ভয়ের মূর্তির সামনে নতজানু কান্ডারী

বিদ্যমান অবস্থার মধ্যে টিকে থাকা এবং তাকে টিকিয়ে রাখার প্রবণতা মাঝে মাঝে সমর্থক হয়ে দাড়ায়। সবসময় তো না। কিন্তু একটার মধ্যে আরেকটা লুকিয়ে থাকে। যারা এখন ভয়ের মধ্যে এই দুনিয়াদারি টিকিয়ে রেখেছেন, তারা যদি ভবিষ্যতেও একই হালে থাকতে চান, তো ভয়ের চর্চায় তাদের মাল সামান। তাই দরকার বিদ্যমান ভয়ের মধ্যে থাকা আর টিকিয়ে রাখার ভারসাম্য । ক্ষমতা সম্পর্কের মধ্যে এই ভয়ের চর্চা সর্বদা বহমান।

যেহেতু ভয়ই মুখ্য, তাই সেটা শুধুমাত্র দুর্বলের বেলায় প্রযোজ্য।

কিন্তু অন্য অনেক কিছুর চেয়ে রাজতন্ত্র,স্বৈরতন্ত্র বা যেকোন ধরণের অগণতান্ত্রিক ক্ষমতার সাথে ভয়ের সম্পর্ক প্রধান এবং প্রাণ ভোমরা। এটা জীবন-বিধানের মতো বিষয় হয়ে দাড়ায়। যেখানে শাসক জনগণকে ভয় পান কিন্তু ক্ষমতা প্রয়োগ দিয়ে আড়াল রাখে। আবার জনগণও ভয়ের মধ্যে থাকে।কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে সে অপরাধ সংঘটনের মধ্য দিয়ে ভয়কে প্রত্যাখ্যান করে। চাপিয়ে দেয়া যে ক্ষমতার চর্চা, সেখানে প্রচলিত আইনের ভাষ্যে যা অপরাধ- তা করার মধ্য দিয়েও প্রতিবাদের ভাষা তৈয়ার হয়।

মোহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব নিরাকারের ধর্ম ইসলাম রক্ষার জন্য যা করছেন তার ধর্মীয় গুরুত্ব আছে বৈকি। কিন্তু ইবনে সউদের সাথে ক্ষমতার যে ভাগাভাগি তা তার পৌত্তলিকতা বিরোধী অবস্থানের বরখেলাফ। যদিও তারা যেটাকে (ওয়াহাবী ইসলাম) ইসলামের নিরাকারের দোহাই আর শিরক না করার ভয় দিয়ে জায়েজ করেছেন, তার সাথে ভালোবাসা ও আধ্যাত্মিক ইসলামের সম্পর্ক মামুলি। আল্লাহর বান্দা মানুষের সামনে প্রতিমুহুর্তে দুনিয়া যেভাবে নিজের অপার সম্ভাবনা উজাড় করে দেয়- সেই সম্ভাবনাকে ধরা ও বুঝার সাথে এর কোন যোগসুত্র নাই। এখানে ভক্তি ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক তিরোহিত। বরং, অন্তহীন ভয়ের মধ্যে নিজেকে সমর্পিত করার খাচা নির্মাণই দ্বীন-দুনিয়া, আওয়াল-আখের।

সেই শিরকের ভয় (অবশ্য মানুষকে অবিশ্বাসও নিহিত) আর তাকে টিকিয়ে রাখার পরিণতি দুই পরিবারের শাসন। এটাই তাদের রক্ষাকবচ। অথচ গোত্রবাদের বিরুদ্ধে এবং যেকোন ধরণের ইমেজের (মূর্ত-বিমূর্ত) বিরুদ্ধে ইসলামের যে অবস্থান তারা এটাকে অগ্রাহ্য করেছেন। সৌদি আরবে যা চলে আসছে তা হলো গোত্রবাদ। আর সবকিছুতে শিরকির যে ভয় সেই মতে ক্ষমতা ও ভয়ের ভাই-ভাই চিরন্তন সম্পর্কও পৌত্তলিকতা।

দুনিয়ার যেকোন ব্যবস্থায় মধ্যে ভয় দিয়ে শাসনের রেওয়াজ আছে। তার রূপগুলো নিয়ে আমরা বিতর্ক করি।কিন্তু সৌদি আরবে সে ভয়ের শাসন তার মর্মমূলে ইসলামের কোন বয়ান নয়, বরং স্বৈর শাসনের বিপরীতে মানুষের যেকোন সম্ভাবনাকে আটকিয়ে রাখা। তাই তারা শাস্তিদানকে যথাসম্ভব ভীতিকর আর প্রদর্শনযোগ্য করে তোলে। এখানে আত্মপক্ষ বা পরিপ্রেক্ষিত বিচার (কেউ যদি ইসলামী আইন জারি করতে চায়, তাকে আগে পেটের ক্ষুধা নিবারণের দায়িত্ব নিতে হবে,তারপর ন্যায় বিচারের প্রশ্ন) চলে না। এখানে যেকোন আইনী নিষ্ঠুরতা ন্যায়বিচারের সমার্থক হয়ে দাড়াতে বাধ্য। অহরহ ঘটে যাওয়া বেইনসাফকে তারা ‘দৃষ্টান্ত’ হিসেবে নির্দেশ করে। ইহা হলো কঠোর হস্তে দমন। কিন্তু আদতে কি এরমধ্য দিয়ে অপরাধ সংগঠন কমে?

তো, সেই দুই মানুষের গোত্রবাদের শেষ পরিণতি আসলে নিজেদের বিচারের সামনে দাড় না করানো। সে কারণে সৌদি রাজপুরুষ ও ধনীশ্রেণীকে (লম্পট, ব্যভিচারী, দুর্নীতিবাজ, সমকামী) বিচারের মুখোমুখি হতে হয় না। নিজ গোত্র সুরক্ষিত থাকে। তারা যেন ওল্ড টেস্টামেন্টের ‘নির্বাচিত জাতি’। এইকারণে তাদের সামনে অন্য মুসলমানরা মুসলমান না। বাংলাদেশিদের পরিচয় মিসকিন।

যেহেতু ভয়ই মুখ্য, তাই সেটা শুধুমাত্র দুর্বলের বেলায় প্রযোজ্য। সবলের বেলায় নয়। একমাত্র সে কারণে যৌন নির্যাতনের অতিষ্ট প্রতিবাদী ইন্দোনেশিয়ান বা শ্রীলংকান গৃহকর্মীর শিরোচ্ছেদ হয়। হত্যার অভিযোগে আট বাংলাদেশীর মৃত্যু হয়। বিচার নাই উদ্দেশ্য ও কার্যকারনের। শুধুমাত্র স্বীকারোক্তিই যথেষ্ট। যদি এই নিয়ে কোন বাহাস হয়, নৈতিক এবং বাস্তব অবস্থা নিয়ে তর্ক হয়, হয়তো অনেককিছুর রদ হবে, পরিবর্তন ঘটবে। কিন্তু, পৌত্তলিকতা পরিবর্তন বিরোধি। পরিবর্তনের ভয়ে সে তর্কে যাবে না। ঘরে বাইরে তার ভয়।ভয় আর ভয়। আসলে সে তার মর্মমূলে থাকে না, থাকতে পারে না।সে সবকিছু ভয় দিয়ে জয় করে। আবার ভয়ের মধ্যেই তার পরাজয়। তাই হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্রিটিশ নাগরিকের অব্যাহতি ঘটে।

যে ভয়ের দাস, তার ভয়কে জায়েজ রাখার উসিলা লাগে। সেদিক থেকে রাজতন্ত্র বা স্বৈরতন্ত্রের পয়লা পছন্দ ‘ধর্ম’ কিম্বা ‘আইনের শাসন’। সরকারগুলো নানা উসিলায় সে ভয়কে জারি রাখে। যেমন- বাংলাদেশের এক-এগারোর সরকার। অনৈতিক ক্ষমতাকে জায়েজ রাখার জন্য তাদেরও নৈতিক যুক্তির অভাব ছিলো না।

>লেখাটি রাজনৈতিক.কম-এ প্রকাশিত।

Comments

comments

2 thoughts on “ভয়ের মূর্তির সামনে নতজানু কান্ডারী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *