জড়তাময় গতি-স্থিতি ও অন্তর্গত নীরবতা— দ্য কোয়ায়েট উইথইন

সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে রাশেদ জামানের নামডাক। ওনার ‘দ্য কোয়ায়েট উইথইন’ ভিজ্যুয়াল আর্টের এক্সিবিশন দেখতে গিয়ে বিষয়টা মাথায় থাকা স্বাভাবিক, প্রদর্শনীতে তাকে উপস্থাপনও করা হয়েছে এ পরিচয়ে। এমন না যে ওই রকম পরিচয় ছাড়া ওনারে ভাবা যায় না। সব মিলিয়ে স্থিরতার সঙ্গে মুভিং ক্যামেরার গতিশীলতার সম্পর্ক, আর ভাবনাগত স্থিতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের জায়গা থেকেও দেখা যায় তার শিল্পকর্ম।

মনে হইতে পারে, রাশেদের ছবির বিষয়বস্তু উন্মুক্ত স্পেস। জলরাশি, ধূ ধূ মাঠ বা খোলা প্রান্তর। আর সেখানে কর্তার আসনে বসে আছে প্রাণ। যদিও দুনিয়া জীবন্ত, প্রাণবান তা আমি অস্বীকার করি না। আর ল্যান্ডস্কেপ তো দেখতে সুন্দর হয়; আবার প্রাণপ্রতিষ্ঠায় কিছুটা মুশকিল বোধহয় থাকে। শুধু দৃশ্য তো নয়, গল্পও লাগে। গল্পটা ছবিতে না থাকলেও সমস্যা নাই, এক ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্যে দৃশ্যমান হয়— সেই অভিজ্ঞতার রসদ হয়ে উঠাই একটা ঘটনা। প্রাণপ্রতিষ্ঠা বলতে যা বোঝাইতে চাইলাম বা অব্যক্তই থাকল, তা নিয়ে তর্কও করা যায়। গুড। তাও ধরি সবকিছু্রই তো গল্প থাকে। সে তুলনায় এটা বোধহয় খানিকটা সহজ।

রাশেদ জামানের ছবিতে বিচ্ছিন্ন মানুষ আসে, যদিও মানুষ ব্যাপারটা বিচ্ছিন্ন নয়। আবার পশু কিন্তু একা নয়, যা আছে পশুর পাল। সবাই কোথাও যাচ্ছে! ঘরে ফিরছে, বা ফেরার অপেক্ষা করছে। একজন মানুষরে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। জলাশয়ে কয়েকটা নৌকা, বাংলার ভাব সাধনায় নৌকা নানান সময়ে মেটাফোর হয়েছে। এবং ছবি প্রসেসিং বা উপস্থাপনে বাড়তি কাজ হিসেবে চলমানতাকে তিনি ধরে রাখছেন।

দুনিয়াকে আমরা গতিশীল অবস্থায় দেখি। যাকে আপতিক, ক্ষণিক, আপেক্ষিক, সাপেক্ষ আকারেও বর্ণনা করি। এর বিপরীতে একটা স্থির বিষয় তো আছে। বাস্তব-অবাস্তব বাদ দিয়ে ধারণাগতভাবে হইলেও এটা কাজ করে। আবার স্থির মানেই নিশ্চল নয়, একটা আকর হয়তো, সব গুণের উপস্থিতি। যেটা হয়তো স্থির কিন্তু গতির সূচনা, মাঝামাঝি বা অন্ত। ভাবা যাইতে পারে একটা মৌন মুহূর্ত।

স্থির ও গতির সম্পর্ক প্রাচীন দুনিয়া থেকে আলোচনার বিষয়বস্তু। কারণ গতি আমরা যেভাবে দেখি, স্থিতি ততটা না। যখন কোনো কিছুরে স্থির বইলা মনেও হয়, সে গতি, পরিবর্তনের মধ্যেই থাকে। প্রাচীন গ্রিকের জেনোর প্যারাডক্সের হিসেবে কোনো গতিশীল অবস্থাকে ভাগ করলে আমরা স্থির কিছু পাই। উল্টো দিকে স্থির কিছুরে যোগ করলে কি গতিশীল কিছু পাওয়া যায়? তেমন তো না। স্থির ও গতির এই ভাগাভাগি উহ্য করে ‘আ কোয়ায়েট উইথইন’। গতিময়তার ছায়া, স্থিতিময়তার ছায়া। স্থিতির মধ্যে গতি থাকে, গতির মধ্যে থাকে স্থিতি।

এ শিল্পকর্মগুলো দৃশ্যকে ছাপিয়ে অন্তর্গত নীরবতা, শ্রান্তি বা প্রশস্তির কথা বলে হয়তো। এ ধারণা থেকে আগায়া গিয়াও  চলমানতা ও স্থিরতার দ্বন্দ্ব আমরা এড়াইতে পারি না। এবং শিল্পকর্মে যাদের আমরা দেখি, মানে যে চলমানতা— এ নীরবতা বা মৌনমূহূর্তের মধ্যেই তাদের বসবাস বা চলাচল। রাজধানীর বেঙ্গল গ্যালারির শহুরে কোলাহলের মধ্যে এই নীরবতা অবলোকন এক ধরনের রোমান্টিসাইজ পরিবেশ তৈরি করে নিশ্চয়— ব্যস্ততা আর নস্টালজিক হওয়ার যে স্বাদ; সেটা বোধকরি এ প্রদর্শনীকে সার্থকতা দেয়। কিন্তু আমাদের বোধহয় গতিজড়তা কাটে না। কিছু শান্তি পাইতে তা তো কাটানো দরকার। মানে আরো পথ যাইতে হবে। রাশেদ জামান সেই মৌনতা নিয়া যান না, তবে তেমন কিছু থাকার ইশারা দেন।

চলমান ও স্থিরতার যে ধাঁধা তার থেকে আমরা পালাতে পারি না; এবং একজন নামি সিনেমাটোগ্রাফারের স্থিরচিত্রে দেখার ভঙ্গি, বলার ভঙ্গি এমনকি ছবি তোলার প্রস্তুতি, ফ্রেম-সময় নির্ধারণ, পরবর্তী সম্পাদনার জায়গাটা আমরা খানিকটা বুঝতে পারি। কোলাহল, আপতিক জীবন থেকে পালাতে গিয়েও আমাদের মুক্তি নেই; বরং মানুষের মৌন হওয়া যে সাধনার বিষয় সেই ইঙ্গিত খানিকটা ‘আ কোয়ায়েট উইথইন’।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *