জুলাই অভ্যুত্থানের নিনাদ ‘ক্যাফে রেভ্যুলুশন’

‘ক্যাফে রেভ্যুলুশন’ যখন লেখা হচ্ছিল, এক বন্ধুর কাছে উপন্যাসটির বিষয়বস্তু সম্পর্কে শুনেছিলাম। পাণ্ডুলিপি পড়েছিলেন তিনি। আর। মুরাদ কিবরিয়ার প্রথম উপন্যাস ‘নিনাদ’ পড়া ছিল। তাই তার যেকোনো কাজের প্রতি আমার আগ্রহ আছে। সাহিত্য-সংক্রান্ত। ‘ক্যাফে রেভ্যুলুশন’ তার তৃতীয় উপন্যাস।

উপন্যাসটি নিয়ে কথা বলব এমনটা যখন ভাবছিলাম, কিছু অস্বস্তি তৈয়ার হইছিল। আমার ধারণা, মুরাদের লেখা প্রসঙ্গে ‘নিনাদ’ নানাভাবেই চলে আসবে। এটা যে বেঠিক তা না। আবার সব সময় দরকারি এমনও না। অনেক পাঠকই থাকবেন যারা ‘ক্যাফে রেভ্যুলুশন’ দিয়ে মুরাদের সঙ্গে পরিচিত হবেন। এখন। যেহেতু আমি তেমন না। ধান ভানতে গেলে শিব ঠাকুর চলে আসবেন।

তো তুলনা অবরহিত অবস্থায়, ‘ক্যাফে রেভ্যুলুশন’ পড়া একটু কষ্টকরই ছিল। ‘নিনাদ’ আমার কাছে এপিকতুল্য, যেটা আমি রাত-দিন একাকার করে পড়েছিলাম। ভাষা বা বয়ান দুই জায়গা থেকে দুটো উপন্যাস ভিন্ন। আবার গল্পটাই এমন যেখানে আগের প্রজন্মের কাছে আনপড় থাকা জেন জি’দের বুঝতে চাওয়ার চেষ্টা আছে। যাদের হাত ধরে পুরো একটা দেশ নতুন জামানায় প্রবেশ করল। তবে সেখানে মুরাদ কিছুটা হইলেও হাল ছাড়ছেন!

হ্যাঁ, ভাষাগত দিক থেকে কমিক ফর্মে হয়তো মুরাদ আরো বেশি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইছিলেন। জেন জিও হইতে পারে তার পাঠক। যোগাযোগের এ আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে আমার ধারণা, এটা ‘ক্যাফে রেভ্যুলুশন’-এর সম্ভাবনার জন্য ক্ষতিকরই হয়তো বা। না, এমন না যে আমি লেখককে কোনো উপদেশ দিতেছি। ক্রিয়েটিভ ক্ষেত্রে তার থট প্রসেসের পক্ষে আমি।

প্রথম যখন ‘ক্যাফে রেভ্যুলুশন’-এর বিষয়বস্তু শুনলাম। ‘কাসাব্লাঙ্কা’ সিনেমাটার কথা মনে হইছিল। ১৯৪৩ সালে আমেরিকায় মুক্তি পাইছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আবহে আলজেরিয়ার একটা ক্যাফেতে শত্রু-মিত্র বা নিরপেক্ষ সবাই হাজির হয়। আছে প্রেম-বিবাহ, গ্রহণ-প্রত্যাখ্যান, আত্মত্যাগ। যেটা হলো, হাসিনার ফ্যাসিবাদে এ ধরনের কোনো স্পেস সম্ভব ছিল না বাংলাদেশে। ‘ক্যাফে রেভ্যুলুশন’ নামের ক্যাফেটাও যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে পড়ে যায়। রাহাত নামের ৩৫ বছর বয়সী এক বেকার কিছু করতে না পারার ভেতর দিয়ে এ ক্যাফের মালিক হয়। রাতারাতি ইন্টারনেট সেনসেশনে পরিণত হয়। বিশেষত তার বন্ধুদের কল্যাণে। শুরুতে মনে হয় গোবেচারা রাহাত। অরাজনৈতিক একটা জীবন। কিন্তু অধিকার প্রশ্নই যে রাজনৈতিক সেই বোঝাপড়ার ভেতর দিয়েই তার বেড়ে উঠা। একপর্যায়ে চাকরির কোটা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রাহাত জড়িয়ে পড়ে গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে।

রাহাতের আলাপের ভেতর দিয়ে সামাজিক-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও মতামতগুলো উপন্যাসে হাজির হইছে। বিষয়গুলো শ্রেণী-গোষ্ঠী ও নানান বিভেদের মধ্য দিয়ে আলাদা। কিন্তু ২০২৫ এর জুলাই এমন একটা স্পেস তৈয়ার করছে, যেখানে এ দেশের বেশির ভাগ একইসঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজেছে। পরে তাদের বেশির ভাগেরই নীরব প্রস্থান ঘটেছে। কিন্তু রয়ে গেছে আশা-নিরাশা ও বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দেলাচল।

‘ক্যাফে রেভ্যুলুশন’ এর গল্প হৃদয়স্পর্শী। কমেডির ওপর জোর দিয়ে এর শুরু। গল্প আগানোর ভঙ্গি পরিচিত ঠেকে, যেখানে মুরাদ কিবরিয়া হয়তো বেশি চিন্তা না করার ফাঁদে পড়ে যান, এমন না। বরং সচেতন সিদ্ধান্তের কারণে অনেক সময় মনে হয় বিষয়ের গুরুত্ব কমে যাচ্ছে। কিছু কিছু মুহূর্তে হাসতে হাসতে বই বন্ধ করতে হইছে। আবার কিছু মুহূর্তে রাহাতের মতো লজ্জা পেয়ে বই বন্ধ রাখছি। মানে সিরিয়াসনেসে হাঁসফাঁস নাই; কিন্তু কমেডিতে হাঁসফাঁস হইছে।

এর বাইরে যে গল্প, যা ৩৫ বছর বয়সী বেকারের সংকট সামনে নিয়ে আসে। বেকারত্ব কীভাবে সোসাইটিতে নাক গলানোর মতো বোঝা তৈয়ার করে; তার নমুনা রাহাত। কিন্তু এটা আবার আমাদের সমাজের সবল দিকও। এর সঙ্গে বাস্তব অবস্থা মিলিয়ে দেখা পাঠকের জন্য কঠিন নয়। যেহেতু রাহাতের আত্মকথন ধরে গল্প এগিয়ে যায়; সে দিকে জীবন নিয়ে স্যাটায়ারাস্টিক দৃষ্টিভঙ্গি হয়তো ঠিকঠাক। তবে রাহাতের বৈবাহিক সংকট পুরুষ আকারে যেভাবে আঁকা হইছে; তার নারী বন্ধুদের বেলায় সেই সংকট আছে কিনা বোঝার চেষ্টা করছি। যেহেতু বইয়ের বাইরে গিয়ে তাকানোর সুযোগ নাই, মানে সাবপ্লটগুলো যেভাবে ডেভেলপ করে তার ইঙ্গিত না থাকায় খামতি চোখে পড়ে। বারবার মনে হইতেছিল নাবিলা বা তাপসীর বিয়ে না হওয়াজনিত ঝামেলা নাই, যতটা রাহাতের আছে।

গল্পের যে বুনন এবং দৃশ্যত হালকা চালে এগিয়ে নেয়া; তা পার হইতে পারলে খুবই আবেগঘন একটা জায়গায় পৌঁছে দেন ‘ক্যাফে রেভ্যুলুশন’। সামাজিক বিরোধ, ক্ষোভকে প্রকাশের সহজ ভাষাও আছে মুরাদ কিবরিয়ার। ভেবে দেখলাম, যে পয়েন্টে জুলাইয়ের নৃশংসতা ও অবিশ্বাস্য অমানবিকতার গল্প আমি বা অনেকেই বলতে পারেন না মুরাদ কিবরিয়া শেষ পর্যন্ত বলে ফেলছেন। যেখানে ভীষণ মানসিক অস্থিরতা তৈয়ার হয়; যেভাবে জুলাইয়ে মানুষের ওপর মানুষের হামলে পড়া দেখেছিলাম বা শুনেছি। উপন্যাসের শেষ ভাগে এসে মনে হয় কল্পনায় নৃশংসতার ছবির আঁকার তুলনায় বাস্তবিক জাহেলিয়াত তুলে ধরা কঠিন। সম্ভবত অন্য পাঠকরাও অনুভব করে থাকবেন। জুলাই যে আমাদের যুথতা ও সম্ভাবনার ভরসা।

জুলাই অভ্যুত্থানের যে বিস্তৃত সামাজিক পরিসর এবং এটি চাপা পড়া কত ক্ষতকে জাগিয়ে তুলেছে— তা হয়তো বুঝতে আমাদের আরো সময় লাগবে। বিশেষ করে জুলাইয়ে যেভাবে শত নদী একসঙ্গে মিলে গিয়ে; আবার পৃথক আকাঙ্ক্ষা ও পথে বিভক্ত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ঠিক আগের বাংলাদেশ নেই। পিছুটানের একটা লড়াই চলছে; আগামীতে থাকবে। এগিয়েও দিয়েছে। কোনো ধরনের পূর্বাভাসবিহীন এ স্রোত আমাদের চেনা-জানা অলিগলিতে কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছে; নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বাদে সব মানুষই তার অংশ হয়ে গেছে তা ছোট্ট জায়গার ভেতর বলেছেন মুরাদ কিবরিয়া।

উপন্যাস অনুসারে রাহাত ২০০৮ সালের সেনা শাসনবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু এরপর পরবর্তী বাংলাদেশে ক্ষমতা যে রূপ সে দেখেছে; তাতে অরাজনৈতিক পরিসরে ঢুকে যায়। যেন ব্যর্থতা একটা কাল আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ছিল। এটা খুবই সাধারণ চিত্র। ফ্যাসিবাদে হাঁসফাঁসে আমরা বেভুলও ছিলাম। এটা রাহাত বা লেখক মুরাদ কিবরিয়ার সমকালের পাঠকরা বুঝতে পারবেন। ২০০৮ সালের সেনাশাসনবিরোধী লড়াই থেকে ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের ধারাক্রমও আমরা অনুসরণ করতে পারি। রাহাত যে প্রজন্মকে প্রতিনিধিত্ব করেন তাদের রাজনৈতিক স্মৃতি-বিস্মৃতি এবং পরবর্তীতে অরাজনৈতিক পরিসরে ঠেলে দেয়া এক প্রজন্ম— তাদের যন্ত্রণা ও বিভ্রান্তি মুরাদ সংযতভাবে তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশের গড়পরতা বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে এ বিষয়গুলো যথাযথ অ্যাড্রেস করতে পারে নাই। বরং মতাদর্শিক লাভ-লোকসানের অংকে আটকে ছিল এর ব্যাখ্যা।

রাহাত হয়তো আবারো সেই পুরনো পরিসরে আবার ঢুকে যাবে। হয়তো না। একইসঙ্গে তারা এমন এক প্রজন্মকে দেখেছে যারা অন্য রকম ধাতুতে গড়া। এই রকম অনেক স্রোত অল্প অল্প করে মিলিত হয়েছে ‘ক্যাফে রেভ্যুলুশন’-এ। তাতে ভারাক্রান্ত হয়নি উপন্যাস। বরং সহজ চালে গল্প শুরুর ভেতর দিয়ে আমাদের বাস্তবতার মুখোমুখি করে।

একদম শুরুর আলাপে ফিরি। ‘নিনাদ’ নিয়ে বলছিলাম। ‘ক্যাফে রেভ্যুলুশন’ যার থেকে বর্ণনাগতভাবে আলাদা। কিন্তু ‘নিনাদ’-এর যে সময় আর জুলাই গণঅভ্যুত্থান, দুটোকে আমরা এক সুতোয় গাথতে পারবো, আমাদের রাজনৈতিক লড়াইয়ের ইতিহাসে। এমনকি পুরোনো ভঙ্গিসর্বস্ব রাজনৈতিক চর্চা এবং বুদ্ধিবৃত্তি বা সংস্কৃতি; যা শেষ পর্যন্ত নব্বইকে ছুঁতে পারেনি তার অনুরণন কীভাবে পরের প্রজন্মে বয়ে চলে; তা দেখা যায়। লেখক মাত্রই নীরিক্ষাপ্রবণ হয়ে উঠার সম্ভাবনা নিয়ে লিখতে বসেন। সে হিসেবে দুটো ভিন্ন ধরনের লেখা। এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়া কিন্তু ভিন্ন এক স্তরে ‘ক্যাফে রেভ্যুলুশন’ নতুন সম্ভাবনার দিকে আমাদের এগিয়ে দেয়। একদম জীবন্ত।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *