শুঁটকি বৃত্তান্ত ও মন ভালো হওয়ার গল্প

শুঁটকি বানানোর প্রক্রিয়া আমার রপ্ত নাই। তবে শুঁটকি বানাতে দেখেছি। যেমন- রোদে শুকিয়ে কুচো চিংড়ি, পুঁটি বা মলার মাছের শুঁটকি। আবার লবণ, হলুদ ও সরিষার তেল মাখিয়ে ইলিশ মাছের শুঁটকি। ছোটবেলায় দইজ্যার কূলে দেখেছিলাম বিশাল বিশাল মাছের শুঁটকি। ওইগুলো কী মাছ ছিল জানা হয় নাই— কারণ যারা ওখানকার শ্রমিক ছিলেন তাদের ভয় পাইতাম, যেমন করে আজো অচেনা মানুষকে ভয় পাই। এ ছাড়া আরেকটা কারণ আছে, তা হলো প্রশ্ন করতে ভালো লাগে না। মনে হয় জানাজানি খুবই সহজাত ব্যাপার। আমি জানি, এটা নেহায়েত বোকার মতো ধারণা! কারো কাছে কোনো কিছু জানতে চাওয়া মানে, পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। সেটা প্রায়শ বোকামীতে পর্যবসিত হয়। যাকে বলে অনাভ্যাসে বিদ্যা নষ্ট।

Dried fishশুঁটকি সম্পর্কিত আমার প্রথম যে অভিজ্ঞতা ইয়াদ হয়— তা তিন কী সাড়ে তিন বছরের। ওইটা আসলে এক ধরনের ট্যাবুর মতো। ঘটনাটা এমন— শুঁটকি সম্পর্কিত যে কোনো অভিজ্ঞতা ওইখানে গিয়ে পর্যবসিত হয়। তখন লাকি আপুর সঙ্গে স্কুলে যেতাম। আমাদের স্কুলের নাম সবুজ শিক্ষায়তন উচ্চ বিদ্যালয়। লাকি আপু আমার প্রতিবেশিনী। আমাকে টিচাররা খুব আদর করত। একটা স্যার ছিলেন, যাকে সবাই বড়ুয়া স্যার বলতেন। আমি যখন স্কুলে ভর্তি হলাম, তিনি তার কিছু বছর পর অবসর নেন। উনি আমাকে কোলে নিয়ে হাঁটতেন আর ডাকতেন ‘বউয়ের বাপ’।

আমি সাধারণত লাকি আপার সঙ্গে টিফিন পিরিয়ড তক থাকতাম। একদিন হলো কী— লাকি আপু বাসায় গেলেন না। ফলে আমিও। উনার এক বন্ধু মানে আরেক আপু বললেন— আমার সাথে খা। আমরা তিনজন একটা বাটিতে করে ভাত খেলাম। শুঁটকির সালুন। গোটা গোটা শুঁটকি, চ্যাপ্টা। কী শুঁটকি— আজো জানি না। কী যে স্বাদ— এখনো যখনি শুঁটকি খাই— ওই সালুনটার কথা মনে পড়ে। বিকেলে বাসায় গিয়ে মিথ্যা বলতে গিয়েও পারিনি। সম্ভবত ওইটা ছিল সজ্ঞানে কারো সঙ্গে একপাতে প্রথম খাওয়া। এরপর কখনো খাওয়া হয় নাই সম্ভবত। আমাদের বাসায় মা-বাবার সঙ্গেও বাচ্চাদের একপাতে খাওয়ার চল ছিল না। কী নিঠুর মা-বাবা!

শুঁটকি বলতে সারাবছর চট্টগ্রামে যা দেখতাম তা মোটামুটি লইট্টা, ছুরি, রূপচাঁদা, ইলিশ— এবং সম্ভবত বাটা মাছ। এর মধ্যে রূপচাঁদা খাই না। তবে মাসখানেক আগে আপা-দুলাভাই মতিঝিলের হিরাঝিল রেস্টুরেন্টে আমাকে খেতে ডেকেছিলেন। তারা রূপচাঁদা খাচ্ছিলেন আর আমি ইলিশ। মাঝে মাঝে তারা নিজের পাত থেকে এক-আধটু রূপচাঁদা ফ্রাই তুলে দিচ্ছিলেন। তখন মনে হলো এতদিন রূপচাঁদা না খাইয়া ভালো করছি। এতো মমতা। অভিভূত হওয়ার মতো ব্যাপার। অন্য কেউ খেয়াল করলে ভাবত অভিভূত হওয়ার দৃশ্য।

Dried fish 1চট্টগ্রামে বেশি দেখতাম লইট্টা বা ছুরি শুঁটকির রান্না। খোসাসহ আলুর টুকরো, অনেক ঝাল ও টলটলা পানি। এখন জিবের গোড়ায় নিশপিশ করছে। তবে আমরা ঘন ঝোল পছন্দ করি। শুঁটকি সম্ভবত বেগুন দিয়েও রান্না হতো। আবার সিমের বিচি দিয়েও। আমরা সিমের বিচির চড়ুইবাতি করলাম পুকুর পাড়ে। সেখানেও শুঁটকি থাকত। আমার ভালো লাগত ইলিশ শুঁটকি কুচি কুচি করে বেশি বেশি পেয়াঁজ দিয়ে ভাজা। এখনো ভালো লাগে। ইলিশের সিজনে রাত ১২টার পর দেখা গেল মণ খানেক ইলিশ নিয়ে বাড়ির লোকজন বসে গেল— এরপর কাটো, লবণ, হলুদ ও সরিষার তেল মাখো। মাঝে মাঝে তাজা ইলিশ ভেজে খাওয়া হতো। ইলিশ বিক্রি করতেন এমন এক মহিলার নাম ছিল ‘শান্তির মা’। শান্তির মা!

তবে আমার কাছে ভেরি স্পেশাল হলো কুঁচো চিংড়ির শুঁটকি। এর একটা আইটেম দেখতাম নোয়াখালিতে গেলে। তখন আম্মা, ফুফু ও অন্যান্য মহিলারা সকাল ১০টার দিকে পান্তা ভাত খেতেন। ওইটা ছিল শুঁটকি কড়াইয়ে গরম করে পেঁয়াজ, শুকনো মরিচ ও সরিষার তেল দিয়ে মাখিয়ে। আহ! এখনো জিবে পানি আসছে। এটা সর্বশেষ খেয়েছিলাম গত বছর রিদয়পুর সাহিত্য আড্ডায়। ধন্যবাদ ফরহাদ (মজহার) ভাই। উনাকে অবশ্য তৎক্ষণাৎ শুকরিয়া জানিয়েছিলাম। আমি আর নিশান (ভাগ্নে) কক্সবাজার গিয়ে তো একবার শুঁটকি ভর্তার প্রেমে পড়েছিলাম। প্রতি বেলায় শুঁটকি খেয়েছিলাম।

Dried fish 2

আরেকটা রেসিপি আছে, কয়েকবছর আগে চট্টগ্রামে অর্পিতা (মাসুদ জাকারিয়ার বউ) রান্না করেছিল। আমিই বলেছিলাম শুঁটকি খাবো। সেটা ছিল মাছ ও শুঁটকির মিশেলে রান্না। সম্ভবত খিচুড়ির সঙ্গে খেয়েছিলাম। হা হা হা। পরে ঈদের সময় দেখি আম্মাও একই জিনিস রান্না করছে। ওই ঈদে আমাদের বাড়ি এসেছিল শোয়েব করিম। ও জানালো তার দুলাভাইয়ের এলাকায় (বসুরহাট) একে মরা-তাজা বলে। কী বিচ্ছিরি নাম!

এবার আসা যাক মন ভালো হওয়ার গল্পে। আমার যখন খুব মন খারাপ থাকে বা বিষন্ন থাকে— শুঁটকি যেন নিরাময়ী গুণ নিয়ে হাজির হয়। বিশেষ করে পরীক্ষা টাইপ ব্যাপারগুলোতে। পরীক্ষার ভার মাথা থেকে নামলেই আর কিছু ভালো লাগত না। কারণ বেঁচে থাকার আপাত কোনো কারণ থাকে না। অথচ বন্ধুদের মাঝে কী আনন্দ! তাই ক্যাম্পাসে থাকতে প্রতি পরীক্ষার পর শুঁটকির তরকারি দিয়ে ভাত খাইতে চাইতাম। কয়েকবছর আগে এমফিল ফার্স্ট পার্ট পরীক্ষায়ও একই কাণ্ড। তখন তো আরও একা। বন্ধুহীন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতাম আর মন খারাপ করতাম। তবে বটতলায় হালকা শুঁটকি দেওয়া ভাজাভুজি পাওয়া যেতো। তাই রক্ষা! আর হতাশাজনক কাণ্ডে— কে আমাকে স্বস্তি দেবে? শুঁটকি!! আর এখন– আমি অনেক ফুরফুরে!

ব্যবহৃত ফটো : অনলাইন থেকে সংগৃহীত। কৃতজ্ঞতা : জাহাঙ্গীর সুর/যিনি শুঁটকি পছন্দ করেন না।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *