ইচ্ছার খবরদারি

ছবি: ফিরোজ আহমেদ/ সূত্র: ডেইলি স্টার

কিছুদিন আগে বোরকায় ঢাকা এক নারীর ছেলের সঙ্গে ক্রিকেট খেলা নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছে। নেতিবাচক আলোচনাটুকু পোশাক নিয়েই ছিল। হয়তো দৃষ্টিকটু রকমেরই নেতিবাচক আলোচনা হয়েছে— ‘যা ইচ্ছা করা’র বিপরীতে একে ‘যা ইচ্ছা বলা’র স্বাধীনতার চরমতম ব্যবহার বলাও যায়।

হয়তো বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ ধরনের প্রতিক্রিয়া না থাকাটা অস্বস্তিকর ঠেকতো! যেহেতু এই ধরনের আলোচনার যথেষ্ট আবহাওয়া আছে এখানে। দ্রুত কারো মনোভঙ্গির পরিবর্তন ঘটবে তা ভাবাও ভুল। এমন পূর্বাপর অনেক ঘটনা আছে নিকট অতীতে। সেই অর্থে এই ‘জঙ্গিপনাটুকু’ দেখাদেখি কম উপভোগ্য নয়। সিরিয়াস অর্থে!

এখানে অধিকারের তর্ককে অধিকার না দেওয়ার তর্কে নামিয়ে দেওয়া হয়- অথচ সেই তর্কটা ব্যক্তি অধিকারের সূত্র ধরেই তোলা। নারীবাদ ও পুরুষতন্ত্রের মোটাদাগের আলোচনাগুলো সীমানা অতিক্রম করে মাখামাখি অবস্থায় বিরাজ করে এ সব জায়গায়। নিরপেক্ষতাও পরিণত হয় একচক্ষু বয়ানে।

এই নিয়ে অনেক গুরুতর আলোচনা হয়েছে নিশ্চয়। খুব বড় পরিসরে তর্কগুলোতে মনোযোগ না দিলেও কাজের খাতিরে একটা সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট পড়তে হয়েছিল। যেখানে একটা লাইন ছিল, এমন ভাবার্থ যে— ‘যার ইচ্ছা বোরকা পড়ুক, যার ইচ্ছা বিকিনি পড়ুক’। কথাগুলো শুনতে বেশ সহনশীল ও উদার মনে হলেও মূলত অদ্ভুত ঠেকেছে। বিবিধ অর্থে।

এখানে ইচ্ছার নিরঙ্কুশ মূল্য দেওয়া হয়েছে। কিন্তু, কোন ‘ইচ্ছা’? আমরা যে কোনো ‘ইচ্ছা’ স্থান-কালের নিরিখেই তো বিবেচনা করি। এই নিরঙ্কুশ ইচ্ছা যে নিন্দা করে তার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য নয় কি? বা এই নিরঙ্কুশভাবে ইচ্ছার জয়ধ্বনি পয়দা হয় কোন জমিনে?

এই ‘ইচ্ছা’র ভেতরের ইতিহাসটা গুরুত্বপূর্ণ। ইচ্ছা তো নিজে নিজে নিজের কাণ্ড থেকে ডালপালা হয়ে গজায় না। কে কেন কীভাবে কখন— এই সব শর্ত পালনও করতে হয়। অথবা ‘ইচ্ছা’ ব্যাপারটা নিজে কী? তাহলে একটা সার হয়তো মেলে। সেখানে ‘যার ইচ্ছা বোরকা পড়ুক, যার ইচ্ছা বিকিনি পড়ুক’ ধরনের সাধারণীকরণ খাটে না। আলগা একটা মলম বটে। কিন্তু আমরা বোরকা পরি বা বিকিনি পরি সেই মলম কেন আপন আপন গায়ে লাগাবো।

বরং এই বাক্যের মধ্যে ইচ্ছার প্রাধান্যের জায়গা থেকে বোরকা ও বিকিনি একই ধরনের চিন্তা কাঠামোতে হাজির হওয়ার ইশারা মেলে। সে অর্থে বোরকা ও বিকিনির ইতিহাস আলাদা করা যায় না। সেটাই ভয়ংকর ব্যাপার। কেন আলাদা ও একসঙ্গে বোরকা-বিকিনির আলাপ কেন করা যাচ্ছে না বিদ্যমান অবস্থায়— তাকে পাশ কাটিয়ে চটকদার উদারতার ফাপরে পড়ে যাই। এমন আলোচনাগুলো সরলতার ভান বা সুযোগ নিয়ে সূত্রগত আলোচনাকে দূরে সরিয়ে দেয়।

ভাবতে দিতে চায় না বোরকার যে মতাদর্শগত আলাপ তাকে ‘বিকিনি পরার ইচ্ছা’ দিয়ে মাপা যাবে না। দুই কর্তা তো আলাদা। তাদের ইতিহাস পরস্পরবিরোধী ও ক্ষেত্র বিশেষে বিস্তর লড়াইয়ের। পরস্পরকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার। তাহলে তাদের ইচ্ছাকে এক করে মাপ যায় না। এবং যে ইচ্ছা তাদের এক করে মাপে তারাও সেই ইচ্ছাকে পাত্তা দেয় না। এমনকি এই মাপকাঠি নিয়ে দাঁড়ানো ব্যক্তি তাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে দেখে না। সেখানে বোরকা ও বিকিনি মোটামুটি একই দৃশ্যে দুটি অংশ মাত্র। কিন্তু দুটি অংশ আলাদাভাবে বা একসঙ্গে কী গুণ ও ভাব ধারণ করে সেটা আর বিবেচ্য হয় না। বড় হয়ে উঠে দুটি অংশকে একই ছবিতে রাখার বাহবাটুকু।

সমাজের মধ্যে বোরকার পক্ষে যে-ই মূল্যবোধ দাঁড়ায়, বিকিনির আলাপ তার সমকক্ষ না। তাদের সম্পর্ক বরাবরই নাকচের। এমন একটা সমাজের পক্ষে হয়তো যুক্তি দেওয়া যেতে পারে যেটা না বোরকা-না বিকিনি’র পক্ষের লোক, সে এমন চিন্তা ওকালতি করতে পারে। কিন্তু বোরকা ও বিকিনির বিরোধের মীমাংসা করতে না পারলে ‘ইচ্ছা’র খবরদারির মধ্যে কোনো মীমাংসা নাই।

মীমাংসা হয়তো সহনশীলতার তরফে হতে পারে। কিন্তু, এটা কী বস্তু। রাষ্ট্র যখন বিকিনিতে নেই সেটা আদতে বোরকার পক্ষে থাকে না। এমন কি? এর মীমাংসা কী হবে। ‘মধ্যযুগ’কে আধুনিক বানানোর মন্ত্র দিয়ে! সেখানেই তো ঘোরতর জঙ্গিপনাগুলো চোখে পড়ে। মানে এই বিকিনিগত আলাপগুলো সেক্যুলার ও একটা উদারনৈতিক আলোচনা দ্বারা সামনে আনা হয়। কিন্তু সেক্যুলার তো ধর্মীয় চিহ্নকে ব্যক্তিগত জায়গায় নিয়ে যায়। আর বিকিনির চরিত্র ধর্মীয় না। তার আলাদা করে ব্যক্তিগত পরিসরে যাওয়ার দরকার পড়ে না। সে প্রকাশ্যে থাকতে পারে স্বাচ্ছন্দ্যে (বরং এভাবে স্বীকার না করলেও এর পক্ষের যুক্তিগুলো ধর্মের দৈব আনুগত্যের মতোই)। এখানে ইচ্ছাকে আরও উদোম করে হাজির করা হয়। আর বোরকার এর ধার ধারে না। এখানে ইচ্ছার বুনন বিকিনির মতো করে হাজির থাকে না। দুটো পরম অর্থ যেহেতু আলাদা, তাই দুইকে কখনো এক জায়গায় রাখা হয় না। ন্যূনতম অর্থে দুইকে ‘বিশ্বাস’ অর্থে বলা হলেও বোরকার ভেতরকার মর্ম এর অবোধ্য থেকেই যাবে। যা অবশ্য ভয়ের ও অবিশ্বাসের। বিপরীত দিক থেকে বিকিনিও ভয়ের হয়ে উঠে।

ইচ্ছার এই জয়গান চিন্তার নিরঙ্কুশ স্বাধীনতার জায়গা থেকেও হয়তো। যেখানে অপরাপর চিন্তার সঙ্গে আলাদা হয়েও বৃহত্তর কোনো চিন্তার জায়গা তৈয়ার হয় না আপাতত। যার যার চিন্তা তার তার। তাহলে আমাদের চিন্তাগুলো একসঙ্গে দাঁড়ালো কই! ইচ্ছা! তার ওপর তো জবরদস্তি খাটছে না, সে খবরদারিই করছে। যেখানে আপনি এমনই চিন্তার দাসত্ব করবেন সেই চিন্তার বিবর্তন বা বাঁকবদলের ঘটনা খুবই গৌণ। সেই ক্ষেত্রে অমুক এটা করুক বা তমুক এটা করুক— এই ধরনের চিন্তার মধ্যে স্বীকৃতির এমন একটা রূপ পাওয়া যায়, যে স্বীকৃতি আসলে বোরকা বা বিকিনির ওপর ছড়ি ঘোরায়। বোরকা আর বিকিনির তর্ক এক জায়গায় দাঁড়িয়ে করতে দেয় না। যে যেখানে আছে, সে সেখানে থাকে। এমনকি সামাজিক প্রাণী সাপেক্ষেও তারা একই পাটাতন দাঁড়ায় না, নিরন্তর যুদ্ধ করে। কারণ তাদের মতাদর্শিক অবস্থানগুলো কখনো সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলে না। বরং ইচ্ছার ছড়ি ঘোরানোর বদলে মানুষের জায়গা থেকে আর কী কী অপশন থাকে সেটা গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে এই মানুষগুলো এই পার্থক্য সত্ত্বেও কথা বলতে পারে— ইচ্ছার উন্নসিকতা না ছড়িয়ে। এবং সে ক্ষেত্রে ‘যার ইচ্ছা বোরকা, যার ইচ্ছা বিকিনি’র জন্য এমন বাহারি পণ্যের সুপারশপে যেতে হয় না, সেখানে একসঙ্গে টপলেস জামায় উন্মুক্ত থাকা শরীরের উপযুক্ত ফরসাকারী ক্রিম ও হিজাব শ্যাম্পু মেলে। পারস্পরিক ঘৃণা ও ঝগড়া সমেত, কোনো বোঝাপড়া ছাড়াই!

Comments

comments

One thought on “ইচ্ছার খবরদারি

  1. ধন্যবাদ স্যার। এই বিষয়ে এই কথাগুলো বলা দরকার ছিল। তবে আরেকটু আগে প্রকাশ করলে বেশী ভালো হতো।

Comments are closed.