অর্থহীন মুভি নিয়ে অর্থহীন কথন

নিজের জ্ঞানবত্তাকে বিদ্রুপ করার জন্য নিজের নির্বুদ্ধিতা দেখানোর মধ্যেই কি জীবনের সবচেয়ে গুরুভার নয়? – ফ্রেডারিক নীটশে

নিজেকে এমন করে কে পারে দেখতে! নীটশের কথায় যদি ধরি তবে আত্মার ক্রমবিবর্তনের ধারায় নিজের নঞর্থক (এমন শব্দ ব্যবহারে দ্বিধা আছে, তবু্ও) রূপটি আমরা দেখার চেষ্টা করি। দেখলে সেটা কেমন? নিচের কথাগুলোর সাথে হয়ত উপরের কথাগুলোর কোন নির্যাসগত মিল নাও থাকতে পারে। যেহেতু কথাগুলি স্বঘোষিত অর্থহীন মুভি নিয়ে, তাই ক্ষমা সুন্দর দুষ্টি কামনা করছি। তবুও বলি, জীবনের যে রূপটিকে আমরা অর্থপূর্ণ বলে ধরে নিই তার বিপ্রতীপ একটা দিক আছে। তবে সেটাকে আলোর বিপরীত অন্ধকার ধরে হাঁটলে চলে কি? বরং তাদের মধ্যে কখনো কখনো পরিপূরক রূপ দৃষ্ট হয়। তখন বলতে ইচ্ছে করে। দুটো মিলেই তো এই আমি।

নয় নম্বর বিপদ সংকেত হুমায়ূন আহমেদের শেষদিকের মুভিগুলোর একটি। এই মুভি সম্পর্কে হুমায়ূন আহমেদ নিজে বলেছেন এটা একটি অর্থহীন মুভি। এটাই এই মুভির ট্যাগ লাইন। আক্ষরিক অর্থে অর্থহীন শব্দটি কি বুঝায় সে দিকে না গেলেও এরমধ্যে একটা আয়রনি থাকে। কেন না, আমরা দেখি অর্থহীন বলে আমরা যা প্রকাশ করি না কেন তা এক অর্থে কোন না অর্থ নিয়ে হাজির হয়। হাজির হয় এই অর্থে যে সে গরহাজির হয়ে অন্য কিছুকে উদ্ভাসিত করে। এই মুভির কি তেমন কোন দ্যোতনা আছে? আমি নিশ্চিত নয়। তবে খেয়াল করার বিষয় এটাকে অনর্থক বা নিরর্থক মুভি বলা হয় নাই। সে বিষয়ে হুমায়ূনের জবান থেকেই শুনা যাক-

noy-number-bipod-sonket‘আমাদের যে সমস্ত কর্মকাণ্ড খুবই অর্থপূর্ণ, খুবই গুরুত্বপূর্ণ সেগুলোতে আনন্দ নাই। আনন্দ কোনগুলোতে থাকে? যেগুলো অর্থহীন। সে অর্থে এটাকে আমি অর্থহীন ছবি বলতে পারি। দ্বিতীয়ত: আমি রসিকতা খুবই পছন্দ করি, বানালাম একটা হাসির ছবি, কোন রসিকতা করলাম না, দিয়ে দিলাম একটি অর্থহীন ছবি। লোকে চিন্তা ভাবনা করবে ব্যাপার কি অর্থহীন নাকি অর্থপূর্ণ। এখন সমস্যা হলো কি! আমি যখন রসিকতা করি সবাই ভাবে সিরিয়াস কথা বলছি আর যখন সিরিয়াস কথা বলি সবাই ভাবে এটা রসিকতা। এটি রসিকতা ছাড়া কিছুই না। তারপরও যদি দর্শকরা মনে করেন আসল ব্যাপারটা কি? তারা হাসেন। হলে এসে দেখেন, তারপর নিজেরা নিজেরাই ঠিক করেন এটি অর্থহীন ছবি নাকি খুবই গুরুত্বপূর্ণ অর্থপূর্ণ ছবি’।

তার মানে হলো, সিরিয়াস কথার সাথে রসিকতার যেমন সম্পর্ক থাকতে পারে তেমনি রসিকতার সাথে সিরিয়াস হবার ব্যাপারটা ঘটতে পারে। ভাবাভাবির একটা রেশ তো পাওয়া গেল। আপাতত সেদিকে না গিয়ে মুভির কাহিনিতে ঢুঁ মারা যাক-

সোবহান সাহেব বৃষ্টিবিলাস নামের বিশাল একটা বাড়িতে কাজের লোকদের নিয়ে একা থাকেন। কিন্তু তার মনে কোন আনন্দ নাই। তার দুই মেয়ে আর এক ছেলে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত। অনেকদিন তারা বাবাকে দেখতে আসেন না। সোবহান সাহেব ভাবেন বৃষ্টিবিলাসে আনন্দ ফিরিয়ে আনা যাবে- যদি তার সন্তানরা বেড়াতে আসে। তিনি ম্যানেজারকে পরিকল্পনা করতে বলেন- কি করে তাদের আনা যায়। ম্যানেজার বুদ্ধি করে বলেন, সবাইকে খবর পাঠাতে হবে সোবহান সাহেব মারা গেছেন। এই খবরে সবাই আসে। এরপর হুমায়নী স্বভাব মতই ঘটতে থাকে মজার সব ঘটনা। এরমধ্যে হাজির হন এক রহস্য মানবী। যিনি ভালো গান করেন- শুধু তা নয়, পুরুষের গলায় গান ও কথা বলতে পারেন।

মোটামুটি এই হলো নয় নম্বর বিপদ সংকেতের কাহিনি। এরমধ্যে হুমায়ূনের আরেকটি কথা শরণ নেয়া যায়- তিনি বলেন, এটি এক অর্থে অর্থহীন। কারণ চ্যানেল আই অভিনেতা অভিনেত্রীদের খুব কমই অর্থ দিয়েছে। এই কথা ফাঁস করা হুমায়ূনের রসিকতা বটে। কিন্তু সবোর্পরি রসিকতার চেষ্টার যে কথা বলা হচ্ছে সেটার গুরুত্বপূর্ণ একটা দিক হচ্ছে- বাংলাদেশে হাসির ছবি বা কমেডি মুভি আসলে কম দেখা যায়। আমাদের সময়ে শহীদুল ইসলাম খোকনের ‘পালাবি কোথায়’ বা ‘ভণ্ড’র মতো খুব কম মুভির নামই বলা যায় যেগুলোকে সফলভাবে কমেডি বলা যায়। দূর অতীতে তাকালে অন্যের মুখে শুনা ‘১৩ নং ফেকু ওস্তাগার লেন’ ছাড়া অন্য কোন মুভির নাম মাথায় আসছে না। এর একটা মানে হতে পারে জাতি হিসেবে আমরা সিরিয়াস। সেটা বাদ দিয়ে বললে জেনর হিসেবে কমেডি বানানোর চেষ্টার সাধুবাদ জানাতে হয়। এক অর্থে আমরা হুমায়ূনী ঢঙয়ের সাথে পরিচিত- সেখানে হাসানোর যথেষ্ট চেষ্টা ছিল। কোথাও কোথাও মনে খুলে হেসেছি বলতে দ্বিধা নাই। তবে বৃদ্ধিবৃত্তিকভাবে নিজেদের ঋদ্ধ দাবি করেন- এমন লোকেরা এই মুভি পছন্দ নাই করার কথা। কারণ, এই মুভিতে ভোঁতামুখো হয়ে বসে থাকার কিছু নাই। এখানে হুমায়ূনকে ধন্যবাদ- তিনি ভোঁতামুখো কোন অ-বিনোদন উপহার দেন নাই। কিছু ক্ষেত্রে যে অতিরসিকতা বিরক্ত করে নাই- তা নয়। তবে সে কথা আজ থাক।

কিন্তু অর্থপূর্ণ আর অর্থহীনতা নিয়ে মনে দ্বিধা থাকে। এরমধ্যকার ভেদরেখা কি? ভেদরেখা খোঁজার মধ্যে জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তোলার একটা বাসনা আছে। এই বাসনার মধ্যে দেখা যায় আমরা এমন কিছু অনুঘটক বা প্রভাবকের দ্বারা আচ্ছন্ন হই আসলে আমরা সচেতনে প্রায়শ খেয়াল করি না- কিন্তু কিছু অযৌক্তিক ঘটনা আমাদের জন্য দারুন প্রনোদনা হয়ে কাজ করে। সেক্ষেত্রে এই অর্থহীনতার দিকে পক্ষপাতিত্ব আমার ঢের আছে। এটা আসলে নিজের অন্তর্গত স্বরূপের বিষয়। আমরা যখন যুক্তি-তর্কের ভেতর দিয়ে এই জগতের সাথে পরিচিত হতে চাই অথবা সবকিছুকে যৌক্তিক মোড়কে ধরতে যায়- আমাদের হাত ফসকে অনেক কিছু পড়ে যায়- যেগুলো হয়তো আমরা সচেতনে খেয়ালই করি না। এটা প্রকৃতির সঙ্গতি। এটাকে যখন যুক্তিতর্কের দুনিয়ায় তুলে আনতে চাই নানা ধরণের ঘটনা ঘটতে পারে। যেমন- কখনো অতি বাড়াবাড়ি হয়। কখনো বা বিশেষ ভঙ্গিমার মাধ্যমে সেটাকে আমরা শিল্প বলে থাকি। তবে পুরোটায় রিপ্রেজেন্টশনের খেলা। সেখানে হুমায়ূনের নিজস্ব রীতি আছে। সেটা কারো বা ভালো লাগে, কারো লাগে না। সেসব কথা না বাড়িয়ে আমি বলতে চাই হুমায়ূন এই মুভিতে যুক্তি-তর্কের দুনিয়ার অযৌক্তিক অনুঘাটককে তুলে ধরেছেন। যার দার্শনিক মর্ম হলো- মানুষকে সম্পন্ন করে জানতে গেলে তার এই দিকটাও জানা বা ধরা দরকার।

noy-number-bipod-sonket2আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে এই আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা যায়। সেটা শুধু এই মুভি সম্পর্কেই নয়। শুধু এই মুভি নয় হুমায়ূন আহমেদের লেখালেখির ধরণও এর সাথে জড়িত। হুমায়ূনের গল্প বলার ঢংয়ের মধ্যে ঐতিহ্যিক একটা বিষয় আছে। অনেকটা বলা যায় তিনি বৃহত্তর ময়মনসিংহের গল্প বলার ঢংটি ব্যবহার করেন। যেখানে গল্পের বিষয়টি আপাত তুচ্ছ বা অর্থহীন। আলোকিত সিরিয়াস পাঠকের মনে হতে পারে- এরমধ্যে তো সিরিয়াস কোন বিষয় নাই, খামাকা ঠাট্টা তামাশা। এইখানেই মুশকিল। আপনি যদি কোন অর্থ খুঁজতে চান- পেয়েও যেতে পারেন। নয়তো নির্মল হাসি ঠাট্টা। এই ধরণের গল্পের প্রচলন রয়েছে ময়মনসিংহ অঞ্চলে। রীতিমত সংকলন পাওয়া যায় বাজারে। তবে এই আলোচনাকে আমরা তুল্যমূল্যের দিকে নিয়ে যাবো। অর্থহীনতার ব্যাখ্যার সাথে হুমায়ূনের সৃষ্টিকর্ম নিয়ে একটা নোক্তা দেয়া মাত্র।

শেষ করার আগে আরো কটি বিষয়ে প্রশংসা করে নিই। চিত্রনাট্য অনুযায়ী সবাই দারুন অভিনয় করেছেন। মুভির গান ভালো আমার দারুন লেগেছে- বিশেষ করে গানের কথাগুলো। সব মিলিয়ে তুলনারহিত স্বঘোষিত একটা অর্থহীন একটা মুভি হয়ে দাড়িয়েছে নয় নম্বর বিপদ সংকেত।

এইসব কথা কি মানে দাড়ালো সেটা পাঠক বিবেচনা করবেন। হতে পারে রসিকতাহীন অর্থহীন কথাবার্তা। আমি নয় নম্বর বিপদ সংকেতের মতো করেই বলছি- আমার কথাটি ফুরোলো, নটে গাছটি মুড়োলো নাকি নটে গাছটি মুড়োলো, আমার কথাটি ফুরোলো।

অভিনয়: রহমত আলী, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, চ্যালেঞ্জার, দিতি, স্বাধীন খসরু, শবনম পারভীন, তানিয়া আহমেদ, চৈতি, রূপক, মাজনুন মিজান, তানিয়া সুলতানা মুন্নী ও আসাদুজ্জামান নুরসহ অনেকে
কাহিনি, চিত্রনাট্য, সংলাপ ও পরিচালনা: হুমায়ূন আহমেদ
প্রযোজনা: ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড
চিত্রগ্রহণ: মোস্তফা কামাল
সম্পাদনা: তৌহিদ খান বিপ্লব
গীতিকার: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও হুমায়ূন আহমেদ
সংগীত: এস আই টুটুল
মুক্তির তারিখ: ৬ জুলাই ২০০৭
রেটিং: ৬/১০

…………………………………………………………………….

*লেখাটি ই-ম্যাগাজিন ‘মুখ ও মুখোশ’ এর অনুরোধে প্রস্তুতকৃত। এ ছাড়া প্রকাশিত হয় মাসিক দখিনা’য়।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *