হরতালের দিনে বই মেলা

গাড়ীর হেলপার দশ টাকার ভাড়া পনের টাকা দাবি করলেন। কারণ হরতাল। যাত্রীর দাবি আগের ভাড়াই অনায্য, সেখানে বাড়তি কেন। তারপর বলে, যা। পাঁচ টাকা বেশি দিলাম খুশি তো। হেলপার খুশি হলো কিনা বুঝা গেল না। তবে সাবধান করে দেয় জানালার কাঁচ দুটো যাতে একসাথে খোলা না হয়। সিঙ্গেল কাঁচ ভাঙ্গলে গায়ে পড়তে পারে। ভালো কথা। এইগুলা সব ৫ ফেব্রুয়ারীর কথা। আগে বলি নাই আজকে বলি। আজকেও হরতালের দিন।

হরতাল নাই এমন দিনের বইমেলা। ফটো: ইন্টারনেট।

হরতাল নাই এমন দিনের বইমেলা। ফটো: ইন্টারনেট।

লোকজন কম, গাড়ি কম, রাস্তা ফাঁকা। শাহবাগ পৌছতে বেশি সময় লাগল না। আচ্ছা, এমন একটা হরতাল কি হতে পারে না- যে হরতালের দিনে লোকে সকল তাল বন্ধ করে পড়ার তাল করবে। শহর জুড়ে বই মেলা। বেকারী থেকে গরম গরম পাউরুটির কেনার মতো লোকে বই কিনবে। গরম পাউরুটি একবার খেলে সারা জীবন মনে থাকে। নতুন বইয়ের কি এমন কিছু আছে? আছে তবে অন্য রকম। নতুন বই ছুয়ে দেখার, শুঁকে দেখার অনুভূতি আলাদা। বাহ্যিকভাবে গরম না হলেও স্বাদটা তো গরম গরম। বইমেলায় এসে লোকে গরম বইয়ের খোঁজ করে। মানে নতুন বইয়ের খোঁজ করে। এই একমাসে বই যে পরিমান উত্তাপ উৎপাদন করে সে তুলনায় অন্য মাসগুলো নস্যি। অন্য মাসগুলোতে কিছু ব্যালেন্স হওয়া দরকার।

শাহবাগ জুড়ে কাদের মোল্লার রায় বিরোধীদের মানব বন্ধন। হরতালে অন্যমাত্রা তৈয়ার করেছে। ছবির হাট পেরুতে পেরুতে ভাবছিলাম হরতালে বইমেলা জমবে তো। কলেরার দিনে যদি মহব্বত হয়, হরতালের দিন বইমেলাও জমতে পারে।বইয়ের মহব্বত তো কম জোরালো না। যখন নাকি কেউ তাকে না, শুধু বইই থাকে!

আজ মেলার সপ্তম দিন হলেও দুটো ষ্টল পাওয়া গেল- যারা আজ পসরা সাজাচ্ছে। কয়েকটা লিটলম্যাগের ষ্টলও খালি। ষ্টলের মাথায় নামগুলো জ্বলজ্বল করছে। খালি পাওয়া গেল একটা টিভি চ্যানেল ও ব্যাংকের যৌথ ষ্টল।

মিডিয়া সেন্টারের সামনে বরাবরে মতই ভীড়। একটা অংশ বড় সময় ধরে টিভি ক্যামেরার দখলে থাকে। নামি-দামি লোকেরা সাক্ষাৎকার দেন, তাদের বই নিয়ে বলেন। এছাড়া নানান বেশভুষার মানুষেরা গাঁদা ফুল গাছে ঘেরা ভাষা শহীদদের ভাষ্কর্যের সামনে ফটো তুলে। হাসি হাসি মুখে সুখী চেহারার ফটো। ফটো তোলার আরেকটা স্থান হলো বাংলা একাডেমীর নতুন ভবন। এই ভবনের দেয়ালে নজরুল, লালনসহ আরো কজনের লাইন লেখা আছে। এইসব ক্যামরায় পুরো না আসলেও তরুণীরা ফটো তুলতে পোজ দাড়াঁয়। এক পলক ঘুরে আসলে বেশ দেখা যায়। এছাড়া টিভি ক্যামেরা তো আছে- কখন কোন ক্যামেরায় ধরা পড়ে যাবেন- তার ঠিক নাই। এরা যে পরিমাণ সাক্ষাৎকার আর মানুষের ভিড়-ভাট্টা দেখায়, সে পরিমাণে বই নিয়ে প্রোগ্রামই করে না। ইহা ফেব্রুয়ারীর অগ্রাহ্য গরম। বাংলাদেশের শিক্ষিত মানুষরা অগ্রাহ্য করতে পারে না।

মিডিয়ার সেন্টার সামনেই ছিলেন কবি সাখাওয়াত টিপু এবং শিক্ষক ও নাট্যকার শাহামানা মৈশাল। টিপুর নতুন কোন বই আসে নাই। তবে আলোচনায় আছে গতবছর বের হওয়া ‘কার্ল মার্কসের ধর্ম’ বইটি। মৈশাল জানালেন এই বছর কোন বই আসে নাই। আগামীবছর হয়তো অনেকগুলো বই আসবে। লিটল ম্যাগ প্রাঙ্গনে আসতে আসতে কথা এসে দাঁড়ায় ক্যামেরা ও টেকনোলজিতে। ঢাকা শহরের যেখানে যান সর্বদর্শী ক্যামেরা এসে হাজির হবে। শোবার ঘরে আছেন, ক্যামেরা থেকে নিস্কৃতি নাই। মৈশাল বলেন, মোবাইল একটা ফ্যাসীবাদী বস্তু। সে সবখানে হাজির। যেকোন মুহুর্তে একটা কল এসে আপনার মুহুর্তেই পাল্টে দিতে পারে।এই কথা শুনতে শুনতে কখনো কানে এসে আচড় দেয় মেলা মঞ্চের পল্লীগীতি। আরো আরো কথার মাঝে হাজির হয় হরতাল, রাজনীতি, ফাসিঁ, যাবতজ্জীবন।

সন্ধ্যার পর থেকে মেলার দর্শনার্থী বাড়তে থাকে। সম্ভবত এই কয়েকদিনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ছুটি ছুটি আমেজ লক্ষ্যনীয়। আরো লক্ষ্যনীয় খুব কম সংখ্যক মানুষই বই কিনছে। সেটা মেলার বাহির হবার পথে ঢের টের পাওয়া গেল। বেশির ভাগের হাতেই কোন বই নাই। হরতালের তালহীনতা বই মেলায়ও লেগেছে।

এই বইমেলা উপলক্ষ্যে তৈয়ার করা আরো ক’টি লেখা:

তানানুম তানানুম

বই কেনার রকমফের

কবিতা ও বন্ধুর বইমেলা

সর্বনিম্ন পঞ্চম শ্রেণীর শিশু

Comments

comments

9 thoughts on “হরতালের দিনে বই মেলা

  1. এবারের বই মেলার আকর্ষন অনেক কম। আমি কয়েকবার গিয়েছি। ৫ টা বই কিনেছি। আর যেতে ইচ্ছা হচ্ছে না। শাহবাগেই আড্ডা ও প্রতিবাদ ভাল লাগছে।

    • আকর্ষন কমেরে ব্যাপারটা বইমেলায় গেলে টের পাওয়া যায়। কি কি বই কিনলেন? মেলায় আসলে আগে আগে জানাইয়েন। মোটামুটি প্রায় দিনই যাওয়া হয়।

    • ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে চলি। সাধারণত একুশ তারিখ যাওয়া হয় না।
      গেলে অবশ্যই আপনার খোঁজ করব। ভালো আছেন নিশ্চয়।

  2. একুশে বই মেলায় কখনো যাওয়া হয়নি। তবে গত ডিসেম্বরের শেষের দিকে কাজের সুবাধে ঢাকায় যাওয়ায় বাংলা একাডেমীতে গিয়েছিলাম। পরিবেশটা বেশ সুন্দর। তবে আপনার এই লেখার ২টি লাইন বেশ মনে ধরেছে।

    “নতুন বই ছুয়ে দেখার, শুঁকে দেখার অনুভূতি আলাদা। বাহ্যিকভাবে গরম না হলেও স্বাদটা তো গরম গরম।”
    ব্যাপারটা আসলেই ঠিক!

    • এইবার তো আসার টাইম আর নাই।
      সুযোগ পাইলে সামনেবার চইলা আইসেন। অনেকে এই মেলার জন্য এক বছর অপেক্ষায় থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *