জলে কার ছায়া

আমি মাঝে মাঝে গল্প লিখার চেষ্টা করি। কবিতার সাধনা আমাকে দিয়ে হবে না তা জানি। কবিতা দেখা, শুনা ও অনুভূতিকে মন্ত্রে রূপান্তরিত করে। এটা গভীর ভাব আর সাধনার বিষয়। গল্পে সে গভীরতা নাই এমন না, তবে যেমন ইচ্ছে নিজের জগতটাকে বর্ননা করা যায়। কোন সিদ্ধান্ত থেকে এই কথা বলছি না। কয়েকটা গল্প লেখার পর খেয়াল করেছি আমার গল্প আসলে এক নিঃসঙ্গ কিশোরের বয়ান ছাড়া কিছুই না। সেই কিশোর জলের দিকে নিমগ্ন তাকিয়ে রয়, মেঘের ভেলায় ভাসে অথবা বৃষ্টির দিনে দিকহারা মাঠে শুয়ে থাকে। তার সঙ্গী সাথী কারা। তার মা, বাবা, ভাই, বোন, বন্ধু সব কিছুই বানানো। কিন্তু জগতে এমন কাউকে দেখছি বলেই তো গল্প বানাচ্ছি। কেন না, সেইসব গল্পের বাবা বা মা কিছু অংশে তো আমার দুনিয়াবী বাপ, মায়ের মতো।

কিন্তু এমন একটা চরিত্র আমি বানাইতে পারি নাই- যিনি আমারে শিক্ষা দিতে পারেন। ভক্তি ভরে তার চরণ ধুইয়ে দিতে পারব। নিজের অক্ষমতা বেশ টের পায়।

ছোটবেলায় খুব ভোরে উঠে মক্তবে যেতে হতো। ওজু করতে পুকুর ঘাটে যেতাম। জলের দিকে তাকিয়ে তাকতে ভালো লাগতো। নিজে নিজে জলের সাথে কতো কথা বলতাম। দুপুরের খাবারের পরের সময়টা আমার কাছে সবসময় অন্যরকম। অন্য রকম আলোতে ভরা উদাসীন সময়। সবাই ঘুমিয়ে পড়ত। আমি একা একা পুকুরের জলে তাকিয়ে থাকতাম। আমার স্বপ্নেরা এসে হাজির হতো। এই করে করে আমার বয়েসীদের মূল স্রোত থেকে আলাদা হয়ে পড়ি। তাদের কথাবার্তা বুঝতে পারতাম না। অদ্ভুত লাগত। কখনো খেলার চেষ্টা করতাম। মজাও পেতাম। তারপরও সেই মজাটা কাউকে বুঝাতে পারতাম না।

তারপরৃ. নিজেতে কথা বলা চলত সারাক্ষন। কিন্তু সামাজিক উঠে প্রবল বাসনা ছিলো মনে মনে। মনে হতো আমি নিজে নিজে কখনো এই বাসনা ছুতে পারব না। কোন একজন মানুষ এসে আমাকে উদ্ধার করবেন। যাই হোক, মসিহার যুগ শেষ।

একটু কনফেশন করি, পুরো জিনিসটায় একা একা কথা বলার মধ্যে ঘটেছে। কেন না, পরবর্তীতে আমার বন্ধুরা যাদের নমস্য মনে করতেন, যাদের চরণ ছুয়ে ধন্য হয়েছে এবং তারা আসলেই নমস্য- আমি তাদের কাছে কখনো যাই নাই। লজ্জাবোধ তো আছে সাথে অদ্ভুত একটা হেতুও আছে। আমার ভেতরে কে যেন বলে- তোর ভেতর যে আছে তার কাছে খোঁজ…।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক স্যার।

এইভাবে বললে অনেককিছু বলা সম্ভব। আমি আসলে মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক স্যার-কে নিয়া দুই কলম লিখতে বসেছি। আজ স্যারের জন্মদিন। কিন্তু কোথা থেকে কি শিবের গান গাইছি। যেহেতু বাসনা অপরিপক্ক তাই দুই এক কথা বলে ছেড়ে দিই।

স্যারের উপর বেশির ভাগ ছাত্রের বিরক্তি। কেন না, স্যার জ্ঞানতত্ত্ব ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স নামে দুটো খটর-মটর বিষয় পড়ান। এইসব ছাই-পাশ নাকি মাথায় ঢুকে না। তার উপর পুরানা নোটও নাই। এমন কি অহরহ নোটপত্র থাকা দর্শনের সমস্যায়ও তিনি একই গোল বাধিয়েছেন। কিন্তু স্যার নাছোড়বান্দার মতে পড়িয়ে ছেড়েছেন। বাহবা দিতে হয়!!

স্যারের কথা ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হয়েই শুনেছি। যেহেতু ফার্স্ট ইয়ারে ক্লাস নিতেন না। তো, তার সাথে সাক্ষাতের সুযোগ হয় নাই। ফার্স্ট ইয়ার ফাইনালে কোন এক পরীক্ষায় স্যার বললেন, এখানে ওয়াহেদ কে? লাজুক ভঙ্গিতে বললাম,আমি। স্যার আমার নোট খাতা পড়ে প্রশংসাসূচক কিছু একটা বলেছিলেন। মনে নাই।

ফার্স্ট ইয়ার শেষে আমার চিন্তা নৈতিকতার ভিত্তি ও তাৎপর্য নিয়ে ব্যাকুল হয়ে গেল। স্যারকে ভয়ে ভয়ে ফোন করলাম। তিনি আমাকে একটা বই দিলেন। এটাকে এক ধরণের পরিচয় বলা যায়। মজার বিষয় হলো, এরপরে অন্য কারো কাছে যেমন- স্যারের কাছেও আমি কখনো কোন বিষয়ে জিজ্ঞাসা নিয়া যায় নাই। আমার মনে হতো, আমার পাশে কেউ কাছে সে আমাকে উত্তর দিবে। সুতরাং, গুরু বিষয়টা আমার কাছে পষ্ট হয় নাই। নিজের ভ্রান্তিও টের পাই।

কোন একদিন স্যারের বাসায় গিয়েছিলাম। স্যার বাগানে কাজ করছিলেন। আমি তার কাজ দেখতে দেখতে কথা শুনছিলাম। এখনো মাঝে মাঝে মোবাইলে তার কথা শুনি। প্রশ্ন করা হয় না। তিনি কাজ শেষে বললেন, এইবার গুরুর হাত ধুইয়ে দাও। আমি স্যারের হাতে পানি ঢেলে দিলাম। সেই দিনের অনুভূতি জানা নাই। এখন মনে হয় সবকিছু হয়ত কথা দিয়ে হয় না। অনেক কিছু আড়ালে থাকে। যেটা শুধু র্হদয় বুঝতে পারে। স্যার প্রশ্ন করা পছন্দ করেন। কিন্তু আমি কখনো প্রশ্ন করি নাই। তারপরও তিনি আমায় পছন্দ করেন। এই ভালোবাসার দান কোথায় রাখি! তার এই স্বীকৃতি আমার জন্য অনেক।

ইউনিভার্সিটির শেষ দিন নিয়ে আমার একটা গল্প আছে। সেই গল্প থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করছি-

শেষ পয্যন্ত সেই অসম্ভব নিরবতা আর নির্মম সময় উপস্থিত। আমাকে যেতে হবে। আমাদের দুজনের চোখ ভেজা। একসময় বললাম, স্যার আপনার পা ছুয়েঁ সালাম করব। আমার সামনে দুনিয়াটা উলটে পালটে যাচ্ছিল। ইচ্ছে করছিল দূরে কোথাও পালিয়ে যাই। এই আবেগ আর সহ্য হচ্ছিল না। আহ.. আমি যদি অনুভূতিহীন হতাম, অন্তত এই মুহুর্তে।

তিনি আমাকে বুকে জড়িয়ে নিলেন।

……………………………………………………

এখনো ডিপার্টমেন্টের জুনিয়র কারো সাথে পরিচয় হলে তারা বলে, স্যারের কাছে আপনার নাম শুনেছি। আমি বিস্মিত হই না। এই দুনিয়ায় আল্লাহ মানুষকে নানান ধরণের ভালোবাসার উসিলায় বাঁচিয়ে দেন। আমিও তেমনি বেঁচে থাকি। আমাদের কাছে পর্যালোচনায় চেয়ে পছন্দ-অপছন্দ বেশি প্রিয়। আমার বন্ধূরা এবং অনেকে নানা কারনে স্যারকে পছন্দ করেন না। স্বাভাবিক। কিন্তু আমি খেয়াল করেছি স্যারের নতুন নতুন নানা বিষয়ে  জানতে চাওয়া ও দার্শনিক অনুসন্ধানের  মহিমা অনেকে ধরতে পারে নাই। স্যারকে নিয়ে আমারও সমালোচনামূলক অভিমত আছে। সেটা প্রাসঙ্গিক না। কিন্তু মানব চিন্তার অবিরাম চলনে তার আস্থা আমায় আপ্লুত করে। মজার বিষয় হলো আমার পড়ালেখা এখনো তার দেখানো রাস্তায়। অদেখাতেও গুরুগিরি ছাড়েন নাই!!!

সেই কিশোরের জলের গল্পে ফেরত যাই। অনেকদিন কোন অদ্ভুত আলোর দুপুরে জলে কারো ছায়া খুঁজি না। কিন্তু স্বপ্ন তো থেমে নাই। সেই স্বপ্নে জলে যাদের মুখ ফুটে উঠে, সেই সব বাস্তব অবাস্তব মানুষের মাঝে স্যার একজন। স্যারকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা। তার কৌতুহলের আজন্ম জেগে থাকুক।

>ফটো:  স্যারের ফেসবুক একাউন্ট থেকে সংগৃহীত। অচেনা ফটোগ্রাফারের কাছে কৃতজ্ঞতা রইল।

>লেখাটির আমার দেশ লিংক

Comments

comments

35 thoughts on “জলে কার ছায়া

    • ধন্যবাদ জানে…
      অনেক যৌথ ভালোলাগার সাথে আরেকটি ভালোলাগা যুক্ত হওয়ায় আমিও আনন্দিত।
      সর্বশেষ কবে চিঠি লিখেছিস মনে আছে?

  1. sir re loia amar o ek kha valo laagar sriti ase, sritita amare kajer prerona jogay abar atonkito o kore tole, sir sustho thakun ata e kamona…

    • অজস্র বর্ষার স্মৃতির সাথে
      অনিঃশেষ লাবন্য মাখে
      নিকট আর দূরের সমূহ পথ
      ঠিকরে উঠে সবুজ চামড়ার ভাঁজে।

  2. আমাদের কাছে পর্যালোচনায় চেয়ে পছন্দ-অপছন্দ বেশি প্রিয়। আমার বন্ধূরা এবং অনেকে নানা কারনে স্যারকে পছন্দ করেন না। স্বাভাবিক। কিন্তু আমি খেয়াল করেছি স্যারের নতুন নতুন নানা বিষয়ে জানতে চাওয়া ও দার্শনিক অনুসন্ধানের মহিমা অনেকে ধরতে পারে নাই। স্যারকে নিয়ে আমারও সমালোচনামূলক অভিমত আছে। সেটা প্রাসঙ্গিক না। কিন্তু মানব চিন্তার অবিরাম চলনে তার আস্থা আমায় আপ্লুত করে। মজার বিষয় হলো আমার পড়ালেখা এখনো তার দেখানো রাস্তায়। অদেখাতেও গুরুগিরি ছাড়েন নাই!!!

    স্যারের জন্য সালাম। আমি দর্শনের ছাত্র নই, তবু নিজেতে শিষ্য বোধ হচ্ছে।

  3. আজ ব্লগে এসে আরো ভাল লাগল। চমৎকার দেখাছে আরো। পরিষ্কার ও ঝকঝকে…।
    কমেন্ট গুলো (উত্তর একই লাইনে হচ্ছে) এটা স্টেপ করে দিলে পড়তে আরো ভাল লাগবে।

    আপনার লেখা নিয়ে বলার কিছুই নাই, চমৎকার লিখেন, লিখুন।

    • এইমাসের সাত তারিখে এম.ফিল থিসিস জমা দিয়েছিলাম। এই কারণে অনেকদিন নতুন কিছু লেখার মুড ছিলো না। সেই সময় দুই একটা কবিতা ও বেশিরভাগ পুরানো লেখা শেয়ার করেছিলাম। থিসিস জমা দেবার পর কিছুদিন ঘুরাঘুরি করলাম। ইনশাল্লাহ, এবার নতুন লেখা দিবো। সম্ভব হলে আজই। ভালো থাকুন।

  4. স্যারের সাথে প্রায় দেড় বছর ধরে পরিচয়। অসাধারণ একজন মানুষ।
    আপনার অনুভূতি হৃদয় ছুয়ে গেলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *