নড়াইলে

একবছর পর যখন নড়াইলে পা রাখলাম, তখনও সন্ধ্যা। আগেরবার যশোরের মনিহার সিনেমা হলের কাছের বাসস্ট্যান্ড থেকে গাড়িতে চড়েছিলাম ৪ জন। এবার মাগুরা হয়ে এলাম ২ জন। মাঝে বাস পাল্টানো লাগছে। নদী পার হতে হবে শুনে ভেবেছিলাম চিত্রা নদী। সে রকম কিছু হল না। পথে একটা নদীর ঘাট ছিল যদিও। আমরা গঙ্গারামপুর থেকে দ্বিতীয় বাসে চড়লাম। সন্ধ্যা নামিয়ে যখন নামলাম বুঝতে পারলাম দিক বিভ্রম হচ্ছে। আকাশ ভর্তি মেঘ— তাই সেদিন তারাও উঠে নাই।

চিত্রা নদীর পাড়ে বিখ্যাত বাধাই ঘাট। শুধু বসে থাকা আর নদীর দিকে তাকায়া থাকা।

চিত্রা নদীর পাড়ে বিখ্যাত বাধাই ঘাট। শুধু বসে থাকা আর নদীর দিকে তাকায়া থাকা।

প্রথম কাজ ছিল নড়াইলের মূল শহর যা রূপগঞ্জ নামে পরিচিত, ওখানে গিয়া হোটেল ঠিক করা।

দিক-বেদিক অবস্থায় রূপগঞ্জের ত্রিমোহনী না চৌমুহনীতে এনে রিকশা নামায়া দিল। কিছুই চিনতেছি না অবস্থায় সামনে থাকা কুঁচো চিংড়ির বড়া খাইতে শুরু করলাম। আমি তিনটে, দারাশিকো ভাই দুটো। দোকানী আরেকজনের কাছে বলতেছিলেন, তিনিই প্রথম এ বড়ার ব্যবসা শুরু করছেন। তার দেখাদেখি এখন অন্যরা করছে। এ জিনিস আগে দেখছি কিনা মনে পড়ছে না। এক্সক্লুসিভ হইলেও হতে পারে।

তার মতো আরেকজন বড়াওলা দেখছি একটা জুতোর দোকানের সামনে। ওই দোকানির সাথের একজনকে জিজ্ঞাসা করছিলাম সম্রাট হোটেল কোনটা? তিনি বলতে পারেন নাই। জানালেন, এ এলাকায় নতুন। অন্য বড়াওলা অন্য এলাকা থেকে আসছেন এমন ইঙ্গিত মনে হয় প্রথমজনের কাছ থেকে পাইছিলাম। নাকি ভুল হচ্ছে!

বড়া খাইতে খাইতে জানলাম, এ চিংড়ির কেজি ৩০০ টাকা। খাওয়া দিয়া তো অন্য চাহিদা আড়াল করা যায় না— এমন অবস্থায় হোটেলের খোঁজ করতে করতে একটা গলি পরিচিত মনে করে ঢুকে পড়লাম।

কিছুই চিনতেছি না অবস্থায় সামনে থাকা কুঁচো চিংড়ির বড়া খাইতে শুরু করলাম। আমি তিনটে, দারাশিকো ভাই দুটো। দোকানী আরেকজনের কাছে বলতেছিলেন, তিনিই প্রথম এ বড়ার ব্যবসা শুরু করছেন। তার দেখাদেখি এখন অন্যরা করছে। এ জিনিস আগে দেখছি কিনা মনে পড়ছে না। এক্সক্লুসিভ হইলেও হতে পারে।

কিছুই চিনতেছি না অবস্থায় সামনে থাকা কুঁচো চিংড়ির বড়া খাইতে শুরু করলাম। আমি তিনটে, দারাশিকো ভাই দুটো। দোকানী আরেকজনের কাছে বলতেছিলেন, তিনিই প্রথম এ বড়ার ব্যবসা শুরু করছেন। তার দেখাদেখি এখন অন্যরা করছে। এ জিনিস আগে দেখছি কিনা মনে পড়ছে না। এক্সক্লুসিভ হইলেও হতে পারে।

এখানে এক দোকানী প্রথমবার সম্রাট হোটেলের খোঁজ দিয়েছিলেন। রাত আটটা মতন হবে। অথচ ওই গলির সব দোকানই বন্ধ। মনে হচ্ছিল পোড়ো খনি শহর। হাঁটতে হাঁটতে সম্রাটের দেখা না পায়া আরেকটা গলিতে ঢুকলাম। এরপর পরিচিত সিড়ি বেয়ে নেমে বললাম, ‘এটা হল চিত্রা নদী।’ আমাদের সংক্ষিপ্ত ভ্রমণে এ নদীর পারের দুটো জায়গায় যাবো।

আগেরবার যখন আসছিলাম— তখন দুর্গা পূজার সময়। কী জমজমাট ছিল নড়াইল শহর। যদিও রাত সাড়ে ১০টা বাজায় খাবারের জন্য অনেকদূর যাইতে হইছিল। সেবার নদীর ওপার থেকে উচুঁ ভলিউমে গান শুনছিলাম। এবারও তাই। তবে সে আলোকচ্ছটা বা রোশনাই নাই। আগিলা বছর পুজা মণ্ডপগুলা দেখতে দেখতে এ ঘাটে এসে পড়ি— দেখি ওপারেও পুজোর মচ্ছব।

পরদিন কালি পুজা।

পরদিন কালি পুজা।

এর কয়েক ঘণ্টা পর যখন আমরা খেতে বের হবো তখন বাজারে বেশ বড় বড় মাছ দেখতে পাবো। আমাদের দুইজনের এ টিমে দারাশিকো ভাই প্রধানত মাংসাশী। তবে মাছের প্রতি উনার অশেষ আগ্রহ। জানা গেল খুলনা থেকে আসছে বড় মাছগুলো। কারণ পরদিন কালি পুজা। যে ব্যাপারটা ছিল— দুর্গা পুজার উল্টো কালি পুজোই— তেমন কোনো আয়োজন চোখে পড়ল না। যদিও পরেরদিন কুমোরের বাড়িতে অনেক প্রতিমা দেখেছিলাম। দুর্গা, লক্ষী ও কালি পুজা কাছাকাছি হওয়ায় কুমোরের বাড়িতে একটা মচ্ছব এ সময় লেগেই থাকে। কুমোরের বললেন তারা চতুর্দশীতে পুজো করে ফেলছেন। সেদিন অন্যদের পুজো।

তো আমরা অন্ধকার সিড়িতে দাঁড়িয়ে গল্প করতে করতে দেখি ঘাটে আরো মানুষজন আসছে। তারা ওইপারে যাবেন। নৌকার আসার শব্দ পাওয়া গেল। অপেক্ষামান যাত্রীদের একজনের কথা শুনে মাতাল মনে হলো। যদিও তার কোনো যৌক্তিক কারণ ছিল না। সিনেমায় মাতালরা এভাবে কথা বলে— তাই বলা।

এবার হাঁটতে হাঁটতে বড় রাস্তা পেয়ে গেলাম। অবচেতনে হইলেও রাস্তা চিনা ফিরা আসছি। বুঝতে পারলাম— গতবার নড়াইলে যে পাশে বাস থেকে নামছিলাম, এইবার তার একদম উল্টোদিকে নামছিলাম।

সামনে দ্বিতীয় চিংড়ি বড়ার দোকান। হোটেলের খোঁজ করতে পাশের জুতোর দোকানের এক তরুণ বললেন, সামনে আছে আয়োজন কমিউনিটি সেন্টার অ্যান্ড গেস্ট হাউস। সেখানে যাইতে যাইতে বিদ্যুত চলে গেল। বিল্ডিং এর দোতলায় উঠে পোলাওয়ের মৌ মৌ গন্ধ পাইলাম। আমাদের দুই বেডের একটা রুম দেখানো হলো, নিচে আরেকটা তোষকের উপ্রে কেউ ছিল আগের রাতে। তাদের জিনিসপত্র রাখা এখনো ওই ঘরে, তারা চেক আউট করেন নাই। রাত্রে আসতে পারেন, নাও পারেন। ভাড়া ১২০০ টাকা। বেশি টাকা ও অন্যান্য অসুবিধার কারণে থাকব না বলে চলে এলাম। তারাও গরীবি হালত দেখে পরামর্শ দিলেন কম ভাড়ায় থাকা যাবে সম্রাট হোটেলে।

আমার পণ ছিল আগেরবার যে হোটেলে থাকছিলাম সেখানে এবার না। পড়বি তো পড় মালির ঘাড়ে। হোটেল নীল তিমিতে উঠার সিড়ির মুখে বুঝলাম একবছর আগে এই হোটেলে ছিলাম। এমনকি আমাদের দেখানো হলো একবছরে পরিবর্তন না হওয়া আগের রুমটাতেই। বিতিকিচ্ছিরি গন্ধের কারণে ৬০০ টাকার রুমটা ছাইড়া আসলাম।

এখন একমাত্র ভরসা সম্রাট হোটেল। বাজারের ভেতর হাঁটতে হাঁটতে আর তার আগে কলা খাইয়া চলতে চলতে স্যান্ডেল ভিজে গেল। শাক-সবজি, মাছের মচ্ছব পার হয়ে সম্রাট হোটেলের নিচে মধ্যবয়সী একজন বসে ছিলেন, যিনি এ হোটেলের মালিক। তার গলা শুনেও মাতাল মনে হলো। সিনেমায় এমনও দেখা যায়। থাকতে চাই শুনে পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন। সাংবাদিক শুনে ভাবলেন, নিউজ করতে আসছি। জানালাম, তেমন কোনো ইচ্ছে নাই, আমরা পর্যটক-ঘুরতে আসছি। তিনি অবাকই হলেন। যেন নড়াইলের লগে ঘোরাঘুরি-দেখাদেখির সম্পর্ক নাই। লোকের এমন অবাক হওয়া যে কত জায়গায় দেখছি। ইয়াত্তা নাই।

প্রথমে দুই বেডের যে রুম দেখাইলো তাতে মাঝখানে ছোট্ট জায়গা। টিভি নাই, বাথরুমও নাই।

ওই সব সুবিধার কথা জিগেশ করতে চিলেকোটায় ঠাঁই হলো। যার দুইপাশে দুইটা বড় জানালা। একটা বারান্দা, অন্য পাশে বিশাল ছাদ। বাথরুম পছন্দ হয় নাই। আর পাশের মন্দির থেকে আসছিল বাজনার শব্দ।

আগের রাতে মাগুরার মন্ডল ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে ঘুমানোর আগে একটা খুনের গল্পের প্লট বলছিল দারাশিকো ভাই। তারে বললাম, খাটের নিচে চেক করেন লাশ-টাশ আছে কিনা। উনি বললেন, কিছু নাই। তবে আয়না দেখা যাচ্ছে। বললাম, আয়না হলে উল্টায়া রাখেন, নইলে কিছু বাইর হয়ে আসতে পারে।

টিভিতে চলতেছিল তনু ওয়েডস মনুর ওই সিনটা। যেখানে তনুকে বিয়ে করার জন্য দেখতে আসছে মনু। কথা শেষে দেখে তনু অজ্ঞান হয়ে বিছানায় ঢলে পড়ছে। এ সুযোগে তনুর ছবি মোবাইলে তুলে নেয় মনু। আশপাশে তাকায়া একটা চুমুও দিয়া দেয় ঠোঁটে। কয়েক সিন পর মনুর বিভ্রান্তকর অবস্থা হয়। সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে তনু জানায়, তার প্রেমিক আছে। ব্লাউজ নামায়া প্রেমিকের নাম নাকি কী যেন দেখায়! পরে খানিকটা ল্যাপটপ, বাগি, আরো কি যেন একটা ছবি ও বাংলাদেশি টিভিতে বিজ্ঞাপনের ফাঁকে ফাঁকে নাটক, খবর দেখছিলাম। আমরা অবাক হয়েছিলাম— জ্যাক শ্রফ একজন ভারতীয় মানুষ, তার ছেলে কিনা চাইনিজ।

খানিকক্ষণ শুয়ে-বসে কাটানোর পর নিচে নেমে নাম এন্ট্রি করলাম। জিগেশ করলাম আশপাশে ভালো হোটেল কোনটা? মালিক বললেন, ‌‘ভালো কিনা বলতে পারব না। দুই গলি পর একটা হোটেল আছে। নইলে সোনারগাঁও হোটেলে খেতে পারেন।’

আমাদের দুইজনের এ টিমে দারাশিকো ভাই প্রধানত মাংসাশী। তবে মাছের প্রতি উনার অশেষ আগ্রহ। জানা গেল খুলনা থেকে আসছে বড় মাছগুলো। কারণ পরদিন কালি পুজা।

আমাদের দুইজনের এ টিমে দারাশিকো ভাই প্রধানত মাংসাশী। তবে মাছের প্রতি উনার অশেষ আগ্রহ। জানা গেল খুলনা থেকে আসছে বড় মাছগুলো। কারণ পরদিন কালি পুজা।

আমরা খাবারের খোঁজে বের হলাম। গলির মুখেরটা পছন্দ হয় নাই। যাচ্ছি সোনারগাঁওয়ে। আগেরবার বেশ কয়টা খাবারের দোকানে যাওয়া হইছিল। তার মধ্যে সম্ভবত একমাত্র মুসলমান মালিকাধীন ও সবচেয়ে বড় হোটেল এটা। এর মালিকের সঙ্গে আবার এক মন্ত্রীর ছবিও দেওয়াল ঝুলানো আছে। এবার খেতে গিয়া দেখি আমরা ছাড়া খরিদ্দার নাই। দশটা বাজে নাই, এখানে তখন নিশুতি রাত। ফেরার পথে বড় বড় অনেকগুলা ট্রাঙ্ক দেখে উল্টায়া দেখলাম— ভেতরে মানুষ আছে কিনা! পরদিন এমন ট্রাঙ্ক দেখবে এসএম সুলতানের বাড়িতে। আলোকসজ্জিত একটা মণ্ডপ দেখলাম কিন্তু প্রতিমা ছিল না!

এবার আমরা অন্য গলি দিয়া যাবে ঠিক করলাম। তখন সুন্দর একটা মসজিদ দেখে নামাজ পড়তে ঢুকলাম। তবে মূল মসজিদের দরোজা লাগানো থাকায় ওয়াকওয়েতে পড়তে হল। সামনে লাগানো ছিল একটা লিস্টি। কতজন নবী আসছেন দুনিয়ায়। আমরা মোবাইলে সে ছবি তুলে নিলাম। নামাজ শেষে আমরা আরেকটা গলি ধরে হাঁটতে থাকে। একসময় মিষ্টির দোকানগুলোর সামনে দাঁড়ায়া উইন্ডো শপিং থুক্কু উইন্ডো ইটিং করলাম। এরপর খানিকক্ষণ রাস্তা হারায়া চড়কির মতো ঘুরে ফিরতে পারলাম সম্রাট হোটেলের ২৩০ টাকা দামের রুমে।

: সম্রাট বাদে বাকি দুই হোটেলের অস্তিত্ব থাকলেও এ লেখায় নাম কাল্পনিক।

Comments

comments

Related Post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *