এই লঘু হাওয়ার ফাগুন

‘ফাগুন হাওয়ায়’ ছবিতে নুসরাত ইমরোজ তিশা ও যশরাজ শর্মা (বামে)

ফাগুন হাওয়ায়’ না দেখেও আমরা হাততালি দিতে পারি। যেহেতু ভাষা আন্দোলনকে এতকাল সিনেপর্দায় না দেখেই থাকতে হয়েছে। সেই পঞ্চাশ বছর আগে জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’য় প্রভাত ফেরি দেখি আমরা। শুনি ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটিও। তারপর বোধহয় এ প্রসঙ্গ সিনেমায় আর আসে নাই। আসলেও মশহুর কিছু হয় নাই- হয়তো!

ফলত বিষয়বস্তুর কারণেই ‘ফাগুন হাওয়ায়’ প্রশংসিত উদ্যোগ। তার উপর নির্মাণ করেছেন তৌকীর আহমেদ। যিনি বেশ প্রশংসিত নির্মাতা, এর আগে জিতেছেন দেশি-বিদেশি পুরস্কারও। আরও বিস্ময়ের ব্যাপার টিটো রহমানের নাতিদীর্ঘ গল্প ‘বউ কথা কও’কে কীভাবে বড়পর্দা উপযোগী করলেন- সেটা ভেবে।

গল্পটি পড়েছিলাম বাংলা ভাষার সর্ববৃহৎ ব্লগ ও মত প্রকাশের সবচেয়ে বড় প্লাটফর্ম সামহোয়ারইন ব্লগে। পরিহাস! সিনেমাটি মুক্তির কয়েকদিনের মাথায় সরকারি নির্দেশে ব্লগটি বাংলাদেশে ব্লক করা হয়। আজ অবধি খোলেনি। এ নিয়ে ঢাকার মুক্তবুদ্ধি-শিল্প-সংস্কৃতিতে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। এমন আবহাওয়ায় থাকুক ‘ফাগুন হাওয়ায়’ নিয়ে কয়েক নোকতা।

এক.

‘ফাগুন হাওয়ায়’ নামটি বেশ কাব্যিক। ফাল্গুনকে ভেঙে এই ফাগুন। রোমান্টিক-স্বপ্নালু। আর তখন ফাল্গুন মাস। লঘু হাওয়ার দিন। ফুল-পাখি-পাতা-নদী-হাওয়ার নাচন দিকে দিকে। এমন দিনে ‘ফাগুন হাওয়ায়’ এসে লঘু শিল্পের ভার বহন করে আমাদের হৃদয়। লঘু এই অর্থে হতে পারে এ সিনেমার বয়ান ও দৃশ্যায়ন খুবই প্রথাগত-ক্লিশে। সর্বোপরি সিনেপর্দায় (রাজধানী থেকে দূরে) ভাষা আন্দোলন দেখা ছাড়া আপনার অভিজ্ঞতায় নতুন কিছু যোগ করবে না। হ্যাঁ, অভিজ্ঞতায় নতুন কিছু যোগ না করলে আমরা সবসময় লঘু আকারে দেখবো এমন নয়। অন্তত, এখানে তেমনটা ঘটেনি।

সারা সিনেমা জুড়ে সাবটাইটেলের ছড়াছড়ি। বাংলা থেকে ইংরেজি, ইংরেজি-উর্দু থেকে বাংলা। কিন্তু ছবির শুরুতে মুখবন্ধ রয়ে গেল শুধু ইংরেজিতে। সেখানে আমরা জানতে পারি- ধর্মের ভিত্তিতে ব্রিটিশ ভারত ভাগ হলো। আর বাংলাদেশ পাকিস্তানের অংশ হয়ে গেল। খুবই সরল বয়ান। প্রথমে হয়তো ভুল লক্ষ্য নির্দেশ করবে। ধর্মকে জাতিবাদীরা এখন খুব খুব সামনে নিয়ে আসলেও হিসেব-নিকেশ ছিল অর্থনীতি তথা জমিদারি প্রথা বিলোপকেন্দ্রিক। এবং সেই ভাগাভাগির জন্য দায়ী করার খেলায়ও ভুল বোঝাবুঝি থাকে প্রায়শ। আর এ ভাগাভাগির বিকল্প হতে পারতো কোনটি- আমাদের শিল্প-সাহিত্য বলি বলি করেও যেন বলে না। আর এই ফাঁকে আমরা বাংলাদেশ নামের আস্ত একটা রাষ্ট্র পেয়ে গেলাম।

সেই হিসেব মতো হিন্দু আর মুসলমান এই ভাগাভাগিতে এগিয়েছে পুরো সিনেমা। আবার মুসলমান হিসেবে পাকিস্তানিরা উঁচু, বাঙালিরা নিচু- এ ভাষ্যও পাবেন। ভাগাভাগি এত প্রকট যে ‘জাত-ধর্মহীন বাউল’ও বলছে, ওপারে যাচ্ছি- যেখানে সবাই যায়। ওপার মানে ভারত আর ভারত মানেই যেন স্বর্গ। এটা কি পঞ্চশ দশকের দৃষ্টিভঙ্গি নাকি এ সময়ের বয়ান? কিন্তু একজন ‘অ্যান্টিক’ বাউলকে কেন এই কথা বলতে হচ্ছে! এই দোলাচাল পুরো সিনেমা জুড়েই পাবো। আমরা একেও পরিহাস হিসেবে গ্রহণ করতে পারি। ভালোবেসে। লঘুত্বে।

চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক কীভাবে বলেন, বাংলাদেশ পাকিস্তানের অংশ হলো। তার মানে কি তিনি অস্বীকার করছেন ‘বাংলাদেশ’ আরও ২৪ বছর পর পয়দা হবে এমন একটা অঞ্চলের লোকেরা পাকিস্তানের জন্য আন্দোলন করেননি বা পাকিস্তান চান নাই। আমরা তো শুনেছি পূর্ব বঙ্গের নিপীড়িত মানুষ সেই রাষ্ট্রের জন্য কীভাবে লড়েছেন। তৌকীরের বয়ান ধরলে- বাংলাদেশ বলে ‘ধারণা’ আগে থেকে ছিল, যেটা আদতে রাজনৈতিকভাবে পাকিস্তান থেকে আলাদা ব্যাপার। কোথায়? কবে? এবং পাকিস্তান কেন আমাদের অংশ নয়? হয়তো ‘আবহমান বাংলা’র ধারণাকে প্রতিস্থাপন করেছেন রাষ্ট্রে, তো এখন সেই ‘আবহমান বাংলা’ কোন ভূগোলে।

দুই.

প্রধান দুই চরিত্রে সিয়াম আহমেদ ও নুসরাত ইমরোজ তিশা

এ ভঙ্গুর বয়ান নিয়ে শুরু সিনেমার পরতে পরতে দেখি বাধা-ধরা ফর্দ মেনে যেখানে যা যা লাগবে সে ধরনের আয়োজন। যেমন; টিটো রহমানের গল্পের মূল চরিত্র কে? পাঞ্জাবি পুলিশ (যশপাল শর্মা), তিনি হাজির। (গল্পে না থাকা সত্ত্বেও সিনেমায়) যেহেতু নায়ক-নায়িকা দরকার, দীপ্তি-নাসির (তিশা ও সিয়াম) হাজির। তারা আবার হিন্দু-মুসলমান। মানে ভারত-পাকিস্তান বিভাগ কি! এবং বাঙালিত্বের সাথে হিন্দুত্বের অনিবার্য সম্পর্ক। (পুরো সিনেমায় হিন্দুয়ানি জাত-পাত অনুপস্থিত) আর লাগবে বাঙালিয়ানার প্রতি বিতৃষ্ণা। সেই অনুসারে জাত দুটো বাঙালি (প্রায় হিন্দু) ও পাকিস্তানি (সাচ্চা মুসলমান)। অবশ্য বাঙালিরা নিজেদের সাচ্চা মুসলমান মনে করে কিনা সেই হদিস এখানে নাই। এক বোরকা পরা নারী ছাড়া। আরও দেখি হিন্দুরা পাকিস্তান থেকে ভারতে চলে যাচ্ছে। তবে ভারত থেকে কেউ পাকিস্তানে আসে কিনা জানা যায় না।

এহেন গল্পের শুরুর দশায় লঞ্চে ভদ্রলোক ক্লাশে একজন বাউল দরকার। সাথে আরেকটা চরিত্র বউ কথা কও (এটা আবার মূল গল্পের নাম) পাখি। ওই ক্লাশে আর কোনো যাত্রী নাই। মানে বাড়তি একটা চরিত্রও থাকবে না এ সিনেমার ভূগোলে। প্রায় প্রতিটি দৃশ্য এভাবে হাজির। মানে হলো লিভিং কোনো জায়গা থেকে দৃশ্যগুলো উৎপাদন হয় না। মন হয় না- জীবনের চলমানতা থেকে দৃশ্যগুলো হাজির। বরং চিত্রনাট্য একটা বাজারের ফর্দ। ফর্দ মেনে চরিত্রগুলো হাজির হয়। তো, শুরুর লঞ্চের দৃশ্যে বলা নাই-কওয়া নাই বাউল ভাই গান শুরু করে, আর বাংলা শুনে পাঞ্জাবি পুলিশ রেগে গিয়ে চড় মেরে বসে। প্রতিবাদ করে সিয়াম। এর পর সিনেমায় সিয়াম আর পুলিশের আরও আরও দৃশ্য দেখবেন। প্রতি দৃশ্যে পুলিশ বলবে, এখানে তোমার কাজ কী। বাহির হও। সিয়াম বাধ্য ছেলের মতো চলে যায়। এই হলো নায়কোচিত ভূমিকা। ভাবখানা যেন এক্সটেনডেড ক্যামিও।

যাই হোক, পুলিশ চলে গেলে এবার দোতারা হাতে সিয়ামই গান ধরে ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসার’। দারুণ নাটকীয়তা। কিন্তু ভাই কীসের সাথে কী মেলালেন। আর এবার কেন পুলিশ এসে আস্ফালন দেখায় না। কারণ, হতে পারে পরিচালক এই গানটা শুনিয়ে একটা আবহ তৈরি করছেন। দর্শককে গল্পের জন্য আগাম প্রস্তুত করে নিলেন। যতদূর অনুমান করা যায় এটা একটা ভুল নির্বাচন। তুচ্ছ এক পুলিশ কর্মকর্তার দাপটের সঙ্গে জাত-পাতের সম্পর্ক স্পষ্ট না! যেহেতু পুরো সিনেমায় দাপটের নামেই তাকে হাস্যকর করে তুলবেন। শুধু এখানেই কেন সিরিয়াস হবেন! হ্যাঁ, এখানে সিনেমা যতটুকু সিরিয়াস, আসলে পুরো সিনেমা ততটুকু সিরিয়াস। এখানেই আটকে থাকে শেষ না হওয়া পর্যন্ত।

তিন.

এরপর ছবি শহর ফেলে গ্রামে গড়ায়। যদিও ছবির পাত্র-পাত্রীদের কথা শুনে মনে হয় এটা মফস্বল বা জেলা শহর। তবে ওই শহরে ছবির পাত্র-পাত্রী ছাড়া আর কাউকে দেখা যায় না। নাটকের দলের আড্ডার দেওয়ার জন্য হিন্দু ধর্মাবলম্বীর চায়ের দোকান আছে বটে। তবে পাসিং শটের প্রয়োজনেও কোনো কাক-পক্ষীর দেখা মেলে না। শুধু যখন যে চরিত্র দরকার সে এসে হাজির হয়। তবে টিভি নাটকের চেয়ে ভালো আয়োজন। আজকাল নাটকে নাকি মা-বাবাও থাকে না, এখানে তা আছেন।

নায়ক-নায়িকার আবার দেখা হয় দীনবন্ধু মিত্রের কালজয়ী নাটক ‘নীল দর্পণ’-এ অভিনয় করতে এসে। এই ব্যাপারটা বেশ লাগে শুরুতে। ব্রিটিশ আর পাকিস্তানি আমলের তুলনা চলে আসে সমান্তরালে। যদিও তখন পাকিস্তানের বয়স মোটে তিন বছর আর ‘নীল দর্পণ’ পয়দা হয় প্রায় শত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে। একটা ‍উপনিবেশ, আরেকটা নিজের দেশ। তবে যেহেতু এখন আমরা ইতিহাস আকারে ঘটনাটা দেখছি- তার ইন্টারপ্রিটেশন আকারেই দেখছি। তাই তাও ভালো। কিন্তু দেখেন কী নীরস ব্যাপার।

পরিচালক তৌকীর আহমেদের সঙ্গে নুসরাত ইমরোজ তিশা ও সিয়াম আহমেদ

‘নীল দর্পণ’-এর ক্ষেত্রমণি আর ‘ফাগুন হাওয়ায়’ ঝুমুরের ধর্ষণ দৃশ্য বিশাল বৈপরীত্য নিয়ে হাজির। নাটকে সাহেবের কাছে ক্ষেত্রমণি কত অনুনয়-আকুতি করে। অন্যদিকে পাকিস্তানি ‍পুলিশ ধর্ষণ করলেও ঝুমুর কোনো প্রতিবাদ করে না বা নিজেকে বাঁচাতে চায় না। অথচ ছবির ভাষ্য এমন- এ দেশের মানুষ পারলে তিন বছরেই পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে যায়। এর পর পুলিশ যখন নাটক দলের বোরকাওলা নারী (সাজু খাদেম) সদস্যকে ধর্ষণ করতে চায়- না হেসে পারি না আমরা। হলসুদ্ধ দর্শক হাসছিল। এই বোরকা আর মুসলমানিত্বের চেতনা প্রবল করে না।

কিন্তু গুরুতর প্রশ্ন মেথরের মেয়ে ঝুমুর আমাদের স্মৃতিতে দুঃখ উৎপাদন করে না কেন? তৌকীর কেন এত লঘু দৃশ্য তৈরি করলেন উত্তর নাই। তবে কী তিনি পাকিস্তানিদের জ্বালানো আগুনেই হাসছেন সিনেমার কাহিনী ভুলে। সেটা পুষ্পের হাসি না। স্রেফ সুড়সুড়ির। নাকি বলতে চাইলেন- ধর্ষণ আমরা উপভোগ করি। তাইলে ঝুমুরকে না মারলেই পারতেন! শুধু শুধু গরীব বলে ধর্ষণ করালেন, মেরেও ফেললেন।

চার.

ছবির ইন্টারেস্টিং দিক হলো ভাষার ব্যবহার (‘ফাগুন’ মনে রেখে)। দর্শকদের নিশ্চয় মনে আছে- আগের সিনেমা ‘হালদা’য় আধাখেচড়াভাবে হলেও তৌকীর আমাদের চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা শুনিয়েছেন। এ নিয়ে প্রচার-প্রচারণায় কত বাতচিত! অথচ দেখেন এ সিনেমায় ঢাকার বাইরে এসেও চরিত্রগুলো গড়গড় প্রমিত বাংলা বলছে। শুধু সাজু খাদেম বা ফজলুর রহমান বাবু ছাড়া। সাজুর উচ্চারণ কোন অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করে না, অন্যদিকে বাবু বিহারি ভাষায় বলেন- যা তার জাতি ও পেশাগত পরিচয়কে তুলে ধরে।

আর নায়কের মা আফরোজা বানুও প্রমিত স্বরে ‘শেষকৃত্য’ জাতীয় শব্দ উচ্চারণ করে। কেন? এর উত্তর জানা নাই। তবে এটা সত্য যে- প্রমিতের আধিপত্যকে প্রচার করছে এই সিনেমা। এমনও হতে পারে- রাষ্ট্রভাষার জন্য আমাদের পূর্বপুরুষরা শহীদ হলেও আন্তর্জাতিকীকরণ ঘটেছে ‘মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে। তাহলে প্রমিত রাষ্ট্রভাষার কাছে বলি হলো মাতৃভাষা, আঞ্চলিক উচ্চারণ। সে ক্ষেত্রে মনে হতে পারে প্রমিতকে উচ্চমান্য করে নতুন আধিপত্যের সূচনা দেখিয়ে দেয় এ ছবি। যদিও তৌকীরের আগের সিনেমা ‘হালদা’ পরের সিনেমার অবস্থানকে খর্ব করে। বিষয়টি উপাদেয়।

ছবির আরও মজার বিষয় হলো- পাকিস্তানিরা বাংলা বলবে না, বাঙালিরা উর্দূ বলবে না। সেটা রাষ্ট্রভাষা বা দাফতরিক আকারে জেদের বিষয়। কিন্তু যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে সমস্যাটা কই- স্পষ্ট না। ঘৃণাই যদি এর কারণ হয় নায়ক কেন উর্দূকে ঘৃণা করে, আবার ঠিক ঠিকই ইংরেজিতে কথা বলে? তার বাবা তো ব্রিটিশদের অত্যাচারে জেলেই মারা গেছে। তাহলে ধরে নিতে হয় বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এ তরুণ আধিপত্যের উপরি তল নিয়ে নাকচ-বিরোধ করে, ভেতরকার দিক নিয়ে তার কোনো আপত্তি নাই।

আর বাংলা সাবটাইটেল জুড়ে এত এত ভুল বানান কেন?

‘ফাগুন হাওয়ায়’ ছবির ট্রেলার

পাঁচ.

টিটো রহমানের গল্পে পাঞ্জাবি পুলিশ ভিন্ন কোনো চরিত্র ছিল না মনোযোগ পাওয়ার মতো। সিনেমায় অবশ্য ভিন্ন। তো, এই পুলিশ কেমন পুলিশ? ছবির শুরুতে দেখি সে মদ খায়। যেহেতু খারাপ মানুষ মদ খায়। আসলেই? সে ঘুষখোর, দুই-চার টাকা গাড়িভাড়াও দিতে চায় না। সে নারীলোলুপ! সে বাঙালিত্বকে ঘৃণা করে, হিন্দুদের ঘৃণা করে। মানে যা কিছু ‘কালো’ সবই তার মধ্যে আছে। শত্রু হিসেবে সে কেমন? মোটা বুদ্ধির এক ভিলেন। তার দাবির মধ্যে কোনো আদর্শিক দিক নাই। অন্তত আমরা তেমন কিছু টের পাই নাই। ফলত তার শত্রু যারা তাকে মোকাবেলা করে তারাও মোটাবুদ্ধির। মানে আমরা বীর রচনা করতে পারি না।

আমাদের গল্প-উপন্যাস-সিনেমায় পাকিস্তানি ভিলেনরা মদ খায়, একে মারে, ওর গরু-ছাগল নিয়ে খেয়ে ফেলে, মেয়েলোক দেখলে ধরে নিয়ে যায়। আর মুক্তিকামীরা এইসব প্রতিরোধ করতে করতে দিনপাত করে, কেউ মারা যায়। তাহলে এখানে শোষণের যুক্তিগুলো কই, আর প্রতিবাদের বুদ্ধিদীপ্ত ভাষ্যগুলো কই। যার মাধ্যমে একটি রাষ্ট্রের অভ্যুদয় হয়। অথচ দেখেন এইখানে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এ কে ফজলুল হক, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানি ও শেখ মুজিবুর রহমানসহ অনেক মহাপুরুষের। এই রাজনীতি বা প্রজ্ঞার প্রতিফলন কই এ সিনেমায়। তার চেয়ে আমাদের লক্ষ্য ভিলেনকে প্রস্রাব খাওয়ানো বা ভূতের ভয় দেখানোতে।

আর তৌকীর যদি বুদ্ধি-বিকলাঙ্গ জাতির উদ্ভব দেখাতে চান, সেটা অন্য বিষয়। এর সঙ্গে আমরা একমত হবো না।

ছয়.

এ সিনেমার মূল চরিত্র ‌‘ঘৃণা’। বাঙালি পাকিস্তানিকে ঘৃণা করে, পাকিস্তানি বাঙালিকে ঘৃণা করে। বাঙালির ঘৃণাকে অপরের ঘৃণার প্রতিত্তরই মনে হয়। কিন্তু বাঙালিকে যেভাবে স্রেফ প্রতিক্রিয়া দেখানো গোয়ার-গোবিন্দ বাঙালি হিসেবে পাই- ব্যাপারটা বোধ হয় এতো সরল নয়। তার কাছে মুক্তির পক্ষে, সাম্যের পক্ষে যুক্তি ছিল। তবে এ ঘৃণার বয়ান হতে পারে সমসাময়িক বাংলাদেশ। কারণ, এখনো অনেক অনায্যতাকে পাকিস্তানের দোহাই দিয়ে পার পাই আমরা। সে ভূত কাঁধে নিয়েই হাঁটলো ‘ফাগুন হাওয়ায়’। একটা ঘরানার বৃদ্ধিবৃত্তিকভাবে ভঙুরতা একুশ শতকের ভূত ভর করেছে ঊনিশশ’ বায়ান্ন সালে। তাহলে কোথায় এগিয়ে থাকলাম আমরা!

তৌকীরের স্বল্পবুদ্ধির বয়ান বেশ হাস্যরস যোগালেও এক জায়গায় এসে আসলে হতবুদ্ধি করে দেয়। যেমন; বাঙালির ‘মাছের ঝোল’ পছন্দ করে না গোশত পাগল পুলিশ অফিসার। অধস্তনরা তার জন্য খাঁচা ভর্তি মোরগ নিয়ে আসে। এর মধ্যে চারটি পোষার জন্য রেখে দেয়। যেগুলোর নাম রাখা হয় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, লিয়াকত আলী, খাজা নাজিমুদ্দীন ও মুহাম্মদ একবাল। যেহেতু চিত্রনাট্যে এদের খাড়া করা হয় কতলের উদ্দেশ্যে। প্রতীকী হলেও ব্যাপারটা তাই। কিন্তু একবাল কেন? স্রেফ পাকিস্তানের আধ্যাত্মিক রূপকার বলে ১৯৩৮ সালে মারা যাওয়া এ কবি-দার্শনিককে আবার কতল করতে হলো। তৌকীর হয়তো ভেবেছিলেন স্রেফ কতলে ঘৃণা প্রকাশ কম হয়ে যাচ্ছে। একটু খিস্তিও দেওয়া যাক। তাই ছবির চরিত্র আদর করে একবালকে বলছে, ‘বাল বাল একবাল’। এ সংলাপ লিখে নিশ্চয় তৌকীর হেসেছেন। আমরাও হেসেছি! হাসির পর কীই থাকে। বলুন?

রচনাকাল : মার্চ ২০১৯

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.