বড়দের ‘অসাধারণ’ জগতে ঢুকে যাওয়ার অনেক দিন পর ‘সত্যিকারের অসাধারণ’ জগত ঝিলিক দিয়ে উঠা… কত যে আনন্দময়! যা মূলত ছোটবেলা এবং ছোটবেলার স্মৃতিতেই ঘটে। আমাদের সময়ের অনেকের কাছে সেই সত্যিকালের অসাধারণ জগত হলো তিন গোয়েন্দার সঙ্গে থাকা।
প্রথমবার তিন গোয়েন্দা পড়ছি; এই স্মৃতির সঙ্গে সন্ধ্যা সন্ধ্যা একটা গন্ধ আছে। সম্ভবত আমি সন্ধ্যা বেলায় বইটা পড়তে বসছিলাম। যেহেতু স্কুল থেকে এসে জিরোতে জিরোতে প্রায় সন্ধ্যা। বইটার নাম? খেপা শয়তান। এমনও হতে পারে, গল্পটার শুরু যেভাবে হয়; সেখানে সন্ধ্যাবেলা আছে কোনোভাবে। একটা বাচ্চা মেয়ে কিশোর পাশার কাছে এসে বলে, সন্ধ্যার সময় আমার পুতুলটা জানালা গলে উড়ে গেছে। তুমি আমার পুতুলটা খুঁজে দাও।

তিন গোয়েন্দা ফ্যান গ্রুপ থেকে সংগৃহীত ছবি। ডিজাইন: নির্ঝর নৈঃশব্দ্য
এটা হাইস্কুলের প্রথম দিকের ঘটনা। নব্বই দশকে, ক্লাশ সেভেনে পড়ি তখন। ওই বছর রাশেদ আমাদের সঙ্গে ভর্তি হয়। তিন গোয়েন্দার টিম লিডার কিশোর পাশার চাচার নামও রাশেদ পাশা। যাই হোক, আমার বন্ধু রাশেদের চাচাতো ভাই রাজু কামালের শেলফ ভর্তি ছিল সেবা প্রকাশনীর বই। তিন গোয়েন্দা বেশি ছিল না; যেহেতু তিনি তখন অনেক বেশি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার কথা। তার কাছে থাকা বেশির ভাগ বইয়ের দাম ছিল দেড়-দুই টাকা। তিনি বাঁধাই করে বই সংগ্রহ করতেন।
রাশেদ চাচাতো ভাইয়ের শেলফ থেকে বইপত্র লুকিয়ে স্কুলে নিয়ে আসত। এর মধ্যে মাসুদ রানাই ছিল বেশি। যেহেতু পড়ার বেশি কিছু পাইতাম না; মাসুদ রানাও পড়ে ফেলতাম। তো, একদিন হাতে চলে এল খেপা শয়তান। মঙ্গোলিয়ান একটি মূল্যবান স্বর্ণের মূর্তি চুরি নিয়া যত রহস্য। ওই গল্পের আরেকটা বিষয় মাথায় আটকে আছে এখনো। বক্স ক্যানিয়ন। গল্পের শেষ দিকে ভৌতিক নৃত্য দেখানোর পর ওই রকম বদ্ধ জায়গায় আটকে পড়ে ভিলেন। কিশোর বলছিল, ভুতটা এখানে কোথাও আছে, বক্স ক্যানিয়নে ঢোকার আর বের হওয়ার রাস্তা একটাই। এ ধরনের ভৌগলিক বর্ণনা আমার কাছে প্রথম। এটা তো খুবই সম্ভব যে, তিন গোয়েন্দার পাঠকরা এমন নতুন নতুন বিষয় জানতে পারত, যা সিরিজটার প্রতি আকর্ষণ আরো বাড়িয়ে দিতো।
খেপা শয়তান পড়ার পর যা হওয়ার তাই হলো। আমাদের মধ্যে তিন গোয়েন্দা নিয়ে আগ্রহ বেড়ে গেল। সমস্যা হলো, রাজু ভাইয়ের সংগ্রহে এ সিরিজের বই আর ছিল না। আর আমরা থাকি চট্টগ্রাম শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে। যেখানে মানুষ হুমায়ূন আহমেদ বা ইমদাদুল হক মিলনের নাটক দেখে। কিন্তু বই পড়ে মূলত কাশেম বিন আবু বকরের। আরো পরে আবদুস সালাম মিতুলর। কারো কারো কাছে দস্যু বনহুর থাকলেও তা বেশ সেকেলেই লাগত। তখন এক-আধটু ব্যান্ডের গানও শোনা হয়।
ওই বছর, মানে ক্লাস সেভেন শেষ হওয়ার কথা আউটার স্টেডিয়ামের বিজয় মেলায় গেছিলাম, যেটা ডিসেম্বর মাসে হয়। আমার গৃহশিক্ষকের সঙ্গে। তখন কিনছিলাম কালো হাত। তিন গোয়েন্দার লেটেস্ট বই। একটা ক্রুজশিপে ভ্রমণ নিয়ে। ইউরোপের দারুণ সব জায়গায় তারা ঘুরতে যায়, আর চোখ খোঁজে। তো সেই বই কেনার পর আমরা ঢাকায় বেড়াতে আসছিলাম। মনে আছে, বইটা অনেক অনেকবার পড়ছি। আর ভাবতাম প্রতিবার পড়ার পর যদি গল্পটা ভুলে যাওয়া যাইতো। তাহলে গল্প আবার নতুন হয়ে উঠত। এটার মধ্যে অজানারে জানার একটা কৌতুহল দেখা যায়। আর গল্প? জীবনে মানুষের যা যা ভুলে যাওয়ার কথা, তা তো সব সময় হয় না।
ওই সময় আমার সঙ্গে পরিচয় হয় টিপুর। ঢাকায়। আমার সমবয়সী। আপার ননদের ছেলে। ওর কাছে পায় অনেকগুলো বইয়ের হদিস। তখন বই ভাড়ার চলও ছিল। অনেক বছর পর যখন ঢাকায় পড়াশোনার উদ্দেশে আসি; এই রকম একটা দোকানে আমার কেনা একটা বই একজন পড়তে নিয়ে বিক্রি করে দিছিল। অভাবের কারণে। এটা অবশ্য অনেক পরে জানছিলাম; ততদিনে ও আমাকে আরেকটা কিনে দিছিলো। যে গল্পটা আমার কাছে যন্ত্রণা হয়ে বিধে আছে। কারণ, আমি বারবার বইটা ফেরত চাইতেছিলাম।
এসব আউট বই পড়া বাবা পছন্দ করতেন না। কিন্তু উনার সঙ্গে যখন শহরে যাইতাম এক-দুইটা তিন গোয়েন্দা কিনে দিতে বাধ্য হইতেন। কারণ ছেলেকে নিয়ে ঘুরতে আসছেন তাই রাগ দেখানোর সুযোগ নাই; যা চাইতাম কিনে দিতেন। বাসায় এসে কিন্তু কিছু কথা শোনা লাগতই। এর মধ্যে একটা বইয়ের নাম মনে পড়ছে ‘ধূসর মেরু’। আইসল্যান্ডে বেড়াতে যায় তিন গোয়েন্দা। আরেকবার দুলাভাই তিন গোয়েন্দা কিনে দিছিলেন। ঘটনা হইলো, খালাম্মার বাসায় গেছিলাম বোধহয় আমরা। কাছেই কমলাপুর রেলস্টেশন। উনি রেলস্টেশন দেখাইতে নিয়া গেলেন। সেখানে সবচেয়ে মজা পাইছি বুকস্টল দেখে। স্তরে স্তরে সাজানো বই। বইটার নাম কী যেন বানর! (বানরের থাবা) ব্রাজিলের গল্প, সঙ্গে পিরানহাভর্তি সুইমিং পুল নিয়ে একটা বিষয়াদি ছিল।
এ সময় মাসুদ রানা, কুয়াশা বা গোয়েন্দা রাজু; এসব বই পড়লেও আমাদের নায়ক হয়ে উঠছিলেন রকিব হাসান। ততদিনে আমাদের এলাকার হকারকে তাগাদা দিয়ে সেবা প্রকাশনীর ‘কিশোর পত্রিকা’ নিয়মিত আনাইতাম। আর ইত্তেফাকে সিনেমার বিজ্ঞাপনের ফাঁকে ফাঁকে দেখা হইতে সেবা প্রকাশনীর নতুন বইয়ের খবর। তবে আমার মূল আকর্ষণ কিছু কিশোর-মুসা-রবিন। কিশোর পত্রিকায় প্রকাশ হইতো ‘আমার কৈশোর’ নামে রকিব হাসানের ছেলেবেলার কাহিনি। ফেনীতে থাকতেন উনারা। সেখানে কী কী ঘটত তা সরসভাবে ফুটিয়ে তুলছিলেন। ওই বইয়ের আরেকটা দিক হলো সূক্ষ্নতা; মানে ব্যক্তি রকিব হাসানরে পাওয়া যায়। তার রুচিগত দিক উঠে আসছে। মনে আছে, ওই ধারাবাহিক লেখায় আরবী ভাষা নিয়ে কী একটা মন্তব্যে বিরক্ত হইছিলাম। সেই হাইস্কুলে থাকতে। তখন রাশেদ বলতেছিল, আরবীতে কি পর্নোগ্রাফি নাই? আরবী মানেই এত ভক্তির কিছু নাই? আমার বোধবুদ্ধি কখনো এতটা শার্প ছিল না। তবে ধর্ম বিষয়ে একটা অজ্ঞেয় অবস্থান রকিব হাসানের মাঝে আছে। যেটা পরে তার ইন্টারভিউ সূত্রে মনে হইছিল। এমনকি তার বইয়ের চরিত্রগুলোর মতো জীবনকে এতটা রোমাঞ্চকরভাবে দেখেন না।
এখন কমন ব্যাপারটা হলো; তিন গোয়েন্দা পড়ে কে গোয়েন্দা হইতে চায় নাই! আমাদের মধ্যেও তেমন কিছু বিষয় ছিল আরকী! আমি-রাশেদ; সঙ্গে ইসমাইলও ছিল বোধহয় যে কিনা কুয়াশা বলতো। পরে ক্লাস নাইনে থাকতে যোগ হয় আরিফ। যেহেতু আমরা চট্টগ্রামের এমন এক এলাকায় ছিলাম যেখানে পাহাড় আর সাগর দুই-ই আছে; ফলে রহস্য যে নাই এমন না। আমরা বোধহয় পাহাড়ে কোনো ধরনের রহস্যময় আলোও আবিষ্কার করে ফেলছিলাম। ও হ্যাঁ, ততদিন কিন্তু মার্ক টোয়েনের টম সয়্যার সিরিজের দু-একটা অনুবাদ পড়ে ফেলছি। যারা আঙুল কেটে ডাকাত হওয়ার শপথ করে। তবে বিষয়গুলো অনুসন্ধান পর্যন্ত আগায় নাই আর। ভাবতেই ভালো লাগতেছিল আরকি। আমরা গোয়েন্দা। গোয়েন্দাগিরি ছাড়াই সুন্দর সময়গুলো কেটে গেল আমাদের!
রকিব হাসান; এমনকি সেবা প্রকাশনীর লেখকদের একটা অদ্ভূত সংযম ছিল। অনেকটা নাকউচুঁ সেলিব্রিটিদের মতো। তাদের বই হাজার হাজার কপি বিক্রি হচ্ছে মাসে। কিশোর পত্রিকা, রহস্য পত্রিকা বা বইয়ের পেছনের আলোচনা বিভাগে তাদের প্রতি পাঠকের মুগ্ধতা, ভালোবাসা, টান, মান-অভিমানের শেষ নেই। কিন্তু তারা সত্যি সত্যিই দূর আকাশের তারা। এখনো সম্ভবত রকিব হাসানের সাক্ষাৎকার বলতে হাতেগোনা দু-একটা। সেখানে জীবনের প্রতি কী নিরাসক্ত কথাবার্তা। যেন মেদহীন ঝরঝরে লেখার মতো জীবন। বাহ্যত তাই! আমাদের ভয়ানক জটিলতাগুলো শান্ত চেহারার ভেতরেই তো থাকে, মানুষ ততটা টের পায় বা টের পাইতে দেয়।
এখন যে কথাটা বলব সেটা হয়তো সেবার আর আর বই সম্পর্কেও খাটে। পাঠককে একটা ঝকঝকে ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতার দিকে নিয়ে যাওয়া। সেখানে যখন বড় শহর ব্যাপারটা বলে বা একটা পার্বত্য অঞ্চলের বর্ণনা থাকে, ইউ ফিল ইট, সি ইট। এটা বোধহয় বাংলা ফিকশনে বেশ মিসিং। এমনকি অন্যদের অনুবাদে একটা ম্যাড়ম্যাড়ে ভিজ্যুয়াল দেখি।

তিন গোয়েন্দা নিয়ে এই মুগ্ধতার মাঝে আমাদের স্কুলবেলা শেষ হয়। যেখানে মহাসাগরের তলে অভিযান থেকে অ্যামাজন জঙ্গলে দানবীয় সাপ ধরতে যাওয়া কী না আমরা করছি। মানে আমরাই কিশোর-মুসা-রবিন। অথবা ট্রেজার আইল্যান্ডের (সেবার জন্য এ বইটাও অনুবাদ করছিলেন রকিব হাসান) মতো জলদস্যুর পরিত্যক্ত জাহাজে স্বর্ণ কুড়ানো। এরপর যখন কলেজে উঠি তখন সেবার ওয়েস্টার্ন বা ক্লাসিকগুলোই বেশি টানত। রকিব হাসানও তিন গোয়েন্দা লেখা বাদ দিলেন। তার আগেই বোধহয় সিরিজে ভুত-প্রেত ঢুকে যায়; এগুলোর কিছু অন্য কারো লেখা বলেও শুনেছি। কারণ সেবার সঙ্গে রকিব হাসানের গণ্ডগোল চলছিল। তবে ভলিউমের কল্যাণে আমার কালেকশনে রকিব হাসানের লেখা তিন গোয়েন্দার প্রায় সব বই-ই ছিল; এখনো তার অনেকগুলো থাকার কথা।
কয়েক বছর আগে সার্জারি পরবর্তী নিদ্রাহীন সময়ে বাসায় খুঁজে-পেতে তিন গোয়েন্দার একটা ভলিউম পাইছিলাম। কত বছর পর! আরে হলিউডের নায়িকার অদ্ভুত জীবনযাপন, প্রেতসাধনার সেই গল্প পড়ে তো মজা পাচ্ছি! অদ্ভুতভাবে এত বছর পরও দেখি গল্পের কিছু মোড় মনে আছে। আহা! জীবনে যদি এমন অনেক বিষয় যদি তাজা থেকে যেতো। এরপর অবশ্য আর পড়ার চেষ্টা করি নাই।
কিছুদিন আগে শুনলাম রকিব হাসান খুবই অসুস্থ। এছাড়া ফেসবুক গ্রুপে তিন গোয়েন্দা নিয়ে অনেকের নস্টালজিক আলাপ চোখে পড়ে। আচ্ছা, লেখার ইতি টানা যাক। তিন গোয়েন্দা তো অ্যাডাপ্টেশনই। এর বাইরে রকিব হাসান চমৎকার কিছু ক্লাসিক বই অনুবাদ করছেন। প্রাপ্তবয়স্কদের আলিফ লায়লা অবশ্য পড়ি নাই কখনো। তিমির প্রেম বলে একটা বই আছে; দারুণ। তার অনূদিত অসাধারণ একটা বই ফ্রেড জিপসনের ‘শিকারী পুরুষ’। কৈশোরের স্বপ্নতাড়িত জীবন আর বড়দের জগতে প্রবেশের ঘটনাগুলো কী চমৎকারভাবে বাংলায় উঠে আসছে। সঙ্গে বন্য এক পরিবেশ। রকিব হাসানের বইগুলোর মধ্যে এটা যে কতবার পড়ছি! কী এক বিস্ময় নিয়ে বইটা পড়তে শুরু করি। বড়দিনে পানি এত ঠাণ্ডা থাকে কেন? বড়দিনে পানি ঠাণ্ডা থাকবে; এটা আমার অজানা না। কিন্তু জানা বিষয়টা আমি যতবার পড়ছি; অদ্ভুত লাগত। আর এখন ভাবছি একদম গোলার্ধের উল্টো দিকে অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ড… সেখানকার কিশোরদের কাছেও কী লাইনটা বিস্ময়কর? যদি হয়, নিশ্চয় আমার মতো করে নয়।



