জানালা লাগিয়ে গণতন্ত্র রক্ষা

অফিসে আসা-যাওয়ায় তিনটে বাস পাল্টাতে হয়। হালের ট্রেন্ড হলো বাসের জানালা লাগিয়ে বসা। কাঁচ একটুখানি ফাঁক করে বসার জো নাই, চারদিক থেকে রব উঠবে— দেশের কি অবস্থা জানেন না, জানালা লাগান। সে দিন এক ছেলে বারবার জানালা খোলায় বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হলো। অবশ্য চেহারায় গরীবী হালতের কারণে এটা সহজেই সম্ভব হলো। হয়ত!

fire in bus-ws.com

ওইদিন জানালা টেনে বসলাম, পেছনের সিট খালি ছিল। দুই কাঁচের একটা ছিল না। পেছনে এসে এক ভদ্রলোক বসলেন। এসে আমার জানালার কাঁচটা টেনে নিলেন। আরেকদিন আমাদের সামনের সিটের কাঁচ ছিল না। অনেকক্ষণ কেউ আমাদেরটা টানল না। একজন টানতে গিয়ে কী মনে করে থেমে গেল।

কিন্তু জানালার পাশের সিটটা ছেড়ে গেল না। অর্থাৎ এ সম্ভাবনাকে মেনে নেওয়া হচ্ছে। কাউকে বলতেও শোনা গেল না, ‘এমন বিপদের দিনে জানালা লাগানো হয় না ক্যান!’ কারণ কিছু না। আমরা সয়ে যাই। কিন্তু পাঁচ মিনিট গাড়ি দাঁড়াক— চিল্লাচিল্লি শুরু হবে। ‘সময় খারাপ, তাড়াতাড়ি চালা’। ভাগ্যিস বাংলায় তুই, তুমি, আপনি বলে কিছু ব্যাপার আছে। ফলে আমাদের ভদ্রতার কাকতাড়ুয়া সাজা সহজ, আবার খসে পড়াও সহজ। আমরা শুধু নিজের জান নিয়া পালাতে চাই। দুনিয়ায় কারো জান আমার আপন জানের চেয়ে মূল্যবান নয়। আমার জন্যই কেউ প্রতিক্ষা করে, আর কারো জন্য না।

এমন তর্কও শোনা যায়, জনগণকে কষ্ট দিয়ে গণতন্ত্র চাওয়া বা না চাওয়া কেন? মানে হইল একটা দেশে আমি থাকব। আবার সে দেশের আসল পরিস্থিতি থেকে বাইরে থাকব। জানালা লাগাইয়া। আরে আমার কাজ কি অন্যের উপ্রে প্রভাব রাখে না। থাক, এতো ঝুট ঝামেলা ক্যান। আর্মি আসুক। আর্মি ভালো।

সেই ছোটবেলায়, যখন ১৯৯১ সালের পর। লোকজন বলত, ‘গণতন্ত্র আসছে। এখন যদি কেউ রাস্তায় খাড়ায়া বলে হরতাল, তবে হরতাল’। এ হলো গণতন্ত্রের বোঝাপড়া। এখনও শুনি গণতন্ত্রকে ধরে রাখতে হবে। কোথায় বসে কে ধরে রাখে কে জানে! যে লোক একটু আগে গণতন্ত্রের কথা বলে সে খানিকক্ষণ পর বলে, আর্মি শাসন ভালো। সে হয়ত তার রূপ দেখে নাই। এই তো এভাবে চলছি।

এটাই আমার জীবন। যেখানে জীবন আর আপন আপন অধিকারবোধ কোন ধরনের সমতা রক্ষা করে চলে না। সে এমন এক জীবন, যেখানে অধিকার আর দায়িত্ব-কর্তব্যবোধ জীবন থেকে আলাদা। তারা পরস্পরকে তুচ্ছ ভাবতেই ব্যস্ত। আপনার ভাবে না। অথচ প্রতিবার বাস পুড়তেছে, আপনিও পুড়তেছেন। আপনার সকল অধিকার বাসের আগুনে পুড়ছে।

আচ্ছা এটা ভালো, আচ্ছা ওটা যখন হচ্ছে না এটা ভালো। আরে এতে তো জনগণের ক্ষতি হচ্ছে। পড়ুন, শুধু আমারই ক্ষতি হচ্ছে। কারণ, আমার কাছে আমিই মূল্যবান। আর কেউ না। তো, এ ব্যাপারটা যদি পরিষ্কার থাকেন— তাইলে এতো এতো কল্পনা শক্তি ব্যয় করতে হয় না। নাকি এমনটা ভাবলে নিজের কাছে নিজে ছোট হইয়া যাই।

আসলেই এমনটা ভাবলে ভালো লাগে না! আসুন রাজনীতিরে গালি দিই, সুশীলরে গালি দিই, টক শোরে গালি দিই…। এর কোনোটাই আমার জানালা না। শুধু নিজেরে না পুড়ানোর বাসনা জারি রাখি। ভেতরে পুড়লে পুড়ুক, তার গন্ধ বাইরে আসে না। বাইর যেন না পুড়ে। হা গণতন্ত্র রক্ষা করতে হবে, তাকে ভুলণ্ঠিত হতে দেয়া যাবে না। তাই আপন আপন জানালার কাঁচ লাগিয়ে রাখুন। না থাকলে অপরের জানালা থেকে ভাগিয়ে আনুন।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *