ছবি কথা বলে, নাকি আড়াল করে: প্রসঙ্গ উকিল মুন্সীর প্রতিকৃতি

‘ছবি কথা বলে’— এমন মন্তব্য বিভিন্ন সময়ে শুনতে পাবেন। এমন না যে আলটপকা কোনো আলাপে ঢুকে পড়ে। ছবি যিনি তোলেন বা আঁকেন তার একটা আলাপ থাকে, সেই আলাপে এই ‘কথা বলা’র মধ্যে আমরা ঢুকে পড়ি। এবং কালেকটিভ ইমাজিনেশনের বিষয়ও থাকে। ছবিটা কে তোলে বা কে আঁকে এবং কেন; এ আলাপও গুরুত্বপূর্ণ। কোন কালে, কোন সময়ে আঁকা হয় তা তো ব্যাপারই। কথা হলো, ছবি ছাড়া কি চিন-পরিচয় চলে না? চলে। হয়তো ‘কল্পিত ছবি’ একটা কল্পনার স্থায়ী রূপ দিতে সহজ। যাচাই-বাছাইও সহজ করে তোলে। অন্য পরিচয়ও আড়াল করে তুলতে পারে।

উকিল মুন্সীর সাম্প্রতিক প্রতিকৃতি নিয়ে এ আলাপ। এমনিতে ছবি বা প্রতিকৃতি আঁকা নিয়ে আপত্তির কিছু দেখি না। আবার বিষয়টা যে সমস্যাজনক না, এমনও নয়। একটা ছবি নির্দিষ্ট একটা ব্যক্তিত্বকে সামনে নিয়ে আসে। কীভাবে আনে, এবং সুনির্দিষ্ট সেই রূপটি কেন। প্রতিকৃতিটি যে অনুষ্ঠানে উন্মোচন হয়েছিল তার সঙ্গে জুড়ে ছিল একটা ডকুমেন্টারি, ‘একতারার ইমাম’। নির্মাণ করেছেন অনার্য মুর্শিদ। শাদা চুল-দাড়ি আর সফেদ টুপি-পাঞ্জাবি মিলিয়ে একজন ইমাম সাহেবকে এঁকেছেন এ জেড শিমুল। সে ছবি আঁকা ও প্রামাণ্য একটা নমুনা পাওয়া জটিল ছিল বলে জেনেছি সংবাদ প্রতিবেদন। [এ লেখার চূড়ান্ত করার পর আরেকটি প্রতিকৃতির কথা জানতে পেরেছি, যা আলাদা অনুষ্ঠানে উম্মোচিত হয়। এ প্রতিকৃতির জন্য কোলাবরেশন করেছে আব্দুল্লাহ আল মামুন (জয়) ও কুন ক্রিয়েটিভ ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট টিম] এখন অন্য একটা ছবি নিয়ে ভাবুন। বছরের পর বছর উকিল মুন্সীর ছবি হিসেবে প্রচারিত ছিল সুনামগঞ্জের কামালউদ্দিনের ছবি! বাবরি চুল আর ক্লিনশেভড একটা মুখ। একদম উল্টো। ওই ছবিও উকিল মুন্সীর একটা ভাব-কল্পনা তৈরি করেছে। এমনকি উকিল মুন্সীকে নিয়ে তথ্য-তালাশের সময় একই ব্যক্তির কাছে ভিন্ন ভিন্ন বয়ানও পেয়েছি। কখনো তিনি বিরহী সত্তাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন, কখনো আবার ইসলামিক ভাবধারার বিষয়টি।

বামের প্রতিকৃতিটি এঁকেছেন এ জেড শিমুল। অন্যটি করেছেন আব্দুল্লাহ আল মামুন (জয়)। ডানের প্রতিকৃতি নিয়ে বিশেষ ‘অথেন্টিসিটি নোট’ দেখুন পরবর্তী ছবিতে

‘বাউল’ শব্দটা নিয়ে সাধারণত আমাদের এখানে যেকোনো ভাব সংগীতকে একই বর্গে ফেলে দেয়া হয়। খুবই অস্বস্তির সঙ্গে এককালে এটাও খেয়াল করেছি কখনো কখনো গেরুয়া পরা, একতারা হাতের কোনো এক ব্যক্তির অলংকরণ ব্যবহৃত হয়েছে উকিল মুন্সী সম্পর্কিত লেখায়। সেই ছবিও একটা দৃষ্টিভঙ্গি দাঁড় করিয়ে দেয়। এর মাঝে উকিল মুন্সী কোনজন।

যে ব্যক্তির ছবি নেই তাকে ছবি আকারে হাজির করার অভিপ্রায়কে আমরা কীভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি? অতিপরিচিত দার্শনিক আলাপ ধরে বলা যায়. ‘অনুপস্থিতকে উপস্থিত’ করানোর একটা প্রকল্প। যেখানে কোনো ব্যক্তি আমাদের ধারণার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠে। যেমন ইমাম সাহেব উকিল মুন্সী। কিন্তু এ ছবি তো তার একমাত্র ছবি না। তিনি তো লাবুসের মায়ের জন্য পাগলপারা এক মজনুও ছিলেন। ছিলেন মা-বাবা হারানো এক এতিমও। ঘাটু গানের শিল্পী। আবার নেত্রকোনার বৃহত্তর ভাব পরিমণ্ডলের এক নক্ষত্র। প্রচলিত বাইনারির মধ্যে মসজিদের ইমাম ও সাধক-গায়কের একটা দ্বৈততা আছে। খুবই অ্যাডভেঞ্চারমূলক দ্বৈততা। এটা অসম্ভব নয় যে, ব্যক্তি পরিচয় বিভিন্ন সময়ে এসে পরিবর্তন হয়, তার মানে এই নয় যে, তার ওই সব বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যায়। উকিল মুন্সীর ক্ষেত্রে দেখবেন, মসজিদের ইমাম গান গাইছেন এমন ধারণার বিপরীতে ‘বিরহী বাউল’ অভিধা বেশি প্রচলিত। অনুমান করা যায় যে ভাব সংগীতের ট্র্যাডিশনে ‘বিরহে’ উকিলের অবদানকে সবচেয়ে ‘উল্লেখযোগ্য’ বৈশিষ্ট্য আকারে তুলে ধরা হয়েছে। আবার ‘বিরহী বাউল’ এমন আলোচনার মধ্যেও তার জানাজা পড়ানো বা জানাজার মোনাজাতের আহাজারি বাদ পড়ছে না।

আব্দুল্লাহ আল মামুন (জয়) ও কুন ক্রিয়েটিভ ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট টিমের ‘অথেন্টিসিটি নোট’

এখন একটি মুখ মানুষকে আবেগগতভাবে সংযুক্ত করে। তার ইতিহাসকে জীবন্ত করে তোলে। ব্যক্তি বিশেষে কল্পিত প্রতিকৃতিও জাতীয় পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠতে পারে। যেমনটা আমরা ফকির লালন শাহর ক্ষেত্রে পাই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর তার বোটে লালন শাহকে ডেকে এনে ছবি এঁকেছেন— এমন গল্প তো প্রচল আছে। এ গল্পে এত শুদ্ধতা আরোপ করা আছে যে লালন শাহকে নিয়ে লেখা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘মনের মানুষ’ উপন্যাসে এটা বিশেষ ঘটনা হয়ে আছে; এমন পরবর্তীতে নির্মিত গৌতম ঘোষের চলচ্চিত্র এ ছবির আঁকার অল্পক্ষণের মধ্যে শেষ হয়। বৈচিত্র্যবিরোধী বাঙালি জাতীয়তাবাদের মধ্যে লালনকে ঢুকিয়ে ফেলার ক্ষেত্রে এর চেয়ে ভালো উপলক্ষ্য কী হতে পারে! এমনকি সুনীল গঙ্গোপাধ্যয় তার উপন্যাসকে কল্পিত হিসেবে বর্ণনা করলেও কেউ কেউ একে ইতিহাস হিসেবে পাঠ করছেন।

উকিল মুন্সী সম্পর্কে আরো লেখালেখি

উকিল মুন্সী সম্পর্কে যে বর্ণনা আমরা জনপ্রিয় সাহিত্যে পাই; তাও নির্মিত। যেমন হুমায়ূন আহমেদের ‘মধ্যাহ্ন’ বা তার সিনেমায় ব্যবহৃত গান। এ সূত্র ধরে আমরা আগাতে গেলে বিভ্রান্তির এক ঘোলাজলেই পড়ে যাই। তাই বলে কী কেউ উকিল মুন্সীর ছবি আঁকবে না বা তাকে নিয়ে ফিকশন লিখবে না। লিখবে তো অবশ্য। এই যে আমার এ নন-ফিকশনও এক ধরনের ফিকশন। আরোপন। উকিল মুন্সীকে নিয়ে বছর দশের আগে যখন তার পরিবারের সঙ্গে কথা হয়; ছবি সম্পর্কে তারা জানান, শরিয়তের বিষয়ে কড়া ছিলেন বলে তিনি কখনো ছবি তোলেন নাই। এমনকি তার নাতনীকে পরে গানও করতে দেন নাই। আবার শরিয়ত ও গানের মধ্যে যে দ্বৈততার প্রচলন আমরা দেখি তা নিয়ে রিচির পীরের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তিনি জানালেন, শরিয়তের সঙ্গে গানের বিরোধ নেই। তবে শরিয়তের দাবি পূরণের পরই আসে মারেফত। এখন একটা ছবি কি এমন দৃশ্য বর্ণনা করতে পারে। হয়তো কোনো ছবিই পারে না।

‘ইমাম সাহেব গান গাইছেন’— এমন আলাপের মধ্যে সমন্বয়ের একটা ঢংও পাওয়া যায়। এর বিপরীতে যে ট্র্যাডিশনের মধ্যে উকিল মুন্সীর বসবাস তা হয়তো আলাপের বাইরে থেকে যায়। উকিলের পীরের দরবারের আলোচনা এ বিষয়ে নোক্তা। এমনকি হিন্দু মিথের ব্যবহারকে যে অর্থে মুসলমানের গানে আরোপন বলে মনে করা হয়, সেখানেও ঐতিহ্য, আবহ, অঞ্চল এসব বাদ দিয়ে একক ইসলামের ধারণা পাই।

যাই হোক, আলাপ তো প্রতিকৃতি নিয়ে। সেই প্রসঙ্গে উপরে দু-একটা বলা হলো। ছবি দরকারটা আসলে কী? অনুমান করা যায় যে— ছবি নাই এমন ঐতিহাসিক ব্যক্তির ছবি আঁকা একদিকে স্মৃতি সংরক্ষণ ও সাংস্কৃতিক কল্পনার কাজ। অন্যদিকে এর সঙ্গে আছে ক্ষমতা, পরিচয় ও ইতিহাস নির্মাণের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। দার্শনিকভাবে অনুপস্থিত অতীতকে দৃশ্যমান করার চেষ্টা। রাজনৈতিকভাবে বলতে গেছে, প্রায়ই একটি সমাজ কীভাবে তার অতীতকে দেখতে চায়, তার প্রকাশ ঘটে এ ধরনের নির্মাণে। তাই এমন প্রতিকৃতি শুধু ‘মানুষটির ছবি’ নয়, বরং সেই সমাজের আত্মপ্রতিকৃতিও।

ঐতিহাসিক ব্যক্তির প্রতিকৃতি আঁকার বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রশ্নটি শুধু ‘তিনি দেখতে কেমন ছিলেন’ নয়; বরং ‘কারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে যে তিনি দেখতে কেমন ছিলেন’ বা ‘তার চেহারাটা বানানো যায়’ এবং ‘এই সিদ্ধান্ত সমাজে কী ধরনের ক্ষমতা সৃষ্টি করছে’ তাও। ঐতিহাসিক ব্যক্তির কল্পিত প্রতিকৃতি আঁকা হলো একটি ‘সত্য-উৎপাদনের’ প্রক্রিয়া। ধরা যাক, কোনো মধ্যযুগীয় সাধক, রাজা বা বিপ্লবীর কোনো ছবি নেই। পরে কোনো শিল্পী তার একটি প্রতিকৃতি আঁকলেন। শুরুতে সবাই জানে এটি কল্পনা। কিন্তু সেই ছবি এক সময় পাঠ্যবইয়ে ছাপা হয়, সরকারি অফিসে টাঙানো হয়, ডাকটিকিটে ব্যবহৃত হয়; এমনকি স্মৃতিস্তম্ভে খোদাই করা হয়। ধীরে ধীরে সেটিই ‘স্বাভাবিক’ ও ‘সত্য’ চেহারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে। যেটা আমরা লালনের ক্ষেত্রে দেখি। আর ডিজিটাল মিডিয়া ও আর্কাইভের এ সময়ে এসে ছবি ছাড়া কোনো কিছুই যেন সত্যতা হিসাবে থাকে না। এখানে এখানে শুধু একটি ছবি তৈরি হয়নি; একটি ‘ডিসকোর্স’ও তৈরি হয়েছে। এটি এমন একটি জ্ঞান-ব্যবস্থা, যা নির্ধারণ করে দেয় কী বলা যাবে, কী সত্য বলে গণ্য হবে এবং মানুষ কোনো বিষয়কে কীভাবে কল্পনা করবে। ফলে ছবিটি ইতিহাসের দলিল না হলেও ইতিহাস সম্পর্কে মানুষের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। এর পর কি মসজিদের ইমাম ছিলেন উকিল মুন্সী এমন একটা ইমেজ ছাড়া আমরা তাকে ভাবব?

জনপ্রিয় উদাহরণ হতে পারে সক্রেটিস। তাকে শনাক্ত করা যায় এমন কোনো সমসাময়িক প্রতিকৃতি পাওয়া যায় না। তবু জেনোফেন ও প্লেটোর বর্ণনা ধার করে আধুনিক যুগে আমরা সক্রেটিসকে প্রায়ই টাকমাথা, দাড়িওয়ালা, গভীর চিন্তামগ্ন এক বৃদ্ধ হিসেবে কল্পনা করি। কেন তাকে সুন্দর যুবক হিসেবে আঁকা হয় না? কেন তাকে সাধারণ এথেনীয় নাগরিকের মতো দেখানো হয় না? কারণ পশ্চিমা সংস্কৃতি ‘দার্শনিক’ বলতে যে চেহারা কল্পনা করে, সক্রেটিসের প্রতিকৃতি ধীরে ধীরে সেই আদর্শের বাহক হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ, আমরা হয়তো সক্রেটিসের প্রকৃত মুখ দেখছি না; বরং ‘জ্ঞানী দার্শনিক’ সম্পর্কে পশ্চিমা সভ্যতার ধারণা দেখছি। আবার যিশু এশিয়ান হওয়া সত্ত্বেও শতাব্দীর পর শতাব্দী ইউরোপে তাকে লম্বা চুল, ফর্সা ত্বক, হালকা রঙের চোখবিশিষ্ট একজন মানুষ হিসেবে আঁকা হয়েছে। ক্লিওপেট্রাও তেমন আরোপন। এখন ভাবুন, সাদামাটা চেহারার জীবননান্দ দাশের কোনো ফটোগ্রাফ যদি না থাকত, তবে তাকে কীভাবে আঁকা হতো! যতই বর্ণনা শুনুন তার— প্রতিকৃতি আঁকার সময় কবিতার প্রভাব কি পড়ত না!

অনেক বছর ধরে উকিল মুন্সীর ছবি হিসেবে আরেক ভাব সাধক ও গীতিকবি কামালউদ্দিনের ছবি ব্যবহার হয়ে আসছে

মানুষের মস্তিষ্ক শব্দের চেয়ে দৃশ্য বা ছবি অনেক দ্রুত এবং স্থায়ীভাবে গ্রহণ করে। উকিল মুন্সীর বিরহী সত্তা বা তার গানের দর্শন বুঝতে হলে তার গান শুনতে হয়, গানের বাণী বিশ্লেষণ করতে হয়, অথবা তাকে নিয়ে লেখা দীর্ঘ প্রবন্ধ পড়তে হয়—যা সময়সাপেক্ষ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমের বিষয়। (এর মানে নয় যে যিনি বা যারা প্রতিকৃতি আঁকার উদ্যোগ নেন বা আঁকেন তারা এ পরিশ্রমটুকু করেন না) অপরদিকে, শাদা চুল-দাড়ি, সফেদ টুপি-পাঞ্জাবি পরা একজন ‘ইমাম’ বা ‘মাওলানা’র ছবি চোখের সামনে আসামাত্রই দর্শক এক সেকেন্ডে একটি সম্পূর্ণ অবয়ব ও ধারণা মাথায় গেঁথে নেয়। এই ভিজ্যুয়াল প্রাতিষ্ঠানিকতা তার ভেতরের প্রেমিক বা বিরহী সত্তার বিমূর্ত ভাবটিকে ঢেকে দেয়, কারণ মূর্ত ছবি বেশির ভাগ সময় বিমূর্ত ভাবের চেয়ে বেশি শক্তিশালী।

আমাদের সমাজে ‘মসজিদের ইমাম’ এবং ‘গান গাওয়া বাউল’—এই দুটি পরিচয়ের মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট সামাজিক ও ধর্মীয় বাইনারি (দ্বৈততা) রয়েছে। প্রায়শই বাউল বা সাধক সত্তাকে সমাজের মূলধারা কিছুটা প্রান্তিক বা ‘শরীয়ত-বিরোধী’ হিসেবে দেখে। যখন উকিল মুন্সীকে একজন পুরোদস্তুর ‘ইমাম’ হিসেবে সগৌরবে চিত্রীত করা হয়, তখন সমাজ বা রাষ্ট্র তাকে একটি ‘নিরাপদ’ এবং ‘গ্রহণযোগ্য’ ছাঁচে ফেলে দেয়। এই একটি ছবি তখন কেবল একটি অবয়ব থাকে না, বরং তা একটি সামাজিক শুদ্ধিকরণ বা ‘স্যাটিফাইড ইমেজ’ হিসেবে কাজ করে। ফলে তার যে সত্তাটি লাবুসের মায়ের জন্য পাগলপারা ছিল কিংবা যে সত্তাটি বিচ্ছেদের আগুনে পুড়ে গান বাঁধত, সেই ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বা ‘অপ্রচলিত’ পরিচয়টি প্রাতিষ্ঠানিক ইমেজের নিচে চাপা পড়ে যায়। হয়তো ছবিটি বারবার বিভিন্ন সেমিনারে, বইয়ের প্রচ্ছদে কিংবা প্রামাণ্যচিত্রে প্রদর্শিত হতে থাকবে, তখন নতুন প্রজন্মের কাছে সেটিই উকিল মুন্সীর ‘একমাত্র সত্য’ চেহারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

শুরুর দিকে মানুষ জানবে এটি একটি ‘কল্পিত ছবি’, কিন্তু সময়ের সাথে সঙ্গে ছবিটির পেছনের কল্পনা হারিয়ে যাবে এবং অবয়বটিই চূড়ান্ত সত্য হয়ে উঠবে। তখন মানুষ উকিল মুন্সীর গান শোনার সময়ও তার ওই ‘ইমাম’ রূপটিই কল্পনা করবে। ফলে তার বহুস্তরীয় ও রূপান্তরশীল জীবন—যেখানে তিনি কখনো এতিম, কখনো সাধক পরিমণ্ডলের নক্ষত্র, কখনো মজনু—তা সংকুচিত হয়ে একটি মাত্র ‘একক বয়ানে’ রূপ নেবে। ছবিটি উকিল মুন্সীর বাউল সত্তাকে শারীরিকভাবে মুছে দিচ্ছে না, বরং এটি দর্শকের কল্পনার সীমাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ছবিটির আধিপত্য এমন এক ‘দৃশ্যমান সত্য’ উৎপাদন করছে, যা উকিল মুন্সীর জটিল ও দ্বান্দ্বিক জীবনকে সরলীকরণ করে কেবল একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ের ফ্রেমে বন্দী করে ফেলছে।

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন লালনের স্কেচ করেছিলেন, তখন তা ছিল একটা একক ক্যানভাসে সীমাবদ্ধ। সেই যুগে একটা ছবিকে ‘সত্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা (পাঠ্যবই, ডাকটিকিট, সরকারি অফিস) লাগত, যা ছিল বেশ সময়সাপেক্ষ। ডিজিটাল মিডিয়া ও অ্যালগরিদমের এই যুগে এসে সত্য-উৎপাদনের রাজনীতি আরো দ্রুত ও আগ্রাসী হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তি এখন অনুপস্থিত অতীতকে শুধু দৃশ্যমানই করছে না, বরং হাইপাররিয়ালিটি তৈরির মাধ্যমে মানুষের যৌথ কল্পনাকে এমনভাবে ফ্রেমবন্দী করছে, যেখানে অ্যালগরিদমের সিলেক্ট করা ‘একটি ছবি’-ই মানুষের চিন্তার একমাত্র সত্য দলিল হয়ে উঠছে।

লেখা প্রায় শেষ। ভাবগানের ইন্টারেস্টিং একটা বিতর্ক নিয়ে কথা বলি। উকিল মুন্সীর সতীর্থদের মধ্যেই। ক্যাটাগরিক্যাল মিসকেট থাকবে যদি তুলনা করি, তাই তুলনা ছাড়াই যোগ করা যাবে।

১৯৪৯ সালে নেত্রকোনা জেলার আটপাড়া উপজেলার বাসাটি গ্রামে এক মালজোড়া গানের আসরে জালাল উদ্দীন খাঁ ধরাট বা প্রশ্ন রেখেছিলেন ‘আল্লা বলতে কেউ নাই এ সংসারে, মিশে গেছে আলো হাওয়ায় বিশ্বজুড়ে তালাশ কর কারে?’ তার প্রতিপক্ষ বাউল ইদ্রিস এই ধরাটের উত্তর দিয়েছিলেন রশিদ উদ্দিনের একটি গানের সাহায্য নিয়ে— ‘জালাল তুমি ভাবের দেশে চল-আল্লাকে দেখবে যদি চর্মচক্ষের পর্দা খোল, গিয়া তুমি ভাবনগরে চেয়ে থাকো রূপ নেহারে, সজল নয়নে ফটোগ্রাফ তোল, মনরঙে প্রেমতরঙ্গে তোমার দিলের কপাট খোল, দেখবে তোমার মাবুদ আল্লা সামনে করে ঝলমল।’

গানের ভেতরের এই আধ্যাত্মিক ‘ফটোগ্রাফ’ বা রূপকের সমান্তরালে, বাস্তবেও অনুপস্থিত সাধকদের দৃশ্যমান অবয়ব বা মূর্তি তৈরির উদাহরণ যে আমাদের দেশে নেই, তা নয়। কিন্তু আলোচনায় তাদের আমরা পাই না। উদাহরণ হতে পারে ঝিনাইদহের পাগলা কানাই। তার মাজারের প্রাঙ্গণে রয়েছে আবক্ষ মূর্তি। যা কি-না তার বংশধরের শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও বিভিন্ন বর্ণনা অনুসারে তৈরি। সেই মূর্তি নিয়ে তেমন আলোচনা নেই। এর বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। হয়তো পাগলা কানাইকে বিশেষ কিছু আকারে হাজির করার তাগাদা নাগরিক সমাজে নেই। উকিল মুন্সীর ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে আজকাল তাকে নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্র প্রস্তু হচ্ছে। আবার এক সময় তিনি নাগরিক সমাজের চোখের আড়ালেও ছিলেন। এখন পাগলা কানাই বা অন্য মহাজনদের জাতীয়বাদ, ধর্ম, সমন্বয় বিভিন্ন প্রসঙ্গে প্রয়োজন পড়ছে না। বা অন্য কোনো সময়ের প্রয়োজনে। এছাড়া এমন অনেক ভাবসাধকের গান আমরা প্রায়ই শুনি তারা কিন্তু মনোযোগ পান না। এ আলোচনায় স্লেষ থাকতে পারে, আশঙ্কা বা আপত্তি থাকতে পারে এবং আলাপের ভঙ্গিও নেতিবাচক হতে পারে। তবে আলোচনা জারি থাকুক, বারবার আমরা কথা বলব— তেমন প্রবাহমান হোক আমাদের ভাব সাধনার দুনিয়া।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *