মানসিক অবস্থা কি করে বাইরের দুনিয়াকে উপস্থাপন করে?

‘আমরা যে ভাব-ভাষা আর অভিজ্ঞতার জগতে বাস করি সেটা কি আসলেই আছে? নাকি এটি নির্মিত, আমাদের অজ্ঞাতাসারে কেউ কল-কাঠি নাড়াচ্ছে। আমরা যেভাবে চিন্তা করি, সেই চিন্তার কি কোন স্বাধীন অস্তিত্ব আছে? নাকি আমরা কৃত্রিম কোন অভিজ্ঞতার শিকার হই? যেখানে আমরা নিছক খেলার পুতুল বা পরীক্ষাগারে পরীক্ষণযোগ্য বস্তু মাত্র, কৃত্রিম পরিবেশে কিছু শর্তের মাঝে জীবন-যাপন করতে হয়। এই ধরণের প্রশ্ন নতুন কিছু নয়। এই প্রশ্ন যদি আপনি নাও তুলেন, তারপরও জীবনের নানা পদে নানা ভাবে এমন ভাবনা আপনার মাঝে খেলা করে’।

করিম পানি খেতে চাচ্ছে এবং ভাবছে এখানে একটা পানির কল আছে। এই ভাবনার মানে হলো কল ঘুরালেই পানি পাওয়া যাবে। এখন মানসিক অবস্থার মধ্যে থাকা এই জিনিসগুলো (পানি এবং পানি’র কল) দুনিয়ায় থাকা বস্তুগুলোর সাথে সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু দুনিয়াতে এই জিনিসগুলোর কার্যকারণিক ক্ষমতা এদের মধ্যে থাকা বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভরশীল,যা বাইরে থেকে দেখা যায় এমন কোন জিনিস না।

কিছুদিন আগের আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স: ‘আমার ভাব ভাষা কি আসলেই আমার‘ পোষ্টে এই কথাগুলো বলেছিলাম। সেই আলোচনা ছিল সবল আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স সম্পর্কে। সেখানে আমরা ব্রেন ইন ভ্যাট নামক ধারণার সাথে পরিচিত হই। সেই পোষ্টে কল্প বিজ্ঞান ও সাহিত্য সম্পর্কিত আলোচনা এসেছিল। সেই প্রেক্ষিতে ব্রেন ইন ভ্যাট মূল্যায়নে সংকীর্ণ ও বিস্তৃত আধেয়ের ধারণা এসেছিল।এবার সেই ধারণার কার্য-কারণিক দিকটি দেখা যাক। এটি রাউটলেজ এনসাইক্লোপেডিয়া অব ফিলোসফি’তে অন্তর্ভুক্ত কেন্ট বাখ’র লেখার আংশিক পরিবর্তিত উপস্থাপন।

সেই প্রাচীনকাল থেকে দার্শনিকদের কাছে কার্যকারণের মূল্যায়ন একটা গুরুত্বপূর্ণ অধিবিদ্যিক সমস্যা। সময়ে সময়ে নানা বিষয়ে (বিজ্ঞানে তো বটে)কার্য-কারণের প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সেটা আমাদের মানসিক অবস্থা ও বাহ্যিক দুনিয়ার সম্পর্কের (দেহ-মন সমস্যা তো বটে)ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যেমন- মানসিক অবস্থা কি করে বিদ্যমান দুনিয়ারকে (states of affairs) উপস্থাপন করে।একটা উদাহরন দিলে বিষয়টি বুঝতে সহজ হবে। করিম পানি খেতে চাচ্ছে এবং ভাবছে এখানে একটা পানির কল আছে। এই ভাবনার মানে হলো কল ঘুরালেই পানি পাওয়া যাবে। এখন মানসিক অবস্থার মধ্যে থাকা এই জিনিসগুলো (পানি এবং পানি’র কল) দুনিয়ায় থাকা বস্তুগুলোর সাথে সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু দুনিয়াতে এই জিনিসগুলোর কার্যকারণিক ক্ষমতা এদের মধ্যে থাকা বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভরশীল,যা বাইরে থেকে দেখা যায় এমন কোন জিনিস না।

একজন মানুষ যদি উদাহরনের করিমের অবস্থায় থাকে, পরিস্থিতি যদি একই (পিপাসার্ত) হয়,তাইলে তার মানসিক অবস্থায় একই ধরণের ভূমিকা পালন করবে।যদি এমনও হয় যে,এইখানে নির্দেশ করার মতো পানি নাই অথবা পানির কলও নাই।অথচ কার্য-কারণিক সম্পর্ক সেখানে বিদ্যমান।

যাই ঘটুক না কেন,কাল্পনিক ‘থট এক্সপেরিমেন্ট’ (চিন্তার পরীক্ষন) ভিত্তি করে এই কার্য-কারণিক সম্পর্ক নিয়ে দার্শনিকদের মাঝে সুনির্দিষ্ট কিছু তর্ক আছে। থট এক্সপেরিমেন্ট’র বাইরে অনেক দার্শনিকের মত হলো, চিন্তার বিষয়াদি নির্ভর করে বাইরের দুনিয়ার উপরে। সেটা শারিরীক বা সামাজিক হতে পারে।এই যেন এক উভয় সংকটের ধাধাঁ। যার সমাধান দরকার।

এই সমাধানের জন্য সেই দুটো জিনিসের কথা আসে।সংকীর্ন (Narrow content) ও বিস্তৃত আধেয় (Wide content/ আধেয়’র চেয়ে ভালো বাংলা হলে সুবিধা হতো)। বিস্তৃত আধেয়ের ক্ষেত্রে সমগ্র পরিস্থিতির পর্যবেক্ষণ অন্তর্ভুক্ত। এটি মানসিক অবস্থা যে বস্তু ও তার গুনের কথা বলে তাদের নির্দেশনামূলক (Referential) সর্ম্পককে ধারণ করে।অন্যদিকে সংকীর্ন আধেয়ের ক্ষেত্রে পরিস্থিতির সমগ্রকে নয, বরং খন্ড খন্ড করে দেখা হয়। এটা মনস্তাত্ত্বিক ভূমিকার নির্ধারককে অন্তভুক্ত করে।এই দুটি ভাগ তর্কবাগীসদের তর্ক তোলার ব্যাপার দারুন সুযোগ করে দেয়। দার্শনিকরা এই দুইটির সম্ভাব্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সেই বাদ-বিবাদে  তিনটা অবস্থান পাওয়া যায়-

পার্থক্যকে স্পষ্ট করার প্রনোদনা (Motivating the distinction), যমজ দুনিয়া চিন্তার পরীক্ষণ (Twin Earth thought experiments) এবং দুই ধরণের আধেয় (Two kinds of content)?

এই পোষ্টে আমরা ‘পার্থক্যকে স্পষ্ট করার প্রনোদনা’ নিয়ে জানব। মজাদার দুটো টপিক (দুই দুনিয়া ও দুই আধেয়) সামনের জন্য তোলা থাকল-

প্রত্যক্ষণ,স্মৃতি এবং বিশ্বাসের (অবশ্যই শারিরীক গ্রন্থির সাহায্যে)মতো আমাদের অনেক মানসিক অবস্থা দুনিয়ায় থাকা বস্তু এবং ঐ বস্তুর গুনাবলীর ঘোষনা (represent) দেয়। কিন্তু এখানেও সেই উভয় সংকট তৈয়ার হয়।

একদিকে,প্রতিনিধিত্বকারী এই অবস্থা (representational states) হলো, মানসিক অবস্থাগুলো কোন বস্তুকে যেভাবে উপস্থাপন করে তার গুন।তাহলে ভিন্ন ভিন্ন আধেয়ের কারণে তারা প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র্য (ঐ সব মানসিক অবস্থা), যারা আমাদের কাছে বস্তুগুলোকে (দুনিয়াস্থ বস্তু, ঐ বস্তর গুনাবলী এবং সম্পর্ক) দুনিয়ায় অন্তর্ভুক্ত বলছে।

অন্যদিকে, ইতিমধ্যকার ঘটনা আমাদের মনস্তত্ত্বে কার্য-কারণিক ভূমিকা পালন করে। কারণ একজনের কাছে দুনিয়া যেমন দেখাবে তারা তা ঠিক করে দিচ্ছে এবং সম্ভবত বাপারটা আমাদের মাথার মধ্যে ঘটছে।সেই মতে,আমাদের মগজ যদি কোন ভিটামিন (ব্রেন ইন ভ্যাট বা ভিটামিনের মধ্যে মস্তিষ্ক) জাতীয় পদার্থের মধ্যে চুবানো থাকত আমাদের মনস্তত্ত্বের ভূমিকাও একই হতো। অথবা ডেকার্টের অপদেবতার জাদু-টোনাও একই ঘটনা ঘটাতো।উভয় সংকট হলো কি করে আসলে যা ঘটছে তাকে দেখানো করা যায়।যেখানে এই দেখাদেখি আর ভাবাভাবি নির্ভর করছে মানসিক অবস্থার সাথে বাহ্যিক অবস্থার সম্পর্কের উপর। আবার দুইয়ের আছে তার্য-কারণিক সক্ষমতা, যা নির্ভর করে বস্তুর ভেতরকার গুনাগুনের উপর।

এখন সংর্কীন ও বিস্তৃত আধেয়ের পাথর্ক্য হতে পারে এই উভয় সংকটের সমাধান। প্রথম কথা হলো এটা কি আসলে একটা উভয় সংকট?

মানসিক অবস্থার কোন কার্য-কারণিক সক্ষমতা নাই এমন সংশয়কে একপাশে সরিয়ে রেখে, একজন তর্ক তুলতে পারেন এই উভয় সংকট বিভ্রমমাত্র।শক্তভাবে বললে আধেয় ‘গুলোই’ (সংর্কীন ও বিস্তৃত)ভেতরকার গুন।এই নিয়া অনেক দার্শনিকের সাথে বিরোধ ঘটবে,সোজা কারণ আধেয়ের ধারণা কোন কিছুর নির্দেশনা ও সত্য অবস্থার ধারণার সাথে সম্পর্কিত। তাহলে বিষয়টি এই নয় যে, আধেয়  বাইরের কিছু।

Friedrich Ludwig Gottlob Frege- জার্মান গণিতবিদ, যুক্তিবিদ, দার্শনিক। যাকে বিশ্লেষনী দর্শনের জনক বলা হয়

যা ফ্রেগ’র (Friedrich Ludwig Gottlob Frege জার্মান গণিতবিদ, যুক্তিবিদ, দার্শনিক। যাকে বিশ্লেষনী দর্শনের জনক বলা হয়) আধেয়ের ধারণার সাথে বেশ মিলে।ভাষায় আমরা কিছু প্রকাশ করি। এই প্রকাশে নিদের্শনামূলক চেতনা (Sense) আছে এবং একই সাথে এটা তার ধারণা নিয়ে কথা বলে। এই ধারণা নির্দেশনার শর্তকে (Sense) প্রকাশ করে এবং যা শর্তকে সন্তুষ্ট করে এটা তা নির্দেশ করে।এই শর্ত চিন্তাকারীর বাইরের অবস্থার উপর নির্ভরশীল নয়। চিন্তার ভেতরের জিনিস।আমাদের স্পর্শকাতরতা এই কনটেক্সকে স্পর্শ করে না। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, ফ্রেগের শুকতারা আর সন্ধ্যাতারা’র অভিন্নতা আলোচনাটি বেশ মজাদার।

যদি ধারনাকে ফ্রেগিয়ান পথে নেয়া যায়,যেকোন দুইজন চিন্তাকারির আমোদিত চিন্তাকে ধারণার দিক থেকে একইভাবে সাজানো যাবে।কোন পরিস্থিতিতে তারা চিন্তা করছেন সেটা বিবেচনায় না রেখে তাদের চিন্তাকে একই সত্যতার শর্তে ফেলতে পারি।যদিও এটা কিছু বিষয়কে অসম্ভব করে তুলবে। কারণ পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায়, আমাদের কেউ কোন কিছুকে সত্য ভাবতে পারেন আবার কেউ বা মিথ্যে।

ফ্রেগিয়ান মতের মুশকিল হলো এটা বিশেষ কারো চিন্তাকে ধরতে পারে না। যেমন ‘এটা হয় বক’- এই উক্তি কোন কিছুকে উল্লেখ করছে। এর সত্য পরিস্থিতি কার সম্পর্কে বলছি তার উপর নির্ভর করে। এখন ভিন্ন কোন মানুষ গুনগতভাবে একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে পারে, একই কাঠামোর চিন্তার মধ্যে সে অন্য কোন পাখির কথা চিন্তা করতে পারে। ফ্রেগিয়ান চিন্তার এই চিত্র ‘রেকগনিশনাল কনসেপ্টে’*কেও একই ধরণের সমস্যায় ফেলে দেয়।

ধরা যাক, একজন খাগড়াছড়ির জঙ্গলে অপরিচিত পোকা দেখে বলল, ‘এটা এই জঙ্গলের দুর্লভ পোকাদের একটি’।  এখন পরবর্তীতে কেউ খাগড়াছড়িতে একই ধরণের অপরিচিত কোন নমুনা পেল। সে বলল, ‘এটাও অবশ্যই এই ধরণের একটি’। দেখা যাচ্ছে তাদের উভয়ের নির্দেশনা একই রকম। এখানে যেকোন কারো ভুল হতে পারে, যদি এমনও হয় প্রথমটি দ্বিতীয়টির মতো, কিন্তু আলাদা পোকা।তাহলে কোন কিছুর এই একই ধরণের ‘হওয়া’র গুন আসলে কোন নির্দিষ্ট ধারণা বা প্রতিচ্ছবির সাথে মিলে যাওয়া নয়। এখানে পোকা দুটির ধারণা একটার সাথে আরেকটি সম্পর্কযুক্ত নয়। কিন্তু পুরো বিষয়টা আসলে একজন কিভাবে বুঝাতে চায় তার সাথে যুক্ত। সুতরাং, ফ্রেগিয়ান ধারণা ‘রেকগনিশনাল কনসেপ্টে’র ক্ষেত্রে খাটে না।

তাহলে এই দুটি আধেয়ের সমস্যাটির সমাধান কোথায়। আশা করছি সামনের দিকে সে পথে কিছুটা হাটা যাবে। সামনে আমরা যমজ দুনিয়ার ধারণার সাথে পরিচিত হবো, সেটা কল্প-বিজ্ঞান ও ধর্মেও পাওয়া যাবে।

সে পর্যন্ত শুভ কামনা।

সংযুক্তি:

 *A concept is recognitional when it can be applied on the basis of perceptual or quasi-perceptual acquaintance with its instances. And a concept is purely recognitional when its possession -conditions (in the sense of Peacocke, 1992) make no appeal to anything other than such acquaintance. A concept is purely recognitional when nothing in the grasp of that concept, as such, requires its user to apply or appeal to any other concept or belief. A purely recognitional concept of experience is then a higher-order recognitional concept, which applies to another mental state (viz. an experience), and whose possession-conditions don’t presuppose any other mental-state concepts (not even the concept experience). মূল লেখা: PETER CARRUTHERS  এর Phenomenal concepts and higher-order experiences.

ফ্রেগের সেন্স এন্ড রেফারেন্স: উইকিপিডিয়া থেকে-

Sense and reference

The distinction between Sinn (“sense”) and Bedeutung (usually translated “reference”, but also as “meaning” or “denotation”) was an innovation of Frege in his 1892 paper “Über Sinn und Bedeutung” (“On Sense and Reference”). According to Frege, sense and reference are two different aspects of the significance of an expression. Frege applied Bedeutung in the first instance to proper names, where it means the bearer of the name, the object in question, but then also to other expressions, including complete sentences, which bedeuten the two “truth values“, the true and the false; by contrast, the sense or Sinn associated with a complete sentence is the thought it expresses. The sense of an expression is said to be the “mode of presentation” of the item referred to.

The distinction can be illustrated thus: In their ordinary uses, the name “Charles Philip Arthur George Mountbatten-Windsor”, which for logical purposes is an unanalyzable whole, and the functional expression “the Prince of Wales”, which contains the significant parts “the prince of ξ” and “Wales”, have the same reference, namely, the person best known as Prince Charles. But the sense of the word “Wales” is a part of the sense of the latter expression, but no part of the sense of the “full name” of Prince Charles.

These distinctions were disputed by Bertrand Russell, especially in his paper “On Denoting“; the controversy has continued into the present, fueled especially by Saul Kripke’s famous lectures “Naming and Necessity“.

Imagine the road signs outside a city. They all point to (bedeuten) the same object (the city), although the “mode of presentation” or sense (Sinn) of each sign (its direction or distance) is different. Similarly “the Prince of Wales” and “Charles Philip Arthur George Mountbatten-Windsor” both denote (bedeuten) the same object, though each uses a different “mode of presentation” (sense or Sinn).

> ব্যবহৃত ছবির লিংক: AIAI

Comments

comments

7 thoughts on “মানসিক অবস্থা কি করে বাইরের দুনিয়াকে উপস্থাপন করে?

  1. Pingback: যমজ পৃথিবী সবকিছু কি পৃথিবীর মতো হুবহু একই! « ইচ্ছেশূন্য মানুষ

  2. Pingback: যমজ পৃথিবীর সবকিছু কি পৃথিবীর মতো হুবহু একই! « ইচ্ছেশূন্য মানুষ

  3. সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ‘মুগলি’ সিনেমাটিতে ভালু(ভালুক) যখন মধুর জন্য হাহাকার করছিলো তখন মুগলী যে পদ্ধতিটা ব্যবহার করার চিন্তাটা করলো এটার ব্যাখ্যা কি?

    • সিনেমাটি দেখি নাই। দেখে বোঝার চেষ্টা করব। ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *