অভিযাত্রায় অবতার

কাহিনীকার, চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক ও পরিচালক জেমস ক্যামেরুনের অ্যাভাটার মুভিটি ২০০৯ সালে মুক্তি পায় । মুভিটি দর্শক ও বোদ্ধা উভয়ের কাছ থেকে দারুন সাড়া পেয়েছে। এর সাফল্য তার পরিচালিত ১২ বছর আগের মুভি ‘টাইটানিক’কেও ছাড়িয়ে গেছে। যা ছিলো পশ্চিমা বিনোদন বাণিজ্যে সর্বোচ্চ আয়। ক্যামেরুনের বেশিরভাগ মুভি কল্পবিজ্ঞান ঘরনার। তার কল্পবিজ্ঞান কাহিনীতে মানবজাতির ভবিষ্যতে প্রতি পদেপদে কি ধরনের ভয়ংকর ঘটনার সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে, তার হদিস মেলে। এই ভবিষ্যত অবশ্যই বিজ্ঞান কেন্দ্রিক সভ্যতার অনিবার্য ফলশ্র“তি। সেই ভয়ংকর ভবিষ্যতের বীজ কিন্তু এই বর্তমানেই লুকিয়ে। টার্মিনেটর সিরিজে দেখি বিজ্ঞানে মানুষের এগিয়ে যাওয়া আবার মানুষের সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনার যুগল প্রয়োগ। অ্যাভাটার মুভিতে তিনি তার নির্মিত পূর্বের সব দৃশ্যকল্পকে ছাড়িয়ে গেছেন। কাহিনী এবং নির্মাণ (এটাই প্রথম পূর্ণাঙ্গ থ্রিডি মুভি) দুটোই চোখে পড়ার মতো। এবার তাকে আগের চেয়ে অনেক সুসংহত মনে হয়েছে।

জ্যাক ও নেয়েত্তি চরিত্রে অভিনয় করেছেন স্যাম ওরথিঙটন ও জো স্যালডানা। এই মুভি বেশিরভাগ অংশ থ্রিডি অ্যানিমেশনে রুপান্তরিত। অসাধারণ বর্ণিল সব দৃশ্যের ঝলকানী কল্পনাকে হার মানায় যেন। থ্রিডি চশমার যাদুতে দর্শকদের প্যানডেরায় নিয়ে যায়। যদিও আমরা বাংলাদেশে দেখছি সিনেমা হল থেকে পাইরেটেড ডিস্কে। এই মুভির অসাধারণ মিউজিক করেছেন জেমস হর্নার। যার ঝুড়িতে রয়েছে দ্য বয় ইন দ্য স্ট্রিপড পায়জামা, এপোক্যালিপ্টো, দ্য ফরগোটেন, ট্রয়, দ্য ফোর ফেদারস, টাইটানিক, আ বিউটিফুল মাইন্ড’সহ অসংখ্য বিখ্যাত মুভিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা। অ্যাওয়ার্ড জিতেছেন বেশ কয়েকবার। মুভিটি মুক্তি পেয়েছে ১৮ ডিসেম্বর ২০০৯। এরমধ্যেই সেরা মুভি (ড্রামা) এবং সেরা পরিচালক ক্যাটাগরীতে জিতে নিয়েছে ৬৭ তম গোল্ড্রেন গ্লোব অ্যাওয়াড। অস্কারে ন্যামিনেশন পেয়েছে ৯টি ক্যাটেগরীতে। এছাড়া আরো ১৪টি অ্যাওয়ার্ড ও ৩৩ টি ন্যামিনেশন পেয়েছে এই মুভি।

সময় ২১৫৪ খ্রিস্টাব্দ; এনার্জি বা শক্তি বলতে দুনিয়ায় আর কিছু নাই, মানুষ সব খরচ করে ফেলেছে। শক্তির সব উৎস খালি হয়ে গেছে। ততদিনে নতুন উৎসের সন্ধানে দুনিয়ার আসমানের বাইরেও ঢু মারতে শুরু করেছে মানুষ, নিজের সৌরজগতের বাইরে, এমনকি গ্যালাক্সি থেকে গ্যালাক্সিও পাড়ি দিচ্ছে। এবং মিলে গেছে নয়া জ্বালানি– যা এখনো অবটেইন বা অর্জন করা হয় নাই– আনঅবটেনিয়াম। দূর এক গ্যালাক্সির এক গ্রহ– প্যানডোরা গ্রহে এই আনঅবটেনিয়াম পাওয়া গেল। কিন্তু তা অর্জন করা মুশকিল হয়ে গেলো ওই গ্রহের অধিবাসী না’ভিদের কারণে, অধিবাসীদের কাছে গ্রহের প্রাণ-প্রকৃতি সবই আপন। ছেঁড়াছিঁড়ি খোঁড়াখুঁড়িতে রাজি না তারা। মানুষ ভাবে– না’ভিরা অসভ্য, আদিম। তাই সভ্য হিসেবে এই শক্তি দখলের হক্ব তারা রাখে। কাজেই ‘সভ্য’ মানুষ দখলদারিত্ব কায়েমের অভিযান শুরু করে। জেমস ক্যামেরুনের চলচ্চিত্র অ্যাভাটার শুরু হয় এভাবে।

পরিচালক ক্যামেরন এই অ্যাভাটার ধারণা আমদানী করেছেন, ভারতীয় অবতার ধারণা থেকে। ভারতের প্রাচীন পুরানে দেখা গেছে, দেবতারা মানুষের সুরত আর খাসলতে দুনিয়ায় হাজির হতেন– অবতরণ করতেন, ‘অবতার’ হিসাবে। সেই থেকে শাস্ত্রে এসেছে অবতার ধারণা, ক্যামেরনের অঞ্চলে মানে পশ্চিমে যার নাম এনথ্রোমরফিক কনসেপ্ট। পশ্চিমে দেবতা বদলে গেছেন ‘মানুষের চেয়ে উচু বা নীচু যে কোনো সত্তা’য়– এমন কোনো সত্তায় যখন মানুষের বৈশিষ্ট্য আরোপিত হয়, তারে কয় অবতার।

শক্তির সন্ধানে দুনিয়া আর দুনিয়া ছাড়িয়ে বহুদূরে অভিযাত্রী হওয়ার যেসব কান্ডকারখানা চালায় শক্তিমানেরা, পরিচালক ক্যামেরন এই চলচ্চিত্রে তাদের প্যানডোরা’র বাকসো খুলে দিয়েছেন। পুরো কাহীনি-ই দূর এক গ্যালাক্সির ‘প্যানডোরা’ গ্রহে। বিস্তর ব্যবসাদারওয়ালা কোম্পানীর মালিকের পৃষ্ঠপোষকাতায় এক নির্দয় জেনারেলের নেতৃত্বে ওই গ্রহে ঘাঁটি গেড়েছে সৈনিকরা। কোম্পানীর বিজ্ঞানীরা প্যানডোরার অধিবাসী না’ভিদের ক্লোন শরীর তৈরি করে, যেসব শরীরে প্রবাহিত নির্দিষ্ট মানুষের জীবন। গবেষণাগারে যন্ত্রের মধ্যে থাকে জীবনদায়ী মানুষটি, তার মস্তিষ্ক ও চিন্তা শক্তি চালায় ক্লোন করা না’ভি শরীরটিকে। ক্লোন মিশে যায় সত্যিকারের না’ভি দের সাথে, দরকারি সব তথ্য মেলে, যে তথ্য জমাপড়ে মানুষটির মস্তিষ্কে। ক্লোন করা না’ভি শরীরটি হলো মানুষের অ্যাভাটার।

মিথ ও ধর্ম ছাড়িয়ে এনথ্রোমরফিক ধারণা এবার জায়গা করে নিয়েছে বিজ্ঞানে, অন্তত অ্যাভাটার চলচ্চিত্রে। মূলত যার অ্যাভাটার বানিয়ে গোয়েন্দাগিরি করানোর পরিকল্পনা ছিলো, সেই জীব বিজ্ঞানীকে না’ভি সমাজ বিষয়ে অনেক পড়াশোনাও করিয়েছিল আগ্রাসী বাহীনি। কিন্তু সেই জীববিজ্ঞানী হঠাৎ মারা যায়। নিহত জীববিজ্ঞানীর পক্ষাঘাতগ্রস্থ যমজ ভাই হচ্ছে জ্যাক, যার সাথে মৃত ভাইয়ের জেনেটিক্যালি অনেক মিল। জ্যাক মেরিন সৈনিক ছিলো।

সে জগতে– তার না’ভি দেহের পা থাকে কর্মক্ষম, এমনকি বয়সও কমে যায়। জ্যাক পরিকল্পামাফিক সব কাজ করতে সমর্থ হয়। সে দরকারী তথ্য উপাত্ত যোগাড় করে। এরমধ্যে তার সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে প্যানডেরা’র না’ভি কন্যা নেয়েত্তি’র সাথে। একইসাথে না’ভিদের জীবন-আচরণের গভীরে সে ঢুকে পড়ে। তখন না’ভিদের সহজ-সরল প্রকৃতি বান্ধব জীবনাচরণ আর তার মানবসূলভ যান্ত্রিক লোভাতুর জীবনে দড়ি টানাটানি শুরু হয়। তার লোভের স্থানটায় বসত করে নেয়, প্যানডেরা’র চমৎকার প্রাকৃত জীবনের হাতছানি। শেষ পর্যন্ত জ্যাক না’ভিরূপেই স্থায়ী হয়ে যায় প্যানডেরায়। কিন্তু সে সমাপ্তিতে যেতে অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হয়।

জ্যাকের দ্বৈতজীবন তার কাছে বড়ো ধরনের সমস্যা হয়ে হাজির হয়- নিজের মনুষ্যবোধকে কি আকারে জানান দেবে, আবার ক্ষমতার লড়াইয়ে জাহিরী বিষয় আশয়ের মীমাংসা কোন পথে হবে। এখানে ইনসাফের ধারণাটি মানুষের [কোন মানুষ?] ভালো মন্দ আকারেই নয় বরং প্রচলিত মানবকেন্দ্রিক ইনসাফ বড়ই বেইনসাফী বলে দেখা দেয়। এখানে সে সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে ইনসাফীর ধারণার বিস্তার ঘটেছে ব্যাপকার্থে। সুতারাং, এটাই সহজ যে ইনসাফের ধারণা শুধুমাত্র মানব বলয়ে ধরে রাখার বিষয় নয়। বিশেষ করে জ্যাক এবং জেনারেলের যে দ্বন্দ্ব: সেখানে মানবকেন্দ্রিক বিশ্বসংসার না বিশ্বসংসার নিজেই সবকিছুকে ধারণ করে, এই প্রশ্নে জ্যাক প্রকৃতির অন্তর্গত ভারসাম্য-শৃঙ্খলা মাফিক চলতে বলে সে বিরোধ স্পষ্ট করে তোলে। এখানে ক্ষমতা বিকাশের দিক হতে বিদ্যমান মানুষের স্বভাবের ভেতরই মূল সমস্যা। এই তর্কটা নৈতিক বোধ, না মানবিক বোধ, না স্বভাবজাত প্রকৃতির সম্পর্ক কোন দিক হতে মানুষে হাজির থাকে তা নিরূপন করা কঠিন। ক্যামেরুন প্যানডেরা’সহ সমগ্র জগতসংসারকে শুধু মানুষের চোখ দিয়ে না দেখিয়ে না’ভিদের চোখেও দেখিয়েছেন। যেখানে আজকের মনুষ্য সভ্যতা সবকিছুকে তার নিজের দেখা আর প্রয়োজন দিয়ে ব্যাখ্যা করে।

প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্ক কি? এইভাবে প্রশ্ন করা হলে মানুষ ও প্রকৃতিকে পৃথক মনে হয়। মানুষ ভাবে- সে প্রকৃতিকে যে-রূপে দেখে প্রকৃতি আসলে তেমন। প্যানডেরায় জ্যাক প্রতিকূল কিছু প্রাণীর (তার ধারণায়) মুখোমুখি হয়। সে আগুন জ্বালিয়ে এই প্রাণীগুলোকে তাড়ানোর চেষ্টা করে। পরবর্তীতে এইসব প্রাণীরা তাকে আক্রমণ করে। তখন নেয়েত্তি তাকে বাচাঁয়। সে বলে, জ্যাকের আচরণ শিশুদের মতো। সে ভয় পাচ্ছে কেন? তার উচিত ভয়কে এড়িয়ে চলা। অর্থ্যাৎ প্রকৃতির ভেতরকার সম্পর্ক ভয়ের নয়। যদি ভয়ের হয়, তবে সেই ভয়কে জয় করতে হয়। আর জয়ের প্রশ্ন মানে পরাজয়ের ধারণাকেও টেনে আনা। অর্থ্যাৎ মানুষের সাথে প্রকৃতির সম্পর্ক ভেদের। কারণ মানুষ বলে সে প্রকৃতিকে জয় করেছে, সে প্রকৃতিকে বশ(মানুষ পশুকে বশ মানায়, পরাজিত গোষ্ঠীকে বশ মানায়) মানিয়েছে।

প্যানডেরায় এলিয়েন জ্যাক না’ভিদের সাথে মিশে যায়, শেখে তাদের কথা ও অভ্যস্ত হয় তাদের লোকাচারে। এখানে বৃক্ষ এবং পশুর সাথে না’ভিদের সম্পর্ক নিবিড় ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের। শুধু পরিচিত হতে হয়। তারা পরস্পরকে বুঝতে সক্ষম, তার আবার কায়িক ঘটনাও আছে। এক পর্যায়ে প্যানডেরা’র অবোধ্য ভয়ংকর প্রাণীটি না’ভিদের সাথে মিলে হানাদারের বিরুদ্ধে লড়াই করে। এই লড়াই প্রাণ আর প্রকৃতিকে রক্ষা করার লড়াই, যেখানে তারা কি না’ভি কি বৃক্ষ কেউ আলাদা না। অপর আর আমি আলাদা না। ক্যামেরুনের এই ভাবনাটা ভিনগ্রহের আদলে হাজির হলেও এটা এই পৃথিবীর আদি আর আসল রুপ। বর্তমানে সভ্যদুনিয়ায় এই দ্বন্দ্বটাতে প্রকৃতি হাজির নাই- হাজির আছে কে উন্নত দুনিয়া, কে উন্নয়নশীল আর কে আধা উন্নয়নশীল। সে হিসেবে প্রকৃতির ভাগ-ভাটোয়ারা করে জোর যার মুল্লুক যার নীতি টিকিয়ে রাখা। প্রকৃতি আর আমার নিজের অংশরূপে হাজির নাই। আমি আর অপরের যে ভেদজ্ঞান তা শুধু আমিকেই ধ্বংস করে, অপর আর আমি মিলে যে মহীরূহ তাকে আর বুঝতে দেয় না। এই একাত্ম বোধের ভেতর দিয়ে নির্মিত সভ্যতার অনেক রোগের নিরাময় আছে তা আর বুঝা হয় না। তাই শেষ পর্যন্ত প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা না’ভিরূপে জ্যাককে টিকে থাকতে হয়। হয়তো একজন জ্যাকই সুভাগ্যবান।

জেমস ক্যামেরুনের এই মুভিতে সাম্রাজ্যবাদের বিশ্বব্যাপী আগ্রাসন রূপকার্থে হাজির হয়েছে। এই অর্থে মতাদর্শের ভেতর দিয়ে নির্মিত রাজনৈতিক সংঘাতকে চূড়ান্তার্থে বুঝার নানান উপায় আছে। বিশেষ করে পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সভ্যতা নির্মাণে বিজ্ঞান ভয়াবহ দানব আকারে হাজির। সভ্য এবং অসভ্যদের যুদ্ধের ভেতর যে তথাকথিত সভ্যের জিয়নকাঠি লুকিয়ে আছে তা স্পষ্ট। এই মুভিতে মানুষের চোখে মানুষ সভ্য আর না’ভি’রা অসভ্য ও আদিম। যা অসভ্য ও আদিম তার উপর যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের ন্যায্যতা কথিত সভ্যদের আছে। চলমান সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ যে আসলে প্রাকৃতিক শক্তির উৎস লুন্ঠনের বাণিজ্য তা স্পষ্ট করে বলার কিছু নাই। এর ভেতর দিয়ে সামাজিক এবং প্রাকৃতিক দুই বিপর্যয়ের বীজ লুকিয়ে আছে। একইসাথে ‘অসভ্য’দের ইতিহাস ঐতিহ্য সামাজিক রীতি-নীতি ধর্মের প্রতি বিন্দুমাত্র সহনশীল না হবার যে রীতি(ঘৃণা) তা এই মুভিতে স্পষ্ট। এই মুভিতে প্যানডেরার সেই মহীরুহের পতনের মধ্য দিয়ে প্রতীকায়িত হয়েছে সভ্যদের হিংস্র মনোবৃত্তি- যেখানে অসভ্যদের আত্মপরিচয় আর ঐতিহ্য স্বীকৃত নয়।

একটা যন্ত্র মানে মেশিন যতই নিখুত হোক না কেন, দেখা যায় মেশিনের মধ্যে ভুত ঠিকই আছে। ‘মেশিনের মধ্যে ভুত’ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের জনপ্রিয় ধারণা। এক অর্থে সর্ষের মধ্যে ভুত। জ্যাক তো সেই মেশিনের মধ্যে ভুত। সিস্টেমের মধ্যে থেকে সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ করা যায়। যা পাশ্চাত্যের নানা সিদ্ধান্তমূলক ধারণার ভ্রান্ত প্রমাণ হবার ভেতর দিয়ে স্পষ্ট।

সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনে গোয়েন্দা সার্ভিসগুলোর নানাধরণের নেটওয়ার্ক থাকে। জনমত তৈরি, জনমতকে প্রভাবিত করা এমনকি তাদের একজন হয়ে প্রভাব সৃষ্টিকারী হয়ে উঠা। মনুষ্য জগতে সিক্রেট সার্ভিস এবং নানাধরণের দেশীয় এজেন্টের ভূমিকার কথা স্মরণ রেখেই হয়তো ক্যামেরুন এই প্রক্রিয়ার ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। যেখানে হয়তো নতুন পরিবেশ প্রতিবেশে নতুন শর্ত হাজির হয়, কিন্তু গুণগতভাবে একই ঘটনারই আবির্ভাব ঘটে।

এইসব বিচারে এই মুভিতে ক্যামেরুন কাহিনীর যে উপাদানগুলো ব্যবহার করেছেন, তা আসলে বিশ্বপ্রেক্ষাপটে বিদ্যমান বাস্তবতা। তা হয়তো এই মুভির প্রতি দর্শকদের সাড়া দেয়ার ভেতরকার কারণ। আয়নায় নিজের চেহারা কে না দেখতে চায়। অথবা একজন সফল নির্মাতা জানেন কিভাবে দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হয়। কল্পবিজ্ঞানের আদলে ক্যামেরুন নির্মাণ করেছেন আধুনিক মিথ। মোটাদাগে প্রায় প্রতিটি কল্পবিজ্ঞানের ফর্মেট মিথের মতো নতুন নতুন যুক্তি, সম্ভাবনা ও বিশ্বাসের যাচাইকরণের ভিত্তি তৈরি করে। যেখানে রুপকার্থে একধরনের বাস্তবতা তৈরি করা হয়, যা আসলে বর্তমানকে ভেঙ্গে তার সম্ভাবনাকে আমাদের সামনে মূর্ত করে তোলে।

শেষ বিচারে মানুষ যে সাড়া দিলো তাকে কিভাবে বিচার যায়। আমরা সমস্যা বুঝি, তাহলে এর তৎপরতার রূপটা কি? এই প্রশ্ন মানুষের সম্ভাবনার শর্তগুলোকে নাড়িয়ে দেয়। একই সাথে আমাদের মূঢ়তা আমাদেরই সামনে গল্প কাহিনী গান আকারে হাজির হবার মতো প্রত্যাহিক বাসনার পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। যা আমাদেরই নগ্ন করে প্রকাশ কিন্তু আমরা বিনোদিত হই। এটা কনফেনশন আর রিয়েলিটি শো নির্ভর পুঁজির রঙ্গিন দুনিয়ার ঝলক। হয়তো এই বিচারে অ্যাভাটারের সাফল্য বিনোদন বাণিজ্য সূচকে নতুন পালক লাগানো বৈ কিছুই নয়। এটা হতে পারে। কিন্তু মানুষ তার সমস্যাগুলোকে বুঝতে পারে এবং তার সৃজনশীলতার ভেতর তার ব্যাখ্যা করতে চায়, সেটা কম কি? এই সবকিছুর মধ্য দিয়ে সে অনুকূল হাওয়া পেলে জ্বলে উঠতে পারে। সবশেষে বলা যায়, প্রকৃতির দান-দাক্ষিণ্য, দয়া-মায়া, মমতা, ভালোবাসায় যে প্রকৃতির সকলবিন্দুর ন্যায্য হক্ব রয়েছে এর নিপুণ বয়ান এমন মহাকাব্যিকরুপে সিনেমা পর্দায় খুব কমই দেখা গেছে।

> লেখাটি চিন্তা পত্রিকার সাইটে প্রকাশিত।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *