আমার ভাব-ভাষা কি আসলেই আমার

দেখা গেল, যার মগজ ভিটামিনের মধ্যে বসবাস করছে ক্ষুধা অনূভবের শরীরি গ্রস্থি তার আয়ত্বে নাই, স্বাদ গ্রস্থিও নাই। তারপরও সে ঝাল করে রান্না করা চ্যাপা শুটকি খেতে চাইছে। এমনকি এর স্বাদ ও গন্ধ সে অনুভব করতে পারছে। ছবি: উইকিপিডিয়া।

আমরা যে ভাব-ভাষা আর অভিজ্ঞতার জগতে বাস করি সেটা কি আসলেই আছে? নাকি এটি নির্মিত, আমাদের অজ্ঞাতাসারে কেউ কল-কাঠি নাড়াচ্ছে। আমরা যেভাবে চিন্তা করি, সেই চিন্তার কি কোন স্বাধীন অস্তিত্ব আছে? নাকি আমরা কৃত্রিম কোন অভিজ্ঞতার শিকার হই? যেখানে আমরা নিছক খেলার পুতুল বা পরীক্ষাগারে পরীক্ষণযোগ্য বস্তু মাত্র, কৃত্রিম পরিবেশে কিছু শর্তের মাঝে জীবন-যাপন করতে হয়। এই ধরণের প্রশ্ন নতুন কিছু নয়। এই প্রশ্ন যদি আপনি নাও তুলেন, তারপরও জীবনের নানা পদে নানা ভাবে এমন ভাবনা আপনার মাঝে খেলা করে। কিছুদিন আগের একটা পোষ্টের শিরোনাম, আসল মানুষ চেনা যায় কেমনে। সেই চেনা-জানার আগের কথা হলো, কি করে বুঝব আমি যাকে ‘আমি’ বলছি সেটা বানানো জিনিস না, আমার বাইরের কিছু না। আসুন এমন ভাবনা থেকে ‘পাত্রের মধ্যে মগজ’ বিষয়টা নিয়ে বাতচিত করা যাক।

এক.

আপনি ঝাল করে রান্না করা চ্যাপা শুটকি খেতে পছন্দ করেন। এখন চ্যাপা শুটকি দিয়ে ভাত খাচ্ছেন। আপনার জিহবা ও নাক শুটকির স্বাদ ও গন্ধ অনুভব করতে পারছে। কিন্তু যে মস্তিষ্ক দিয়ে এই স্বাদ আর গন্ধ অনুভব করছেন, তো সেই অনূভবের কোন শরীরি গ্রস্থিই আপনার আয়ত্বে নাই।

যদি ঘটনা এমন হয়, তবে আপনার আমার ভাব-ভাষা আর অভিজ্ঞতার যে জগত সেটা কি আসলেই আছে? নাকি এটি নির্মিত, আমাদের অজ্ঞাতাসারে কেউ কল-কাঠি নাড়াচ্ছে। তাহলে আমরা যা চিন্তা করি, সেই চিন্তা আমাদের নয়। আমরা কৃত্রিম কোন অভিজ্ঞতার শিকার হচ্ছি। যেখানে আমরা নিছক খেলার পুতুল বা পরীক্ষাগারে পরীক্ষণযোগ্য বস্তু মাত্র, কৃত্রিম শর্তাধীন পরিবেশে জীবন-যাপন করছি? এই ধরণের প্রশ্ন নতুন কিছু নয়। এই প্রশ্ন যদি আপনি নাও তুলেন, তারপরও জীবনের নানা পদে নানা ভাবে এমন ভাবনা আপনার কাছে আসে। এমন ভাবনা থেকে ‘পাত্রের মধ্যে মগজ’ বিষয়টা নিয়ে বাতচিত করা যাক।

বাংলায় ‘পাত্রের মধ্যে মগজ’ কথাটা শুনতেই অদ্ভুত লাগছে। ইংরেজীতে ব্রেন ইন আ ভ্যাট বা সংক্ষেপে BIV বলে। জ্ঞানতত্ত্ব ও আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্সের (Artificial Intelligence) দার্শনিক আলোচনায় AI এই সংক্ষেপ নামেই বেশি ডাকা হয়। জ্ঞান যে সম্ভব, এর বিরুদ্ধে সংশয়বাদীদের দেয়া যুক্তিগুলোর একটি হলো এই ‘পাত্রের মধ্যে মগজ’। ‘পাত্রের মধ্যে মগজ’ নামে একটু খটমটে মনে হলেও দর্শন, কল্প বিজ্ঞান সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এর নানা ধরনের ব্যবহার হয়েছে।

আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI), বিশেষ করে শক্তিমান আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্সের বিরুদ্ধে ‘পাত্রের মধ্যে মগজ’ এই যুক্তিটি ব্যবহার করা হয়। শক্তিমান আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্সের ধারণা মতে, উন্নত যন্ত্র বা রোবট মানুষের মত চিন্তাও করতে পারবে।

খটমটে লাগার কারণে আমরা ‘পাত্রের মধ্যে মগজ’ বলার বদলে BIV ব্যবহার করব। একই সাথে আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্সকে অও বলা হবে।একই নামে স্টিভেন স্পিলবার্গের অসাধারণ একটা মুভি (২০০১) আছে। আমাদের আলোচনাও শক্তিমান অও ভিত্তিক। আমরা মেরী শেলীর বিখ্যাত উপন্যাস ফাঙ্কেনস্টাইনকে স্মরণ করতে পারি। শক্তিমান অও এর দুর্বল অনুকরণ হিসেবে রজনীকান্ত অভিনীত হিন্দী মুভি রোবট দেখতে পারেন (শঙ্কর, ২০১০)।

দুই.

ধরে নিলাম,আমাদের বুদ্ধিবৃত্তি ও চিন্তা ভাবনার প্রধান কেন্দ্র হলো মস্তিষ্ক। মনে করা যাক, জন্মের পরপরই একে দেহ থেকে আলাদা করে একটি ভিটামিন পূর্ণ পাত্রে রাখা হলো (BIV)। এটা মস্তিষ্ককে সচল রাখে এবং এর বৃদ্ধির কাজটি করে। এই মস্তিষ্কটি একটি তারের মাধ্যমে কম্পুটারের সাথে যুক্ত আছে। কম্পুটার একটা অবাস্তব জগতের ভাব তৈরি করে এবং ইলেকট্রিক সিগনালের মাধ্যমে সেই ভাব ব্রেনে চালনা করা হয়। এতে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক গতি ক্রিয়া বাধাগ্রস্থ হয়। ফলে বাস্তব জগত দেখার বদলে একটা কৃত্রিম বানানো জগতকে দেখে। পঞ্চেন্দ্রিয় নিজ নিজ অনুভূতি লাভ করে। এরজন্য শুধুমাত্র কম্পুটার নির্মিত উদ্দীপককে সঠিকভাবে চালনা করতে হবে।

এবার একটু পেছনে ফেরা যাক। প্রাচীন গ্রীক দর্শনে প্লেটোর (Plato) গুহার রূপক বা Allegory of cave’এ একটি কৃত্রিম পরিস্থিতির কথা বলে। যেখানে জন্ম থেকে গুহায় বন্দী একদল লোক কৃত্রিম অবস্থাকে সত্য বলে মনে করে। দেয়ালে পড়া ছায়াকে তারা সত্য বস্তু মনে করে। প্লেটো তার দি রিপাবলিক (The Republic, বাংলা অনুবাদ করেছেন সরদার ফজলুর করিম) বইয়ে জ্ঞানের আলোচনা করতে গিয়ে এই গুহার রূপকের আশ্রয় নেন। আধুনিক দর্শনে এসে আমরা ফরাসী দার্শনিক রেনে দেকার্তের মেডিটেশন (Meditation, বাংলা অনুবাদ করেছেন মহিউদ্দিন) বইয়ের ফার্স্ট মেডিটেশন অধ্যায়ে এই ধরণের যুক্তির দেখা পাই। দেকার্তের সমস্যা ছিল নিশ্চিত ও অনিশ্চিত জ্ঞানের ভেদ নির্ণয়। তার ভয় ছিলো কোন অপদেবতা বা দানব আমাদের অবাস্তব জগতকে বাস্তব বলে দেখায় কিনা।

রিয়ানু রিভস অভিনীত জনপ্রিয় সাই-ফাই মুভি দি ম্যাটিক্স এবং একই নামের উপন্যাসে (ওয়াস্কী ব্রাদার্স লেখা ও নির্মিত, ১৯৯৯)এ কৃত্রিম অভিজ্ঞতার জগতের কথা বলা হয়। কম্পুটার উদ্দীপনায় পাওয়া অভিজ্ঞতাকে সত্যজ্ঞান করছে মানুষ, সেভাবে তারা চলছে। অন্যদিকে এভাটার (জেমস ক্যামেরন, ২০০৯)মুভিতে আরো উন্নত অবস্থার মুখোমুখি হই আমরা।যেখানে নায়ক জ্যাক কৃত্রিমভাবে প্যানডেরার অধিবাসীদের অভিজ্ঞতা লাভ করে।

আমেরিকান দার্শনিক, গণিতবিদ ও কম্পুটার বিজ্ঞানী হিলারি পুটনাম ।

আমেরিকান গণিতবিদ ও কম্পুটার বিজ্ঞানী হিলারি পুটনাম একজন বিশ্লেষণী দার্শনিক। তিনি তার Reason, Truth and History (১৯৮১) বইয়ের পাঁচ ও ছয় নাম্বার পৃষ্ঠায় ইরা এর আলোচনা করেন। তার মতে, শক্তিমান AI’র সম্ভাব্যতা নিয়ে বলতে গেলে আমরা দুটি বিষয় পাই। এতে মানুষ এবং যন্ত্রের পার্থক্য টের পাওয়া যায়। মানুষের বৈশিষ্ট্য হলো মানসিক অবস্থা এবং যন্ত্রের বৈশিষ্ট্য হলো ইনপুট ও আউটপুট ভিত্তিক পদ্ধতি। ইনপুট ও আউটপুট ভিত্তিক পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য হলো এটি আকস্মিক এবং কার্যকারণিক (Functionalism)। অন্যদিকে,মানসিক অবস্থা হলো উচুঁ স্থরের প্রকাশমান বৈশিষ্ট্য যা নিউরণের মধ্যে নিচুস্থরের প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে সৃষ্ট (Biological naturalism).

এখন, শক্তিমান অও’র ক্ষেত্রে ইনপুট ও আউটপুটের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয় চিন্তার ক্ষমতার উপর। ‘BIV’ পরীক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেয়া হয়, কৃত্রিম স্নায়বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চিন্তা করা যায় কিনা। এইক্ষেত্রে ‘BIV’ যুক্তিকে শুধুমাত্র সংশয়ী যুক্তি বলে নাকচ করা যায় না। বরং, এই ধারণার বিস্তৃত সম্ভাবনা আছে। যেকোন যুক্তির প্রচলিত ফর্মুলার বাইরেও এর বিপরীত ব্যাখ্যার সুযোগও কম নয়।

তিন.

একে শুধুমাত্র দর্শন বা AI বা সাই-ফাই মুভির বিষয় ধরে নিলে পুরোপুরি ভুল হবে। আমরা আমাদের নিত্য আচরণে এই ধরণের কিছুতে কি শিকার হই না। যৌক্তিক-অযৌক্তিক চিন্তার নামে এর মধ্যে জীবন-যাপন করি। ধর্মের নামে, বিজ্ঞানের নামে, যুক্তিবাদের নামে, রাজনীতির নামে অথবা পুঁজি শাসিত দুনিয়ায় আমরা কি ভিটামিনের মধ্যে বসবাস করি না? আমাদের কামনা-বাসনা-ইচ্ছে-অভিব্যক্তি-সাড়াদানে কি তাদের নিয়ন্ত্রন নাই? কলকাতার লেখক শাহযাদ ফিরদাউসের উপন্যাস শাইলকের বাণিজ্য বিস্তারে (সংবেদ, ২০১১) আমরা দেখি টাকা কি করে মানুষের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যতকে ঠিক করে দেয়। নতুন নতুন অভিজ্ঞতা তৈয়ার করে । অথবা নানা কারণে আমরা কি আত্মসম্মোহনের শিকার হতে চাই না? আমাদের আসক্তি দ্বারাও আমাদের জগত নির্মিত হয়। আবার এইসবের মধ্যেও চিন্তায় বা ঘটনাকারে এই অবস্থাকে উতরে যাবার যার পর নাই চেষ্টা কি নাই? আমরা বাস্তব অবস্থার মুখোমুখি হতে চাই। সে থাকুক আর নাই থাকুক। জিম ক্যারি অভিনীত দ্যা ট্রুম্যান শো (পিটার উইয়, ১৯৯৮) মুভির কথা মনে আছে কি? এখানে রিয়ালিটি শো এর ভ্রান্ত জগতের মধ্যেও মানুষ সত্যজগতকে নিয়ে প্রশ্ন করে।

চার.

আগেই বলেছি, যার মগজ ভিটামিনের মধ্যে বসবাস করছে ক্ষুধা অনূভবের শরীরি গ্রস্থি তার আয়ত্বে নাই, স্বাদ গ্রস্থিও নাই। তারপরও সে ঝাল করে রান্না করা চ্যাপা শুটকি খেতে চাইছে। এমনও হতে পারে চ্যাপা শুটকি বলে বাস্তব জগতে কোন খাবারই নাই। দি ম্যাট্রিক্সে সাইফার নামের চরিত্র কাবাবের মধ্যে ছুরি চালাতে চালাতে বলে, ‘আমি জানি এইখানে কোন কাটা চামচ নাই। জানি, যখন আমি এটা মুখে দিব, দি ম্যাট্রিক্স বলবে, এটা কাবাব’। যদি এই হয়, তবে আমাদের মন নিয়ে প্রশ্ন উঠে। একটি শরীরের মধ্যে মস্তিষ্ক যে মানসিক অবস্থা (যাকে আমরা সত্যিকার বলছি) তৈরি করে, তা কি কৃত্রিম মানসিক অবস্থার মতই হবে।

এই যেন এক অনিশ্চিত অবস্থা। যে মানসিক অবস্থা নিয়ে এতো কথা, তাকে কিভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়? এর উত্তর দিতে গিয়ে হিলারি পুটনামের সাহায্য নিয়ে মানসিক আধেয়কে (মন কি ধারণ করে। এই প্রসঙ্গে Ela Kumar এর Artificial Intelligence বইটি দেখতে পারেন। বইটি গুগল বুকসে সরাসরি পড়া যায়) দুইভাগে ভাগ করেছেন।

দ্যা ম্যাট্রিক্সে বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষ, যারা বন্দী হয়ে আছে ক্যাপসুল কুঠুরীতে।

. বিস্তৃত আধেয়/ Wide content

. সংকীর্ণ আধেয়/ Narrow content

 বিস্তৃত আধেয়ের ক্ষেত্রে একজন সমগ্র পরিস্থিতিটি পর্যবেক্ষণ করবে। সর্বজ্ঞাতার দৃষ্টিতে। তিনি একজন বাহ্যিক পরিদর্শক। সে ভিটামিনের মধ্যে থাকা মস্তিষ্কের কৃত্রিম বাস্তবতার সাথে বাস্তব পরিস্থিতির তুলনা করতে পারবে। তাকে অতিপ্রাকৃত কিছু হতে হবে এমন না, তিনি একজন মানুষও হতে পারেন। তাহলে, এই সর্বজ্ঞাতার দেখা থেকে সাধারণ মানুষের দেখা ভিন্ন একটা বিষয়। এমনকি কেউ বাস্তবে থেকেও ভুল মনে করলে তিনি তাকে বাস্তব অবস্থার ইশারা দিতে পারবেন। যেমন-প্লেটোর সেই গুহা থেকে একজন ব্যক্তি বের হয়ে আসে। সে অন্যদের জানায় তারা যা দেখছে ভুল দেখছে। অথবা দি ম্যাট্রিক্সের কম্পুটার প্রোগ্রামার টমাস এ এন্ডারসন নিও। সে জানতে পারে, মানুষ যে জগতে বাস করছে, সেটা প্রোগ্রাম নিয়ন্ত্রিত পরাবাস্তব।

অন্যদিকে সংকীর্ন আধেয়কে কেউ কেউ বলেন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি। এখানে পরিস্থিতি বিশ্বাসে এমন ভেদ-বিবাদের বিষয় থাকে না। এখানে কৃত্রিম আর বাস্তব অবস্থার পার্থক্য বলে কিছু থাকে না। এখানে তার দৃষ্টিতে সকল আচরণ, নীতি, বিশ্বাস একই রকম। এটা যেন সমগ্রকে খন্ড খন্ড করে দেখা। যেমন- দ্যা ম্যাট্রিক্সে বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষ, যারা বন্দী হয়ে আছে ক্যাপসুল কুঠুরীতে।

পাচ.

বাস্তবে অনেকে হয়তবা শুটকির গন্ধও সহ্য করতে পারেন না, কিন্তু অনেকের সহজাত ধারণা হলো শুটকি একটা সুস্বাদু খাবার। তারা মনে করেন এই বিশ্বাসের মধ্যে এমন কিছু আছে যেটা সেই বিশ্বাসের অনুরূপ। আমাদের অন্তনিহিত অভিজ্ঞতার রাজ্য থেকে ঘুরে আসলে এর এক ধরনের ব্যাখ্যা পাওয়াও যেতে পারে। দুইজন লোক। একজন ‘ক’, আরেকজন ‘খ’। ‘ক’, যিনি বর্ণ অন্ধ। অন্যদিকে ‘খ’ স্বাভাবিক দৃষ্টি শক্তির অধিকারী। এখন ‘ক’ যে বস্তুকে সবুজ দেখছে, ‘খ’ সেটাকে দেখছে লাল। রং আলাদা হলেও দুইজনে ট্রাফিক বাতি দেখলে একই প্রতিক্রিয়া দেখাবে। যদিও একজনের কাছে যা লাল, আরেকজনের কাছে সেটা সবুজ। কিন্তু দুইজনেই বলবেন, তারা লাল আলো দেখে গাড়ি থামিয়েছেন। এখানে বাহ্যিক পরিস্থিতি একই মনে হলেও তারা তাদের অভিজ্ঞতার দিক হতে ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করছেন। আমরা বাহির থেকে এগুলোকে স্বাভাবিক ধরে নিচ্ছি। তাই বাহ্যিকভাবে এটা স্পষ্ট নয় যে, তাদের মানসিক অবস্থা একই না পৃথক?

জিম ক্যারি অভিনীত দ্যা ট্রুম্যান শো (পিটার উইয়, ১৯৯৮) মুভির দৃশ্য। রিয়ালিটির শোর বাইরে আসল দুনিয়ায় যাবার দরোজা পেয়ে গেছে।ছয়.

শক্তিমান AI মানুষ যেভাবে চিন্তা করে যন্ত্রকে সেভাবে চিন্তা করাতে চায়। তাহলে তাকে প্রথমে চিন্তা পদ্ধতির বাইরের ও ভেতরের সম্পর্কটি ধরতে হবে। উপরের দুই ব্যক্তির উদাহরণের মতো ‘BIV’ এমন কিছু হলে দুটা ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে যারা আলাদা পরিস্থিতিতে বসবাস করছে তাদের মতোই কিছু বুঝবার উপায় নাই। কিন্তু এই চিন্তা শুধুমাত্র মানুষের মধ্যে না তার চিন্তা যা করে সেখানেও থাকে? আইজাক আসিমভের ছোট গল্প অবলম্বণে নির্মিত আই. রোবট (অ্যালেক্স প্রইয়াস, ২০০৪) মুভিতে মেশিনের মধ্যে ভুত (Ghost in the machine) বলে একটা বিষয় আছে। সেখানে মেশিনের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের মধ্যে আলাদা কিছু ভর করে। সেখানে একটা রোবট রোবট্রিক্সের তিন নিয়মের নিয়ন্ত্রনের বাইরে যেতে সক্ষম হয়। সেখানে ‘BIV’ সব কিছু নয়। এর বাইরেও কিছু থাকে। এটা ডিজিটাল যুগের উদাহরণ। এনালগ যুগে, রবার্ট লুই স্টিভেনশনের বিখ্যাত উপন্যাস ড. জেকিল এন্ড মিস্টার হাইডের ভুল লবণের ব্যবহারে ভুল করেছিলেন মাত্র।

এখন শক্তিমান AI’র সংজ্ঞা মতে, চিন্তা পদ্ধতিকে অর্জন করতে চাইলে চিন্তার এই পার্থক্যগুলো বিবেচনায় নিতে হবে। চিন্তা তার ধারাবাহিক অবস্থার মাধ্যমে তার যৌক্তিক আকার ও ইতিহাসবোধ রক্ষা করে। সেখানে তার নানা বিবর্তন ঘটে। এখন আমাদের চিন্তা আসলে স্বাধীন কিনা সেই চিরায়ত প্রশ্নের উত্তর জানতে হবে। একই সাথে চিন্তার কোন সাধারণ সুত্র আছে কিনা তা আবিষ্কার করতে হবে। সেটা কি আসলেই সম্ভব? সম্ভব বা অসম্ভব যা-ই হোক লক্ষ্য করুন, এই প্রশ্নগুলো তুলছে দর্শন ও সাহিত্য। মানুষের সবচেয়ে সৃজনী বৃত্তি। যদি তা-ই হয়, তবে হয়তো মানুষ কৃত্রিম অবস্থার মধ্যে থাকলে তাকে অবশ্যই একদিন জয় করবে।

* মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক স্যার। AI’র যা কিছু জেনেছি, তার ক্লাসের সামান্য অনুরণন মাত্র।

Comments

comments

5 thoughts on “আমার ভাব-ভাষা কি আসলেই আমার

  1. আমার কিছু বিষয় জানার ছিল, বর্তমানে কোন বিষয়ে পড়ালেখা করছেন? আপনার লেখাগুলো বেশ ভালো… নিয়মিত এসে পড়ে যাবো… :mrgreen:

  2. Pingback: মানসিক অবস্থা কি করে বাইরের দুনিয়াকে উপস্থাপন করে? « ইচ্ছেশূন্য মানুষ

  3. Pingback: যমজ পৃথিবীর সবকিছু কি পৃথিবীর মতো হুবহু একই! « ইচ্ছেশূন্য মানুষ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *