চৈত্রের মাতাল দিনে

এক-দুই, তিন-চার-পাচ-ছয়, সাত-আট, নয়, দশ…
না এগারো, বারোও হতে পারে। আহা, জট পাকিয়ে গেলো। একের পর এক কাক উড়ে এসে বসছে আবার চলে যাচ্ছে।

রহিম বাদশার মাথার ভেতর সংখ্যাগুলো কিলবিল করতে থাকে। কোনটা কেচোর মতো আর কোনটা জোকের মতো। কোনটা অতি সুক্ষ্ণ, কোনটা জটিল। কোনটা লাল, কোনটা নীল। কোনটা যেন মাছির মতো ভো ভো শব্দ করছে। নানা ধরণের শব্দের মাঝে দুনিয়াটা বড়ো হতে থাকে আর রহিম বাদশা ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হতে থাকে।

একটা কোকড়াচুলো কিশোর তার সামনে দিয়ে হেটে যায়। হাতে ঘুড়ি আর নাটাই। সাদা আর কালো ঘুড়ি। এই রং কিশোরবেলার সাথে যায় না। খুব চিন্তিত সে। রহিম বাদশাকে জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা বলেন তো আকাশের তারা কি গণা যায়? কিশোরটি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। কিন্তু কথাগুলো থেকে যায়। একটা মেয়ে আসে। চোখে কাজল দেয়া মিষ্টি মেয়ে। সে বলে, আচ্ছা রহিম বাদশা বলতে পারেন আপনার ঘরে কয়টা মশা গান করছে। তারপর মিষ্টি মেয়েটি অদৃশ্য হয়ে যায়।
এবার সেই বিকট কন্ঠটি সুর করে বলতে থাকে, রহিম আকাশের তারা গুনতে থাকো।
অনেক দূর থেকে কোন এক তরুণী ফিস ফিস করে, না না না।

আপনের কি হইসে?
না কিছু হয় নাই।
তাইলে এই রকম হইয়া আছেন ক্যান?
মাথা ব্যথা হইতেছিল।
বাইত যান ঔষুধ খান।
আস্তে আস্তে রহিমের ঘোর কেটে আসে। মেয়েটার দিকে তাকায়। কোমল ধরণের শ্যামলা মুখ। কিছুটা রোগা। আরো দুই-এক জন মানুষ দাড়াইয়া আছে।
একজন বলে, ভাই আপনের নাম কি?
রহিম বাদশা উত্তর দেয়ার আগে মেয়েটা বলে, ভাই বিরক্ত করেন ক্যান? দেখতেছেন মানুষটার শরীর খারাপ। জিজ্ঞেস করেন নাম। নাম দিয়ে কি করবেন?

লোকজন ধীরে ধীরে সরে আসে। এখন আর দেখার কিছু নাই।
আমার নাম রহিম বাদশা।
আপনের নাম দিয়া কি করুম। বাইত যান।
বাড়ি কেথায় মনে পড়তেছে না।
কি কন। নাম তো মনে আছে।
রহিম কিছু বলে না। লেকের পানি দিকে তাকায়। তারপর বেঞ্চীটার দিকে ফিরে তাকায়। কিছু নাই। আশে পাশে একটাও কাক দেখে যায় না।
আচ্ছা বলেন তো আকাশের তারা কি গণা যায়?
কি কন বুঝি না।
রহিম কিছুটা লজ্জা পায়। কি আবোল-তাবোল বকছে।
আমারে একটু পানি খাওয়াবেন।
মেয়েটা কোত্থেকে যেন মিনারেল ওয়াটারের বোতল নিয়ে আসে।
রহিম বাদশা মুখে আর মাথায় পানি দেয়। কিছু পানি ঢকঢক করে পান করে।
আপনি আমার জন্য অনেক কষ্ট করলেন।
মেয়েটা রহিম বাদশার দিকে তাকায়। যেন তার চেহারার ভেতর কিছু একটা খুজছে।
আমার নাম রূপবান ।

এইটা আমার আসল নাম না। বানাইন্না নাম।
কেন?
আপনি হইলেন রহিম বাদশা। আপনার পাশে অন্য কাউরে তো মানায় না।
মেয়েটা হাসতে থাকে। রহিম হাসার চেষ্টা করে। রূপবানের কথা শুনে সে বেশ মজা পেয়েছে। হাসির মধ্যে কেমন যেন বিষস্ন আবার রোদেলা ছন্দ আছে। তার মনের ভেতরের মেঘ ধীরে ধীরে কাটতে থাকে। কোথায় যেন টান পড়ে।
রূপবান আমার মনে পড়ছে।
কি?
আমার বাসার ঠিকানা।
কোথায়?
এই তো কাছে।
আপনে কি করেন?
একটা কলেজে পদার্থ বিজ্ঞান পড়াই।
এইখানে কি জন্য আইছেন।
এই মাঝে মাঝে পার্কে বসি। বাতাস খাই। গাছ-পালা, মানুষ-জন দেখি ভালো লাগে।
মানুষ-জনের মইধ্যে দেখার কি আছে?
আছে আবার নাইও।
আইজকে আপনার কি হইছিল।
আমার একটা পুরানো অসুখ আছে। ভালো হইয়া গেছিলো। হঠাৎ কেন জানি আজকে ফিরে আসছে।
কি অসুখ?
কি অসুখ- তাতো বিস্তারিক বলতে পারব না। লণ বলতে পারি। আকাশটা বড়ো হয়ে যায়। তারা গুনে শেষ করা যায় না। আমার অস্থির লাগে, ভয় লাগে।
কি বলেন? তারা গুনে কি শেষ করা যায়?
ওফ।
কি হইছে।

রহিম বাদশার বয়স তখন সাত কি আট। রাতের বেলায় বাড়ির উঠোনে চাটাই বিছিয়ে সবাই গল্প করত-ঝগড়া করত। সুখের কথা-দুঃখের কথা বলত। আমবস্যা-পূর্ণিমা কোনটাই বাদ যেতো না। এই পাড়া-ও পাড়া সব যেন উঠোনে এসে জমা হতো। কোথায় কে কি খেল- কার সাথে কার প্রেম, ধর্ম-অধর্ম, মুজিব-জিয়া-এরশাদ, রাজ্যের যত কথা। মা-চাচী-ফুফু-দাদী আর এক দঙ্গল পোনাপান। পাশের বাড়ির বুড়ি-বিবির মা, আরো কতো জন। এমন একদিনে চাটাইয়ের উপরে শুয়ে শুয়ে রহিম বাদশা আকাশের তারা গুনতে থাকে।

কত পর্যন্ত গুনেছিল তার মনে নাই। হঠাৎ খেয়াল করল সে আর চাটাইয়ের উপরে নাই। মাটির দুনিয়ায় নাই। আকাশে ভাসছে। উপরে নীচে সব জায়গায় তারা মিটমিট করছে। কি সুন্দর। জায়গাটা তার বড়ই ভালো লাগল। কিছুটা শীত শীত লাগে। আরামদায়ক কোমল অনুভূতি।
কেউ একজন বলল, বলতো রহিম বাদশা আকাশে কয়টা তারা।
রহিম আবার তারা গুনতে থাকে।
অনন্ত অসীম সময় ধরে গুনতে থাকে। কিন্তু শেষ হয় না। তারার কি কোন শেষ আছে।
তারা গুনতে গুনতে থাকে রহিম ছোট হতে থাকে আর আকাশটা বড় হতে থাকে। এক অসহনীয় ক্ষুদ্রতা, তুচ্ছতার অভিজ্ঞতা লাভ করে। নিজেকে মহাসমুদ্রের মধ্যে হারিয়ে ফেলার বৈচিত্র্য অনুভূতি লাভ করে।
সে চেষ্টা করে গণনা থামাতে কিন্তু কে যেন অবিরত বলতে থাকে, রহিম গুনতে থাকো। গুনতো থাকো। রহিম এরপর যন্ত্র হয়ে যায়। তারা গণনার যন্ত্র।

রূপবান বলে, তারপর কি হইল…।
পানি খাব।
রূপবান পানির বোতলটা এগিয়ে দেয়।
…কষ্ট লাগলে বলার দরকার নাই।

তারপর রহিম বাদশার ভয় ক্রোধ ক্ষোভ আর অস্থিরতায় রূপ নেয়। সে চিৎকার করে গণনায় অস্বীকৃতি জানায়। কিন্তু গলা দিয়ে স্বর নামে না। কে যেন বলতে থাকে, রহিম আরো জোরে। আরো জোরে চিৎকার করো, অস্বীকার করো।
অন্যদিকে আরেকটি কন্ঠ বলতে থাকে, রহিম গুনতে থাকো। গুনতো থাকো।
রহিম অগ্রাহ্য করে। সে চিৎকার করতে থাকে । না না না। কিন্তু কোন স্বর বের হয় না।
একসময় গুনতে থাকো, এই কথার আড়ালে হারিয়ে যায় অস্বীকার করো।
আকাশটা আরো বড়ো হতে থাকে। বড়ো হতে থাকে।
রহিম বাদশার মাথার ভেতর তারার সংখ্যাগুলো কিলবিল করতে থাকে। কোনটা কেচোর মতো আর কোনটা জোকের মতো। কোনটা অতি সুক্ষ্ণ কোনটা জটিল। কোনটা লাল, কোনটা নীল। কোনটা যেন মাছির মতো ভো ভো শব্দ করছে। নানা ধরণের শব্দের মাঝে দুনিয়াটা আরো বড়ো হতে থাকে আর বহিম বাদশা ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হতে থাকে।

তারপর, রহিম নিজেকে আবিষ্কার করে মা আর চাচীর মাঝখানে। দুইজনের উদ্বিগ্ন চেহারা।
কি’রে রহিম কি হইছে।
রহিম বুঝতে পারে না কি বলবে।
কথা বলতে পারে না। গলার স্বর আটকে আসে। শুধু তাকিয়ে থাকে।
অনেকণ পর বলে, মা। মা আমি ভয় পাইছি। আমি দেখছি…।
না, এই রাতের বেলায় কইছ না।
রহিম চুপ করে।
তার গা আবার কাপতে থাকে। সে চোখ করে স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করে।
মা তার বুকে থুথু দিতে বলেন। লবণ খাওয়ান। গোসল করিয়ে দেন। সেই রাতে ভাত খেতে দেন না। ভাত খেলে নাকি ভয়টা ভাতের সাথে পেটে ঢুকে পড়বে। কিন্তু ভয় ঠিকই ঢুকে পড়ে।

এইভাবে প্রতিদিন কখনো অনন্ত অসীম আকাশ আর অগণিত তারা আর কখনো বিশাল বিশাল এক দুই তিন … তার দিকে তেড়ে আসতে থাকে। না ঘুম-না জাগরণ এই এক অদ্ভুত ঘোর।
সে শুধু বলত, না আমি আর গুণব না।
না, কোনভাবেই এই অসুখ যাচ্ছিল না। তার বাবা ডাক্তার-বদ্যি কিছুই বাদ রাখেন নাই।
এর মাস ছয়েক পর গ্রামে আসেন রামগঞ্জের বড়ো পীর সাহেব। মা রহিমকে পীর সাহেবের কাছে নিয়ে গেলেন। সাথে আফরোজা খালা।
তিনি মনোযোগ দিয়ে সব কথা শুনলেন।
সব আল্লাহর ইচ্ছা। তার ইচ্ছা ব্যতিরেকে এই দুনিয়াতে কিছু হয় না। এই বাচ্চা তো মাসুম। এর দিলে কোন পাপ নাই। এর সমাধান আল্লাহ পাকই করবেন।
বাবা তোমার হাতটা দেখি। ..না ডান হাত দেখাও। এই বার বলো তো হাতের আঙ্গুল কয়টা?
পাচটা।
মুখস্থ না গুনে বলো।
রহিম চুপ করে থাকে। সে গুনবে না। গুনতে ভয় পায়। সে যেন শুনতে পায় কে যেন বলছে, না না না না…।
কি হলো বলো।
রহিম বলে না। তার মা আর চাচী বলে, বাবা বল।
রহিম আর পারে না। এক-দুই-তিন-চার-পাচ।
এই তো বাবা পারছো।
এইবার গুনে বলো হাত-পায়ের আঙ্গুল কয়টা?
পীর সাহেব মাথার পাগড়ী খুলে বলেন, দেখি তো আমার কয়টা চুল গুণতে পারো?
রহিম গুনতে থাকে।
তিনি রহিমের মাথায় হাত রেখে পবিত্র কালাম থেকে তেলওয়াত করেন।
থাক আর দরকার নাই। এইতো অনেক পারছো। তাইলে এতো ভয় পাও কেন। আল্লাহ আমাদের শরীর নামের কারখানা দিছেন। সেইখানেও হিসেব নিকেশ আছে। সেইখানেও গণনা শেষ নাই। ভয়ের কিছু নাই। তুমি বলছো তারা গণে শেষ করা যায় না। কে বলছে। তুমি আমি হয়তো পারি না। হয়তো অন্য কেউ পারে। আর কেউ না জানলেও আল্লাহ তো সব জানেন। আল্লাহর দুনিয়ায় আল্লাহ ছাড়া অনন্ত অসীম কেউ নাই। সবকিছুই তার গণনার ভেতর থাকে। সেটারে তুমি শেষ করতে পারো না, মনে করবা সেটা গণনার দায়িত্ব তোমার না। প্রত্যেকের কর্ম সীমিত। সবাই সব কিছু পারে না। আলাহরে স্মরণ করবা। দেখবা কোন বালা-মুসিবত আর নাই, সব মুশকিল আসান হয়ে গেছে।
রহিমের মনে হতে থাকে সবগুলো তারা যেন একটি ধোয়ার কুন্ডুলীর মাঝে মিশে গেলো।
পীর সাহেব কেমন যেন উদাস হয়ে যান। কি যেন ভাবেন, কি যেন খুজেন। তারপর আবার বাস্তবে ফিরে আসেন।
আপনার ছেলে বড়ো ভাগ্যবান। সে অজানারে জানতে চায়। সে নিজের চেয়ে বড়ো জিনিসকে আয়ত্ব করতে চায়। এটা তো আল্লাহর খাস রহমত। আমরা যারে খারাপ বলি-বদ বলি, তার মধ্যে কি হেকমত আছে তা সবসময় বুঝতে পারি না। এই ছেলে অনেক বড়ো হবে।
রহিম আরো স্বাভাবিক হয়ে আসে। মনে বল পাই। পীর সাহেবের গা থেকে আতরের সুবাস পায়। কি চমৎকার সুবাস। চৈত্র দিনের বাতাস সে সুবাস দূরে থেকে দূরে ছড়িয়ে দিচ্ছিল। তারপরেও সেই সুবাসের শেষ নাই।
আজো সেই সুবাস রহিমের নাকে লেগে আছে।
পীর সাহেব গঙ্গাপুর গ্রামে সপ্তাহখানেক ছিলেন। এই গ্রামে তার অনেক ভক্ত। রহিম পুরো সময় তার সাথে সাথে ছিলো। লোকে বলাবলি করছিলো, এই অসুখ তারে কত বড়ো নেককার লোকের সঙ্গ পাওইয়া দিলো। এতো ভাগ্য কয় জনের হয়। আল্লাহর কি মাহিমা।

উদাসিনতা রহিম বাদশার ভর করে। তার মনে হয় সে আবার গণনা ভুলে যাচ্ছে। অনেকদিন তার সংখ্যাভীতি ফিরে এসেছি কি। বেঞ্চটার দিকে তাকায়। না, আর কোন কাক আসে নাই। মনে হচ্ছে আসলে কোন কাকই ছিলো না। সে জেগে জেগে খোয়াব দেখেছে। মনে করার চেষ্টা করে, গত কয়েকদিন সে নিজ সম্পর্কে কি ভেবেছে। সেই ভাবনাগুলো আসলেই কষ্টকর। তার কিছুটা বিশ্রামের দরকার হয়তো।

রহিম বলে, আচ্ছা আপনি কি আকাশের সব তারা গুণতে পারবেন?
আকাশের সব তারা গুণে আপনি কি করবেন।
ঠিক তো। আচ্ছা বলেন তো ঘরের সবগুলো মশা কি গণা যায়।
যায়। যদি আপনে সবগুলো মশা মেরে এক জায়গায় করতে পারেন। তারপর গণলেই হয়ে যাবে।
রহিম এই জবাবে অবাক হয়।
দুইজনে মিলে হাসতে থাকে। অনেকদিন এতো মজার যেন কেউ শুনে নাই।
সেই সুবাসটি তীব্রভাবে টের পায়। অবাক হয়ে আবিষ্কার করে এই সুবাসের ভেতর কি যেন গাণিতিক ছন্দ আছে। সা-রে-গা-মার মতো সুর তুলছে। সুর তুলে অনেক দূরে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু সুবাসের শেষ নাই। হঠাৎ হাওয়া বেড়ে উঠে। ধূলির ঘূর্ণি এগিয়ে আসে। গাছগুলো জোরে জোরে নড়তে থাকে। গান করে। সেই গানেও ছন্দ আছে। তারা দুজন শুনতে থাকে সেই অপার্থিব গান।
আজ কতো তারিখ।
আজ চৈত্র্যের প্রথম দিন।
রূপবান কি চমৎকার সুবাস। তাই না।
কই?
রহিম থমকে যায়। টের পায় এই সুবাসটা কাছাকাছি বসা কারো কাছ থেকে আসছে। রহিমের ইচ্ছে করে তার হাতটা ধরে।
আমি কি তোমার হাত ধরতে পারি।
রূপবানের খিলখিল হাসিতে মাতাল প্রকৃতির নির্জনতা ভেঙ্গে পড়ে। হাওয়ার গতি বাড়তে থাকে।

>ব্যবহৃত ছবিটি একেঁছেন পাখি ও পাপ’ র কবি নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *