কারাবন্দীর চিঠি

সংগ্রাম করার যথেষ্ট শক্তি আমার রয়েছে

Ameer Makhoul

(আমের মেকউল। ইসরাইলের জেলে দন্ডপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বন্দী এবং সিভিল সোসাইটির নেতা। তাকে ২০১০ সালের মে মাসের ছয় তারিখে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের ১২ দিনে তাকে তার পরিবার বা আইনজীবি কারো সাথে দেখার করার অনুমতি দেয়া হয় নাই। তার বিরুদ্ধে বিদেশীদের  হয়ে [বিশেষ করে লেবানন ভিত্তিক হিজবুল্লাহ] দেশের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ আনা হয়। কিন্তু সাবাক [ইসরাইলের আভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা- যেটা সিনবেথ নামে পরিচিত] তাদের অভিযোগের স্বপক্ষে কোন প্রমাণ দেখাতে পারে নাই। তার উপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। সবশেষে গত ২০১০ সালের অক্টোবর মাসে তিনি অভিযোগ স্বীকার করতে রাজী হন। এতে ২০১১ সালের জানুয়ারীতে হাইফা জেলা কোর্ট তার নয় বছরের কারাদন্ডের রায় দেয়। [আপডেট] কিন্তু অনেকে মনে করেন আমের এবং তার পরিবারকে চাপের মুখে রেখে এই স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে। তার গ্রেফতার ও কারাদন্ড নিয়ে অ্যামেনেষ্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার ডাকে ইসরাইল ও ইসরাইলের বাইরে প্রতিবাদের ঝড় উঠে। যদিও প্রথমে দেশের ভেতর এই বিষয়ে মিডিয়ায় আলোচনা নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত বহাল থাকে নাই। যেমন- ইসরাইলী নাট্যকার জোশুয়া সোবল একে সোভিয়েভ আমলের রাশিয়ার এক ইহুদী বুদ্ধিজীবির আটকের সাথে তুলনা করেন। এই চিঠিটি ২০১০ সালের ২৯ নভেম্বর ইলেকট্টনিক ইন্তেফাদায় প্রকাশিত হয়। )

আরবীতে যাকে বলে আল ফানার, তার অর্থ হলো বাতিঘর। এটা আমার অনুপ্রেরণা। আমি জেলখানার ভেতর অবস্থান করেই বাতিঘর তৈরি করেছি। জেলখানায় কোনকিছু তৈরীর অনুমতি নাই, তাই এটি আমার মনের ভেতর এবং আমার মন পুরোপুরি আমারই দখলে। মানুষের স্বাধীনতা ও মর্যাদা নিয়ে আমার ভবিষ্যত চিন্তা ও স্বপ্নে আল ফানার একটি অংশ হয়ে গেছে। জেলখানার বাইরে বাতিঘর, যেখানে সে নোঙর করেছে এটি অনেক গভীর এবং নিরাপদ। বস্তুত, বাতিঘর আমার ভবিষ্যত দৃষ্টিকে পথ দেখাবে এবং যার নোঙরের ভূমিকা হলো আমি কোথায়, কোন অবস্থানে আছি সেটি বুঝিয়ে দেয়া। এখনকার বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভারসাম্যহীন।  আমাকে ভারসাম্যপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত আচরণ করতে হবে। প্রতিদ্বন্ধীতা জানিয়েই বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। এই পরিবর্তন আমার এবং আমাদের সকলের জন্য দরকার। যেটাকে আমি নোঙর বলছি সেটি নির্দেশ করবে আমাদের কি ধরণের কাজ করতে হবে। বাতিঘরের আলোতে দেখবো এই কাজ কেমন, কিভাবে হয় এবং কি জন্য হবে।

এই যে বাতিঘর আর একখানা নোঙর এই দুটি জিনিস একজন স্বাধীনতাকামী নবীন বন্দীর জন্য সহজ কিছু নয়। নিজেকে নবীন বলছি, যদিও আমি গত ছয় মাস ধরে জেলখানায় বন্দী। অনেক বন্দীরা আছে ২৩ থেকে ২৮ বছর ধরে। সে তুলনায় আমি এখনো নবীন, কিন্তু একেকটা দিন আসলে অনেক সময়, অনেক দুঃখভোগের। এটা একই সাথে আমার মাতৃভূমি ফিলিস্তিনের উপর কি হচ্ছে তারই প্রতিফলন।
নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করা ইসরাইলের আদালতে কোনভাবেই গ্রহনযোগ্য নয়। হাজার হাজার বন্দীদের গড় এবং সংখ্যার হিসেবের দিক থেকে নির্দোষ বন্দীর সংখ্যা শূণ্য। ফিলিস্তিনীরা দোষী এটাই হলো একমাত্র কথা। সাবাক আমার এবং আমার পরিচিতদের ত্রিশহাজার টেলিফোন মনিটর করেছে, পরীক্ষা করেছে। আমার ই-মেল, স্কাইপি এবং ইন্টারনেট কোনটিকেই তারা তাদের নজরদারীর বাইরে রাখে নাই। যদিও তারা আদালতে বলেছে তাদের কাছে প্রদর্শনযোগ্য কোন প্রমাণ নাই।

free Ameer Makhoul

আমার অভিজ্ঞতা বলে, আমিসহ ইসরাইলী কারাগারের সাত হাজার বন্দীর কারো বিরুদ্ধে সাবাক কোন প্রমান দেখাতে পারে নাই। কিন্তু এর মানে নয় যে, প্রমান দেখানোর খেলা শেষ। তাদের কাছে আরেকটি গোপন অস্ত্র আছে। তথাকথিত ‘গোপন প্রমান’। তারা এই প্রমাণ বিচারকদের সামনে উপস্থিত করে, কিন্তু আমি অথবা আমার আইনজীবি এই গোপন প্রমাণ কি জিনিস তা জানার অনুমতি পায় না। ইসরাইলী সিস্টেম কখনো ইসরাইল অথবা সাবাককে দায়ী করে না। সকল দায় ফিলিস্তিনী অভিযুক্তদের।

আমার অভিজ্ঞতা ও পরিসংখ্যান বলে, এর্টনী জেনারেলের সাথে আলোচনা ছাড়াই দন্ড দ্বিগুন হতে পারে। সুতরাং, প্রমাণের অভাব মানেই মুক্তি নয়। কোর্ট আমাকে নির্দোষ ঘোষণা দিক, এটা ইসরাইল কখনো মেনে নিবে না। অন্যদিকে ধরে নেয়া হয়, আরবের অন্য জায়গায় থাকা ফিলিস্তিনী উদ্বাস্তুদের বন্ধুরা হলো বিদেশী গুপ্তচর। ইসরাইল রাষ্ট্রের ভূমিকা হলো ফিলিস্তিনিদের দোষী করা আর অভিযুক্তের ভূমিকা হলো সেটা ব্যাখ্যা করা, এমনকি সে যদিও নির্দোষ হয়। দেশে বিদেশে আমার অনেক বন্ধু ও সহযোগী আছে। আমি মোহাচ্ছন্ন নয়, আমি সত্যিকারেই মনে করি স্বাধীনতা ও মর্যাদা আদায়ের লড়াইয়ের জন্য আমার যথেষ্ট শক্তি রয়েছে।

 

Comments

comments

4 thoughts on “কারাবন্দীর চিঠি

  1. অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি সুজন ভাই, এত সুন্দর একটা চিঠি আমাদের সামনে নিয়ে আসার জন্য। চিঠিটা পড়ে আমারও বুকের ভিতর ক্রমশ আল ফানার তৈরী হচ্ছে। বিনম্র শ্রদ্ধা আমের মেকউলসহ সকল রাজবন্দীদেরকে যারা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়ছে।

  2. আল ফানার আমাদের বুকের ভেতর প্রতিমুহূর্তে তৈরী হচ্ছে। কিন্তু নানা ছলে তারে আমরা গোপন করি। কেন করি? যখন এটা সচেতন অভিলাষ আকারে আড়াল হয় সেটা বড় প্রতারণা।

    ধন্যবাদ।

  3. sob deshei sorkarera tader somalochokoder mone kore bipojjonok…Israel-er moto ekti jobor dokholkari rastro aro beshi kore e kotha mone korbe…manobotar lojja bole jodi kichu theke thake se amader,kono state-er noy…karon rastro omanusher porichalito ekti songstha matro!muktir dabi tulte chai,songe bolte chai itihaas kauke marjona koreni,korbena…

    ar eri songe mone koriye dite chai ami je desh theke likhchi sekhaneo UAPA bole emoni ekti kala kanun ajo bolobot…gonotontro ebong sustho sonajer poriponthi esob aain…

  4. শুদ্ধ,
    আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ। আপনার কথার সুত্রে বলি,
    মনে হয় তথাকিথত গণতন্ত্র নানা গোপনীয়তা, কালা-কানুনের উপর নির্ভরশীল।
    সে তার ভেতরকার ভুল ধরা সহ্য করতে পারে না।
    তবে এই কথাটা মানি… ইতিহাস কাউকে মার্জনা করে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *