শব্দান্ধ সন্ধ্যা এবঙ তুমি

মেঘলা আকাশ। দিনমানে সন্ধ্যা হয়ে এলো। ধূসর তার দিগন্ত। অসীম দূরত্ব পেরিয়ে রাত্রি এলো শব্দের নিরবতায়। প্রতিক্ষার বিকিকিনি শেষ হলো। রাত্রি যেন ভোরের প্রতিচ্ছবি।

আমি একা এবঙ একটি প্রজাপতি।

রাত্ভর মেঘ আর বিদ্যুতের আনাগোনা। বৃষ্টি আর ঝরে না।

‍‍‘মেঘ তুমি দূরে কেন? বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ো’।
সে বলে, ‘মেঘই ভালো’। হয়তো পাখনা মেলে ভেসে থাকতে চায়। অনন্তকাল।
আমি বললাম, ‘অলীক কল্পনা’।
সে বলল, ‘অলীক বলে কিছু নাই। অন্য এক জগত, এই জগতের চেয়েও সত্য। পার্থক্য হলো এই জগতে আমরা ইচ্ছেগুলোকে দেখতে পাই না, আর সেখানটায় ইচ্ছেরাই তুমি-আমি হয়ে ঘুরে বেড়ায়’।
আমি অবিশ্বাসের সাথে বলি, ‘আচ্ছা এই তবে সেই কথা, তুমি আমি নই দূর’।
সে হেসে উঠে।
আমি বলি, ‘হেসে উঠো পাখি,ফুলের ঘুম ভাঙ্গিয়ে দাও।বৃষ্টি আর জোছনা হাত ধরাধরি করে হাটুক। সকলে জেগে উঠুক, দেখুক এই রুপ রসের অনাঘ্রাত দুনিয়া’।
সে গান গেয়ে উঠে। এই জগত থেকে যেন দূরে সরে যেতে চায়। আমি লাগাম ধরে টান দিই। সে বিরক্ত হয়ে গান থামায়।
আমি বলি,‘তোমাকে সত্য দুনিয়ার বাইরে উড়াল দিতে দেবো না’।
সে বলে,‘সত্য কি এতই সহজ’।
আমি ঠাট্টা করি,‘সহজ কথা নয়তো সহজ’।

সে কটাক্ষ হেনে বলে,‘তাই বুঝি’।
‘যে আমার অন্তরে সে কোথায়’?
আমি হতকচিত হয়ে বলি, ‘কে’?

সে আবার বলে। আরেকটু উচ্চ লয়ে। আবারও বলে, আবারও। তার পৌনঃপুনিক আকুলতা আমায় বিহ্বল করে। ভাবি, একি! আমার কথা বলছে। আমি কি সে নই!কেউ একজন বলে,সে মনের মানুষের কথা বলছে। আমি বলি, এই তো সে কথা, আমার কথা। ভেতরের আমি বলে উঠে, ভালো করে শোন।

আমি ক্রমশ যেন দূরে সরে যাই। তীব্র যন্ত্রণায় গাঢ় হই। আমি ঝাপসা চোখে তার দিকে তাকাই।

তার চোখে জল
আমার চোখেও জল। এভাবেই কি আকাশের মেঘেরা বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে! একি মেঘমল্লার রাগিনী!

তুই মেঘ হয়ে ছিলি আমার ভেতর ..
আমি কখনো বুঝিনি কেন এই ক্ষরণ।

আমার মেঘের আকাশ
অন্ধকারে তার বিলয় ঘটে
তুই বুঝি সেই অন্ধকারে মিটমিট তারা।

আমাদের এই ইতিহাসহীন নৈর্ব্যক্তিক জীবনে
দুরত্বে ক্রমশ নিমজ্জন ঘটায় বোধের অসারতা।

আমি ছিলাম না,
তুইও ছিলি না।

শুধু একটা কালো পাথরে লেখা ছিলো,
সেই কাব্যিক বেদনা-
তাহাদের কখনো দেখা হয় না।

…………………………
আরেকটি ভোর আসে দূরত্ব নিয়ে,বৈপরীত্য নিয়ে।
আমি হেটে চলি তার বিপরীতে। এখনো চারদিকে রাত্রির ফিসফিসানী। মেঘেরা বাড়ি ফিরে গেছে। রোদ্দুরে থৈ থৈ আকাশ। নতুন শীতের আমন্ত্রণ।

ভোরের আলোতে নিজেকে বড়ো নিঃসঙ্গ মনে হয়। শিশির দল এই পথে হেটে গেছে। ভেজা ভোরের ভেজা ঘাসের উপর হেটে গেলাম অনেক দূর। যেখানে আকাশ আর পৃথিবীর একাকার। না দিবস না রাত্রির বিচরণ।আমি আর নিজেকে আলাদা করে চিনতে পারি না। ক্লান্তি আসে না।

কি সব ভাবছি। বৈপরীত্যহীন জগতে কিসের আনন্দ।

আমি রাত্রির অপেক্ষায় থাকি। আমি নিজেকে চিনতে চাই।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.