সুপারহিরোর রমরমা দুনিয়ায় টুইন টাওয়ার ট্র্যাজেডির প্রভাব

২০২১ সালে মুক্তি পায় জন ওয়াটস পরিচালিত হলিউড সিনেমা ‘স্পাইডার-ম্যান: নো ওয়ে হোম’। এ সুপারহিরো সিরিজের নতুন ফেইজে নাম ভূমিকায় রয়েছেন টম হল্যান্ড। চলমান ফ্র্যাঞ্চাইজির তৃতীয় কিস্তিতে চমক হিসেবে ছিলেন এর আগে স্পাইডির পোশাকে শরীর গলানো দুই তারকা টবি মাগুয়ের ও অ্যান্ড্রু গারফিল্ড। যেখানে মাল্টিভার্স নামের ফিকশনাল বয়ানে শত্রু নিধনে মুখোমুখি হয় তিন স্পাইডার-ম্যান, সঙ্গে পুরনো শত্রুরা। যারা সিনেমা হলে বা চোরাই হল প্রিন্ট দেখেছেন, তারা খেয়াল করে দেখবেন, টবি মাগুয়ের যখন পর্দায় হাজির হলেন, দর্শকের মাঝে কী তুমুল উল্লাস! এর পেছনে নস্টালজিয়া কাজ করেছে নিশ্চিত। তবে এ শতকের প্রথম দশকে মুক্তি পাওয়া টবি মাগুয়ের অভিনীত ও স্যাম রাইমি পরিচালিত ‘স্পাইডার-ম্যান’ ট্রিলজির বিবিধ ভূমিকা রয়েছে হলিউড সিনেমা ও মার্কিন রাজনীতিতে। এমনও ভাবতে পারবেন যে ৯/১১-এ টুইন টাওয়ারে হামলা না হলে স্পাইডার-ম্যান এতটা জনপ্রিয় হতো না। এর ফলে পরের দুই দশকে হলিউড বক্সঅফিস সুপারহিরোনির্ভর নতুন ইতিহাস দেখেছে, যা প্রথাগত স্টুডিও সিনেমার বৈচিত্র্য ও সম্ভাবনাকে নষ্ট করেছে বলেও অভিযোগ অনেকের। এমনকি বদলে দিয়েছে হলিউড সিনেমায় কীভাবে ধ্বংসাত্মক দৃশ্য চিত্রায়িত হবে তার ধারণাকেও। অবশ্য এ লেখার পরিসর সংক্ষিপ্ত যা কিনা আরো ব্যাখ্যার অপেক্ষায় রেখে শেষ হবে। আর কৃতজ্ঞতা হিসেবে বলে নেয়া ভালো, এ লেখায় বিবিধ বিদেশী উৎসের সাহায্য নেয়া হয়েছে।

স্পাইডার-ম্যানের চশমায় টুইন টাওয়ারের ঝলক

হলিউডে সুপারহিরো সিনেমার প্রধান দুই ধারা ডিসি ও মার্ভেল কমিকসের বইনির্ভর। দুটি ধারাকে কেন্দ্র করে স্টুডিওগুলোর মধ্যে রয়েছে বড় ধরনের প্রতিযোগিতা। এর মধ্যে ডিসির কনটেন্টের ওপর একচেটিয়া আধিপত্য ওয়ার্নার ব্রসের। অন্যদিকে মার্ভেলের কনটেন্ট ডিজনি স্টুডিওনির্ভর হলেও স্পাইডার-ম্যানের স্বত্বের কারণে সনি পিকচার্সের সঙ্গেও জোট বাঁধতে হয়েছে তাদের।

এ ধারণার প্রসঙ্গে ঢোকার আগে একটা বিষয় সাফ করে নেয়া ভালো যে যুক্তরাষ্ট্রে কমিক বুক শিল্পের যে উত্থান তা মোটেও ৯/১১-কেন্দ্রিক নয়। বরং টুইন টাওয়ার ট্র্যাজেডি একে নতুন আকার দান করেছে। এটি আমলে না নিলেও মার্কিন সুপারহিরোরা কখনো রাজনীতি বিযুক্ত ছিল না। কমিক বুকের মলাট নাম হিসেবে আমরা ‘ক্যাপ্টেন আমেরিকা’কে ধরতে পারি। যার আবির্ভাব ১৯৪১ সালে, যখন সারা বিশ্ব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাপে কাঁপছে। যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে মার্কিন সৈন্যদের দেশপ্রেম ও মনোবল বাড়ানোর জন্য চরিত্রটি তৈরি হয়েছিল। আর প্রথম কমিকসের প্রচ্ছদে ক্যাপ্টেন আমেরিকাকে দেখা যায় হিটলারকে ঘুসি মারতে, যা তাকে যুদ্ধকালীন প্রচারণার অংশ করে তোলে। এভাবে ক্যাপ্টেন আমেরিকা তখনকার কমিকসের সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্রগুলোর একটি হয়ে ওঠে এবং পরবর্তী সময়ে মার্ভেল ইউনিভার্সের অন্যতম নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

৯/১১-এর আগে প্রতি দশকেই একাধিক কমিকনির্ভর সিনেমা তৈরি হয়েছে হলিউডে। কিন্তু ওয়ার অন টেরর বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধকালের মতো ততটা রমরমা হয়ে ওঠেনি। একই সঙ্গে এ সিনেমাগুলো সারা বিশ্বে মার্কিন কমিক হিরোদের নতুন পরিচয় দিয়েছে; যারা কিনা একই সঙ্গে নতুন ত্রাণকর্তা হয়ে উঠেছে। ওয়ার অন টেরর বৈশ্বিক এজেন্ডা হয়ে ওঠায় এ ধরনের শত্রু-মিত্র ধারণায় বেশির ভাগই দর্শক একমত পোষণ করেছে। অর্থাৎ কালচারাল হেজিমোনি আকারে হলিউড মার্কিন যুদ্ধকে দর্শকের মনস্তত্ত্বের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে, তারাও প্রায় নির্দ্বিধায় গ্রহণ করেছে। এ সুযোগে গত আড়াই দশকে ৮০টির মতো সুপারহিরো মুভি মুক্তি দিয়েছে হলিউড। আমাদের এ লেখায় সেখান থেকে শুরুর অংশ এবং পরবর্তীকালে দু-একটি গল্প সামনে আনা হবে।

মূল গল্পের প্রেক্ষাপট হিসেবে ভূরাজনৈতিক আলাপে যাওয়া যাক। উন্নত রণপ্রস্তুতির পাশাপাশি ভূপ্রাকৃতিক কারণে যেকোনো বহিঃশত্রু থেকে সুরক্ষা বজায় রাখতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যখন বিশ্বের বেশির ভাগ অঞ্চল কোনো না কোনো পক্ষের হামলায় আক্রান্ত হয়েছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সাকল্যে ক্ষতি বলতে পার্ল হারবারে হামলা; যাও কিনা দেশটির মূল ভূখণ্ডের বাইরে। এর বিপরীতে জাপানের জনবহুল হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে পারমাণবিক বোমার অমানবিক ক্ষত কখনো কখনো যেন পার্ল হারবারের কাছে ম্লান হয়ে যায়। এখানে হলিউডের শক্তিমত্তা আপনি টের পাবেন। এটা শুধু কে আগে হামলা করেছে তা নয়, বরং শত্রু-মিত্রের আধিপত্যশীল বয়ানের মাধ্যমে গল্পটি নির্মাণ হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে সামরিক উপস্থিতি ও নিজভূমে মার্কিনদের সুরক্ষিত থাকার রাজনৈতিক ও ভূপ্রাকৃতিক আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরায় নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে হামলা। আবার এ হামলার কারণ হিসেবে সিদ্ধান্তমূলক কিছু ঘটনা বদলে দিয়েছে পুরো বিশ্বকে। কিন্তু টুইন টাওয়ার আক্রান্ত হয়ে বুঝিয়ে দেয় এমন হামলা এখন আর শুধু হলিউড সিনেমার বিষয় নয়। ইউনিভার্সেল স্টুডিওর সেটে নির্মিত কোনো দৃশ্য নয়। বরং অতি সাধারণ একটি দিন, যেটি রৌদ্রোজ্জ্বলভাবে শুরু হয়েছিল, অনেকে সবে কফির প্রথম কাপটা হাত থেকে নামিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু নিউইয়র্কের গর্ব জোড়া দালানের ওপর ভর করল সাক্ষাৎ শয়তান। মুহূর্তে শহরজুড়ে নেমে এল নরক। বলা বাহুল্য, ২০০১ সালের ৯ সেপ্টেম্বরের আগের আর পরের দুনিয়া একই থাকল না। ওই ঘটনার আড়াই যুগ পরও সেই রেশ বিশ্বজুড়ে বহমান।

টুইন টাওয়ারের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র পেল সুপারভিলেন। এ নিয়ে বিপরীত মত ও বিতর্কগুলো জনপ্রিয় কোনো বয়ানেই পাত্তা পায়নি। ওসামা বিন লাদেন; এর আগে যদিও মার্কিন মিত্র ছিলেন। সেই মিত্র শুধু রাজনৈতিক অস্ত্রই হয়ে ওঠেননি; জনপ্রিয় ধারায় হয়ে ওঠেন খল চরিত্রের প্রতিচ্ছবি। তো ৯/১১ হামলার মাত্র সাত মাস পর মুক্তি পায় ‘স্পাইডার-ম্যান’ সিরিজের প্রথম সিনেমাটি।

স্পাইডার-ম্যানের সরিয়ে ফেলা একটি ট্রেলারের ফুটেজ এখনো বিভিন্ন ধরনের লেখায় রেফারেন্স হিসেবে আসে। ওই ভিডিওতে এ তরুণ সুপারহিরোর চোখে টুইন টাওয়ারের ঝলক দেখা যায়। কিন্তু পরে ৯/১১-এর দগদগের স্মৃতির কারণে ট্রেলারটি সরিয়ে নেয়া হয়, সিনেমার কিছু দৃশ্য পুনরায় শুট করা হয়। কিন্তু গ্রিন গবলিন নামে এক উড়ন্ত শত্রুর বিরুদ্ধে স্পাইডার-ম্যানের বিজয় কিছুটা হলেও মার্কিন দর্শকদের হৃদয়ে স্বস্তি এনে দেয়, আর প্রথম সপ্তাহান্তের বক্স অফিসে একাধিক রেকর্ড ভেঙে দেয়। সিনেমার পর্দায় প্রায় অক্ষত নিউইয়র্ক শহর দর্শকের মনে আশাবাদ তৈরি করে। এমনকি এ সিনেমার ত্রাণকর্তা র্যাম্বোর মতো বয়সী কোনো চরিত্র নয়। কিশোর ও তারুণ্যের মাঝামাঝি থাকা পিটার পার্কার। তরুণপ্রাণ হয়ে উঠল রক্ষাকর্তা।

কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নেতৃত্বে বৈশ্বিক রাজনীতি দ্রুত পাল্টে যেতে থাকে। শুধু আফগানিস্তানে আক্রমণই নয়, পশ্চিমা মিডিয়াগুলো ইরাকে (যার প্রমাণ কখনো পাওয়া যায়নি) শিগগিরই ধ্বংসাত্মক অস্ত্র আবিষ্কার করবে। ফলে গ্রিন গবলিনের সঙ্গে পিটার পার্কারের লড়াইয়ের সাইডলাইনে থাকা প্রযুক্তিগুলোই সামনে চলে আসে। মার্কিন সামরিক বাহিনীগুলো সরঞ্জামের দিক থেকে আরো দুর্দমনীয় হয়ে ওঠে। বিষয়টি কীভাবে সুপারহিরো সিনেমাকে প্রভাবিত করে তার উদাহরণ হতে পারে ‘স্পাইডার-ম্যান টু’ (২০০৪)। প্রথম কিস্তির অভাবনীয় সাফল্যের কারণে সাধারণ নিয়ম অনুসারে দ্বিতীয় সিনেমাটির বাজেট বাড়ে। গল্পও আরো এগিয়ে থাকা কিছু। যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ও মানবিকতার দ্বন্দ্ব উঠে আসে। তবে ডক্টর অক্টোপাস নামের খল চরিত্রটি আসলে অ্যান্টি-হিরো। এখনো ‘স্পাইডার-ম্যান টু’ ভীষণ দর্শকপ্রিয়, কাল্ট বিবেচিত হলেও প্রথম কিস্তির তুলনায় এর বক্স অফিস কালেকশন কিন্তু কম!

টুইন টাওয়ার হামলার সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলেও ইরাকে হামলা যুক্তরাষ্ট্রে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি করে। মানুষ দুই ভাগ হয়ে যায়। কিন্তু রাজনীতি ঠিকই যুদ্ধ উত্তেজনাকে কাজে লাগাতে পেরেছে। দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজে চলে আসেন জর্জ বুশ। একই সময়ে সর্বকালের অন্যতম সুপারহিরো মুভি হয়েও কিছু ব্যাক ফুটে থাকে ‘স্পাইডার-ম্যান টু’। এর পরিবর্তে ডিসির অধীনে ক্রিস্টোফার নোলানের অতি উদযাপিত ‘দ্য ডার্ক নাইট ট্রিলজি’ ও ‘এক্স ২: এক্স-মেন ইউনাইটেড’-এর জন্ম দেখল দর্শক।

মানুষের মধ্যে বিদ্যমান বিপন্নতা, ভয় শিল্প-সাহিত্যে বড় অনুষঙ্গ হলেও এ সিনেমাগুলো যূথ ভয়ের ওপর নির্মিত, যা একই সঙ্গে মার্কিন রাজনীতির মাঠে ভীষণভাবে ক্রিয়াশীল। এ ভয় অন্যের প্রতি সহিংসতা। এ অপরায়ন দ্রুত সারা বিশ্বে ভিন্ন ভিন্ন নামে ছড়িয়ে পড়ে। যা শুধু প্রতিরক্ষামূলক নয়, আগাম প্রতিরোধমূলকও। যেখানে শত্রু-মিত্রের অনুমান বিধ্বংসীকর। এর পরিণতিতে সামরিক শক্তি অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। এমন শক্তিশালী অস্ত্র ধ্বংসের অজুহাতে কোনো দেশে হামলা বিবেচনাপ্রসূত হিসেবে চিত্রিত হচ্ছে। সেই দৃশ্য আবার যেন জনপ্রিয় সিনেমার স্থলাভিষিক্ত হচ্ছে টেলিভিশনে প্রচারের মাধ্যমে। ভাবা যায়, আফগানিস্তান ও ইরাকে হামলা; দুটি দেশে পুরোপুরি তছনছ হয়ে যাওয়া কীভাবে মার্কিনরা ও সারা বিশ্ব টেলিভিশনের মাধ্যমে উপভোগ করেছে। সুপারহিরো সিনেমার লার্জার দ্যান লাইফ ভাষ্য থাকলেও মার্কিন আবহে মন্দ কল্পনাপ্রসূত নয় বা কোনো দানবীয় চরিত্র নয়, এটি মানুষ এবং এর উৎপত্তি ট্র্যাজিক। স্পাইডার-ম্যান-পরবর্তী সুপারহিরো সিনেমায় রাষ্ট্রের একদম সর্বোচ্চ পর্যায়ে আক্রমণ দেখা যায়। যেমন হোয়াইট হাউজে সুপারভিলেনের প্রবেশে সেই ভয় বাড়িয়ে তোলে যে যুক্তরাষ্ট্রে কেউ নিরাপদ নয়। এমনকি প্রেসিডেন্টও। এখানে কিন্তু ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’ (১৯৯৭) সিনেমার মতো প্রেসিডেন্ট নায়ক নন। মানে প্রচলিত হিরোরা যুক্তরাষ্ট্র তথা দুনিয়াকে বাঁচাতে পারছে না। এ পরিসরে স্পাইডার-ম্যান কামিং এজ হিরো হিসেবে যতটা আশাবাদী; তার বিপরীতে ব্যাটম্যান বা এক্সম্যান হতাশাজনক এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক আবহে অদ্ভুতভাবে বাস্তবসম্মত।

ক্রিস্টোফার নোলান পরিচালিত ‘ব্যাটম্যান বিগিনস’ চলচ্চিত্রের দৃশ্য

৯/১১-পরবর্তী আমেরিকান বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলে ক্রিস্টোফার নোলানের ব্যাটম্যান ট্রিলজি, যা ন্যারেশন ও নির্মাণ বৈচিত্র্যে সুপারহিরো সিনেমার ইতিহাসে মাস্টারপিস হয়েই থাকল। যেখানে ‘ব্যাটম্যান বিগিনস’ (২০০৫) শুরু হয় মা-বাবা হারানো তরুণ ব্রুস ওয়েনের গল্পে। ট্রমা থেকে ফিরে আসার এ পর্বে গোথাম শহরের ভেঙে পড়া অবস্থান পুনরুদ্ধারে তাকে নামতে হয়। যখন কিনা স্কারক্রো নামের ভিলেন শহরবাসীর মানুষের বিরুদ্ধে বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহার করছে। যেখানে বের হয়ে আসছে মানুষের ভেতরকার ভয়, কষ্ট। স্কারক্রো মূলত মধ্যপ্রাচীয় নামের ভিলেন রা’স আল গুলের সাজানো ঘুটি হিসেবে কাজ করে। এমন এক সময় এ গল্প বলা হচ্ছে, যখন বিশ্বজুড়ে শত্রু-মিত্র মেরুকরণ ক্রমেই বাড়ছে, শান্তির কোনো সম্ভাবনা আর কাজ করছে না।

ওই সময়ে আরেক সুপারহিরো সিনেমা ‘ফ্যান্টাস্টিক ফোর’ (২০০৫) একদমই জমল না। কিন্তু নোলানের ট্রিলজির দ্বিতীয় পর্ব ‘দ্য ডার্ক নাইট’ (২০০৮) দর্শক লুফে নিল। এখানে গোথাম শহরে দুর্নীতি থাকলেও তা সহনীয় পর্যায়ে যতক্ষণ না জোকার এসে সব উল্টে দিচ্ছে। জোকার হলো এমন এক ডিলেমা, যে বিদ্যমান স্বাভাবিকতার ফাঁকগুলো ধরিয়ে দেয়। বালির বাঁধের মতো ভেঙে দেয় সবকিছু। নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রের রাজনীতি দিয়ে আপনি একে বুঝতে পারেন। কিন্তু এমন এক সময় জোকারের আবির্ভাব, তখন দুর্নীতি স্বীকার করে নিয়েও এক ধরনের স্বাভাবিকতা দাবি করে রাষ্ট্র। যেখানে পুঁজির সঙ্গে দুর্নীতির বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক! অন্যদিকে সিনেমার মতো বাস্তব জীবনে মার্কিনরা মন্দার কারণে মেডিকেল বিল, বাড়ি ভাড়া দিতে অক্ষম; এর বিপরীতে করপোরেট নোংরামি উঠে আসছে। তা সত্ত্বেও জোকারই ভিলেন, তাকেই ধ্বংস হতে পাবে। কারণ বাস্তব দুনিয়ায় নিপীড়ন মেনে নেয়াই হলো রাষ্ট্রের প্রেসক্রিপশনকৃত শান্তির ঠিকানা।

এবার অন্য বিষয়ে আসা যাক। ওয়ার অন টেরর প্রকল্পে গুরুত্ব পেয়েছে সর্বব্যাপী নজরদারি। যাকে বলা যায় ‘বিগ ব্রাদার ওয়াচিং ইউ’। ব্যাপক নজরদারির বাইরে নয় বাংলাদেশের মতো দেশগুলো। ‘দ্য ডার্ক নাইটে’ নিজস্ব ভার্সনের প্যাট্রিয়ট অ্যাক্টও ছিল। ওই সময়ের খুব বেশি পরিচিত না হলেও প্রজেক্ট প্রিজম নামে ব্রুস ওয়েনের তৈরি নজরদারি প্রযুক্তি সমান্তরাল দুনিয়াকে কাঁপিয়ে দেয়। যা গোথাম শহরের সব ফোনের মাইক্রোফোন ও সোনার সিগনাল ব্যবহার করে লোকেশন ট্র্যাক ও কথোপকথন শোনা সম্ভব করে।  ওয়েনের সহকারী লুসিয়াস ফক্স নৈতিক অর্থে এ ধরনের প্রযুক্তির বিরোধিতা করলেও ব্যাটম্যানের যুক্তি ছিল, অপরাধ দমনে নজরদারি ঠিক আছে।

এদিকে সিনেমা হলের বাইরে প্যাট্রিয়ট অ্যাক্ট পাস হওয়ার পর এবং রাষ্ট্রের নির্বাহী শাখার যুদ্ধক্ষমতা আরো বাড়লে অনেক মার্কিন বুশ প্রশাসনের প্রতি বিরক্ত হয়ে ওবামার কাছে শান্তি, আশা ও পরিবর্তনের আশা করেছিল। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। মিডিয়ায় এরই মধ্যে আবু গারিব কারাগারের কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়ে গেছে। মার্কিন সেনারা ইরাকি বন্দিদের কীভাবে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করছে সেই কেচ্ছা চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। গুয়ানতানামো বের নির্যাতনের কৌশল—ওয়াটারবোর্ডিং, ঘুমহীন রাখা এবং নির্যাতনের উদ্দেশে উচ্চশব্দে গান বাজানো—সবই জনসাধারণের জানা হয়ে গেছে (বাংলাদেশের আয়নাঘরের কথা মনে পড়ছে কি)। এর সঙ্গে মার্কিন সমাজে রাজনৈতিক বিভক্তি বাড়তে থাকে; টি পার্টি, অল্ট-রাইট ও অকুপাই মুভমেন্টের উত্থান ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে সিনেমা হলে আসে ‘দ্য ডার্ক নাইট রাইজেস’ (২০১২), যদিও এ সিক্যুয়েল যথাযথ মূল্যায়িত হয়নি। সিনেমার শুরুতে দেখা যায়, সুপারভিলেন বেনের সহচরদের হাতকড়া পরিয়ে ও মুখ ঢেকে একটি উড়োজাহাজে করে নিয়ে যাচ্ছে সিআইএ এবং একজন বন্দিদের গুলি করে ফেলে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে গোয়েন্দা কর্মকর্তা। এ দৃশ্য আবু গারিব কেলেঙ্কারির মতোই মনে হয়। পরে জানা যায়, বেন নিজেও বন্দিদের মধ্যে একজন, যে মুক্ত হয়ে উড়োজাহাজটি ধ্বংস করে দেয় এবং একজন পরমাণুবিজ্ঞানীকে অপহরণ করে। এরপর গল্প শুরু হয়, যেখানে আমরা দেখি গোথাম শহর ‘দ্য ডার্ক নাইটের’ ঘটনার কয়েক বছর পর কেমন আছে। বাস্তব জীবনে যুদ্ধকালীন বিশেষ ক্ষমতা এবং আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে যেভাবে নির্যাতনকে ন্যায্যতা দেয়া হয়েছিল, তেমনভাবেই গোথাম হার্ভি ডেন্ট অ্যাক্ট পাস করে, যা অপরাধীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিতে আইনি প্রক্রিয়াকে পাশ কাটায়।

এ গল্পগুলো ৯/১১ সংঘটিত হওয়ার প্রথম দশকের ঘটনা। সেখানে যতটা ফিকশনাল কিছু ঘটুক না কেন, তা আর বৈশ্বিক রাজনীতি থেকে আলাদা করা যাচ্ছে না। বরং সমান্তরাল একটা দুনিয়া আমরা দেখতে পাই। এ যেন কমিক বুক সিনেমার অদলে আরেকটা মাল্টিভার্স হিসেবে বিরাজ করছে। খেয়াল করলে দেখা যাবে, ‘দ্য ডার্ক নাইট’ সিরিজে টুইন টাওয়ার হামলা ও মার্কিন মনোজগতের অন্ধকার দিকগুলো যেভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, ‘দ্য স্পাইডার-ম্যান’ সিরিজ ততটা টানতে পারেনি। এর কারণ হতে পারে স্পাইডার-ম্যান তারুণ্য, আনন্দ ও আশাবাদের প্রতীক হয়ে উঠলেও ব্যাটম্যান আসলে তা নয়। এখানে এমন এক ধরনের ধ্বংসাত্মক ট্র্যাজেডি আছে, যা দর্শককে টেনে ধরছে। এমনকি একই ধরনের সমস্যা দেখা যায় ‘ব্যাটম্যান ভার্সেস সুপারম্যান’ (২০১৬) ও ‘জাস্টিস লিগের’ (২০২৭) ডার্ক টোনে। সুপারম্যান হিরো হিসেবে আশাবাদী হলেও তাকে ব্যাটম্যানের মতো ডার্ক টোনে হাজির হতে হয় পর্দায়। এমনিতে যেকোনো সুপারহিরো কোনো না কোনো যন্ত্রণায় তাড়িত থাকে, যা আমরা মহাকাব্যিক চরিত্রগুলোয় দেখি; বেশকিছু সুপারহিরো চরিত্রও মিথলজি থেকে অনুপ্রাণিত। কিন্তু ৯/১১-এর ঘটনা অপরের প্রতি যে ভয় তৈরি করে গেছে; এর সঙ্গে পুঁজিবাদের নিজস্ব সংকট মিলে সুপারহিরো চরিত্রগুলোকে আরো যন্ত্রণাকর করে তুলেছে এবং এ চরিত্রগুলো আরো বাস্তবিক।

তবে ব্যাটম্যানের ডার্ক টোন যেভাবে সুপারহিরো সিনেমায় পরিবর্তন আনে, তা ধরে রাখতে পারেনি ডিসি। তার জায়গায় ‘আয়রন ম্যান’ ফ্র্যাঞ্চাইজি, পরে ক্যাপ্টেন আমেরিকা ও মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্স (এমসিইউ) আকারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে মার্ভেল কমিকস। তার সঙ্গে হাত মেলায় ডিজনি স্টুডিও। ফলে ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবসায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে এ স্টুডিও। লেখার শুরুতে আমরা বলেছিলাম ক্যাপ্টেন আমেরিকার আবির্ভাব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন সেনা রিক্রুটে বড় ভূমিকা রাখে। একই কথা বলা যায় ক্যাপ্টেন মার্ভেলের ক্ষেত্রেও। ক্যাপ্টেন মার্ভেল একজন নারী পাইলট, যে অনেকটা মার্কিন বিমান বাহিনীর পোস্টার গার্লে পরিণত হয়।

‘ক্যাপ্টেন মার্ভেল’ চলচ্চিত্রের দৃশ্য

২০১৯ সালে মুক্তি পায় আনা বডেন ও রায়ান ফ্লেক পরিচালিত ‘ক্যাপ্টেন মার্ভেল’। আদর্শিকভাবে প্রথম দেখায় মনে হবে, ক্যাপ্টেন মার্ভেল যুদ্ধ ও মিথ্যার বিরুদ্ধে কথা বলছে। এসব ধারণা সাধারণত মার্কিন বিমান বাহিনীর সঙ্গে মেলে না। এমনকি ‘টপগানের’ (১৯৮৬) মতো ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো অ্যাডভেঞ্চার সিনেমার সঙ্গে মিলে না। তবু এ সিনেমা সামরিক বাহিনীর জন্য ভালো এক নিয়োগ বিজ্ঞাপন হিসেবে কাজ করে। এখানে আমেরিকা নিজেকে সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক শক্তি হিসেবে দেখে। আমেরিকানরা নিজেদের সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবে নয়, বরং সাম্রাজ্যবাদ ও দমননীতির বিরুদ্ধে লড়াই করা একটি প্রজাতন্ত্র হিসেবে দেখে। তাই ক্যাপ্টেন মার্ভেলের উপনিবেশবিরোধী কাহিনী আসলে আমেরিকার স্বাধীনতা ও মুক্তির প্রচলিত ধারণার সঙ্গে মিলিয়ে দেয়া হয় না। গবেষক লিসা লোয়ের মতে, এটি ‘আমাদের অজ্ঞতার রাজনীতি’র একটি অংশ, যেখানে ইতিহাসের কিছু দিককে গুরুত্ব দেয়া হয়, আর কিছু দিক ভুলে যাওয়া হয়।

ক্যাপ্টেন মার্ভেল সম্পর্কিত ওপরের আলোচনাটি পিটার জে ব্রুনোর এক গবেষণা থেকে নেয়া। যেখানে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ৯/১১-পরবর্তী সুপারহিরো সিনেমাগুলো একদিকে মার্কিন সাম্রাজ্য ও পুঁজিবাদকে মজবুত করে, আবার কখনো কখনো তা প্রশ্নবিদ্ধও করে। এসব সিনেমা এক ধরনের অনিশ্চিত ও শেষ না হওয়া ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’র প্রেক্ষাপটে তৈরি। যেখানে হয় শত্রু নয় বন্ধু ধারণার মধ্য দিয়ে শত্রু-মিত্রের ধূসর রেখা অতিক্রম করে। এসব সিনেমায় শত্রু-মিত্রের ধারণা খুবই সরল। ‘ক্যাপ্টেন আমেরিকা: দ্য উইন্টার সোলজার’ (২০২৪) সিনেমায় এমন প্রশ্ন শোনা যায়, ‘হেই ক্যাপ, আমরা ভালো ও খারাপ মানুষের পার্থক্য কীভাবে করব?’ উত্তরে ক্যাপ্টেন আমেরিকা বলে, ‘যদি তোমার দিকে গুলি ছোড়ে, তাহলে তারা খারাপ।’”একইভাবে আয়রন ম্যান চরিত্রটিকে একটি সংলাপের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেয়া সম্ভব। যেখানে আয়রন-ম্যান ওরফে টনি স্টার্ক বলছেন, ‘আমি খুবই সফলভাবে বৈশ্বিক শান্তিকে প্রাইভেটাইজ করেছি। আপনি আমার কাছে আর কী চান?’

২০০৮ সালে জন ফেব্যু পরিচালিত ‘আয়রন ম্যান’ দিয়ে শুরু হয় এমসিইউর। এরপর প্রায় দুই ডজন সিনেমার মাধ্যমে কামিয়ে নিয়েছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার এবং এ সিনেমায় প্রথম কোনো সুপারহিরো সরাসরি মার্কিনদের যুদ্ধক্ষেত্রে হাজির হয়। গল্পের প্রধান চরিত্র বিলিয়নেয়ার টনি স্টার্ক আধুনিক অস্ত্র নির্মাণে বিশেষজ্ঞ। এ প্রতিভাবান উদ্ভাবক স্টার্ক ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক। তো আফগানিস্তানে নতুন অস্ত্রের প্রদর্শনী শেষে ফেরার সময় টনি স্টার্ককে অপহরণ করে সন্ত্রাসী সংগঠন”টেন রিংস। বন্দিদশায় তাকে জোর করে ভয়ংকর অস্ত্র বানানোর নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু টনি স্টার্ক গোপনে নিজের জন্য একটি শক্তিশালী আর্মার স্যুট তৈরি করেন এবং তা ব্যবহার করে বন্দিদশা থেকে পালান। দেশে ফিরে তিনি বুঝতে পারেন, তার কোম্পানির অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে চলে যাচ্ছে। তাই তিনি স্টার্ক ইন্ডাস্ট্রিজের অস্ত্র ব্যবসা বন্ধ করার ঘোষণা দেন। এরপর টনি স্টার্ক আরো উন্নত প্রযুক্তির আয়রন-ম্যান স্যুট তৈরি করেন এবং দুনিয়াকে রক্ষার জন্য এক নতুন পথ বেছে নেন। তবে পরবর্তী আয়রন-ম্যান ও অ্যাভেঞ্জার্স” সিনেমায় তাকে প্রতিরক্ষা ও উন্নত প্রযুক্তি তৈরিতে মনোযোগ দিতে দেখা যায়, যা কিনা শান্তি রক্ষার জন্য ব্যবহৃত হয়।

এখানে শান্তি বিষয়টা আসলে কী, অন্তত পশ্চিমা প্রকল্পে। হাল দুনিয়ায় যত রাজনৈতিক অস্থিরতা বা সংঘাত, সব ক্ষেত্রেই শান্তিবাদী মার্কিনদের জমজমাট অস্ত্র ব্যবসায় দেখা যাচ্ছে। একটা উদাহরণ দেয়া যাক তবে। ইউরোপীয় জোট ন্যাটোর দেশগুলোয় সর্বশেষ পাঁচ বছরে (২০২০-২৪) আমদানীকৃত অস্ত্রের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের উৎস ছিল যুক্তরাষ্ট্র। নতুন এক প্রতিবেদনে এ তথ্য দিয়েছে গবেষণা সংস্থা স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই)। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ২০২০-২৪ সালের মধ্যে ন্যাটো অঞ্চলে অস্ত্র আমদানি আগের পাঁচ বছরের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে। এর কারণ ইউক্রেনে রুশ আক্রমণের পর অঞ্চলটি প্রতিরক্ষার জন্য অতিরিক্ত পদক্ষেপ নিয়েছে। একইভাবে বছরের পর বছর বিশ্বের শীর্ষ অস্ত্র রফতানিকারক হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে দেশটি। এর সঙ্গে আয়রন ম্যানের ‘প্রাইভেটাইজ শান্তি’ ধারণাকে মিলিয়ে পড়া যায়। এ সিনেমাগুলোর ন্যারেটিভ এতটাই পরিচিত লাগে যে সিনেমা দিয়ে বাস্তব পরিস্থিতিকে সহজে বিবেচনা করা যায়। তার পাটাতনটি মূলত বানিয়ে দেয় ৯/১১।

এখানে জুডিথ বাটলারের একটি মন্তব্য তুলে দেয়া যায়, ‘অধিকাংশ মার্কিন সম্ভবত ৯/১১ এবং এর পরবর্তী ঘটনাবলির ফলে তাদের ফার্স্ট ওয়ার্ল্ডইজম হারানোর মতো একটি অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। আসলে কী হারানো? এটি সেই অধিকার হারানোর বিষয়, যেখানে শুধু মার্কিনরাই অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌম সীমান্ত লঙ্ঘন করতে পারত, কিন্তু কখনই তাদের নিজেদের সীমান্ত লঙ্ঘন হওয়ার শঙ্কায় থাকতে হতো না। যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক জায়গা হিসেবে কল্পনা করা হয়েছিল, যেখানে আক্রমণ সম্ভব নয়, যেখানে জীবন বিদেশী সহিংসতা থেকে নিরাপদ, যেখানে আমাদের জানা একমাত্র সহিংসতা হলো সেই সহিংসতা, যা আমরা নিজেরাই নিজেদের ওপর চালাই। আমরা অন্যদের ওপর যে সহিংসতা চাপিয়ে দিই, সেটি শুধু—এবং সবসময়—নির্বাচিতভাবে জনসম্মুখে আনা হয়।’

লেখার শুরুর দিকে দেখেছি, সুপারহিরো সিনেমার উত্থানে স্পাইডার-ম্যান ভূমিকা রাখলেও বাস্তব দুনিয়ার রাজনীতি (পর্দায় উপস্থাপন তো অবশ্যই) তাকে ব্যাটম্যানের তুলনায় ব্যাটফুটে নিয়ে যায়। আবার এমসিইউতে প্রথম সুপারহিরো ক্যাপ্টেন আমেরিকার দুর্দান্ত সব পর্ব দেখলেও আয়রন-ম্যানের কাছে ব্যাটফুটে চলে যেতে বাধ্য হয়। সিরিজের নেতৃত্বের আসনে চলে আসে এ অস্ত্র ব্যবসায়ী। এমনকি ফ্র্যাঞ্চাইজির চূড়ান্ত পর্ব ‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ড গেমে’ (২০১৯) মানবজাতির অর্ধেক অংশকে বাঁচাতে রীতিমতো আত্মদান করে। অন্যদিকে ক্যাপ্টেন আমেরিকা সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে লাগিল!

সর্বশেষ শুরুতে উল্লেখ করা আরেকটি বিষয়ে নজর ফেরানো যাক। ৯/১১-এর প্রভাবে হলিউডে ধ্বংসাত্মক দৃশ্যের শৈলীতে বেশ পরিবর্তন এসেছে। জ্যাক স্নাইডার পরিচালিত ‘ব্যাটম্যান ভার্সেস সুপার: ডন অব জাস্টিসের’ (২০১৬) ট্রেলারের কথা মনে আছে? শুরুতে আমেরিকার ওপর নেমে আসা বিপর্যয়ের ফুটেজ দেখা যায়, যার সঙ্গে দারুণ মিল টুইন টাওয়ার হামলা-পরবর্তী দৃশ্যের। সেই স্মৃতি জাগিয়ে যেন নির্মাতারা দর্শকদের হলে টানতে চেয়েছিলেন। সামগ্রিকভাবে ৯/১১-এর আগের চলচ্চিত্রে কখনো কখনো গগনচুম্বী ভবন ধ্বংস হতে দেখা গেলেও যা এখনকার দৃষ্টিতে অনেকটা অবাস্তব ও কার্টুনের মতো। অনেক সিনেমায় ভবনগুলো সাধারণত কাঠামো ধরে রাখত, বেশির ভাগ সময় এক পাশে ভেঙে পড়ত এবং সামান্য আঘাতেই সেগুলো ধসে যেত। কিন্তু পরের সিনেমাগুলোয় ধ্বংসের দৃশ্য যেন বাস্তব সংবাদ ফুটেজ। ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী, সহজে ভেঙে না পড়া ভবন এবং দুই ভবনের মাঝ দিয়ে ছুটে চলা সাধারণ মানুষ।

লেখাটি বণিক বার্তা ঈদসংখ্যা ২০২৫-এ প্রকাশিত

Comments

comments