়াগ, ত্রিম্বকেশ্বর, নাসিক ও উজ্জয়িনী। এই চারটি স্থানে কলস থেকে অমৃতরস ক্ষরিত হয়েছিল; তাই এই চারটি স্থান অমৃতসুধারস বিজড়িত। আর ন্যাট জিওতে আমরা এলাহাবাদের প্রয়াগের কুম্ভমেলাই দেখেছি। সমুদ্রমন্থনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ শিব। মন্থনের ফলে উঠে আসা বিষ নিজের গলায় ধারণ করে দুনিয়াকে রক্ষার বদলে তার গলা হয়ে যায় নীল, আর গলায় প্যাচানো ঠাণ্ডা সাপ তাকে শান্তি দেয়। কুম্ভ মেলায় শিবের মূর্তি দেখেছিলাম। আর সমুদ্র থেকে উঠে আসা দেবীর মূর্তি পুরাণের কথা মনে করিয়ে দিল। আরো মনে হল দেবতা ও দানবদের মুখোমুখি করে পাঠের কিছু সমস্যা বোধহয় আছে!

অন্যভাবে বললে, বারো বছর অন্তর হরিদ্বার প্রয়াগ প্রভৃতি তীর্থস্হানে কুম্ভ রাশিতে সূর্যের সংক্রমণ বা প্রবেশ উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত বিখ্যাত মেলাবিশেষ যা কুম্ভমেলা নামে পরিচিত।  উইকিপিডিয়া বলছে, কৃম্ভ রাশি মকর রাশির পূর্বে অবস্থিত। পেগাসাস বর্গ এবং দক্ষিণ মীন মণ্ডলের ফোমালহট তারার মাঝে তিনটি তারা দিয়ে একটি সমবাহু ত্রিভুজ আাঁকা যায় যা হল কলসের মুখ। দক্ষিণের তারাগুলোর পূর্বের বাঁকানো সারিটিকে পানির ধারা কল্পনা করা হয়, অর্থাৎ কলসের মুখ থেকে পানি গড়িয়ে নিচে পড়ছে। পানির এ ধারাটি নিচে দক্ষিণ মীনের মাছের মুখে পড়তে দেখা যায়।

শুধু গুনাগরীই নয়, বাংলাদেশের আরো দুয়েক জায়গায় কুম্ভমেলা হয়। যেমন মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ীর দীঘিরপাড় শ্রীশ্রী গনেশ পাগল সেবাশ্রমে।

ঈশ্বরীর দশ রূপ

গুনাগরীতে এ মচ্ছব হয় ঋষিধামে। বাজারের মাঝের রাস্তা ধরে আগাইতে সাদা ধবধবে ফটক দেখা যায়। তার উপ্রে একটা সাদা ষাঁড়ের মূর্তি। আরো উপরে মাঘের শেষদিকের চাঁদ দিনের বেলায়ও আধখানা হয়ে উঁকি দিচ্ছিল। আমরা ওইদিকে মানে চাঁদ সমেত গেটের নিচ দিয়ে যাবো। একটা গরুর নিচ দিয়ে যাওয়া ভাবতে এখন অস্বস্তি হচ্ছে, তার উপর ধর্মীয় প্রতীক। উর্বরতার প্রতীকও প্রাচীন কোনো কোনো ধর্মে। কিন্তু হলফ করে বলা যায়, আমরা কখনো চাদেঁর নিচ দিয়ে যাইতে পারি না। সেদিনও না।

গেট পার হওয়ার আগেই হাতে ডানে পড়ল বিশাল একটা প্রিন্টেড ব্যানার। ইসকনের পক্ষ থেকে তীর্থ দর্শনের আমন্ত্রণ। ভারতের অনেক ধর্মীয় স্থানের পরিচয় পাওয়া গেল। এর মধ্যে ইন্টারেস্টিং হলো তাজমহল। এটা তবে হিন্দু ধর্মীয় স্থান হলো? আরেক অযোধ্যা নয়তো! এর পাশে পাইলাম মহাভারতের সেই কুরুক্ষেত্র। যেখানে কুরু ও পাণ্ডবদের মধ্যে যুদ্ধ হয়। তাজমহলের পাশে কুরুক্ষেত্র দেখলে কার না ভয় লাগে! আমারও লাগলো। এ নিয়া রাস্তার মাঝে দাঁড়ায়া বাতচিত করতেছিলাম— বুঝতে পারি নাই। মাইকে ঘোষণা এলো যাতে মাঝ রাস্তা থেকে সরে আসি।

দুই.

ঋষিধামের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীমৎ স্বামী অদ্বৈতানন্দ পুরী মহারাজ। আমি গৌরাঙ্গ সহচর অদ্বৈতের সঙ্গে মিলায়া ফেলছিলাম। ইনি ততটা প্রাচীন নন, উনার দেহাবশেষ আছে চট্টগ্রাম শহরের একটা ধামে। এখানে ‘পুরী’ মানে যিনি নগরে সাধনা করেন। পবর্তে সাধনা করলে তার নামের সঙ্গে থাকতো ‘গিরি’। অদ্বৈতানন্দের গুরু হলেন শ্রী শ্রীমৎ স্বামী শংকরানন্দ পুরী মহারাজ। তার গুরু হলেন শ্রী শ্রীমৎ স্বামী জগদানন্দ পুরী মহারাজ। বর্তমানে ধামের দায়িত্বে আছেন শ্রীমৎ স্বামী সুদর্শনানন্দ পুরী মহারাজ। সুদর্শনানন্দকে এক নজর দেখেছিলাম। প্রণাম আর সেলফির ভার বহন করে চলা উজ্জ্বল একজন মানুষ।

শিব, হনুমান ও অন্য একজন

বারোয়ারি মেলা বাদ দিলেও আয়োজনটা বেশ বড়। ১৯৫৭ সাল হতে এই ঐতিহ্যবাহী ঋষিকুম্ভ ও কুম্ভমেলা হয়ে আসছে। যার অনুষ্ঠানসূচির মধ্যে রয়েছে— ঋষিধ্বজা উত্তোলন, দশমহাবিদ্যা ও প্রতিমা পূজা প্রদর্শনী, গুরুমূর্তি স্থাপন, সাধু সন্ন্যাসী ও বৈঞ্চব সম্মেলন, নাটক, মাতৃ সম্মেলন, অন্নকূট, ষোড়শপ্রহরব্যাপী মহানামযজ্ঞ, বিশ্বকল্যাণে পঞ্চাঙ্গ স্বস্ত্যয়ন ও শান্তিহোম, ভুবনমঙ্গল গীতাযজ্ঞ, ধর্মীয় সঙ্গীতাঞ্জলি, দীক্ষাদান, দিবা-রাত্রি প্রসাদ বিতরণ ও প্রভৃতি। এবারের কুম্ভ অনুষ্ঠিত হচ্ছে ২২ থেকে ২৯ মাঘ ১৪২৩ বঙ্গাব্দে (৫ থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫)। আর অনুসরণ করা হয় পূর্ণকুম্ভ।

ধ্যান মন্দিরের সামনে বিশাল মাঠজুড়ে সামিয়ানা। মূলমঞ্চে নানান ঢঙের ধর্মীয় গান হচ্ছে। কিছু কিছু গানের আকুতি মনকে দ্রবীভূত করার মতো। বিকেলের দিকে রাজনৈতিক নেতা ও ধর্মীয় নেতারা মিলে সেখান থেকে অসাম্প্রদায়িকতার জয়োগানও গাইলেন। সামিয়ানার নিচে চাটাই পেতে বসে বা শুয়ে আছেন অনেকে। রাত্রিযাপনও করেছেন এখানে। তার চিহ্ন যত্রতত্র। এ ব্যাপারটা ছেউড়িয়ায় লালনের আখড়ায় খুবই চোখে পড়ে।

ঘুরতে ঘুরতে প্রথম চোখ আটকে গেল এ গুচ্ছ ছবির দিকে। প্রথমে আলাদা আলাদা মনে হলেও পরে বুঝতে পারলাম সব ছবিতে একজনই— অদ্বৈতানন্দ। অনেকটা মঙ্গোলীয় ধাঁচের চেহারা উনার। এমন ছবির সামনে চোখে পড়ল অদ্ভুত গাছটা। প্রথমে ভেবেছিলাম খোসা ছাড়িয়ে নেওয়া পাকা নারকেল দিয়ে গাছটা সাজানো হয়েছে। কিন্তু কাছে গিয়া খেয়াল করলাম- নারকেলের মতো জিনিসটা আসলে ওই গাছের ফল।

মানত করে জ্বালানো মোম ও নাম না জানা বৃক্ষ।

এর পাশ দিয়ে যাইতে গিয়া একই নারীর ১০ রূপ দেখে থমকে গেলাম। অনেকে ১০টি রূপকে প্রনাম জানাচ্ছিলেন। দেখে দুর্গাই মনে হলো। কিন্তু ১০ রূপের কোনোটির নামই দুর্গা নয়। পরে জানলাম ঈশ্বরীর ১০ রূপ। যিনি দুর্গাও। এমনকি এ ধামের কৃষ্ণের বান্দনা যেমন দেখলাম, তেমনি শিবের আবক্ষ মূর্তিও দেখলাম। তাদের মাঝে সম্পর্ক কী? জানি না। তবে শুনেছি শিবকে কৃষ্ণ আর কৃষ্ণকে শিবের নাম নিতে হয়েছিল! একটা ব্যাপারটা এমনই— শিবের সম্পর্ক কৃষির সঙ্গে, অন্যদিকে কৃষ্ণ পশুপালন করেন শৈশবে। রাজনীতির সঙ্গেও তার সম্পর্ক।

কুম্ভর সঙ্গে নদীর যোগ আছে। কুম্ভমেলা নদী কেন্দ্রিক। প্রতি মেলাস্থলের সঙ্গে এক বা একাধিক নদী জড়িয়ে আছে। কারণ বিশেষ বিশেষ তিথিতে পুণ্যস্নানই হলো কুম্ভমেলার প্রধান অঙ্গ। যেমন ভারতে এলাহাবাদে মেলা বসে গঙ্গা-যমুনা ও অন্তঃসলিলা সরস্বতীর সঙ্গমে। আর হরিদ্বারে বইছে গঙ্গা, উজ্জয়িনীতে শিপ্রা এবং নাসিকে গোদাবরী। গোদাবরী তীরে নাসিকে পুণ্যস্নান হয়। বৈষ্ণবরা স্নান করেন নাসিকের রামকুণ্ডতে আর শৈবরা স্নান করেন নাসিক থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে ত্র্যম্বকেশ্বরে। কিন্তু এখানে নদী নাই। তবে পূণ্যস্নান আছে। পুকুরে। বিশাল পুকুর। স্নানের দুটো রাস্তা আছে। একটার গেটের মাথায় দেখলাম হনুমান। অন্যটার মাথায় সমুদ্র থেকে উঠে আসা এক দেবী। চিনলাম না। সে গেটের পাশে শঙ্খ হাতে দাঁড়ানো একজন পুরুষ। এটা সম্ভবত সমুদ্র মন্থনের স্মারক আকারে নির্মিত।

মঞ্চ বরাবর এক জায়গায় বেদিমতন জায়গা। যেখানে জ্বলছে মোমের আলো। মোমের কোমল এ আলো সম্মিলিতভাবেও কোমল থাকে না। আর সবকয়টি বাতি মানুষের কামনা-বাসনার প্রতীক। একসঙ্গে জ্বলে উঠলে কতই না কিছু ঘটে। এখানে একই ধর্মের তবু কত বিচিত্র মানুষের আসা-যাওয়া, কিন্তু কামনা-বাসনার ক্ষেত্রে ভিখ মাখার উপলক্ষ সত্যিই তো কম।

এর বরাবরে রয়েছে ধ্যান মন্দির। যার ফটকে নীরবতা পালনের কথা বলা হয়েছে। আর বলা হয়েছে— নারীরা যেন মাথা ঢেকে রাখেন। উঁকি দেখলাম নীরবতা বহমান। এরপর এ লেখা নিয়াও আগাইতে ইচ্ছে হলো না। থাকি না নীরব হয়ে।

তথ্যসূত্র : গুগল সার্চ ইঞ্জিনে প্রাপ্ত একাধিক পোর্টাল।

Comments

comments

Related Post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *