ভালো মুসলমান হওয়ার সহজ উপায়

এই চলচ্চিত্রটা মুক্তি পাওয়ার আগেই বিস্তর আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্র হয়ে উঠছিল। এক পর্যায়ে শাহরুখ খান বলেছিলেন, এটা প্রেমের গল্প। কিন্তু দর্শকরা প্রেমকে এই চলচ্চিত্রের মূল থিম বলে মনে করতে পারে নাই এবং আসলে করার কোনো কারণও নাই। যদিও কাহিনীর প্রথম দিকে দর্শক  রোমান্টিসিজমে ভোগে, কিন্তু তারপর বিস্তর নীতিকথা আর উপদেশ বর্ষণে রোমান্টিসিজমের আঁচ বিলকুল ধুয়ে যায়। সন্দেহ নাই, প্রেমের সুতা ধরে রিজওয়ান খান ও মন্দিরার গৃহপ্রবেশের মাধ্যমে মাই নেম ইজ খানের কাহিনীরও যাত্রা। কিন্তু এখানে প্রেম মানে প্রেম না। এখানে প্রেম মানে হলো; দুই একজন ‘ভালো মুসলমানের’ বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত আচরণকে ইসলামের ধর্মীয় উদারতা বা মধ্যপন্থা হিশাবে দেখানোর আয়োজন। এই আয়োজন ইনডিয়ায় নতুন না বরং ঔপনিবেশিক ইনডিয়ায় সাম্প্রদায়িক হিন্দুর জন্ম ও বিকাশের মতোই পুরনো।

সুদীর্ঘ মোগল ইতিহাসের একটি মাত্র চরিত্রকে বিশেষ অর্থে ও বিশেষ উদ্দেশ্যে বারবার সামনে নিয়ে এসেছে ইনডিয়া। মোগল বাদশাহ আকবর- বারবার তাকে হাজির করা হয়েছে আকবর দ্য গ্রেট বা মহাত্মা আকবর হিশাবে। ২০০৮ সালের হিট মুভি যোধা-আকবর এক্ষেত্রে সর্বশেষ নজির। মহাত্মা গান্ধীর দেশে বাদশাহ আকবর কিভাবে মহাত্মা হয়ে ওঠেন? কারণ তার মধ্যে উদার এবং অসাম্প্রদায়িক আদর্র্শ শনাক্ত করা হয়েছে। যেমন তিনি এক হিন্দু কন্যাকে বিয়ে করেছেন, রাজপুত কন্যা। রিজওয়ান আর মন্দিরার মতোই তারা দুইজন- আকবর আর যোধা বসাইছেন মসজিদ আর মন্দির। দুইজনের একজনও আপন আপন সম্প্রদায়কে ছাড়িয়ে যেতে না পারলেও সবজায়গায় একে উদার এবং অসা¤প্রদায়িক হবার নিশানা হিশাবে খাড়া করা হয়। একজন আকবর বা রিজওয়ান খান এই কাজটা করতেই পারে, কিন্তু ইসলাম-ডাকনামে যা কিছু ‘ধর্ম’ হয়ে আছে, তার পরিস্কার লঙ্ঘন এটা। কাজেই এটাকে ইসলামের মধ্যে ধর্মীয় উদারতা বা মধ্যপন্থা হিশাবে দেখানোর সুযোগ নাই।

কিন্তু সেই উদারতা আর মধ্যপন্থার সুযোগ নিয়া এবং ‘ভালো মুসলমান’ আর ‘খারাপ মুসলমানের’ কাহিনী নিয়াই এই চলচ্চিত্রটা এই বছরের শুরু থেইকা বলিউডে রমরমা ব্যবসা করে আসছে। চলচ্চিত্রের মূল চরিত্র বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী (অটিস্টিক) রিজওয়ান খান। কিন্তু অটিস্টিক লোকের বিশেষ বিষয়ে যেমন ব্যতিক্রমী প্রতিভা থাকে, রিজওয়ানের আছে যন্ত্রপাতি বিষয়ে। যেকোনো যন্ত্র সে সহজে মেরামত করতে পারে। ইনডিয়ায় তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। কাজেই তার জীবন-অভিজ্ঞতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর্ব আছে। সেই ভয়াবহ দাঙ্গার স্মৃতি থেকে সে আর হলুদ রঙ, উৎকট আলো ও হৈচৈ সহ্য করতে পারে না। তার মা তাকে বলে দুনিয়াতে দুই কিসিমের মানুষ আছে; ভালো এবং খারাপ- সবধর্মে এবং সবজায়গায়। মুসলমান রিজওয়ানের দুনিয়ায় অন্য সবকিছুর মধ্যে এটাই বড় সত্য হয়ে ওঠেÑ ভালো মুসলমান এবং খারাপ মুসলমান।

যুবক বয়সে সে অভিবাসী হয় দুনিয়ার বেহেশত আমেরিকান মুল্লুকে। ওখানে সে ভেষজ প্রসাধনী সামগ্রীর বিক্রয়কর্মী হিশাবে কাজ করে। পরিচয় হয় বিধবা হিন্দু নারী, এক সন্তানের মা মন্দিরার সাথে। একসময় রিজওয়ান আর মন্দিরা বিয়ে করে। মন্দিরা এবং তার ছেলে শ্যাম এর নামের পেছনে ‘খান’ যোগ করে। আকবর আর যোধা’র মতো তারা আলাদাভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করে। কিন্তু রিজওয়ান তো আর আকবরের মতো অধিপতি শ্রেণীর একজন না বরং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যে অনন্ত যুদ্ধে হাল দুনিয়ার অধিপতিরা রত আছে সেই যুদ্ধের টার্গেট ‘খারাপ মুসলমানদের’ একজন হইলেও হইতে পারে সে। কাজেই চলচ্চিত্রে তাকে ‘ভালো মুসলমান’ হয়ে ওঠার সাধনা করতে হয়। সে যে খারাপ মুসলমান বা ‘সন্ত্রাসী’ না এটা তাকে প্রমাণ করতে হয় ‘শান্তির ভাষা’য়, যে ভাষা তার মুখে তুলে দেয় ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ অনন্ত যুদ্ধের কারবারিরা।

দখলদার রাজনৈতিক শক্তির হাতে হাল দুনিয়ায় ‘জনগণের ভাষা’ তৈরি হচ্ছে। তাদের তরফে এই কাজ চমৎকারভাবে করছে গণমাধ্যম। সম্প্রতি এনডিটিভি’র ইন্ডিয়া কোশ্চেন অনুষ্টানে উপস্থিত ছিলেন করন জোহর, শাহরুখ খান, অভিনেত্রী সোহা আলী খান, অভিনেতা কবির খান, ইসলাম বিষয়ে জনপ্রিয় ভাষ্যকার ড. জাকির নায়েক, মাওলানা মোহাম্মদ মাদানীসহ প্রমুখ। আলোচনা বিষয় ছিলো, দি মুসলিম আইডেন্টিটি। আলোচনায় শেষ পর্যন্ত দেখা গেছে এইসব মডারেটর অভিনেতা অভিনেত্রীই কথা বলে যাচ্ছেন। মূলধারার ইসলামিস্টদের তেমন কিছু বলার সুযোগ দেয়া হয় নাই। পেছনে দেখা যাচ্ছিল মাই নেম ইজ খান চলচ্চিত্রের কোলাজ। এই জায়গায় বলিউডী তামাশার চেহারা ফকাফকা।

দখলদার শক্তি নানা আইনি ও নৈতিক শর্তের ওপর নিজেদের অবস্থানকে যায়েজ করে, নিজেদের মজবুত করে। যেমন হাল আমলে সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গীবাদ- এই দুয়ের মাধ্যমে দখলদার শক্তি তাদের অবস্থান মজবুত করে। দখলদারদের কাছ থেকে যেকোনো কিছু খরিদ করতে চাইলে বিনিময়ে আপনাকে দিতে হবে ‘শান্তি’র নিশ্চয়তা। অন্য তরফে টিকে থাকতে চাইলেও সেই টিকেট নিতে হয় শান্তির আইনি শিকলের মধ্যে আটকে থাকবেন সেই ওয়াদা দিয়া। এবং অবশ্যই; কোনটা শান্তি আর কোনটা অশান্তি সেই সংজ্ঞা আর ফারাক ঠিক করে দখলদারেরাই। বিশেষ করে নয় এগারোতে আমেরিকায় নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর এই শান্তির বাধ্যতামূলক বেচাবিক্রি ঘোরতর জোরদার হয়ে ওঠে।

নয় এগারোর নগদানগদ প্রতিক্রিয়া হিশাবে আমেরিকান মুসলমানরা নানান জায়গায় সাম্প্রদায়িক হামলার স্বীকার হয়। রিজওয়ান আর মন্দিরার ছেলে শ্যাম একদিন খেলার মাঠে  সাদা-বন্ধুদের হামলায় মারাত্মকভাবে আহত হয় এবং পরে হাসপাতালে মারা যায়। মন্দিরা এর জন্য রিজওয়ানের নামের মুসলমানি নিশানাকে, ‘খান’কে দায়ী করে। রিজওয়ান বলে, আমার নাম খান হইতে পারে কিন্তু আমি সন্ত্রাসী না, আমি ভালো মুসলমান- ‘মাই নেম ইজ খান, আই এম নট টেরোরিস্ট।’ মন্দিরা বলে; যাও, এটা আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে বলে আসো। এরপর শুরু হয় পরিচালকের ভাষায়, ‘এক মহাকাব্যিক যাত্রা’।

আগে বলা হতো, ১৯৬৫ সালের আগে আমেরিকার মুসলমানদের কোনো ইতিহাস ছিল না। এই চলচ্চিত্র দেখলে মনে হয় ‘মুসলমান’ বলে যাদের ধর্ম পরিচয়, দুনিয়াতে তাদের কোনো ইতিহাসই নাই। টুক করে তারা দুনিয়ায় গজাইয়া উঠল! নৃতত্ত্ব, ভাষা, ভূগোল, রাজনীতি আর দুনিয়ার পালাবদলের মধ্যে মুসলমানদের যেন কোনো অতীত নাই। সে আগন্তুক, কাজেই তারে শান্তিবাণী খরিদ করতে হবে, অন্যদের চেয়ে চড়া দামে। যেন নয়-এগারোর কোনো শানে নুযুল নাই। একদল লোক ইচ্ছা করল, তারপর প্লেন নিয়া ঝাঁপাইয়া পড়ল। এই নিয়া আধুনিক-মধ্যপন্থী বা সুশীল মুসলমান রিজওয়ান খানের কোনো জিজ্ঞাসা নাই। যেমন নাই রিজওয়ান খানের, ‘ভালো’ আর ‘মন্দ’ এর একটা সংজ্ঞা পাইছেন খান, তাতে মানুষ হয় ফেরেশতা নয়তো শয়তান। আসলে কি মানুষ তাই? এই জায়গায় মহা মুসিবত। তাই সে ইরাক যুদ্ধে মামা জেনি’র শহীদ পুত্রের শোকে কাতর। রিজওয়ান তার নিজের ছেলেকে সেই একই কাতারে রাখে। তারপরও এই যুদ্ধের নায্যতা নিয়া রিজওয়ানের কোনো প্রশ্ন নাই। তাহলে এই যুদ্ধে প্রাণ দেয়ার মাজেজা কী?

যেমন তামাম ইনডিয়ার মাওবাদীদের বা কাশমিরের মুজাহিদীন বা সাতকন্যা রাজ্যের লোকদের সংগ্রামের বিষয়ে ইনডিয়ার অধিপতিদের অবস্থান। এইসব সংগ্রাম কী করে ওই জনগোষ্ঠীর জীবনে অনিবার্য হয়ে উঠলো সে বিষয়ে গণমাধ্যমও আগ্রহী না। অধিপতি শ্রেণী সবসময় নিজেদের স্বার্থপরিপন্থী সব কিছুকে ‘অশান্তি’র মোড়কে মুড়ে রাখে। যা কিছু তাদের শক্তির বিস্তারে সাহায্য করে তা-ই ‘শান্তি’। তো, নয় এগারোর ধ্বংসপ্রাপ্ত টুইন টাওয়ার বা ইরাকে যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া এইসব নিয়া প্রশ্নহীন অথচ শোকাতুর রিজওয়ানও ‘শান্তি’ চায়। দুনিয়া কেন এমন হয়ে উঠলো, কোন ন্যায্যতায় অধিপতিরা সারা দুনিয়ার মানুষ-প্রাণ-পরিবেশ আর সম্পদের ওপর নিজেদের শক্তি কায়েম করতে চায়? কেন দুনিয়ার নানা নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর কেউ কেউ ‘ইসলাম’ ডাকনামের মোড়কে দখলদারির বিরুদ্ধে সংগ্রামে রত হইলো? এইসব নিয়া এ যুগের মহাত্মা আকবরের কোনো প্রশ্ন নাই। নাই কিছুই নাই। খান ইনিডয়ান মুসলিম জনগোষ্টীর জন্য চমৎকার ভাষা ও চিত্র নির্মাণ করেছেন। যা আজকের আর আগামীদিনের ইনিডয়ান মুসলমানদেও গলায় কাটার মতো বেধে থাকলো। মজার বিষয় হলো সেই ঘটনাটা ঘটানো হলো সাত সমুদ্দুর তের নদীর পাড়ে আমেরিকায়। চলচ্চিত্রটি নিঃসন্দেহে ঝকঝকা লাইফ স্টাইলের চমৎকার কারবার। অথবা পূর্ব-পশ্চিমে সে একইভাবে বশে থাকল। দুইয়ের স্বার্থ একই।

অপরদিকে নয়-এগারোর যোধা বাই-মন্দিরারও একই অবস্থা, সে ঠিক করছে যে, সব সমস্যার মূলে ওই ‘মুসলমান’, খান এর নাম। যদিও শ্যাম খান মুসলমান ছিল না, রিজওয়ান খানের পরিজনের মধ্যে আর কোনোই মুসলমান নাই। শ্যামের মতো যারা আছে তারা সবাই মুসলমান না হইয়াও একদিকে জেনি’র মতো ‘সন্ত্রাসে’র শিকার অন্যদিকে সেই ‘সন্ত্রাসে’র প্রতিক্রিয়ার শিকার- শ্যামের মতো। মুসলমান আছেন ওই ‘সন্ত্রাসী’রাই। যেমন ড. ফয়সাল। মসজিদে বসে তার নিজের অপরিচিত লোকদের সামনে যেভাবে সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা করছিলেন ড. ফয়সাল তা দেখে, মনে হয় মসজিদে এইসব হরহামেশা ঘটে, আর আমেরিকান তাবৎ গোয়েন্দা বাহিনী বেগার খাটে। তার মানে সকল শান্তির উপদেশের খয়রাত মুসলমানদের জন্য। এইটাকে কোনোভাবে আর মানুষের ইতিহাস বানানো গেল না। কারণ দুনিয়াদারির যে সংগ্রাম নানা কালে আর নানা দেশে এই খান তার কোনো মর্মই উদ্ধার করে না।

ইনডিয়ান চলচ্চিত্র বিশেষ করে করন জোহরের চলচ্চিত্রে আবেগের মাখামাখি যে অবস্থা তা থেকে কোনোভাবে মুক্ত হতে পারে নাই ‘মাই নেম ইজ খান’। তার একটি সাধারণ দৃষ্টান্ত হলো, শাহরুখের অন্য সব মুভির মতো এখানেও ‘আমাদের হিরো সব পারে’। একে তো বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী রোগী তার উপর প্রায় অতিমানবীয়তা দেখানো বেশী বাড়াবাড়ি। ফলে গল্প হয়েছে লাগাম ছাড়া আর শাহরুখের অভিনয় বারবার পিছলে গেছে। কিন্তু লোকে এই মুভি শাহরুখের বরাতেই দেখছে। তার অভিনয় দেখে বারবার মাথায় উঁকি দিচ্ছিল হলিউডের চলচ্চিত্র ফরেস্ট গাম্প [১৯৯৪] এর টমস হ্যাংক আর দ্যা রেইন ম্যান [১৯৮৮] এর ড্যাস্টিন হফম্যান এর অভিনয়। হতে পারে অটিজম নিয়ে কম মুভি হয়েছে। তবে শাহরুখ তার প্রচলিত ধারার চেয়ে অনেকখানি বের হয়ে এসেছেন।

চলচ্চিত্রটা নিয়া বেশ প্রচারণা এবং প্রত্যাশা ছিলো ছবি বানানেওয়ালার। ৬০তম বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছিল এটা, মূল প্রতিযোগিতার বাইরে, ‘তথ্য’ বিভাগেÑ সমালোচকদের নজর কাড়তে পারে নাই। বরং মুসলিম সন্ত্রাসবাদ জঙ্গীবাদ নিয়া নির্মিত অন্যান্য মুভিগুলো এই উৎসবে ভালো নাম কামিয়েছে। তাছাড়া অন্যান্য পত্রিকা বা মিডিয়াতে সমালোচকরা একে তত গুরুত্বের সাথে নেয় নাই। শঙ্কর এহসান লয়ের কম্পোজিশান বরাবরই ভালো। এর মধ্যে সাজদা আর তেরে নেইনা এই দুটি গান উল্লেখ করার মতো। চলচ্চিত্রে তারা একটি বিশেষ ধারায় সঙ্গীতের কাজ করছেন। কাজের জায়গাটা সূফী ঘরানার। তারা হয়তো সুফীবাদকে নিজেদের প্রচারিত শান্তিবাদের নিশানা হিশাবে খাড়া করতে চান। কিন্তু চলচ্চিত্র বানানেওয়ালাদের নিজেদের যে শান্তির ধারণা, দখলদার স্বার্থের ‘শান্তি’ সেই শান্তির সাথে তো সূফীবাদ মেলে না। সূফীবাদের শান্তি তো ইনসাফ কায়েমের যে লড়াই, তার বিপরীত কিছু না। রিজওয়ান যে ইনসাফ কায়েমের লড়াইয়ের বিপরীতে ‘ভালো মুসলমান’ সনদ আদায়ের জন্য আমেরিকান প্রেসিডেন্টের কাছে পৌঁছতে এক ‘মহাকাব্যিক যাত্রা’র মধ্য দিয়ে যান সেই মহাকাব্যের নানা পর্বে আছে আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্য পাড়ি দেয়া, নানা মানুষের সাথে পরিচয়, সখ্যতা, মুসলিম সন্ত্রাসবাদীদের পরিকল্পনা জেনে ফেলা, সন্ত্রাসবাদী সন্দেহে আটক হওয়া, নির্যাতনের স্বীকার হওয়া, জেল  থেকে ছাড় পাওয়া, জর্জিয়ায় হারিকেনের আঘাত হানা, সেখানে ত্রাণকর্তা হিশাবে হাজির হওয়া, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং বারাক ওবামার বিজয়। এরপর রিজওয়ান তার প্রত্যাশার কাছাকাছি চলে আসে। অবশেষে সে কালো প্রেসিডেন্টের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারে এবং তাকে বলতেও সমর্থ হয়, ‘মাই নেম ইজ খান, আই এম নট টেরোরিস্ট।’ রিজওয়ান খানকে ভালো মুসলমান বলে স্বীকৃতি দেন প্রেসিডেন্ট। এই স্বীকৃতিই একজন খানকে, একজন মুসলমানকে সন্ত্রাসী মুসলমানদের থেকে আলাদা করে দেয়। ফলে এই রিজওয়ান খানই হতে পারে মার্কিন জগতের তাবৎ ভালো শান্তিবাদী মুসলমানের অনুকরণীয় আদর্শ। সবশেষে ‘তাহারা সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিল’।

দুনিয়ার অধিপতিরা হচ্ছেন সব ‘ভালো এবং শান্তিবাদী’ মানুষ আর অপরপক্ষে নিপীড়িতরা সব খারাপ আর সন্ত্রাসী। কাজেই খারাপদের নিয়তি হইলো ভালো এবং শান্তিবাদী দখলদার কর্তৃক নির্মূল হইয়া যাওয়া। যারা এই শান্তির স্বপক্ষে নির্মূল অভিযান থেকে বাঁচতে চায়- ‘ভালো মুসলমান’ হইতে চায়Ñ তাদের অবশ্যই ‘ভালোদের’ মানে দখলদারদের ভাষায় কথা বলতে হবে। তার জন্য নতুন নতুন সবকের দরকার পড়ে। সে সূত্র ধরেই করন জোহরের এই উদার মুসলমান হবার সবক। তার মধ্যে নাই অধিকার কায়েমের কোনো রাজনৈতিক-সামাজিক আকাক্সক্ষা। আছে এক আধুনিক ও তথাকথিত শান্তিবাদী কোনো একটি “মডেল জনগোষ্ঠী”তে মিশে যাওয়ার আকাংখা। ইনসাফ আর নিপীড়িত মানুষের মুখে পর্দা টেনে কথিত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রকল্প দিয়া মানুষ ও সমাজকে দখলদারির কবলে রাখাই যার সাধারণ সংস্কৃতি ও রাজনীতি।

> লেখাটি পাক্ষিক চিন্তা’য় পূর্ব প্রকাশিত।

Comments

comments

5 thoughts on “ভালো মুসলমান হওয়ার সহজ উপায়

  1. Pingback: আমরা সবাই আবদুর রহমান « ইচ্ছেশূন্য মানুষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *