বেতবুনিয়ার গল্প

ডাক টিকিটে বেতবুনিয়া

বেতবুনিয়া বা তালিবাবাদ। এই দুটো শব্দ আমার কাছে অনেক ওজনদার ছিল। ছোটবেলায়। এখানে ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র আছে। নিশ্চয় খুব এলাহি কাণ্ডের মাধ্যমে বাইরের দেশ বা দুনিয়া থেকে পাঠানো বার্তা ধরা হয়, যেটা মাঝে মাঝে আমরা টিভিতে দেখতাম, যেমন; বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা! টিভিতে বলা হতো … ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রের মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছে।

একদিন বাবা আম্মাকে বললেন- ‘ওমুক’ খালু তো বেতবুনিয়ায় চাকরি করে। ওনার এক কলিগের সঙ্গে পরিচয় ছিল বাবার। কথায় কথায় নাকি ব্যাপারটা জানতে পারেন। এরপর আম্মা-বাবা তাদের স্মৃতির ভাণ্ডার খুলে দিলেন। আমরাও খানিকটা গল্প শুনলাম, এত দিনে তার ছিটেফোটাও মনে নাই।

ওমুক খালু মূলত নানীর খালাতো বোনের জামাই। তিনি চাকরিসূত্রে সপরিবারে রাঙামাটির বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রে থাকেন। কয়েক দিন পর সেই নানী খবর পাঠালেন, আমাকে দেখতে চান। বাবা এসে যখন এই কথা জানালেন- কী যে ভালো লাগলো। উফফ! বেতবুনিয়া। আগে কখনো একা একা এত দূর যায় নাই।

সেভেন বা এইটে পড়ি মেবি। তো, নির্ধারিত দিনে ভোরে ভোরে বের হয়ে গেলাম নানার সেই কলিগের সঙ্গে। পথের কোনো বর্ণনা মনে নাই। যেহেতু বাসে উঠলে ঘুমিয়ে পড়ি। তবে পাহাড় দেখছি সামান্য মনে আছে। কারণ গন্তব্য কাছাকাছি আসতেই ঘুম ভাঙিয়ে দেন পাশের ভদ্রলোক। যতটা আশা করছিলাম তার চেয়ে কম সময়ে পৌঁছে যাই।

নানা-নানী আমারে খুব আদর করলেন, যেহেতু আমি তাদের আদরের রূপসীর ছেলে। তাদের বাচ্চাগুলোও আপন করে নিলো। উনাদের ফ্যামিলিতে একটা ঘটনা ছিল, মানে যেগুলা বাতাসের আগে আগে ছড়ায়। উনাদের সম্ভবত দুই মেয়ে, তিন ছেলে বা আরও বেশি। এর মধ্যে দুই মেয়ে বোবা। তাদের বিয়ে হয়ে গেছে। একজনের বাচ্চাও আছে। অন্যদিকে আমার চেয়ে বয়সে ছোট ছেলেটাও বোবা। খুবই চঞ্চল ও বদরাগী। আমারে ইঙ্গিতে কী যেন বলছিল- খুব লজ্জা পাইছিলাম। বড় ছেলে মেবি ডিগ্রিতে পড়তেন- একটু রাফ-টাফ টাইপের। আমার বয়সী একটা ছেলে ছিল মানে আমার মামা, সম্ভবত আমরা একই ক্লাসে পড়তাম।

যিনি ডিগ্রিতে পড়তেন ছিল যতক্ষণ বাসায় থাকতেন ততক্ষণ ক্যাসেট প্লেয়ারে গান শুনতেন। একটা গান দেড় দিনে প্রায় মুখস্ত হয়ে গেছিলো ‘গোরে গোরে মুখে কালা কালা চশমা’। এ ছাড়া তখনকার চালু বিরহের গান ছিল। সোলস, তপন চৌধুরী এদের অ্যালবামও ছিল। বিশাল কালেকশন। উনার কাছ থেকে একটা অভ্যাস পাইছিলাম। ক্যাসেট প্লেয়ারে গান ছেড়ে ঘুমানো।

আমার বয়সী মামার সঙ্গে ঘোরাঘুরির সূত্রে অনেকগুলা ছেলের সঙ্গে পরিচয় হলো। তাদের সঙ্গে পাহাড়ি এলাকায় এক-আধটু ঘোরাঘুরি বেশ রোমাঞ্চকর ছিল, বাট স্মৃতিগুলো নাই। বিশেষ করে তখন তিন গোয়েন্দা পড়ি খুব। তাই এমন একটা এলাকা নিয়ে অনেক অনেক কল্পনা তৈরি হওয়ার কথা। তবে একটা ব্যাপার মনে হচ্ছে। একটা টিলার ওপর বড় একটা গাছ। ওপরের জায়গাটা সমতল ছিল- বিকেল বেলা আমরা গিয়ে উঠছিলাম। বসে বসে ওদের গল্প শুনেছি। আমার বলার তেমন কিছু ছিল না। আর ওই সময় তো অপরিচিত কারো সঙ্গে কথা বলা ভীষণ অস্বস্তির ছিল। সেখান থেকে এলাকাটা অনেকটা দেখা যায়। নিচ থেকে টিলা আর পাহাড়ের দৃশ্যটা এখনো চোখে ভাসে। এর সঙ্গে হয়তো অন্য কোনো স্মৃতি মিশে আছে। বিকেলে তাদের ফুটবল খেলা দেখলাম, বাসায় ফিরে ছাদে উঠে বরই খাইছিলাম। তখন বোধহয় খালাগুলার সঙ্গে এক-আধটু ভাব বিনিময় হলো।

তখন ভিসিআরের ভীষণ চল ছিল। একটা বাসায় গিয়ে হিন্দি ছবি দেখছিলাম। একটা ছবির নায়ক ছিলেন জ্যাকি শ্রুফ। সদ্য বিয়ে করছেন। পরদিন এক লোক তার সঙ্গে দেখা করতে আসে। দরজা খোলার পর দেখা যায় নায়কের গাল জুড়ে লিপস্টিকের গাল। এই নিয়ে ভীষণ হাসাহাসি! এখনও হাসতেছি।

পরদিন সকালে বাজার এলাকায় ঘুরতে যাই। তখনই দেখলাম অন্য একটা রূপ। যেটা ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রের ভেতর বোঝাই যায় না। এখানে প্রায় সবাই বাঙালি। বাজারে প্রচুর লোক— উপজাতি। তারা নানান কিছু পসরা সাজিয়ে রাখছে। বাজার পার হওয়ার দেখলাম একটা সিনেমা হল।

পরদিন যখন যখন চলে আসতেছিলাম নানা পকেটে কিছু টাকা গুছে দেন। বাসে ঘুমায়া পড়ছিলাম। যখন ঘুম ভাঙল তখন নামার সময় হয়ে গেছে। যিনি আমাকে নিয়ে গেছিলেন তিনি ছিলেন না সেদিন। নানার অন্য এক কলিগ অলংকার মোড় থেকে গাড়িতে তুলে দেন। সেই দিন সম্ভবত জীবনের প্রথমবার একা একা বাসে চড়ে কোথাও গেলাম। মুড়ির টিন তথা কাঠবডির বাসও হতে পারে সেটা। যেখানে ড্রাইভারের পেছনে একটা আয়নায় লেখা থাকতো- সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক ও Just time no complain. আমার অনেক দিন ধারণা ছিল দুটো কথাই একই। শুধু ভাষা আলাদা।

সে দিন চলে আসার সময় কেমন লাগছিল? আম্মাকে দেখার জন্য মনটা নিশ্চয় কেমন করছিল। এমনিতে অন্য কারো বাসায় থাকতে কখনো অভ্যস্ত ছিলাম না। অনেক গল্প বলার জন্য মন আনচান করছিল। যাই হোক- যা জানি না, তা নিয়ে আর কী কথা!

কাছাকাছি বয়সী সেই মামাকে অনেক আপন মনে হইছিল। কিন্তু পরে ও যখন আমাদের বাসায় আসে ততটা কথা বলি নাই মনে আছে। কেমন যেন অচেনা লাগছিল। তারপর ওর সঙ্গে দেখা হয় নাই আর। অনেক বছর পর যখন ইউনিভার্সিটিতে পড়ি- তখন গ্রামে ফুপাতো বোনের স্বামী মারা যাওয়ায় ওদের এলাকায় গেছিলাম। পাশাপাশি বাড়িতে নানীর অনেক আত্মীয়-স্বজন। সেখানে আমাকে দেখে অনেক বয়সী নারী বলতেছিল রূপসীর ছেলে এটা। বেতবুনিয়ার নানীও ছিলেন!  কিন্তু তার দিকে তাকাতে লজ্জা লাগতেছিল!

* বেতবুনিয়ার কথা ভুলেই গেছিলাম। কিছুদিন আগে প্রচন্ড অসুস্থ অবস্থায় টানা কয়েক দিন ঘুমাইতে পারি নাই। তেমন এক রাতে বেতবুনিয়ার গল্প ইয়াদ হলো। কী কী মনে পড়েছে তার পুরোটা মনে নাই অবশ্য।  

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.