আমার মনের বাড়ি আমার না

এক.

জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় শনিবারে আমাদের অফিসে কোয়ান্টাম মেথডকৃত ধ্যানের ৩০ মিনিটের একটা সেশন হলো। প্রথমদিকে একটা বিষয় ছিল চোখ বন্ধ করে নাক দিয়ে জোরে শ্বাস নেওয়া, মুখ দিয়ে ছাড়া। শরীর থেকে দুষিত কিছু বের করে দেওয়ার একটা ব্যাপার আরকি! প্রথম ধাপেই আমি ফেল্টুস।

জোরে শ্বাস নেওয়া ও ফেলাকে খুবই ব্যক্তিগত জিনিস মনে হইতেছিল। আরও মনে হচ্ছিল আমি ছাড়া সবাই চোখ খোলা রাখছে। তাই এ অস্বস্তি! যাই হোক মনে করলাম জোরে শ্বাস নিতেছি আর ফেলতেছি। এইভাবে মনের বাড়ি নিয়া গেল। জিনিসটা তেমন বিরক্তিকর লাগে নাই যতটা ভেবেছিলাম আগে, আহামরিও মনে হয় নাই। তবে একটা জিনিস— আমার মনে হলো মিনিট দশেক চোখ বন্ধ করে ছিলাম। মন প্রশান্ত হইছে কিনা জানি না, কিন্তু আসল ব্যাপার হলো এমনে এমনে এতক্ষণ চোখ বন্ধ রাখা কঠিন। একসময় অবশ্য রাখতাম। তখন হইত কী, বাসায় কোনো মেহমান আসছে আমরা কথা বলতে লজ্জা লাগতেছে অথবা ইচ্ছে করতেছে না- ঘুমের ভান করে থাকতাম। এটা ভান ছিল না। পরে যখন শুনলাম পুরা জিনিসটা আধঘণ্টার- তব্দা খাইয়া গেলাম।

কিন্তু মনের বাড়ি জিনিসটাই পাখি ডাক-জলের শব্দ দিয়া কনফিউড করছে। এ ভয় আমার আগে থেকেই ছিল। আমার ভেতরে ঢুইকা কেউ আমারে চুরি করে নিচ্ছে না তো (অবশ্য ‘আমি কী’ এটা কঠিন প্রশ্ন)।

wahedsujan.com-MEDITATION????????????????????????????????

ব্যাপারটা বলি, যদি মনের বাড়িটা এজমালি না হয়ে- একান্ত কিছু হয়। যেখানে একা একা সুখে-শান্তিতে থাকবেন, তেমন কিছু! তাইলে ইট-কাঠ অর্থে আমার মনের বাড়ি নাই। অন্য অর্থে আছে। সেটা কেমন? আমার মনের বাড়ি হইল দুইটা- একটা খোলা মাঠ, সবুজ ঘাস আর উপরে নীল আকাশ। আরেকটা হলো ঢেউ খেলানো পাহাড়ের সারি। আমি সবচেয়ে উপরের পাহাড়ে বসে আছি (ইগোস্ট কিছু হতে পারে)। সেখানে কোনো শব্দ নাই, এমনকি বাতাসে কিছু নড়েও না। যাই হোক, গুরুজীর রেকর্ড করা বাণী আমার মনে বাড়িতে পাখি আর জল নিয়ে আসল (রেকর্ডে এ সবের হাকাহাকি ছিল)। যা অবধারিতভাবে ফুলও নিয়া আসছে। আর গাছের ফাঁকে ফাঁকে সূর্য কিরণ। হায়! কতভাবেই না আমরা চুরি হইয়া যায়। সবাই কি ম্যাট্রিক্স হইয়া যাইতেছি!

দুই.

মেডিটেশনের আগে কোয়ান্টাম বিষয়ক কিছু কথাবার্তা শোনা হল। অনেক অনেক কথা আর উদাহরণের ভেতর একটা হল এটা ধর্ম সম্মত। প্রত্যেক ধর্মে নাকি এটা আছে। যদি এটা থাকে তাইলে ধর্ম করলেই তো হয়। না কি! এ ছাড়া এখানে মনের বাড়ি বইলা একটা জায়গা নিতেছে। অথচ ধর্মের লক্ষ্য হলো- আল্লাহ। এখানে আল্লাহ কই। বরং দৈব বাণীর মতো কথা বলতেছেন গুরু। এর অন্য কোনো ব্যাপার থাকতে পারে। যাই হোক!

প্রতিটি ধর্ম দুনিয়াতে ওই সময়ে একটা মিশন লইয়া আসছে। সেটা কত সময়ের তা অন্য ব্যাপার। তাই ধর্ম মাত্রই ধ্যান না- জগত সংসার নিয়া তার বয়ান ও স্রষ্টার লগে মানুষের সম্পর্ক এখানে গুরুতর বিষয়। তাছাড়া আপনি ধ্যান করবেন ভালো কথা— তার জন্য ধর্মের দোহাই দরকার ক্যান? এটা কী ধর্মের মিশনের লগে কন্ট্রাডিক্ট করে না। সম্বন্বয়ও হইতেছে। সম্বন্বয় জিনিসটা কোনো কিছু এসেন্স নষ্ট করার জন্য ভালো জিনিস।

এভাবেও দেখা যায়- দুনিয়ার সব ধর্ম বলে ‌‘সত্য বল’। কিন্তু দুনিয়ায় ধর্ম না কইরাও সত্য করা যায়- সে সত্যে পরম সত্য মিলবে এমন ধারণা ছাড়া। তেমনি আল্লাহ মিলবে এমন ভাব না নিয়াও ধ্যান করা যায় (এখানে অবশ্য আল্লাহর কথা বলা হয় নাই)।

তিন.

মেডিটেশন বিষয়ে বয়ানের একটা অংশ হলো বিশ্বাস বিষয়ক। বিশ্বাস কইরা কে কী করছে তা বলা হলো। কিন্তু বিশ্বাস কি এমন কিছু? এটা তো একটা ভৌতিক বিষয়! আপনি ভুতে বিশ্বাস করেন, এলিয়েনে বিশ্বাস করেন বা বিশ্বাস করার ইচ্ছা করেন- তাতে কী আসে যায়। এর সঙ্গে আপনার আমলের সম্পর্ক। দুনিয়াতে আপনি কী করবেন বা কী হবেন তা আমলের উপ্রে নির্ভর করে। তারপরও ধইরা নিলাম বিশ্বাস বইলা কিছু আছে- যা আপনারে মিলাইয়া দিবে। কিন্তু কোয়ান্টাম যাদের যাদের উদাহরণ বলল- তারা তো কোয়ান্টাম করে নাই। কোয়ান্টাম কেমনে বলবে তাদের বিশ্বাসের প্যার্টান কোয়ান্টামে বিশ্বাসের মতন।

চার.

সে দিন সকালের একটা গল্প বলি। ফার্মগেট থেকে নিউ ভিশনে উঠলাম। কাওরান বাজারে আসতে উঠলেন মজনু ভাই। তিনি আমাদের বার্তা সম্পাদক। মনে হইল উইঠা গিয়া কথা বলি। পরে মনে হইল এতক্ষণ সংসারের মধ্যে ছিলেন। অফিসে গেলে ১০-১২ ঘণ্টা নিউজ নিয়া থাকবেন। বাসের ২০ মিনিট তার জন্য একান্ত নিজের। যা ভাবলে ভাল লাগে আরকি! ধরেন এমন সময় আপনি চাইলে কাউরে একটা ভেংচিও দিতে পারেন। তো, উনারে ফলো করার কোনো মানে হয় না। একান্ত ইচ্ছার মধ্যে উনি থাকুন।

এরচেয়ে সমুদ্র যাত্রা ভাল। চোখ বন্ধ করে সমুদ্রে চলে গেলাম। একা একা একটা জাহাজে। যে জিনিসটা বিরক্তিকর ঢেউয়ে কোনো ছন্দ নাই। যেদিক থেকে ইচ্ছে আসতেছে। তখন মনোযোগ দিলাম মাঝিহীন নৌকাগুলোর দিকে। নোঙ্গর ফেলা চারদিকে জাল ছড়ানো নৌকাগুলো একা একা দুলতেছিল। দুইবার চোখ খুললাম। একবার শাহবাগ, আরেকবার পল্টনে।

এখন ভাবতেছি- এসব মনের বাড়ি অন্য কারো এন্ট্রি নাই ক্যান! এমনকি নিজের প্রতিবিম্বেরও।

পাঁচ.

তবে মোটের উপর অন্যের বানানো আমার মনের বাড়িতে ভালোই লাগছে। একটা আর্টি ব্যাপার আছে তো! এভাবে নানা কিছুরে মূল থেকে বিচ্ছিন্ন কইরা মূল জিনিস বইলা চালানোর চল খারাপ না। অন্যদের মতো এরে বাণিজ্য আকারে দেখছি না। একটা শিল্প আকারেই দেখছি। তো, শিল্পের জয় হতে পারে। এতে আমার বলার কিছু নাই।

Comments

comments

One thought on “আমার মনের বাড়ি আমার না

  1. এক পরিচিত জনকে একদিন দেখলাম উনি উনার বাম হাতে সোনালী রঙের বালা পড়েছেন। এই বালার মাহাত্ন্য কী সেটা জানতে চাইলে উনি জানালেন যে এর দ্বারা নিজের মন সুস্থ থাকে, ব্লা, ব্লা…. এর মাস খানেক পর আরেক পরিচিত জনের হাতে দেখি ঐ একই বালা। উনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম বালাটা কোথায় পাওয়া যায়। উত্তরে উনি কোয়ান্টার ফাউন্ডেশন নাকি কী একটা অর্গানাইজেশনের নাম বলেছিলেন এবং আমাকে ওখানে নিয়মিত যাওয়ার জন্য অনেক বয়ান করছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *