ক্রমশ। মুনেম ওয়াসিফের দৃশ্যশিল্পের প্রদর্শনী। যখন এ খবরটা পাইলাম, যাইতে হবে এটা যে নিশ্চিত, জানতাম। কিন্তু সময়টা বড়ই বেরহম। যদিও সময়কে গালি দিতে নাই! দীর্ঘ ও যন্ত্রণাময় দাঁতের চিকিৎসার মাঝে একদিন হাজির হইছিলাম বেঙ্গল গ্যালারিতে। গ্যালারি খোলার আগে আগে হাজির হওয়ায় অন্য এক আয়োজনে ভাস্কর নভেরা আহমেদের ওপর পরপর তিনটা ডকুমেন্টারি দেখলাম। সেখানে দুই দশক আগের ও সম্প্রতি নির্মিত ডকু স্থান পাইছে। তো যা দেখলাম। নভেরাকে ভুল যাওয়াজনিত যে ভ্রম তা এখনো বিদ্যমান। নভেরা প্রকল্পে নতুন কোনো অনুসন্ধান জাতি পায় নাই। নভেরাও হয়ে থাকলেন মরিচীক। ক্রমশ প্রসঙ্গে বাড়তি শব্দক্ষয়ের একটা বা অনেক কারণ তো থাকে। কারণ ওই সময় সচল আর্ট বা ভিডিওচিত্রের প্রতি একটা আলাদা মনোযোগ তৈরি হইছিল বটে; পরে স্মৃতি থেকে আরো ভালোভাবে অনুধাবন করলাম।

ক্রমশ নিয়ে আরো মনে হইতেছিল পরে। শুরু থেকে মানে বিজ্ঞাপনে দেয়া একটা ফটো মনের মধ্যে আটকা পড়ছিল। যেটা থেকে পরে আমি আর বাইর হইতে পারি নাই, যদিও এ ধরনের কোনো স্থিরচিত্র দেখছি কিনা প্রদর্শনীতে এখন মনে নাই। এটা খুবই অদ্ভুত একটা ঘটনা।
এ অবস্থা তৈরির পেছনে কয়েকটা কারণ থাকতে পারে। একটা বলি, যেহেতু একইদিনে নভেরা ওপর তিনখানা ডকুমেন্টারি দেখছি (আগেই তো বলেছি)। মুনেম ওয়াসিফের ছবিগুলো নিয়ে একটা সাদা-কালো সিনেমা আছে। খেয়াল। যেখানে স্থির হয়ে থাকা দৃশ্যের আবহ উঠে আসে। নির্বাক; তবে স্বাতন্ত্র্য একটা ফিল্ম। বাস্তব, পরাবাস্তব ও অধিবাস্তব। অথবা বাস্তবতার ওভারল্যাপ।
পুরান ঢাকার গলিতে যখন মাঝরাত নেমে আসছে, আলো-ছায়ার মাঝে একটা ঘোড়া দাঁড়ানো। মাটিতে আধশোয়া একজন মানুষ। তারা দুজন পরষ্পরের দিকে তাকায়া আছে। তাদের মধ্যে যে নিবিড় (বোধকরি ভিন্ন দুই সত্তার বিভেদজনিত বিহ্বলতা) যোগাযোগ, কিছুটা হিংসাও যেন। যা হয়তো কোনো দৃশ্যগ্রাহ্য মাধ্যমের অতীত কোনো ঘটনা। এবং সেটা আত্মার স্তরে, যেখানে যোগাযোগে কোনো ভাষা লাগে না। নাকি পুরান শহরগুলোয় যখন মানুষের সভ্যতা এতটা যান্ত্রিকতায় উৎকট নয়; তারই পুনরুৎপাদন। এটা একটা খণ্ডিত হতে থাকা একটা জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনার জায়গাও। যাই হোক, ক্রমশর পোস্টারে এ ছবিটা আমি দেখি।
ব্যাপারটা এই যে, প্রদর্শনীতে যে চলচ্চিত্রে দেখা যাইতেছিল, ঘোড়াটা মাটির ওপর পা দিয়ে ঠকঠক শব্দ করতেছিল। রাগ নাকি অনুরাগ। আমার মনে হইল এটা একটা চ্যালেঞ্জ। কারণ পুরো ব্যাপারটা স্থিরতার ভেতর ধরা কেমনে সম্ভব। যেখানে দুনিয়া ব্যাখ্যা করা জন্য খোদা তায়ালা দুনিয়ার ঘূর্ণন থামায়া রাখেন না। এই যে ঘটমান একটা জগৎ। যার ভুত ও ভবিষ্যৎ আছে। তাকে মাঝের একটা স্থিরতা দিয়ে কীভাবে ব্যাখ্যা করি। আত্মার সঙ্গে আত্মার যোগাযোগ দিয়ে? জিনিসটা আমারে কেউ বলে নাই; কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা এ দিশা জোগায়। সম্ভবত ক্রমশ সেই ধারাবাহিকতাকে ইঙ্গিত করে এমনটা অনুমান তৈরি করা যায়। যেটা শিল্পের কাজ্ও। দৃশ্যের ধারাবাহিকতা এবং অবশ্যই আত্মার ক্রমবিকাশও।

ছবি স্বত্ব: মুনেম ওয়াসিফ
আমার পক্ষে চলমান দৃশ্য থেকে বাইর হওয়া অনেকটাই অসম্ভব হয়ে উঠে। এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক বারবার দৃশ্যে আসতেছিলেন। তারে দেখা যায় ইঁদারা থেকে পানি তুলে গোসল করতে। এটা দৃশ্যে দেখা যায়, লোকটা বালতি ভর্তি পানি গায়ে ঢালছেন আর গড়িয়ে পড়ছে ফেনাপূর্ণ পানি। দর্শক আর দৃশ্যের ওপারের দুই মানুষই বিস্মিত। তার দেখাদেখি আমরা ইঁদারায় উঁকি দিই। না, কিচ্ছু নাই। স্বচ্ছ জল। স্থির। বালতি ওপরে উঠতে পানির বলে ফেনা নাকি, গায়ে পড়ার পর পানি আর শুদ্ধ পানি থাকছে না। তবে ফেনায়িত জলের উৎস কী? সময়। সময় কি তবে বুদবুদ! তাকে ছাড়িয়েই আমাদের ভাবতে হবে, দেখতে হবে। অস্ফুটভাবে বলে উঠি, ‘মাই গড’। এও ভাবি, স্থিরচিত্রের বোধহয় যাত্রাটা এই; সময়কে বন্দি করা। আসলেই? সে তো ক্রমশ। যে আবার কোথাও না কোথাও স্থির। তাহলে কোথায় পানি গিয়া ফেনায় বদলায়; সে ধরতে পারে!
মুনেম ওয়াসিফের কাজের সঙ্গে এক-আধটু পরিচয় আছে। সেহেতু। তার কাজের বিষয় হিসেবে পুরান ঢাকার হাজির থাকা হঠাৎ কিছু নয়। বরং তিনি যে এই আলো-আধারি, গলি-ঘুপচি হয়ে বেড়ে উঠেন, তার দেখার চোখ তৈরি হয়; তাও বোধহয় টের পাওয়া যায়। পুরান ঢাকা নস্টালজিয়া এবং ইউটোপিয়া উঠার যে প্রবণতা সেখান থেকে চোখ ফেরানোর মতো দৃশ্য আছে; যা আমাদের কল্পনাকে উসকে দেয়। সম্ভবত মুনেম ওয়াসিফের যাপনের কারণে সেটা আরো চোখে লাগে। এবং সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম। সাদা-কালোর ফাঁকে ফাঁকে ঝলমলে কিছু দৃশ্য ধরা পড়ে তার ক্যামেরা বা পরবর্তী পর্বে। যেখানে রঙ দিয়েই আইডেন্টিফাই করতে হচ্ছে, যেখানে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যিক দৃশ্যগুলো রং ছাড়া মানে সাদা-কালোতেও ভীষণ বর্ণিল। মানুষের চোখ-মুখ ফুড়ে বের হয়ে আসছে যুথতার আনন্দ। ইভেন পুরান ঢাকার নৈঃশব্দ্য অন্ধকার কোনগুলোও উজ্জ্বল হয়ে হাজির। হ্যাঁ, এ যে দুনিয়া তো এখন বিশ্বায়নের চূড়ায় পৌঁছে গেছে। বিশ্বায়ন তো একটা কালই। এখন বোধহয় নিচের দিকে নামার মতো ঘটনাও আছে। বিশ্বায়ন তো হারাবে না, কিন্তু সবকিছু একাকার হওয়া বোধহয় আর হবে না। আবার মানুষ তো আর প্রিমেটিভ যুগে ফেরত যাবে না। পুরান ঢাকার বিবর্তন আছে পরবর্তী কিছু ছবিতে। এবং বস্তুগতভাবে তিনি তুলে ধরেছেন ইনস্টেলশনে।
আমি। গড়পরতা বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরেকটু অবনত দর্শক হিসেবে বলা যায়— ওই ছবিটা সবার নজর কেড়েছে নিশ্চয়। এটা বিউটি বোর্ডিং কি? যেখানে একজন (এক লেখায় উনাকে বিমল দা বলা হচ্ছে) গামলা ধুয়ে সাফ করছেন। তাকে ঘিরে আছে কাক, বিড়াল। যেখানে প্রতিটি চরিত্রই এতটাই জীবন্ত যে স্থির কোনো মুহূর্তে তাদের ধরে রাখাকেই যেন চ্যালেঞ্জ জানায়। এ চ্যালেঞ্জটুকু তো দরকারই পড়ে মানুষ বা আর যেকোনো কিছুর। যেমন একটা ইটের দেয়ালও ক্রমশ ক্ষয়ে পড়ে। তার বিনাশও কিন্তু একটা জীবন্ত সত্তার মতো। এই যে আসা-যাওয়া। প্রতিমুহূর্তে রূপান্তরের অনিত্য জগৎ, সে বা তারা বা আমরা বোধহয় এরই ভেতর অস্তিত্বকে নিত্য করে, লীন হয়ে থাকি। ফলত ক্রমশ থাকা আর না থাকার সাক্ষি। যে বরং কোনো কিছু যে আছে তার ভেতরই না-ই হওয়াকে তুলে ধরে। আমি ও আমার ব্যথা। এই যে ব্যথা; যার ওপর ভর করে দেখছিলাম। জগৎ। আর অবশ্য অবশ্যই এ প্রদর্শনী। সেও নিজের না থাকারে ক্রমশ প্রকাশ্য করে অনিত্য থাকার ভেতর। হায় বেদনা! তোমারও বিনাশ আছে।
