দ্বৈরথে বাঁধা নিত্য জীবনের অভিজ্ঞান

মানুষ নিজেকে ইতিহাসের ভেতরই প্রকাশ করে। এক অর্থে, মানুষ ইতিহাস চেতনায় বন্দী! ইতিহাস লিপিবদ্ধ

পাথরের পাঠশালা। মাদল হাসান। প্রচ্ছদ: তৌহিন হাসান। প্রকাশক:সংহতি। একুশে বইমেলা ২০১১। পৃষ্টা ৬৪। মূল্য ১০০ টাকা।

করার জন্য যুক্তির কষ্টিপাথর থাকে। থাকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রমান। কিন্তু মানুষের ইতিহাস শুধুমাত্র যুক্তির ইতিহাস নয়। কখনো ব্যক্তি তার বাসনায় ব্যক্ত হয় আবার কখনো বাসনা  নিজে অব্যক্ত ও অধরা থেকে যায়। এই ব্যক্ত-অব্যক্ততা ফুড়ে বের হয় মানুষের যাবতীয় নিত্য অভিজ্ঞান, দিব্য অভিজ্ঞান। সে পথে নির্মিত হয় তার যাবতীয় কলা চৈতন্য। কলা যেন যুক্তি আর অযুক্তির সেতু। কলায় লিখিত হয় দুনিয়ার আদিম ইতিহাস। শুরুর বিন্দু- যেটা এখনো যুক্তির ইতিহাস নির্মাণ করতে পারে নাই। মানুষকে নিজেকে খুড়ে বের করে নিত্য দুনিয়ার পাঠাতন। কিসে দাড়িয়ে আছে মানুষ আর দুনিয়ার ইতিহাস।সে সম্বল নিয়েই তবে মাদল হাসান বলেন,

‘মানুষের ব্যক্তিত্বের এমনই ধরন যে/ সে নিজেই বাদী এবং নিজেই বিবাদী…’ (ব্যক্তি, পৃ: ৫৪)

অথবা

‘সব পাতা পাঠ্য হোক/ সব নদী, সব সাগরের জল হোক মসী/ পথে পথে পাথরের রঙিন রহস্যচক/ মাঝে মাঝে মৃত্যুকে পান করি এক ঢোক/ যেহেতু মৃত্যুই আমাদের একমাত্র সমান বয়সী…’। (পাথরের পাঠশালা দুই, পৃ: ১৪)

আহা, নশ্বরের ভেতর মানুষ তার সঙ্গীকে খুজে পেলো। যা কিছু নিত্য তাতে তার দ্বিধা। মৃত্যুর অমরতায় তার দ্বিধা নাই।দ্বিধা নাই বলে ইতিহাসে নিখাদ ধ্যান থেকে যাপিত জীবনের খর বাস্তবতা সকল কিছুতে স্নান করেন। যেন নৈবদ্য হয়ে নিজের সমর্পন । নিজেকে সমর্পন করে  বাদী-বিবাদী মানুষ।যে মানুষটা কবি। প্রশ্ন তুলি, বিস্মিত হই- কবি না কবিতা কে কার উপর ভর করে। সে নিশ্চয়ই কূল প্লবী রূপান্তরের গল্প। সে গল্পটুকু চৈতন্যের আসবাব পত্রে ঘর বানায় সাজিয়ে রাখে সপ্ত আসমানে। যে আসমান মানুষ ছুতে পারে, বুঝতে পারে এবং বলতে পারে। এই বুঝাবুঝির ভেতর মানুষের বাইরের কোলাহল আর ভেতরের ধ্যান নিজেদের বাধে একসাথে। সে এক আশ্চর্য সুতো। আশ্চর্যরকম নির্লিপ্ত আবার সে নিজের উর্ধ্বে উঠছে। এ যে সত্ত্বার ভীষণ অস্পর্ধা। প্রতিমুহূর্তে ভীষণ অশান্ততার মধ্যে নিজেকে শান্ত নিমোর্হ করে দেখা। সে তো বাসনার বাইরে নয়।‘পাথরের পাঠশালা’ কাব্যগ্রন্থে মাদল হাসানের প্রথম কবিতা-

‘আর কিছু নয়/ নির্জনে নিজের উর্ধ্বে উঠা…/ ফুল হয়ে ফোটা/ পুষ্পহীনতা কালে/ ডালে…’ (নির্জনে নিজের উর্ধ্বে উঠা, পৃ: ১১)

নির্জনে প্রকাশ হয় দৈব বাণী।পয়গম্বর মুসার সামনে ঝোপ পুড়েছে আগুনে, মুসাও কি পুড়ে খাটি হয় না। জিহোভা দিয়েছেন  মানুষকে সুতোয় বেধে রাখার কৌশল। আবার এই মুসাই লাটির আঘাতে দুইভাগ করেছেন সাগর। নির্জনেই সকলের সৃষ্টি। নির্জনেই সকল ভাগ। নির্জনেই নিজেকে চেনা। কিন্তু নির্জনতায় জীবন নয়। তাকে হেটে যেতে হয় আরো দূরে। নির্জন থেকে যাত্রা মাদাল হাসানের। দীর্ঘ যাত্রা শেষে আমরা আসি এক নিশ্চিতির জগতে। মুসার জাতি যেমন ঘুরেছে মরুভূমিতে। মনুষ্য জীবন কি এই প্রতিশ্রুতির অন্বেষন নয়। তবে মাদল হাসানের প্রতিশ্রুতি নিজের কাছে নিজের নির্মিত। তার আছে অখন্ড রূপ।

‘তুমিও রেখে যেও আগামী জনেদের/ জন্যে গানেভরা ভূ-মন্ডল…/পশু ও পাখি-কীট, বৃক্ষ-মৎস্যের/ মহত্তম এক অবনিতল’। (ঈশ্বরী পাটনীর প্রার্থনা, পৃ: ৬৪)

অথবা-

আত্মজা আমার, তুমি রান্নাবাটি খেল স্বস্থিতে (রাঙা গোধূলির রান্নাবাটি, পৃ: ১৮)

সন্তানের দুধে-ভাতে থাকার প্রার্থনার মধ্যে ধরা দেয় আগামীর পৃথিবীর সম্ভাবনা। এটি কি নিছক দুধ-ভাতের কাহিনী,নাকি পেছনে আছে দুলঙ্ঘ্য কথামালা-অনুভব। এই দুধ-ভাতের কথা বাংলায় বিরল নয়। তার আছে আর্থ-সামাজিক ইতিহাস। কি সেই দুধ-ভাত! এই সুরাহা না করেও বুঝা যায় মাদাল হাসানের কবিতায় বিমূর্ত চিন্তা মূর্ত হয়ে ধরা দেয়। তিনি এই সময়েই যাপন করছেন। আবার ফিরে আসি মাদল হাসানেরর নিত্য অভিজ্ঞানে।

মাদল হাসান একজন কবি। কেমনতরের কবি। কবি তো কবিই, সে আবার কেমন হবে। মাদল হাসান লিখেছেন ‘পাথরের পাঠশালা’। তিনি পাথরের পাঠশালা নামের কবিতা বইয়ের কবি। তার কবিতায় মায়া আছে। আছে ছন্দ- বিষয় ও চিত্রকল্পের নিদারুন বৈচিত্র্য। তার প্রকরণের দৌড় পুরাণ থেকে টেকনোলজি পর্যন্ত। তিনি শব্দের খোলস পাল্টাতে জানেন, রূপভেদ জানেন। এই কি তার পরিচয়! তার পরিচয় তিনি এই বিবিধের মধ্যে পাঠককুলকে কোথায় নিয়ে যাবেন। অথবা কবিদের। আমার ঢের সংশয় কবি ছাড়া অন্য কেউ কবিতা পড়ে কিনা। তিনি সেই মানুষ- মানুষের মাঝে নিরন্তর দ্বৈরথ, কাঙ্খা পাথরের পতন-উত্থানের মধ্য দিয়ে মানুষের ইতিহাস লিখে উদ্ভাসিত হন এই দুনিয়াদারির মধ্যে। তিনি নিক্ষিপ্ত নন, আবির্ভূত। পতনটুকুই যার উত্থানের সিড়ি-তিনি সেই পাথরের গল্প বলছেন। যে পাথর কখনো উপাস্য কখনো শিলীভুত শয়তান আবার একই সময়ে সেই পাথরে চুমু দিলে মুছে যায় সকল পাপ। কিন্তু পাপ তো শুধু মানুষের করতলে। মানুষেরই উত্থান মানুষেরই পতন।

লেখাটি কবিতা বিষয়ক ছোট কাগজ ‘লেটারপ্রেস’ ফেব্রুয়ারী ২০১২ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। কাগজটি একুশে বইমেলার লিটলম্যাগ চত্বরে পাওয়া যাচ্ছে।পাথর, একদা পূজ্য ছিলে তুমি…/ শিলীভূত শয়তান আজ/ হাজার হাজীর কঙ্কর নিক্ষেপে…/ আবার ললিত লাব্বায়েক, ধর্মঝাঁঝ/ হয়তো হাজার হাজি সে পাথরই চুমি/ বেদনার বিমূঢ় বিক্ষেপে…’ (পাথরের পাঠশালা পাঁচ, পৃ: ১৫)

এই পাথর মানুষকে চিনছেন কবি।তিনি কবিদের কথা বলছেন-

আমরা শব্দের সোনারু। সোনারুর সোনা কিনতে লাভ, বেচতে লাভ। কিন্তু শব্দের সোনারুর কিনতে লস লস, বেচতেও লস। কারণ বিগত-আগত-সমাগত কবিদের কাব্যগ্রন্থ কিনতে হয় গাটেঁর পয়সায়। কিন্তু বেচতে গেলে গ্রাহক নাই। তাই তরুণ কবিদের গাটের পয়সা খরচ করে কাব্যগ্রন্থ বিইয়ে তা বিমাতার বাৎসল্যহীনতায় বিলাতে হয়’। (শব্দের সোনারু, পৃ:২০)

এই শব্দের সোনারু’রা সোনার বাংলার সোনার দোকান খুলেছে। একসময় যেখানে কারিগর পাচার হয়েছিল, এখন সেখান থেকে সাগরিদ পাচার হয়ে আসবে সোনার বাংলাদেশে। তো এই কাব্যের সোনারু কি করেন। তারা কি নিখুত কিছু নির্মাণ করেন। না, নশ্বরতার মধ্যে কবি নিখুতের দাবী করেন না।  এই সোনারু’রা জানে-

‘আমরা শব্দের সোনারুরা সবাই জানি-সোনায় (শোনায়) কিছুটা খাদ না মেশালে গহনা সুন্দর হয় না। কেউ খাদ বেশি দেয়। কেউ কম। আমরা শোনা কথায় শোনাসত্যে (সোনাসত্যে) পরিমাণ মতো খাদ মিশাই’। (শব্দের সোনারু, পৃ:২০)

তবে কি খাদ আছে বলেই এই সোনা নিখাদ! আদর্শ দন্ডে ঘষে যে সোনা খাটি হয় তা দিয়ে গহনা হয় না। যে সোনায় গহনা হয় না, তাকে কি সোনা বলা যায়! তিনি বলছেন পৃথিবীতে সবসময় সত্যের জয় হয় না, এটা সত্য-মিথ্যার মখমলে মুড়ে দেয়া গহনা। কিন্তু সত্য আর মিথ্যা কি। যেমনি তার নির্জনে পাওয়া অভিজ্ঞান একাধারে সত্য নয়- কেন না তিনি খাদ না মেশালে সোনার গহনা বানাতে পারেন না।তাই যা কিছু মধু তার কিছু তো মোম, নাকি যা কিছু মোম তার কিছুটা মধুও বটে।কবি তার দুনিয়া নিয়া এইভাবে কথা বলেন আমরা সায় দেবো না কেন। চাক ভেঙ্গে তো শুধু মধু নয়, আসে মৌনতা, আসে স্তদ্ধতা। তাকে শুদ্ধ করে কয়জনা। কারা পারে সোনা আর খাদের অনুপাত বুঝতে। মাদাল হাসান আশাবাদী। ভালো লাগে।

আহা!কবি,তিনি যাই বলুন আমরা হেটে চলি অ-কবি থেকে কবি মাদাল হাসানকে পৃথক করতে। নিজর্নতার পরেই তো কোলাহল। কাব্য কোলাহল নিয়ে তিনি ঢের কথা তুলেছেন। মানতেই হয় এই জগতের শাসনটুকু জানেন।

‘তোমার যা-কিছু বিক্রি হয় না/ তা-ই সবচে’ মূল্যবান।/যেমন- নববধূর গয়না/ (বিশেষত নাকফুল), চাষার গাভীন গরু, বীজ ধান…’।

অথবা,

‘আমরা আতেলেরা বিক্রি হই/নারীতে,তাড়িতে,গাড়িতে,মেডেলে…/বিক্রিমূল্য নিয়ে যত হইচই/

অথবা,

‘লে বাবা, যতপার বেডে লে’…’। (ঢোড়াই চরিত মানস, পৃ: ৪৯)

এই যে কথামালা। কথামালার মধ্যে পাথরের চরিত্রের মতো বৈপরীত্য- এখানে কি যুক্তির শেকলে বসে মাদল হাসান কিছু গ্রহন বা বর্জন করছেন? না, সেখানেই চমক। যেমন মানুষ বাদী আবার বিবাদী,তিনি সত্যের কথা বলেন কিন্তু সত্য-মিথ্যা বা ভালো-মন্দের প্রথাগত তর্ক তুলে আসেন নাই। ভাগ করে অখন্ড নয়। সম্বন্বয় নয,বরং  দুনিয়াকে অখন্ড বিচারে রাখার কাজটা একজন কবিই সহজে করেন। ভাগ করে সে কি পাবে। সেতো নিজেকেই ছুতে পারে নাই।

‘তবে কি নিজের ছায়াকে যাবে না ছোঁয়া?/ থামবে না রক্তে মুখ ধোয়া’ (চক্রব্যুহ, পৃ: ১৭)

‘সপ্ত আকাশ স্পর্শ করি নি তবু/ ছোঁয়াছুয়িঁ খেলা আকাশের ছ’স্তরে…/ পৃথিবীতে যদি পাঠিয়েছিলেন প্রভু/ পাঠশালা খুলে প্রবালে ও প্রস্তরে…’।

অথবা

‘আমার ভেতরের ভাবনার ভুল এসে বলে- হাঁটো হাতিমির দেশে। সন্ধ্যায় সুকুমার রায় সত্য হয়ে ওঠেন হেসে ওঠে হাঁসজারু। বলে- বেদনা এক বকচ্ছপ। জেগে ওঠে শব্দগণিত। ভাবনার ভেতরে ভায়োলিন বাজায় উলঙ্গ ভগ্নাংশব। সেই সুরে এক প্রাণীর মাথা এসে লাগে অন্য প্রাণীর ধড়ে’। (সুকুমার রায়, পৃ: ২৮)

নিজেকে খোজার ইতিহাস মানুষ কোথায় নিয়ে চলে? দ্বিধা আছে শংকা আছে কিন্তু ভয় নাই।এটা নিছক কবির দৃষ্টি নয়। নাকি,কবির সাথে তার যাপিত সত্যের পাথক্য আছে। সত্যের এই রূপ ইতিহাস, ভূ-ভাগে আলাদা নয়। এটা তো পতিত পাথরের মতো নিজের ভেতর নিজের জ্ঞাত বা অজ্ঞাত উৎসের সন্ধানে হেটে যাওয়া।লিখছেন বটে-

‘সত্য উৎপাদিত হয় যখন অজ্ঞাতে রমণীরা রন্ধনশালায় খোপা করে চুলে…/ ঘুমের ঘোরেই সন্তানের মুখে স্তন গুজে দেয় মধ্যরাতে/ সেইসব ক্ষণমুহূর্তে রচিত হয় ইতিহাস সত্য ও সঠিক…’

অথবা,

‘সত্য ওই মাংসফল; মাংসহ্রদ ঘুরে এসে বলা- শেষ সত্য অখন্ডমন্ডলা…’ (অখন্ডমন্ডলাকার, পৃ: ৫৬)

অখন্ডমন্ডলাকার কবিতায় মাদল হাসান জুড়ে দিয়েছেন গীতার প্রারম্ভিক বাণী। এই বাণীর উল্লেখে মাদল হাসান দৈবে তার উত্তরাধিকারকে স্বীকার করে নিলেন। ভূ-মন্ডলের কোথায় নাই তার অধিকার। এই তো কবির অধিকার। কবিই পারে দুনিয়াকে অখন্ড করে বাধতে।কবি পারে প্রথমকে আদমকে নির্দেশ করছে। এইতো কবির নিয়তি। যে নিয়তিটুকু প্রথম মানব নিয়ে এসেছিলেন দুনিয়ার বুকে। কবিত্বের জয় হোক! মাদল হাসানের আরো ক’টি লাইন-

‘ঐতিহাসিক চিহ্রিত চোরাবালি/ চাই নি আমরা রাখতে কোথাও…/ আমরা আনি নি স্বর্গীয় কোন ডালি/ প্রেম ছাড়া নাই আর কোন পন্থাও…’। (আদম হাওয়া, পৃ:৩৬)

 

 

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *